সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: শরৎ শেষের প্রান্তে এসে পশ্চিমবঙ্গের আকাশ যেন আবারও বর্ষার রঙে রাঙা হয়ে উঠেছে। বঙ্গোপসাগরের উপর তৈরি হওয়া ঘূর্ণিঝড় ‘মন্থা’ (Cyclone Montha) ইতিমধ্যেই উপকূলীয় অঞ্চলগুলিতে তার প্রভাব বিস্তার শুরু করেছে। ভারতের আবহাওয়া দফতর (IMD) জানিয়েছে, এই সাইক্লোনের প্রভাবে দক্ষিণবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গের বেশ কিছু জেলায়, ২৯ অক্টোবর, হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি, উপকূলবর্তী এলাকাগুলিতে ভারী বৃষ্টিপাত ও ঘণ্টায় ৩৫ থেকে ৪৫ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে বলে আশঙ্কা। আবহাওয়া দফতরের কলকাতা আঞ্চলিক কেন্দ্রের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, “সাইক্লোন ‘মন্থা’-র বাইরের ব্যান্ডগুলি উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছে, ফলে দক্ষিণবঙ্গের বেশ কয়েকটি জেলায় বিচ্ছিন্ন ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।” তাপমাত্রা স্বাভাবিকের কাছাকাছি থাকবে, সর্বোচ্চ ২৮-৩০°C এবং সর্বনিম্ন ২২-২৪°C। তবে আর্দ্রতার মাত্রা ৮০-৯০ শতাংশের কাছাকাছি থাকায় জনজীবনে অস্বস্তি বাড়বে।
দক্ষিণবঙ্গে প্রভাব সবচেয়ে তীব্র
কলকাতা (Kolkata), হাওড়া (Howrah), হুগলি (Hooghly), উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা (North & South 24 Parganas), পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর (East & West Midnapore) এবং ঝাড়গ্রাম (Jhargram)-এর মতো জেলাগুলিতে সকাল থেকেই মেঘলা আকাশ ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত চলছে। আইএমডি সতর্ক করেছে যে, কিছু কিছু এলাকায় আজ দুপুরের পর থেকে বজ্রবিদ্যুৎসহ ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে।
আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, “উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের অবস্থা আগামী দুই দিন রাফ থাকবে। তাই ২৮ থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত মৎস্যজীবীদের (Fishermen) সমুদ্রে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।” সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা ২ থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। উল্লেখ্য যে, প্রশাসন ইতিমধ্যে সতর্ক। কলকাতা পুরসভা নিম্নাঞ্চলীয় এলাকায় যেমন বেলেঘাটা, টালিগঞ্জ ও সল্টলেক (Salt Lake) -এ জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় অতিরিক্ত পাম্পসেট চালু রেখেছে। ট্রাফিক পুলিশকেও অতিরিক্ত মোতায়েন করা হয়েছে যাতে বৃষ্টিজনিত যানজট এড়ানো যায়।
কৃষক ও মৎস্যজীবীদের জন্য বিশেষ সতর্কতা
কৃষি দফতর জানিয়েছে, পাকা ধান এবং সবজি দ্রুত কেটে গুদামে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বজ্রপাত ও অতিবৃষ্টিতে ফসল নষ্টের আশঙ্কা প্রবল। আবহবিদদের মতে, “মন্থা”র অস্থির মেঘ-বাহিনী এখনই দুর্বল হবে না। আগামী ৪৮ ঘণ্টা উপকূলীয় পশ্চিমবঙ্গ এবং ওড়িশার (Odisha) উপর তার প্রভাব বজায় থাকতে পারে।
উত্তরবঙ্গে সতর্কতা, তবে তুলনামূলক শান্ত আবহাওয়া
উত্তরবঙ্গের (North Bengal) জলপাইগুড়ি (Jalpaiguri), আলিপুরদুয়ার (Alipurduar), কোচবিহার (Cooch Behar), মালদা (Malda) এবং দক্ষিণ দিনাজপুরে (South Dinajpur) আজ হালকা বৃষ্টি হলেও ২৯ থেকে ৩০ অক্টোবরের মধ্যে বৃষ্টির তীব্রতা বাড়বে বলে জানিয়েছে আইএমডি। দার্জিলিং (Darjeeling) ও কালিম্পং (Kalimpong)-এ বৃষ্টি পাহাড়ি রাস্তাগুলিতে ভিজে পিচ্ছিল অবস্থা তৈরি করতে পারে, যা পর্যটক ও স্থানীয়দের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।IMD-র পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, “উত্তরবঙ্গে ২৯ অক্টোবর থেকে বজ্রপাতসহ মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ দেখা দিতে পারে।” এখানকার তাপমাত্রা ১৮ থেকে ২৮ ডিগ্রির মধ্যে ঘোরাফেরা করবে, ফলে শেষের ঠাণ্ডার আমেজ কিছুটা বজায় থাকবে। অন্যদিকে, চা বাগানের মালিক ও শ্রমিকদের উদ্বেগ বাড়ছে, কারণ অতিরিক্ত বৃষ্টিতে পাতার গুণমান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার, সুন্দরবনের (Sundarbans) মতো নিম্নাঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি বেড়েছে। জেলা প্রশাসন ময়নাগুড়ি (Maynaguri), কোচবিহার ও শিলিগুড়ি (Siliguri)-তে সতর্কবার্তা জারি করেছে, বজ্রপাতের সময় কেউ যেন গাছতলায় বা বৈদ্যুতিক খুঁটির কাছে আশ্রয় না নেয়।
আবহাওয়াবিদরা মনে করছেন, “মন্থা”র মতো ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা জলবায়ু পরিবর্তনের (Climate Change) সঙ্গে সম্পর্কিত। বঙ্গোপসাগরের জলের উষ্ণতা বাড়ায় এমন ঘূর্ণিঝড় দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করছে, যার প্রভাব দক্ষিণবঙ্গ থেকে উত্তর-পূর্ব ভারত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। প্রশাসনের তরফে সাধারণ মানুষকে অনুরোধ করা হয়েছে, অপ্রয়োজনে বাইরে না বেরোতে, পুরনো ভবনের নিচে না দাঁড়াতে এবং বজ্রঝড়ের সময় বৈদ্যুতিক সংযোগ থেকে দূরে থাকতে। আবহবিদদের কথায়, ‘সতর্ক থাকুন, আতঙ্ক নয়।’



