সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: দেশের বাঙালি ঐতিহ্য ও অস্মিতাকে নতুনভাবে শ্রদ্ধা জানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (PM Narendra Modi)। রবিবার ‘মন কি বাত’ (Mann Ki Baat)-এর ১২৭তম পর্বে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি স্মরণ করলেন ভারতের জাতীয় স্তোত্র ‘বন্দেমাতরম’ (Vande Mataram) -এর ১৫০ বছরের যাত্রাপথকে। তুলে ধরলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (Bankim Chandra Chattopadhyay) -এর সেই অমর সৃষ্টি, যা একসময়ে স্বাধীনতার আন্দোলনে দেশজুড়ে জ্বালিয়েছিল দেশাত্মবোধের প্রদীপ। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বন্দেমাতরম কেবল একটি গান নয়, এটি আমাদের সভ্যতার ভিত্তি। এই দুটি শব্দ প্রতিটি ভারতীয় হৃদয়ে এক অদম্য আবেগ সৃষ্টি করে। মাতৃভূমির প্রতি ভালবাসার যে শক্তি ‘বন্দেমাতরম’-এর মধ্যে নিহিত, তা যুগ যুগ ধরে মানুষকে একসূত্রে বেঁধে রেখেছে।”
তিনি আরও বলেন, “দেশের ১৪০ কোটি নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ রাখার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে এই গানটির মধ্যে। যখনই কোনও বিপদ আসে, তখন ‘বন্দেমাতরম’ স্তুতি করুন, তা আমাদের সাহস ও দেশপ্রেমকে আরও দৃঢ় করবে।” প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি শুধু ইতিহাস স্মরণ করাতে চান না, বরং জাতির নতুন প্রজন্মকেও মাতৃভূমির প্রতি গর্ববোধে উদ্বুদ্ধ করতে চান।
১৮৭৬ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সংস্কৃত ও বাংলার মিশ্রণে ‘বন্দেমাতরম’ রচনা করেন। পরে ১৮৮২ সালে ‘আনন্দমঠ’ (Anandamath) উপন্যাসে এটি প্রকাশিত হয়। সেই গানই ক্রমে পরিণত হয় ভারতের জাতীয় স্তোত্রে। আসন্ন বছর পূর্ণ হবে তার ১৫০ বছর। সেই উপলক্ষ্যে বিশেষ উদযাপনের ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, “চলুন, এই ১৫০ বছরকে স্মরণীয় করে রাখি। দেশের প্রতিটি মানুষ যেন মাতৃভূমির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন ‘বন্দেমাতরম’-এর মাধ্যমে।”
মোদীর ভাষণে উঠে এসেছে আরও একটি ঐতিহাসিক তথ্য। তিনি জানান, “বন্দেমাতরম প্রথম গেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore)। তাঁর কণ্ঠেই এই গান প্রথম প্রকাশ্যে পরিবেশিত হয়।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে মোদী কেবল বঙ্কিমচন্দ্রকেই নয়, রবীন্দ্রনাথকেও শ্রদ্ধা জানালেন, যিনি গানটির মাধ্যমে এক সুরেলা ঐক্যের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছিলেন। উল্লেখ্য যে, ‘মন কি বাত’-এর এই পর্বে প্রধানমন্ত্রী আরও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গের উল্লেখ করেছেন। বল্লভভাই প্যাটেল (Sardar Vallabhbhai Patel) -এর ১৫০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “দেশের ঐক্য, অখণ্ডতা ও পরিশ্রমের প্রতীক প্যাটেল সাহেবের জন্মবার্ষিকী আমাদের সকলের প্রেরণার উৎস।”
এছাড়া মোদী জানিয়েছেন, ‘এক পেড মাকে নাম’ (Ek Ped Maa Ke Naam) উদ্যোগকে আরও বিস্তৃতভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে, যেখানে প্রতিটি নাগরিককে নিজের মায়ের নামে অন্তত একটি গাছ লাগানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, “মাতৃভূমির প্রতি শ্রদ্ধা শুধু কথায় নয়, কর্মে প্রকাশ পেতে হবে। সেই জন্যই প্রতিটি নাগরিক যদি একটি গাছ মায়ের নামে রোপণ করেন, তবে তা হবে দেশের জন্য এক বিশাল অবদান।”
প্রধানমন্ত্রী মোদী দেশের নিরাপত্তারক্ষীদের প্রশংসাও করেছেন এই পর্বে। বিশেষ করে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ (BSF), সিআরপিএফ (CRPF) -এর ভারতীয় সেনা কুকুরদের (Army Dogs) ভূমিকার কথাও তিনি স্মরণ করেন। তাঁর কথায়, “গতবছর আমাদের সেনা কুকুররা মাওবাদী অধ্যুষিত ছত্তীসগড়ে (Chhattisgarh) ৮ কেজিরও বেশি বিস্ফোরক খুঁজে বের করেছিল। তারা দেশের অজানা নায়ক। তাদের সাহস ও সংবেদনশীলতা অসাধারণ।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শুধু সৈনিকদের নয়, তাদের প্রশিক্ষিত সহচর প্রাণীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
‘মন কি বাত’-এর এই পর্বে প্রধানমন্ত্রী মোদীর কণ্ঠে একদিকে যেমন শোনা গেল বাঙালি গর্বের সুর, অন্যদিকে উঠে এল ভারতীয় ঐক্য ও দেশপ্রেমের এক মিশ্র সঙ্গীত। তাঁর বার্তায় স্পষ্ট, ভারতীয় সভ্যতার শক্তি নিহিত রয়েছে আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারেই। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, প্যাটেল এই সকল মহাপুরুষের চেতনা আজও ভারতের মেরুদণ্ডকে শক্ত রাখে। মন কি বাত-এ এদিন প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের স্বাধীনতা কেবল অতীত নয়, তা এক চিরন্তন যাত্রা। ‘বন্দেমাতরম’-এর ১৫০ বছর আমাদের স্মরণ করিয়ে দিক, এই মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসাই ভারতের প্রকৃত শক্তি।” উল্লেখ্য, ‘মন কি বাত’-এর এই পর্ব তাই শুধু এক রেডিও অনুষ্ঠান নয়, তা হয়ে উঠল এক সাংস্কৃতিক সংলাপ, যেখানে ইতিহাস, আবেগ ও ভবিষ্যৎ একসূত্রে গাঁথা হল ‘বন্দেমাতরম’ -এর সুরে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi Japan Visit | মোদীর জাপান সফর: কৌশলগত অংশীদারি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত




