সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ফ্রান্সের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক ও চাঞ্চল্যকর দিন মঙ্গলবার। দেশটির প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজ়ি (Nicolas Sarkozy) অবশেষে প্রবেশ করলেন প্যারিসের দক্ষিণে অবস্থিত লা সাঁতে (La Santé) জেলে। পাশে ছিলেন তাঁর স্ত্রী, গায়িকা ও প্রাক্তন সুপারমডেল কার্লা ব্রুনি (Carla Bruni)। ফ্রান্সে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম কোনও প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জেলবন্দী হলেন। শুধু তাই নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইতিহাসেও এই প্রথমবার কোনও প্রাক্তন রাষ্ট্রপ্রধান কারাদণ্ডের মুখে পড়লেন। সারকোজ়ির বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২০০৭ সালের নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি লিবিয়ার (Libya) প্রাক্তন নেতা মুয়াম্মর গাদ্দাফির (Muammar Gaddafi) কাছ থেকে অবৈধভাবে তহবিল সংগ্রহ করেছিলেন। আদালতের মতে, ওই তহবিলই তাঁর নির্বাচনী প্রচারের বড় অংশে ব্যবহার হয়। দীর্ঘ তদন্ত, সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে অবশেষে প্যারিসের আদালত তাঁকে পাঁচ বছরের সাজা দেয়।
২০০৭ থেকে ২০১২ পর্যন্ত ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে ছিলেন সারকোজ়ি। ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তবে এই মামলায় সাজা ঘোষণার পরও সারকোজ়ি দাবি করেছেন তিনি “সম্পূর্ণ নির্দোষ”। আদালতের রায় শোনার পর তাঁর সমাজমাধ্যমে পোস্ট করা বার্তায় লেখা ছিল, “আমি নির্দোষ, এটি একটি আইনের কেলেঙ্কারি (judicial scandal)।” মঙ্গলবার দুপুরে প্যারিসের বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় সারকোজ়ির পাশে ছিলেন তাঁর স্ত্রী কার্লা ব্রুনি। তিনি স্বামীর হাত ধরে সাংবাদিক ও উপস্থিত জনতার সামনে দাঁড়ালেও কোনও বক্তব্য দেননি। সারকোজ়ি গাড়িতে ওঠার আগে বাইরে ভিড় করা সমর্থকদের দিকে হাত নাড়েন। উপস্থিত জনতার মধ্যে অনেকেই ‘সারকোজ়ি, সারকোজ়ি’ বলে চিৎকার করছিলেন। তাঁদের চোখে ছিল হতাশা ও ক্ষোভের মিশেল।জেলে প্রবেশের সময় সারকোজ়ির অনুরোধে কোনও সাংবাদিককে ছবি তুলতে দেওয়া হয়নি। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় লা সাঁতে জেলে। আপাতত আগামী পাঁচ বছরই সেই জেলেই থাকবেন তিনি, যদিও তাঁর আইনজীবীরা আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

আইনজীবী থিয়েরি হার্জগ (Thierry Herzog) জানিয়েছেন, “আমরা আদালতের রায় মানি না। আগামী দুই মাসের মধ্যে আপিল করা হবে। আমরা আশা করি, আদালত ন্যায়বিচার করবে।” তিনি আরও বলেন, “এই রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সারকোজ়ির জনপ্রিয়তা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে নষ্ট করতেই এ পদক্ষেপ।” সারকোজ়ির পরিবারও এখন এই কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাঁর ছেলে লুই সারকোজ়ি (Louis Sarkozy), তিনি আগামী বছর মেনটনের (Menton) মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন, জনগণকে বাবার সমর্থনে রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “আমার বাবা একজন সৎ মানুষ। যেভাবে তাঁকে অপমান করা হচ্ছে, তা গণতন্ত্রের অপমান।” ফ্রান্সের রাজনৈতিক মহলে এই ঘটনা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ কেউ বলছেন, এটি ফরাসি বিচারব্যবস্থার দৃঢ়তার প্রমাণ। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ (François Hollande) মন্তব্য করেছেন, “আইনের চোখে কেউই ঊর্ধ্বে নয়, এমনকি প্রাক্তন প্রেসিডেন্টও নয়।” তবে সারকোজ়ির ঘনিষ্ঠ মহল মনে করছে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ষড়যন্ত্রেই তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনাটি ফরাসি রাজনীতিতে নতুন দিগন্ত খুলে দিল। সাংবাদিক জুলিয়েন ডুবোয়া (Julien Dubois) বলেছেন, “এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত পতনের গল্প নয়, বরং ফরাসি গণতন্ত্রের নৈতিক পরীক্ষাও।” তিনি আরও যোগ করেন, “ফ্রান্সে রাজনীতিবিদদের দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতার প্রশ্নে এটি এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।” আদালতের নিয়ম অনুযায়ী, সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি প্রমাণ নষ্ট করার আশঙ্কা না থাকে, তাহলে তাঁকে বাড়িতে গৃহবন্দি রাখার নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে। সারকোজ়ির আইনজীবীরা সেই আবেদনও করেছেন। আদালত আগামী দুই মাসের মধ্যে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আদালত তাঁকে তাড়াতাড়ি মুক্তি দেবে না, কারণ তাঁর বিরুদ্ধে এখনও আরও দুটি দুর্নীতির মামলা বিচারাধীন। ফ্রান্সের জনজীবনে সারকোজ়ির জনপ্রিয়তা আজও যথেষ্ট। তাঁর নেতৃত্বে দেশটি একসময় ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সংকটের মোকাবিলা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কলঙ্কিত হল অর্থ কেলেঙ্কারির ছায়ায়।
সারকোজ়ির কারাবাস শুধু এক ব্যক্তির পতন নয়, এটি ফরাসি সমাজের চোখে এক কঠিন বাস্তবতা, যেখানে ক্ষমতা, প্রভাব, ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যও আইনের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত নয়। ফ্রান্সের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজ়ি (Nicolas Sarkozy) লিবিয়া থেকে বেআইনি তহবিল সংগ্রহ মামলায় দোষী সাব্যস্ত। স্ত্রী কার্লা ব্রুনির হাত ধরে প্যারিসের জেলে প্রবেশ করলেন।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ উনিশ-তম কিস্তি)




