সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ পাটনা : বিহার বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিরোধী শিবিরে শুরু হয়েছে প্রবল টানাপোড়েন। ঠিক এমন সময়েই চমকে দেওয়া সিদ্ধান্ত নিল ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা (JMM)। শনিবার হঠাৎই ঘোষণা করল তারা বিহার নির্বাচনে অংশ নেবে না। দলীয় নেতৃত্বের দাবি, আরজেডি (RJD) ও কংগ্রেসের (Congress) রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে তারা। তাই অপমানের প্রতিবাদে ভোট থেকে সরে দাঁড়ানোই একমাত্র পথ বলে জানাল হেমন্ত সোরেনের (Hemant Soren) দল।
ঝাড়খণ্ডের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের নেতৃত্বাধীন জেএমএম দীর্ঘদিন ধরেই ইন্ডিয়া জোটের (INDIA Alliance) অংশ হিসেবে কাজ করে আসছিল। কিন্তু বিহার বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সেই বন্ধুত্বে ফাটল ধরেছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। জেএমএমের অভিযোগ, জোটের বড় দুই শরিক কংগ্রেস ও আরজেডি তাদের যথাযোগ্য সম্মান দিতে ব্যর্থ। তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে রাজনৈতিক লাভ তোলার চেষ্টা করেছে।জেএমএমের কেন্দ্রীয় নেতা সুদিব্য কুমার (Sudivya Kumar) তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “২০২০ সালের বিহার নির্বাচনের আগে আরজেডি ও কংগ্রেস আমাদের তিনটি আসন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা হয়। এবারে আবারও একই রকম আচরণ করা হল। আমাদের সঙ্গে প্রতারণা হয়েছে। আমরা এটার যোগ্য জবাব দেব।” তিনি আরও বলেন, “ঝাড়খণ্ডে যখন বিধানসভা নির্বাচন হয়েছিল, তখন জেএমএম উদারতার সঙ্গে কংগ্রেস, আরজেডি ও বামেদের জন্য উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু বিহারে এসে আমাদের সম্মান দেওয়ার বদলে হেনস্থা করা হল। এটা শুধু অন্যায় নয়, এক ধরনের রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা।”
শনিবার এক দলীয় সভায় জেএমএমের মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সুপ্রিয় ভট্টাচার্য (Supriyo Bhattacharya) ঘোষণা করেন, “আমরা বিহারে ইন্ডিয়া জোটের সঙ্গে থেকে ভোটে লড়াই করব না। তা নিজেদের সংগঠনের শক্তি যাচাই করতে একাই লড়ব।” তিনি জানান, দলটি ছয়টি আসনে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, চাকাই (Chakai), ধামানদাহ (Dhamdaha), কাটোরিয়া (Katoria – ST), মণিহারি (Manihari – ST), জামুই (Jamui) এবং পিরপাইনটি (Pirpainti – SC)। কিন্তু শেষ পর্যন্ত, সমস্ত অপমানের জবাবে তারা নির্বাচনী লড়াই থেকেই পুরোপুরি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জেএমএমের এই পদক্ষেপ বিহার নির্বাচনে বিরোধী জোটের পক্ষে বড় ধাক্কা। কারণ, এই দলটির ভোটব্যাঙ্ক বিশেষত সাঁওতাল এবং আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে যথেষ্ট প্রভাবশালী। সেখানে জেএমএম প্রার্থী না থাকলে বিজেপি (BJP) ও জেডিইউর (JDU) লাভ হতে পারে।
অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরের দুই বড় শরিক কংগ্রেস ও আরজেডির মধ্যে আসন রফা নিয়ে এখনও জট কাটেনি। সূত্রের খবর, কংগ্রেস যেখানে অন্তত ৮০টি আসন চাইছে, সেখানে আরজেডি তাদের দিতে রাজি মাত্র ৬০টির মতো আসন। এই দড়ি টানাটানির মধ্যেই বিহারের নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন সঙ্কট তৈরি হল জেএমএমের এই সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক অনিরুদ্ধ ঝা বলেন, “ইন্ডিয়া জোট গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ঐক্যবদ্ধ বিরোধী মঞ্চ তৈরি করে বিজেপিকে হারানো। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, জোটের মধ্যেই অসন্তোষ তীব্র হয়ে উঠছে। ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার এই পদক্ষেপ সেই অন্তর্দ্বন্দ্বের স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ।” তবে জেএমএম নেতৃত্বের বক্তব্য, তারা আপাতত পিছু হটলেও ভবিষ্যতে “উপযুক্ত সময়ে” এর জবাব দেবে। হেমন্ত সোরেনের ঘনিষ্ঠ এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা শুধু বিহার থেকে সরে দাঁড়িয়েছি, কিন্তু রাজনীতির ময়দান থেকে নয়। অপমানের জবাব আমরা ঠিকই দেব, সময়ই সেটা বলে দেবে।”
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই ঘটনাটি ইন্ডিয়া জোটের ঐক্যে ফাটল ধরার আরেকটি উদাহরণ। কয়েকদিন আগেই পশ্চিমবঙ্গে আসন ভাগাভাগি নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল। এখন ঝাড়খণ্ডের জেএমএমও একইভাবে অসন্তোষ প্রকাশ করল। যা বিরোধী ঐক্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এদিকে, বিজেপি শিবির এই পরিস্থিতিকে নিজেদের পক্ষে সুযোগ হিসেবে দেখছে। বিজেপি নেতা সঞ্জয় জয়সওয়াল (Sanjay Jaiswal) বলেন, “বিরোধীদের জোট কাগজে-কলমে আছে, বাস্তবে নয়। তারা নিজেদের মধ্যে আসন ভাগ করতেই ব্যর্থ। জনগণ বুঝে গিয়েছে, ওরা শুধু ক্ষমতার লড়াই করছে, মানুষের স্বার্থ নয়।”
বিহারের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, আগামী ১১ নভেম্বর দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে এই নাটকীয় মোড় বিরোধীদের গণিত অনেকটাই বদলে দিতে পারে। জেএমএমের সরে দাঁড়ানো মানে বিরোধী শিবিরে ভোটবিভাজন আরও গভীর হবে, যার সুফল সরাসরি পেতে পারে বিজেপি ও জেডিইউ।হেমন্ত সোরেনের দল যদিও জানিয়ে দিয়েছে, তারা কোনও রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না। বরং নিজেদের মর্যাদা রক্ষার জন্যই এই কঠিন সিদ্ধান্ত। সুপ্রিয় ভট্টাচার্যের ভাষায়, “আমরা এক পা পিছু হটেছি, কিন্তু মাথা নত করিনি। আমাদের নীতি, আমাদের সম্মান, এই দুইয়ের সঙ্গে কোনও আপস নয়।”
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : BiharPolitics2026, Bihar Vote 2025 | বিহারের রাজনৈতিক অজ্ঞতার ছবি ২০২৬: উন্নয়নের মুখোশে এক বিভ্রান্ত জনমত




