সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: ভূরাজনীতির টানাপোড়েনে দমে যায়নি ভারত। মার্কিন চাপে মস্কো থেকে তেল কেনা বন্ধ হবে, এমন জল্পনায় জল ঢেলে দিল অক্টোবরের শুরুতেই প্রকাশিত আমদানি-তথ্য। অক্টোবর মাসের প্রথম ১৫ দিনেই রাশিয়া (Russia) থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করেছে ভারত। যেখানে সেপ্টেম্বর মাসে প্রতিদিন ১৬ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি হয়েছিল, সেখানে অক্টোবরের প্রথম পনেরো দিনেই সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিদিন প্রায় ১৮ লক্ষ ব্যারেল। অর্থাৎ মাত্র এক মাসে রাশিয়া থেকে আমদানি বেড়েছে আড়াই লক্ষ ব্যারেল প্রতিদিন।
বৈদেশিক কূটনীতিক মহল বলছেন, আন্তর্জাতিক তেল বাজারে ওঠানামা এবং ইউরোপের চাহিদা হ্রাসের ফলে রাশিয়া ভারতের মতো বড় ক্রেতাদের জন্য নতুন ছাড় ঘোষণা করেছে। ফলে ভারতীয় সংস্থাগুলি (Indian oil firms) সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আগাম বরাতের মাধ্যমে রাশিয়ান তেল কেনার অঙ্ক আরও বাড়িয়েছে। সাধারণত তেল আমদানির চুক্তি কয়েক সপ্তাহ আগেই হয়, তাই অক্টোবর মাস শেষে এই বৃদ্ধির প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জুন মাসে প্রতিদিন ২ লক্ষ ব্যারেল তেল রাশিয়া থেকে কেনার পর জুলাই থেকে আমদানির পরিমাণ কিছুটা কমেছিল। তখনই মার্কিন প্রশাসনের তরফে চাপ আসে ভারতীয় সরকারের ওপর, রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমানোর জন্য। তবে দিল্লি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়, ভারতের জ্বালানি প্রয়োজনের ভারসাম্যই হবে তার অগ্রাধিকার, কোনও বিদেশি দেশের চাপ নয়।প্রসঙ্গত, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) সম্প্রতি দাবি করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) নাকি তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন, ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করবে। শুক্রবারও তাঁর মুখে একই কথা শোনা যায়। কিন্তু বাস্তব তথ্য একেবারেই অন্য ছবি দেখাচ্ছে। ভারতীয় সরকারি সূত্রের ব্যাখ্যা, ‘আমাদের লক্ষ্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কোথা থেকে তেল আসবে, সেটা ভারতের নীতি নির্ধারণ করবে, বাইরের কোনও চাপ নয়।’
২০১৯-২০ অর্থবর্ষে ভারতের মোট আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের মধ্যে রাশিয়ার অংশ ছিল মাত্র ১.৭ শতাংশ। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশে। অর্থাৎ মাত্র চার বছরের ব্যবধানে রাশিয়া ভারতের প্রধান তেল সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়েছে। এখন ভারতের তেল আমদানির প্রথম উৎস রাশিয়া। দ্বিতীয় স্থানে ইরাক (Iraq), যারা প্রতিদিন ১০ লক্ষ ব্যারেলেরও বেশি তেল রপ্তানি করছে। তৃতীয় স্থানে রয়েছে সৌদি আরব (Saudi Arabia), যেখান থেকে ভারত প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৮ লক্ষ ব্যারেল তেল কিনছে। চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে আমেরিকা (United States), সংযুক্ত আরব আমিরশাহিকে (UAE) পিছনে ফেলে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় ৬ লক্ষ ৪৭ হাজার ব্যারেল তেল ভারতকে সরবরাহ করছে।বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ অরবিন্দ গুপ্ত বলেন, ‘ভারত খুব কৌশলগতভাবে নিজের জ্বালানি সরবরাহের মানচিত্র বদলাচ্ছে। রাশিয়া থেকে কম দামে তেল আমদানি ভারতের অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক, কারণ এটি সরাসরি শিল্পক্ষেত্র ও ভোক্তা বাজারে প্রভাব ফেলে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ভারত তেল আমদানি বন্ধ করেনি, বরং নিজেদের স্বার্থে বিকল্প পথ বেছে নিয়েছে। এটাই বাস্তবনীতি।’
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক তেল বাজারে রাশিয়ান তেল এখনও ১৫-২০ শতাংশ কম দামে পাওয়া যাচ্ছে বলে জানা গেছে। ফলে ভারতীয় রিফাইনারি সংস্থাগুলি যেমন, ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন (Indian Oil Corporation), ভারত পেট্রোলিয়াম (Bharat Petroleum), ও হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম (Hindustan Petroleum), রাশিয়া থেকে তেল কিনে তার একটি অংশ পুনঃরপ্তানির দিকেও নজর দিচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত ভারতের রপ্তানি আয়ে অতিরিক্ত গতি এনে দিতে পারে। বিশ্লেষক অনিরুদ্ধ দাস বলেন, ‘রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের এই সম্পর্ক শুধু জ্বালানি নয়, এটি কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের ইঙ্গিত। আগামী বছরগুলিতে এই প্রবণতা আরও বাড়বে।’
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বাড়ায় ভারতের মোট আমদানির ব্যয় কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু তেলের গড় ক্রয়মূল্য কমে এসেছে। এই পার্থক্যই ভারতের আর্থিক স্থিতি শক্তিশালী রাখছে। ফলে, আন্তর্জাতিক চাপ থাকলেও, ভারত আপাতত নিজস্ব জ্বালানি কূটনীতির পথে অবিচল রয়েছে। উল্লেখ্য, অক্টোবর মাস শেষ হওয়ার আগেই যদি রাশিয়া থেকে তেল আমদানির এই ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে চলতি অর্থবর্ষে ভারতের আমদানির ইতিহাসে এটি হবে নতুন এক রেকর্ড। ভূরাজনৈতিক চাপ ও মার্কিন সমালোচনার মধ্যেও দিল্লির এই অবস্থান দেখিয়ে দিচ্ছে, ভারতের জন্য ‘জ্বালানি নিরাপত্তা’ই আজ সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অগ্রাধিকার।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : India Russia Relation | ভারত-রাশিয়ার অটুট বন্ধুত্ব: লাভরভের বার্তা, ‘যে-ই ভাঙতে চাইবে, ব্যর্থ হবেই’




