শোভনা মাইতি, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : রাজনীতির মঞ্চে পশ্চিমবঙ্গ যেন অদ্ভুত দ্বন্দ্বে আটকে আছে, একদিকে তৃণমূল কংগ্রেস তার দশ বছরের শাসন ধরে রাখার লড়াই চালাচ্ছে, অন্যদিকে বিজেপি (BJP) সেই জমিতে নিজেদের রাজনৈতিক শিকড় গভীর করছে এক সংগঠিত ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের মাধ্যমে। আজ প্রশ্ন উঠছে, “কেন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছে?”এই উত্তরের খোঁজ মেলে রাজ্যের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে, ভোটারদের মনোভাবের পরিবর্তনে এবং বিজেপির নিখুঁত মাঠপর্যায়ের সংগঠনে। বিজেপি বুঝে গিয়েছে, বাংলার ভোটারদের মন কেবল আবেগে নয়, এখন বাস্তবতায় চলে। বেকারত্ব, দুর্নীতি, নারী সুরক্ষা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, এই প্রতিটি ইস্যুকে তারা রাজনৈতিক ভাষায় রূপান্তর করেছে। তৃণমূল যেখানে সরকারি ভাতা ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিতে নির্ভর করছে, বিজেপি সেখানে “দুর্নীতিমুক্ত শাসন ও সাংস্কৃতিক গর্ব”-এর স্লোগানে মানুষের আস্থা অর্জন করছে।
রাজ্যের মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) -এর শাসনে একসময় যে উদ্যম ছিল, তা এখন অনেকটাই ক্লান্ত। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, SSC কেলেঙ্কারি, ও প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা, এগুলি মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত ভোটারদের মনে ক্ষোভ তৈরি করেছে। বিজেপি সেই ক্ষোভকে ‘বিকল্প রাজনীতি’র রূপ দিয়েছে।
সাংগঠনিক শক্তি ও RSS-এর ভূমিকা
বিজেপির সবচেয়ে বড় শক্তি তার সংগঠন। আরএসএস (RSS)-এর মাধ্যমে বুথস্তরে এমন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে যা বামফ্রন্টের আমলেও দেখা যায়নি। প্রতিটি ওয়ার্ড, গ্রাম ও শহরে “পেজ প্রমুখ”, “বুথ প্রতিনিধি”, “প্রচারক দলে” যুক্ত রয়েছে। এই সংগঠন শুধু ভোটের সময় নয়, সারা বছর ধরে কাজ করে : দুর্গাপুজো, রক্তদান শিবির, বন্যা সাহায্য, মেডিক্যাল ক্যাম্প প্রতিটি সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিজেপি নিজেকে যুক্ত রাখছে। এতে মানুষের মনে এই ভাবনা জন্মেছে যে, “ওরা শুধু ভোটের সময় আসে না।”এই ধারাবাহিক যোগাযোগই বিজেপির জনপ্রিয়তার অদৃশ্য শক্তি।
নেতৃত্ব ও মোদী ফ্যাক্টর (Modi Factor)
নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) এখনও দেশের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক মুখ। তাঁর জনপ্রিয়তা পশ্চিমবঙ্গেও প্রভাব ফেলছে। মোদীর উন্নয়নমুখী ভাবমূর্তি, আত্মনির্ভর ভারত, কর-মুক্ত প্রকল্প, এবং দুর্নীতি-বিরোধী বক্তব্য, এসবই বিজেপিকে জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে। বাংলার মানুষ মনে করে, “দিল্লিতে মোদী থাকলে, রাজ্যে উন্নয়নের গতি বাড়বে।” এই ধারণাই বিজেপিকে ‘পরিবর্তনের বিকল্প’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিজেপি কৌশলে ধর্মীয় আবেগকে সংস্কৃতি ও গর্বের রাজনীতি-এর সঙ্গে মিশিয়েছে। “জয় শ্রীরাম” স্লোগানকে তারা কেবল ধর্মীয় পরিচয় হিসেবে নয়, “রাজনৈতিক প্রতিবাদ” -এর প্রতীক করেছে। তৃণমূল যখন এই স্লোগানকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছে, তখন বিজেপি সেটাকে “হিন্দু পরিচয়ের অপমান” হিসেবে প্রচার করেছে। এই কৌশল রাজ্যের গ্রামীণ ও তরুণ ভোটারদের মধ্যে তীব্র প্রভাব ফেলেছে, বিশেষত উত্তর ও পশ্চিমবঙ্গের জেলাগুলিতে।
মিডিয়া ও ডিজিটাল যুদ্ধের জয়ী
বিজেপি তথ্যযুদ্ধে অভিজ্ঞ। তাদের IT Cell, ডিজিটাল টিম, ও ভিডিও প্রচার কার্যক্রমে বিশাল বিনিয়োগ করা হয়েছে। হাজার হাজার হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রতিদিন সরকারবিরোধী বার্তা, মেমে ও শর্ট ভিডিও ছড়ানো হচ্ছে, যা মানুষের অবচেতনে প্রভাব ফেলছে।
তৃণমূলের ডিজিটাল দল অনেক দেরিতে এই মঞ্চে নামলেও, এখনো তারা BJP-র মতো তথ্যযুদ্ধে প্রতিযোগিতা করতে পারছে না।
বাম ও কংগ্রেসের দুর্বলতা: বিজেপির সুবিধা
বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস এখন রাজনীতিতে প্রায় নিষ্ক্রিয়। তাদের সংগঠন ভাঙাচোরা, নেতৃত্ব প্রভাবহীন।
অনেক প্রাক্তন বামকর্মী বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন, কারণ তারা মনে করছেন, তৃণমূল বিরোধী বাস্তব বিকল্প একমাত্র বিজেপি। এই ‘অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি ভোট’-এর বড় অংশ এখন বিজেপির পক্ষে যাচ্ছে।বিজেপি বুঝেছে, গ্রামীণ ভোটারদের কাছে পৌঁছতে হলে শুধু ধর্ম নয়, উন্নয়নও লাগবে। তারা কেন্দ্রীয় প্রকল্প যেমন প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি (PM Kisan Samman Nidhi), উজ্জ্বলা যোজনা (Ujjwala Yojana), আয়ুষ্মান ভারত (Ayushman Bharat)— এই স্কিমগুলির সরাসরি সুফল তুলে ধরছে। তৃণমূল যেখানে স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে ভাতা দেয়, বিজেপি সেখানে “সরাসরি ব্যাংকে টাকা” দেওয়ার উদাহরণ তুলে ধরে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করছে।
নারী ভোট ও নিরাপত্তার প্রশ্ন
রাজ্যে নারী ভোটারদের সংখ্যা এখন পুরুষদের সমান। বিজেপি এই গণতাত্ত্বিক বাস্তবতাকে লক্ষ্য করে নারী সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের ইস্যুতে প্রচার চালাচ্ছে।
হান্সখালি বা বগটুইয়ের মতো ঘটনাগুলি বিজেপি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে, বার্তা দিয়েছে, “মমতার সরকার নারীদের রক্ষা করতে ব্যর্থ।”এই আঘাতমূলক প্রচারণা নারী ভোটে স্পষ্ট প্রভাব ফেলছে। উল্লেখ্য, বিজেপি বারবার বলছে, “রাজ্যে যদি বিজেপি সরকার আসে, কেন্দ্র-রাজ্যের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে, উন্নয়নের গতি বাড়বে।” এই বার্তা বিশেষ করে ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্তদের কাছে আকর্ষণীয়। তারা মনে করে, কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাত নয়, সহযোগিতাই রাজ্যের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পথ।পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে।তৃণমূলের দুর্নীতি-ঘেরা ভাবমূর্তির বিপরীতে বিজেপি নিজের সংগঠিত শক্তি, আদর্শগত স্পষ্টতা এবং মোদী ফ্যাক্টর দিয়ে ক্রমশ এগিয়ে চলেছে। মানুষ এখন প্রশ্ন করছে, “কে কী বলছে নয়, কে কাজ করছে।”এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনই বিজেপির অগ্রগতির মূল সূত্র।
ছবি : প্রতীকী




