সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ পাটনা, ১৬ অক্টোবর: ২০২৬ সালের দিকে এগোচ্ছে ভারত, আর তার সঙ্গে এগোচ্ছে ভোট রাজনীতির উত্তেজনা। কিন্তু বিহার (Bihar) আজও যেন বন্দী নিজের রাজনৈতিক অজ্ঞতার ঘেরাটোপে। সাত দশক কেটে গেলেও রাজ্যের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতার অভাব ও সস্তা আবেগের রাজনীতি আজও উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক সময় “রাজনৈতিক চেতনার জন্মভূমি” হিসেবে পরিচিত এই রাজ্য আজ পরিণত হয়েছে ক্ষমতার যোগ-বিয়োগের ল্যাবরেটরিতে। জনতার মূল সমস্যা চাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষকদুরবস্থা এসবকে ছাপিয়ে গিয়েছে জাতপাত, ধর্ম, নেতা-পূজা এবং দলীয় আনুগত্যের অন্ধ স্রোত।
বিহারের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে আবর্তিত হয়েছে এক চক্রে লালু (Lalu Prasad Yadav), নীতীশ (Nitish Kumar), আর বিজেপি (BJP)। প্রত্যেকেই ক্ষমতায় এসে “বদল আনবো” বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত “বদল” হয়েছে শুধু মন্ত্রিসভায়, সমাজে নয়।২০২৬ সালের দিকে তাকিয়ে আজ প্রশ্ন উঠছে, বিহারের মানুষ কি সত্যিই রাজনীতি বুঝে ভোট দেয়, নাকি আবেগে ভেসে যায়?
জাতপাতের রাজনীতি: অজ্ঞতার প্রাচীন জাল
বিহারের ভোটের মেরুদণ্ড এখনো জাতভিত্তিক।
যাদব, কুর্মি, ব্রাহ্মণ, রাজপুত, মুসলিম, প্রতিটি সম্প্রদায়কে ভোটের জন্য আলাদা সমীকরণে ফেলা হয়। এই বিভাজন রাজনৈতিক দলগুলিকে একধরনের আরাম দিয়েছে, কারণ জনগণ যখন জাতিতে বিভক্ত, তখন যুক্তিতে একতাবদ্ধ হয় না। একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের ভাষায়, “বিহারে এখনও ভোট মানে জাতি, না যে উন্নয়ন।” ফলত, রাজনৈতিক অজ্ঞতা এখানকার গণতন্ত্রকে পরিণত করেছে সংখ্যার খেলায়, নীতির নয়।
নীতীশ কুমারের (Nitish Kumar) দ্বৈত নীতি ও জনবিশ্বাসের ক্ষয়
বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার, যিনি এক সময় উন্নয়নের প্রতীক ছিলেন, এখন নিজেই রাজনৈতিক দোলাচলের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। ২০০৫ থেকে আজ পর্যন্ত তিনি এনডিএ (NDA) ও মহাগঠবন্ধনের (Mahagathbandhan) মধ্যে কমপক্ষে চারবার পক্ষ পরিবর্তন করেছেন। একজন সাধারণ নাগরিকের প্রশ্ন: “যে নেতা নিজের অবস্থান স্থির রাখতে পারে না, সে রাজ্যকে কী স্থিতিশীল করবে?”এই রাজনৈতিক অস্থিরতা ভোটারদের মনে বিভ্রান্তি বাড়িয়েছে।বিহারের তরুণ প্রজন্ম, যারা পরিবর্তনের আশা করেছিল, তারা আজ রাজনৈতিকভাবে হতাশ।
বেকারত্ব ও অভিবাসন: অজ্ঞতার আসল মূল্য
বিহার ভারতের অন্যতম দরিদ্র রাজ্য। এখানে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ তরুণ অন্য রাজ্যে পাড়ি দেয় কাজের খোঁজে। কিন্তু নির্বাচনের সময় এই বাস্তব ইস্যু হারিয়ে যায় “সামাজিক ন্যায়”, “ধর্ম”, “পরিবারতন্ত্র” ইত্যাদি স্লোগানের নিচে। ২০২৬-এর আগে বিহারের অর্থনীতি এখনও কৃষিনির্ভর, শিল্প নেই বললেই চলে। তবু রাজনৈতিক দলগুলো উন্নয়ন নয়, বরং “ভোট ব্যাংকের গণিত” নিয়েই বেশি ব্যস্ত। এই মানসিকতাই বিহারের রাজনৈতিক অজ্ঞতার সবচেয়ে বড় প্রতিচ্ছবি।
শিক্ষায় পিছিয়ে, সচেতনতায়ও পিছিয়ে
বিহারের শিক্ষার মান বহু বছর ধরেই প্রশ্নের মুখে।
স্কুলে শিক্ষক ঘাটতি, কলেজে অবকাঠামোর অভাব এবং কোচিং সেন্টারের অতিরিক্ত নির্ভরতা, সব মিলিয়ে এখানে শিক্ষা হয়েছে একটি বাণিজ্য, সচেতনতার নয়। যখন শিক্ষা দুর্বল, তখন রাজনৈতিক চেতনা জাগে না।
ফলত, মানুষ সহজেই প্রভাবিত হয় নেতাদের আবেগপূর্ণ বক্তৃতা ও ধর্মীয় প্রচারণায়।
সোশ্যাল মিডিয়া: অজ্ঞতার নতুন মঞ্চ
আগে গ্রামের পঞ্চায়েত ছিল রাজনৈতিক প্রচারের কেন্দ্র, এখন সেই জায়গা দখল করেছে ফেসবুক, ইউটিউব ও হোয়াটসঅ্যাপ। এখানেই ছড়াচ্ছে ভুয়ো তথ্য, অর্ধসত্য এবং প্রচারমূলক ভিডিও। একজন বিহারি ভোটার এখন রাজনীতি বোঝে না, বরং “মেম” আর “রিল” দেখে সিদ্ধান্ত নেয়। এই ডিজিটাল অজ্ঞতাই ২০২৬ সালের নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থ ও ক্ষমতার অশুভ জোট
বিহারের ভোট আজ টাকার খেলায় পরিণত হয়েছে।
প্রতিদ্বন্দ্বীরা একে অপরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনে, অথচ নির্বাচনের সময় সেই টাকাই হয় ভোট কেনার মাধ্যম। সূত্রের খবর, গ্রামীণ বিহারে আজও ভোটের দিনে ৫০০ টাকার নোট বা ফ্রি খাবার দেওয়া হয় “উপহার” হিসেবে। এটাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে কুৎসিত চিত্র, যেখানে ভোট মূল্য হারায়, ভোটার হারায় মর্যাদা।
জনমতের পরিণতি: বিভ্রান্তি ও হতাশা
২০২৬ সালের প্রাক্কালে বিহারের মানুষ এক অদ্ভুত অবস্থায়। তারা জানে কী ভুল, কিন্তু তার বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পায়। তারা উন্নয়ন চায়, কিন্তু আবার পুরনো নেতাদের ওপরেই আস্থা রাখে। এটাই রাজনৈতিক অজ্ঞতার প্রকৃত রূপ, যেখানে জ্ঞান নেই, কিন্তু ভয় আছে; সচেতনতা নেই, কিন্তু আনুগত্য আছে।
বিকল্পের খোঁজে নতুন প্রজন্ম
তরুণ ভোটাররা “তৃতীয় বিকল্প” খুঁজছে।
তারা লালু-নীতীশ-বিজেপি ছাড়া নতুন নেতৃত্ব চায়, যারা কাজ দেখাতে পারবে, কথা নয়। তবে এই নতুন প্রজন্মকে যদি সচেতনভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করানো না যায়, তবে ইতিহাস আবারও পুনরাবৃত্তি হবে, অজ্ঞতার মধ্যেই বিহারের ভবিষ্যৎ হারিয়ে যাবে।
অজ্ঞতার চক্র ভাঙবে কীভাবে?
রাজনৈতিক অজ্ঞতা তখনই ভাঙে যখন মানুষ প্রশ্ন করতে শেখে। বিহারের মানুষ যদি ২০২৬-এ প্রশ্ন করে,
“আমার সন্তান চাকরি পাবে কবে?”, “আমার রাস্তা তৈরি হবে কবে?”, তবে রাজনীতি বদলাবে। নইলে জাতপাত, ধর্ম ও আবেগের রাজনীতি চলতেই থাকবে।বিহারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটাই জিনিসে, মানুষের রাজনৈতিক বোধজাগরণে।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত




