পারিজাত গঙ্গোপাধ্যায়, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বিশাখাপত্তনম : এক ক্যালেন্ডার বছরে এক হাজার রান, কেরিয়ারে ৫০০০ রান, এমন একাধিক রেকর্ড ভাঙলেন স্মৃতি মান্ধানা (Smriti Mandhana)। কিন্তু তাঁর রেকর্ড গড়া দিনই হারের কষ্ট নিয়ে মাঠ ছাড়ল ভারতীয় নারী দল। উইমেনস ওডিআই বিশ্বকাপে (Women’s ODI World Cup) বিশাখাপত্তনমের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার মেয়েদের কাছে তিন উইকেটে হারল ভারত। বড় রানের ইনিংস গড়েও জয় ছিনিয়ে আনতে ব্যর্থ হলেন হরমনপ্রীত কৌর (Harmanpreet Kaur)-এর দল।
ভারতের ইনিংস শেষ হয় ৩৩০ রানে। অস্ট্রেলিয়া রান তাড়া করতে নেমে সাত উইকেটে তুলে নেয় ৩৩১। কাগজে-কলমে ম্যাচটা ছিল এক ও তিনের লড়াই। কিন্তু শেষে তিনেই হারল। ভারতের ৩৩০ রানের পাহাড়ও ভেঙে দিল একা হাতে অ্যালিসা হিলি (Alyssa Healy)। তাঁর ঝোড়ো ১৪২ রানের ইনিংসই নির্ধারণ করে দিল ম্যাচের ভাগ্য। প্রথমে টসে জিতে ব্যাট করতে পাঠান অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক হিলি। শুরুতে সাবধানী ভঙ্গিতেই ব্যাট করছিলেন স্মৃতি ও প্রতিকা রাওয়াল (Pratika Rawal)। অষ্টম ওভার থেকেই গতি বদল। সোফিয়া মোলিনেয়াক্স (Sophie Molineux) -এর এক ওভারেই তুললেন ১৬ রান। সেই থেকে রানের স্রোত। ১৫৫ রানের দুরন্ত ওপেনিং জুটি গড়ে দেন স্মৃতি ও প্রতিকা। ৬৬ বলে ৮০ রানের ঝড় খেললেন স্মৃতি, ওঁর ইনিংসে ছিল ৯টি চার ও ৩টি ছক্কা। তাঁর ওই ইনিংস ভারতের মহিলা ক্রিকেটে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত তৈরি করে। এক ক্যালেন্ডার বছরে হাজার রান ছোঁয়া প্রথম ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটার স্মৃতি মান্ধানা। পাশাপাশি ৫০০০ রানের মাইলফলকও স্পর্শ করেন মাত্র ১১২ ইনিংসে।

এই ইনিংসের মাধ্যমেই বিরাট কোহলির (Virat Kohli) রেকর্ডও ভাঙলেন স্মৃতি। যেখানে কোহলির প্রয়োজন হয়েছিল ১১৪ ইনিংস, সেখানে স্মৃতি করলেন আরও দ্রুত। পাকিস্তানের বাবর আজম (Babar Azam) ও দক্ষিণ আফ্রিকার হাসিম আমলা (Hashim Amla) -এর পর এখন তিনিই বিশ্বের দ্রুততম ব্যাটার। অন্য প্রান্তে প্রতিকা রাওয়ালও খেললেন দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন ইনিংস, ৯৬ বলে ৭৫ রান। পরে হারলিন দেওল (Harleen Deol) ছোট অথচ ঝোড়ো ২২ বলে ৩৮ রান যোগ করেন। তবে অধিনায়ক হরমনপ্রীত ফের ব্যর্থ! ১৭ বলে ২২ রান করেই ফিরলেন। ২৪০ রানে ভারতের চতুর্থ উইকেট পতনের পর দায়িত্ব নেন বাংলার রিচা ঘোষ (Richa Ghosh) ও জেমাইমা রদ্রিগেজ (Jemimah Rodrigues)। রিচা তাঁর চেনা মেজাজে ২২ বলে ৩২ রান করেন, যেখানে ছিল ৩টি চার ও ২টি ছক্কা। জেমাইমার সঙ্গে তাঁর জুটি থেকে আসে ৫৪ রান। তবে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারায় ৩৩০ রানের বেশি তুলতে পারেনি ভারত। শেষ সাত বল থাকতে অলআউট হয়ে যায় তারা।
কিন্তু ক্রিকেটের আসল নাটক তখনও বাকি ছিল। রান তাড়া করতে নেমে অস্ট্রেলিয়া শুরু থেকেই চাপে না পড়ে আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিং শুরু করে। ওপেনিং জুটিতে হিলি ও লিচফিল্ড (Phoebe Litchfield) মিলে ৮৫ রান তোলেন। এরপর ক্রমে দলের অন্যান্য ব্যাটাররাও অবদান রাখেন, এলিস পেরি (Ellyse Perry) ৪৭, অ্যাশলি গার্ডনার (Ashleigh Gardner) ৪৫, লিচফিল্ড ৪০ রান করেন।
হিলির ১০৭ বলে ১৪২ রানের ইনিংস যেন এক শিক্ষা হয়ে রইল। তাঁর ব্যাট থেকে বেরোয় ১৭টি চার ও ৩টি ছক্কা। ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি বোলিংয়েও দাপট দেখান অ্যানাবেল সুথারল্যান্ড (Annabel Sutherland)। ৪০ রানে ৫ উইকেট নিয়ে তিনিই ভারতের রানের গতিকে থামিয়ে দেন। ম্যাচের শেষ দিকে যখন প্রয়োজন ছিল ঠাণ্ডা মাথায় ব্যাট করা, তখন পেরি ও কিম গার্থ (Kim Garth) দায়িত্ব নিয়ে জুটি গড়ে ম্যাচ শেষ করেন। ৪৯তম ওভারে জয় পায় অস্ট্রেলিয়া, হাতে থাকে তিন উইকেট।
এই হার ভারতের জন্য শুধু এক ম্যাচের নয়, হতাশার গল্পও তৈরি হল। কারণ স্মৃতি মান্ধানার রেকর্ড, প্রতিকার লড়াকু ইনিংস, রিচা-জেমাইমার তেজ সবই মিলিয়ে ছিল জয়ের উপযুক্ত মঞ্চ। কিন্তু সেই মঞ্চে আলো কেড়ে নিলেন অস্ট্রেলিয়ার হিলি ও সুথারল্যান্ড। ভারতের অধিনায়ক হরমনপ্রীত ম্যাচের শেষে বললেন, “আমরা পরিকল্পনা মতো শুরু করেছিলাম। কিন্তু শেষের দিকে কিছু ভুল সিদ্ধান্ত ও অপ্রয়োজনীয় শট খেলার জন্য হারতে হল। অস্ট্রেলিয়া সবসময় চাপ সামলাতে পারে, ওদের এটাই শক্তি।”
অন্যদিকে অ্যালিসা হিলির কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস, “আমাদের দল জানত, ৩৩০ রানের লক্ষ্য বড় হলেও অজেয় নয়। আমরা নিজেদের দক্ষতায় ভরসা রেখেছিলাম। আমার ইনিংসের জন্য সতীর্থদের ধন্যবাদ, ওরা চাপ কমিয়ে দিয়েছিল।” উল্লেখ্য যে, এই ম্যাচের পরেও ভারতের সম্ভাবনা শেষ হয়নি। তবে এবার থেকে ভুল শুধরে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। স্মৃতির রেকর্ড হয়ত ইতিহাসে থাকবে, কিন্তু এই পরাজয়ও মনে করিয়ে দিল, কখনও কখনও সংখ্যার থেকেও বেশি মূল্যবান হয় দলগত স্থিতি ও মানসিক দৃঢ়তা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Smriti Mandhana record, women’s cricket record 2025 | বিশ্বরেকর্ড স্মৃতি মন্ধানার! ব্যাটে খরা, তবুও ইতিহাস গড়লেন ভারতীয় ব্যাটার



