দেবমৃতা গঙ্গোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : দীর্ঘদিন ধরে ‘প্রতিদিন ১০,০০০ স্টেপ হাঁটুন’ এই ধারণাটি যেন সুস্থতার এক অঘোষিত মন্ত্রে পরিণত হয়েছে। অনেকে মনে করেন, এই সংখ্যাটা পেরলেই শরীর ঝরঝরে হয়ে যাবে, হৃদ্যন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে, আর বয়স যেন থেমে যাবে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, বিষয়টা এত সরল নয়। ১০,০০০ স্টেপ এই নিয়মটি কোনও বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে আসেনি; বরং ১৯৬০-এর দশকে জাপানের এক পেডোমিটার নির্মাতা কোম্পানি (Yamasa Clock and Instrument Company, Japan)-এর বিজ্ঞাপন থেকেই এর সূচনা। তাদের একটি পণ্যের নাম ছিল “Manpo-kei”, যার অর্থই হল “১০,০০০ পদক্ষেপ মিটার।” এরপর থেকেই সংখ্যাটি যেন এক ‘জাদুর সূত্র’-এর মতো সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই নিয়ম কি সবার জন্য নিরাপদ? একেবারেই নয়। The Lancet Public Health -এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, শরীরের বয়স, রোগের অবস্থা, জয়েন্টের স্থিতি, হৃদ্যন্ত্রের সক্ষমতা, সব কিছুর উপর নির্ভর করে এই লক্ষ্যমাত্রা। বরং কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ১০,০০০ পদক্ষেপ হাঁটা বিপজ্জনকও হতে পারে।
যাদের জন্য ১০,০০০ পদক্ষেপ নয় বরং বিপদ!
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবার শরীর একরকম নয়। তাই এক ফর্মুলা দিয়ে সবার ফিটনেস মাপা বিপজ্জনক হতে পারে। কার্ডিয়োলজিস্ট ড: রাজেশ র’ বলেন, “আমাদের হৃদ্যন্ত্রের সক্ষমতা, রক্ত সঞ্চালন ও অস্থি-মাংসপেশির গঠন একে অপরের থেকে ভিন্ন। তাই কারও জন্য ১০,০০০ পদক্ষেপ উপকারী হতে পারে, আবার কারও জন্য সেটা হতে পারে এক বিপদ সংকেত।”
যাদের হৃদ্যন্ত্র অস্থিতিশীল (Unstable Cardiac Condition)
যাদের হৃদ্রোগ বা হার্ট ফেইলিওর আছে, তাদের জন্য অতিরিক্ত হাঁটা হতে পারে ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘ সময় হাঁটার ফলে বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, এমনকি unstable angina বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিও বাড়ে। কার্ডিওলজিস্টদের মতে, হৃদ্রোগীরা হাঁটার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে ১০,০০০ পদক্ষেপে নামলে মারাত্মক বিপদ হতে পারে।
পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজে (Peripheral Artery Disease) আক্রান্তরা
এই রোগে পায়ের রক্তনালী সরু হয়ে যায়, রক্তপ্রবাহ কমে আসে। ফলে পেশিতে অক্সিজেন পৌঁছায় না, আর হাঁটলে ব্যথা, ক্র্যাম্প ও জ্বালা শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের National Institutes of Health (NIH) জানাচ্ছে, এমন রোগীদের জন্য supervised walking program -ই সবচেয়ে নিরাপদ। অর্থাৎ, চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সীমিত সময় ও পরিমাণে হাঁটা।
যাদের জয়েন্ট দুর্বল বা মাংসপেশিতে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা (Musculoskeletal Pain)
আরথ্রাইটিস (Arthritis), লিগামেন্ট ইনজুরি, বা হাড়ের দুর্বলতা থাকা ব্যক্তিদের জন্য অতিরিক্ত হাঁটা একপ্রকার যন্ত্রণা। ১০,০০০ পদক্ষেপ পূরণের নেশায় হাঁটতে গিয়ে অনেকে নিজেদের হাঁটুর ওপর বাড়তি চাপ দেন, ফলে ব্যথা আরও বেড়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, low-impact exercise যেমন যোগ, সাঁতার, বা হালকা স্ট্রেচিং অনেক বেশি উপকারী হতে পারে।
আরও পড়ুন : Begun Posto Recipe | এমন স্বাদের বেগুন পোস্ত রেসিপি, একবার খেলে আরও খাওয়ার জন্য আঙুল চাটবেন
যাদের সাম্প্রতিক অস্ত্রোপচার (Recent Surgery) বা ইনজুরি হয়েছে
অস্ত্রোপচারের পর বা খোলা ক্ষতের সময় হাঁটার মাধ্যমে শরীরে সংক্রমণ বা ক্ষতবৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে। অনেকেই দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান, কিন্তু চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়া হাঁটলে ক্ষতস্থানে চাপ পড়ে এবং সেল মেরামত প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
ড. মীনাক্ষী দত্ত, অর্থোপেডিক সার্জন, বলেন, “অস্ত্রোপচারের পর দৌড় বা দীর্ঘ হাঁটা করা মানে শরীরকে ভুল বার্তা দেওয়া। ক্ষত না শুকালে বা জয়েন্ট পুরোপুরি সেরে না উঠলে হাঁটা বিপজ্জনক।”

বয়স্ক বা অতিরিক্ত স্থূল ব্যক্তিরা (Elderly or Obese Individuals)
বয়স বা অতিরিক্ত ওজনের কারণে হাঁটুর জোড়ায় চাপ বেড়ে যায়। তাই হঠাৎ করেই ১০,০০০ পদক্ষেপের লক্ষ্য নির্ধারণ করলে সেটা হতে পারে শরীরের জন্য শাস্তি। ধীরে ধীরে হাঁটার সময় বাড়ানো, এবং প্রয়োজনে স্টিক বা সাপোর্ট ব্যবহার করা, এটাই নিরাপদ উপায়।
১০,০০০ নয়, কতটা হাঁটলে উপকার?
Harvard Medical School -এর একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্রতিদিন মাত্র ৭,০০০ থেকে ৮,০০০ পদক্ষেপ হাঁটলেও হৃদ্যন্ত্র ও মানসিক স্বাস্থ্যের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে। একই সঙ্গে ওজন নিয়ন্ত্রণ ও রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতেও সাহায্য করে। অন্যদিকে, The Journal of the American Medical Association (JAMA) -এর একটি রিপোর্ট বলছে, ৭,৫০০ পদক্ষেপ পর্যন্ত হাঁটার পর মৃত্যুহার কমতে দেখা গেছে, কিন্তু তার বেশি হাঁটার ক্ষেত্রে বাড়তি লাভ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, ১০,০০০ সংখ্যাটা কেবল এক কাল্পনিক সীমা। ড. অভিষেক রায় স্পোর্টস মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, জানান, “১০,০০০ স্টেপ কোনও যাদুকরী সংখ্যা নয়। আপনার শরীর যদি ৫,০০০ পদক্ষেপে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, সেটাই আপনার সঠিক সীমা।”
বিকল্প হিসেবে কী করা যায়?
যারা উপরোক্ত ঝুঁকির মধ্যে পড়েন, তাদের জন্য মাঝারি তীব্রতার ব্যায়াম (moderate intensity exercise) অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। যেমন:
>৩০ মিনিট হালকা যোগ বা মেডিটেশন
>সাঁতার বা ওয়াটার এরোবিকস
>সাইক্লিং
>প্রণায়াম ও শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম
বিশেষজ্ঞরা বলেন, নিয়মিত হাঁটার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল নিয়মিত নড়াচড়া। যেমন অফিসে দীর্ঘক্ষণ বসে না থাকা, লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করা, বা ঘরে ছোটখাটো গৃহকর্মে সক্রিয় থাকা, এগুলোও শরীরের জন্য সমান উপকারী। তবে
সুস্থ জীবনের মূলমন্ত্র একটাই, শরীরের কথা শোনা। সবাইকে এক ছাঁচে ফেললে যেমন অন্যায় হয়, তেমনি এক ‘১০,০০০ স্টেপ’ ফর্মুলায় স্বাস্থ্য মাপাও ভুল। আপনি যদি হাঁটতে গিয়ে ব্যথা, ক্লান্তি বা বুক ধড়ফড় অনুভব করেন, তাহলে সেটা আপনার শরীরের সঙ্কেত যে এখনই থামা উচিত। অর্থাৎ, হাঁটুন, কিন্তু শরীরের ভাষা শুনে। সংখ্যার পিছনে নয়, নিজের সক্ষমতার সীমানার মধ্যেই থাকুন, তাতেই আসবে প্রকৃত সুস্থতা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : lifestyle change for fatherhood | বাবা হতে চান? এই অভ্যাসগুলি বদলালেই দ্রুত সুসংবাদ পাবেন



