সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ জলপাইগুড়ি, ৯ অক্টোবর ২০২৫: নাগরাকাটার রাজনৈতিক অশান্তি ফের চড়ল চূড়ান্তে। বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মু (Khagen Murmu) এবং শিলিগুড়ির বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ (Shankar Ghosh) -এর উপর হামলার ঘটনায় আরও দুজনকে গ্রেফতার করল জলপাইগুড়ি পুলিশ। বৃহস্পতিবার সকালে নাগরাকাটা থানা এলাকার বাসিন্দা সাহানুর আলম ওরফে মান্নান (Sahanur Alam alias Mannan, 30) এবং তোফায়েল হোসেন ওরফে মিলন (Tofail Hossain alias Milon, 36)-কে আটক করা হয়। এই নিয়ে ঘয়নায় মোট চারজন ধৃত। বুধবারই এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আরও দুই অভিযুক্তকে পুলিশ গ্রেফতার করেছিল। পুলিশের দাবি, তদন্তে একাধিক ভিডিও ফুটেজ ও স্থানীয় সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই এই দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জলপাইগুড়ির পুলিশ সুপার সুমিত কুমার (Sumit Kumar) জানান, “ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ঘটনার পেছনে অন্য কেউ যুক্ত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এখনই তাদের রাজনৈতিক সংযোগ সম্পর্কে কিছু বলা যাচ্ছে না।”

হামলার দিন যা ঘটেছিল
ঘটনা ঘটেছিল সোমবার, নাগরাকাটার দোলাদিঘি এলাকায়। তখন উত্তর মালদহ লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ খগেন মুর্মু ও শিলিগুড়ির বিজেপি বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ স্থানীয় বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হঠাৎই জনতার একাংশ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, “শুরুতে দু’একজন স্লোগান দিতে থাকে। তারপর আচমকা পাথর, লাঠি, জুতো সব ছোড়া শুরু হয়।” আতঙ্কে নিরাপত্তাকর্মীরা নেতাদের ঘিরে ধরলেও পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আক্রমণে খগেন মুর্মুর মুখে গুরুতর চোট লাগে, বিশেষ করে বাম চোখের নিচে গভীর ক্ষত হয়। শঙ্কর ঘোষও মাথা ও কাঁধে আঘাত পান। দু’জনকেই দ্রুত জলপাইগুড়ি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বুধবার শঙ্কর ঘোষ হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেও খগেন মুর্মু এখনও চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাঁর আঘাত গুরুতর হলেও আশঙ্কাজনক নয়।
রাজনীতির ময়দানে উত্তাপ
ঘটনার পর থেকেই জলপাইগুড়ির রাজনৈতিক তাপমাত্রা দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। বিজেপির অভিযোগ, এই হামলার পিছনে তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress)-এর স্থানীয় নেতাদের হাত রয়েছে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার (Sukanta Majumdar) বলেন, “আমাদের সাংসদ ও বিধায়কের উপর যে বর্বরোচিত হামলা হয়েছে, তা গণতন্ত্রের উপর আঘাত। তৃণমূলের লোকেরা এই হামলার পরিকল্পনা করেছিল।” তৃণমূল অবশ্য এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে। দলের মুখপাত্র কুনাল ঘোষ (Kunal Ghosh) বলেন, “বিজেপি নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে নাটক করছে। এটা স্থানীয়দের ক্ষোভ, কোনও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র নয়। আমরা সহিংসতার ঘোরতর বিরোধী।”
মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) বুধবার হাসপাতালে গিয়ে খগেন মুর্মুর শারীরিক অবস্থার খবর নেন। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমি রাজনীতি দেখতে যাইনি, একজন সাংসদ আহত হয়েছেন, আমি তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম। এই ধরনের সহিংসতা কখনওই কাম্য নয়।” তাঁর এই পদক্ষেপে রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। একাংশের মতে, মুখ্যমন্ত্রীর এই সংবেদনশীল আচরণ প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার নিদর্শন, আবার অন্য অংশের মতে এটি রাজনৈতিক বার্তা পাঠানোরই কৌশল।
পুলিশ সূত্রে জানা খবর, ঘটনাস্থলের একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইল ভিডিও সংগ্রহ করা হয়েছে। হামলার পরিকল্পনা আগে থেকেই করা হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া, ধৃতদের মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করে কল রেকর্ড বিশ্লেষণ (Call Record Analysis) শুরু করেছে তদন্ত দল। এক সিনিয়র পুলিশ আধিকারিক বলেন, “এই ঘটনায় কয়েকজন প্ররোচনাকারী মুখও শনাক্ত হয়েছে। আমরা নিশ্চিত, আরও কিছু গ্রেফতার আসন্ন।” পুলিশ প্রশাসন এখন ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করেছে যাতে পুনরায় অশান্তি না ছড়ায়।
নাগরাকাটার রাজনীতি ও সামাজিক প্রেক্ষাপট
নাগরাকাটা বরাবরই রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এলাকা। বহু বছর ধরে এই অঞ্চলে তৃণমূল ও বিজেপির প্রভাব বাড়া-কমার লড়াই চলেছে। সাম্প্রতিক পঞ্চায়েত নির্বাচনেও নাগরাকাটা ব্লকে বিজেপি উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছিল, যার ফলে উত্তেজনা আরও বেড়েছিল বলে স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক অভিজিৎ রায় (Abhijit Roy) জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “এই হামলা কেবল ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নয়, বরং রাজনৈতিক অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ। নাগরাকাটায় যেভাবে রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হয়েছে, তাতে এমন সংঘর্ষ আরও বাড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।” বিজেপির পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই রাজ্যপালের কাছে অভিযোগ জানানো হয়েছে। সাংসদ খগেন মুর্মু হাসপাতাল থেকে বার্তা পাঠিয়ে বলেন, “আমি ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়েছিলাম, রাজনীতি করতে নয়। কিন্তু আমাদের উপর আক্রমণ চালানো হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। এই রাজ্যে বিজেপির কর্মীরা নিরাপদ নয়।” বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ জানান, “আমরা সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের উপর হামলা প্রমাণ করে, রাজ্যে প্রশাসন ব্যর্থ।”
রাজনৈতিক মহল মনে করছে, এই ঘটনাটি উত্তরবঙ্গের (North Bengal) আসন্ন রাজনৈতিক সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষত জঙ্গলমহল ও ডুয়ার্স অঞ্চলে বিজেপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে খগেন মুর্মুর প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক সুবীর দে (Subir Dey) বলেন, “যদি তদন্তে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রমাণিত হয়, তবে এটি তৃণমূলের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে, বিজেপি এই ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে উত্তরবঙ্গের ভোট রাজনীতিতে সহানুভূতির স্রোত টানতে পারে।” উল্লেখ্য, জলপাইগুড়ি জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, তদন্তের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে নাগরাকাটায় শান্তি বজায় রাখার জন্য কমিউনিটি পুলিশিং (Community Policing) শুরু হয়েছে। এক পুলিশ আধিকারিকের বক্তব্য, “আমরা চাই এলাকায় শান্তি ফিরে আসুক। তদন্ত চলছে, কেউ রেহাই পাবে না।”
ছবি: সংগৃহীত




