সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : ভারতের অন্যতম চরম চ্যালেঞ্জিং পরীক্ষা হিসেবে পরিচিত UPSC সিভিল সার্ভিসেস পরীক্ষা। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী এই পরীক্ষায় অংশ নেন, তাদের স্বপ্ন আইএফএস (IFS) বা আইএএস (IAS) অফিসার হওয়া। তবে এই পরীক্ষায় সফল হওয়া যেন এক অলঙ্ঘনীয় চ্যালেঞ্জ। এমন কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া মানে শুধু জ্ঞান নয়, তা ধৈর্য, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং অবিরাম পরিশ্রমের প্রতিফলন। সম্প্রতি, উত্তরাখণ্ডের পিথারগড় জেলার গীতিকা তমতা (Gitika Tamta) সেই উদাহরণ হয়ে উঠেছেন।
গীতিকা ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় আগ্রহী ছিলেন। স্কুল ও কলেজের পড়াশোনা শেষে তিনি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পথে হরিয়ানায় যান। তবুও তাঁর চোখে ছিল একটাই লক্ষ্য, সিভিল সার্ভিসে সফল হওয়া। জানা যায়, ২০২১ সালের নববর্ষের পার্টির পরই গীতিকা নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য উৎসর্গ করেন। গীতিকা জানান, “আমার লক্ষ্য আমাকে বারবার বিচলিত করছে, আমি চেয়েছি সমস্ত মনোযোগ একমাত্র পড়াশোনার দিকে দিতে”। সামাজিক মাধ্যম ও বন্ধু-বান্ধবী থেকে দূরে সরে গিয়ে তিনি এই যাত্রা শুরু করেন।

২০২১ সালের ১৪ জানুয়ারী তিনি সমস্ত সামাজিক মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ডিলিট করেন। এই সিদ্ধান্ত তাঁর জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এরপর থেকে গীতিকা একদিকে যেমন পড়াশোনায় মনোযোগী হন, তেমনি সামাজিক অনুষ্ঠান, পারিবারিক মিলন এবং বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে ঘোরাফেরাও তিনি সীমিত করেন। জানা যায়, সর্বশেষ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ সালে তিনি পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এরপর তিনি নিজেকে শুধুমাত্র লক্ষ্যপূরণে নিয়োজিত করেন। গীতিকার এই কঠোর নিয়মিত অধ্যবসায়ে, তিনি নিজের পড়াশোনার জন্য এপ্রিল ২০২১-এ একটি বিশদ পরিকল্পনা তৈরি করেন। ঘরের কোণায় হোয়াইট বোর্ডে পড়াশোনার লক্ষ্য ও রুটিন লিখে নিজেকে নিয়মিত প্রেরণা দেন। “প্রতি দিন আমার পড়াশোনার লক্ষ্য পূরণ করা মানে ছিল আমার স্বপ্নের দিকে এক ধাপ এগোনো,” গীতিকা জানান। তবে এই যাত্রায় মানসিক চাপও ছিল কম নয়। পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা সবই একত্রিত হয়ে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। তবে, সকল বাধা অতিক্রম করে তিনি দ্বিতীয় কোভিড সময় নৈনিতাল ফিরে আসেন। সেখানে তিনি UPSC প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নেন। প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং ফলাফল তাঁর জন্য ভাগ্য পরিবর্তনের মতো হয়। ২০২২ সালে তিনি UPSC-তে সর্বভারতীয় ২৩৯ নম্বর র্যাঙ্ক অর্জন করেন এবং ভারতীয় পররাষ্ট্র পরিষেবায় (IFS) চাকরি পান। তাঁর এই সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং উত্তরাখণ্ডের এক প্রেরণাদায়ক গল্প হিসেবে সকলের কাছে পৌঁছায়।
বর্তমানে গীতিকা ভারতীয় প্রতিনিধিত্বে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও উপস্থিত হন। ২০২৪ সালের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত জি২০ (G20) শীর্ষ সম্মেলনে তিনি অংশগ্রহণ করেন। সেখানে তিনি সকলের সঙ্গে তাঁর সাফল্যের গল্প ভাগাভাগি করেন। “আমি চাই আমার গল্প সকলের জন্য প্রেরণা হোক, যে কোন লক্ষ্যই অসম্ভব নয়, যদি আমরা সম্পূর্ণ মনোনিবেশ এবং কঠোর পরিশ্রম করি,” তিনি বলেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গীতিকার সাফল্য শুধু বুদ্ধিমত্তার নয়, আত্মনিয়ন্ত্রণ, দৃঢ়সংকল্প এবং সামাজিক জীবনের ত্যাগের ফল। শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ড. অরবিন্দ সিং (Dr. Arvind Singh) মন্তব্য করেন, “গীতিকা তমতা এমন এক উদাহরণ, যা প্রমাণ করে যে একাগ্রতা এবং পরিকল্পনা দিয়ে যে কোন কঠিন লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।”
গীতিকার এই যাত্রা যুবসমাজের জন্য একটি অনুপ্রেরণার চিহ্ন হয়ে উঠেছে। সামাজিক মাধ্যমের ফাঁদ, বন্ধু-বান্ধবী ও পারিবারিক অনুষ্ঠান থেকে দূরে থাকার পরও, স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার তাঁকে সফল করেছে। আজ গীতিকা তমতা শুধুমাত্র একজন সরকারি কর্মকর্তা নয়, তা এক প্রেরণাদায়ক মুখ, যে নতুন প্রজন্মকে দেখাচ্ছেন কীভাবে কঠোর পরিশ্রম ও ধৈর্যের মাধ্যমে স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা যায়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : UPSC Success Story, Yuvraj Marmat UPSC, P. Monica UPSC | UPSC জয় করে ভালবাসায় বাঁধা যুবরাজ-মনিকা, অনুপ্রেরণার সাফল্যের গল্প



