পার্বতী কাশ্যপ, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠের ৭০ শতাংশ জুড়ে রয়েছে সমুদ্র। অথচ এর ৮০ শতাংশ এখনও মানুষের কাছে অজানা রহস্যে ঢাকা। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এই বিশাল জলরাশির গভীরে লুকিয়ে রয়েছে এক বিরাট সম্পদ, যা গোটা বিশ্বের অর্থনীতির গতিপথ বদলে দিতে পারে। সেই সম্পদ হল সোনা। অবিশ্বাস্য শোনালেও সমুদ্রের জলে মিশে আছে কোটি কোটি টন হলুদ ধাতু। গবেষকরা মনে করছেন, এই সোনার পরিমাণ কমপক্ষে ২০ মিলিয়ন টন বা ২ কোটি টন।
আমেরিকার ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (National Oceanic and Atmospheric Administration – NOAA) কয়েক বছর ধরে পরিচালিত অভিযানের পর জানিয়েছিল, আটলান্টিক মহাসাগরের গভীরে অগণিত সোনার ভান্ডার লুকিয়ে আছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, মহাসাগরের নোনা জলে মিশে থাকা সোনার আর্থিক মূল্য হতে পারে অন্তত ২ কোয়াড্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা বিশ্বের মোট জিডিপির তুলনায় বহুগুণ বেশি। ২০১৮ সালে জার্নাল অফ দ্য আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি (Journal of the American Chemical Society) ও নেচার (Nature) পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণাপত্রে উঠে আসে, সমুদ্র থেকে সোনা আলাদা করার নানা পরীক্ষামূলক পদ্ধতির প্রস্তাব। এক উপায়ে স্পঞ্জের মতো বিশেষ উপাদান ব্যবহার করে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে সমুদ্রের জল থেকে সামান্য পরিমাণ সোনা আহরণ সম্ভব বলে দাবি করা হয়েছিল। তবে ব্যাপক পরিসরে এবং বাণিজ্যিকভাবে এই প্রক্রিয়া এখনও কার্যকর নয়।

সমুদ্র থেকে সোনা উত্তোলন কেন এত কঠিন? বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রতি ১০০০ লক্ষ মেট্রিক টন নোনা জলে গড়ে মাত্র এক গ্রাম সোনা মিশে থাকে। এক লিটার সমুদ্রের জলে মেলে এক গ্রামের ১৩০০ কোটি ভাগের এক ভাগ সোনা। ফলে প্রযুক্তিগতভাবে আলাদা করা সম্ভব হলেও খরচ এত বেশি যে তা বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয়। ১৯৪১ সালে করা এক গবেষণায় প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে সোনা আহরণ করতে গেলে খরচ পড়ত সেই সোনার মোট মূল্যের পাঁচ গুণ বেশি। তাই পরিকল্পনাটি গবেষণার স্তরেই থেমে যায়।তাহলে এই বিপুল সোনা এল কোথা থেকে? বিজ্ঞানীরা মনে করেন, প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সমুদ্রের তলদেশে সোনা জমা হয়েছে। ভূমিক্ষয়ের ফলে নদী ও বৃষ্টির জলে ক্ষয়ে আসা সোনার কণা সমুদ্রে প্রবেশ করে। পাশাপাশি, সমুদ্রতলের হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট বা ফাটল দিয়ে ম্যাগমায় থাকা খনিজ ও সোনার কণা সমুদ্রের জলে মিশে যায়। ঝোড়ো বাতাসও ভূমি থেকে সোনার ধুলিকণা নিয়ে সমুদ্রে পৌঁছে দেয়। হাজার হাজার বছরের এই প্রক্রিয়ার ফলেই গড়ে উঠেছে সমুদ্রতলের সোনার ভান্ডার।
বর্তমানে আটলান্টিক (Atlantic), উত্তর প্রশান্ত (North Pacific) ও ভূমধ্যসাগর (Mediterranean) অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি সোনার সম্ভার থাকার সম্ভাবনা। বর্তমান বাজারে এক টন সোনার দাম আনুমানিক ১০ কোটি ৬০ লক্ষ ডলার। সে হিসেবে যদি ২০ কোটি টন সোনা সমুদ্রে সত্যিই মজুত থাকে, তবে এর মূল্য দাঁড়াবে প্রায় ২১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার। যা গোটা বিশ্ব অর্থনীতিকে ওলটপালট করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। তবে প্রশ্ন রয়ে যায়, আসলে কি এই সোনা কখনও উত্তোলন সম্ভব হবে? ওয়াকিবহাল মহলের একাংশ মনে করছেন, উন্নত তড়িৎ-রাসায়নিক (Electrochemical) প্রযুক্তি ও পদার্থবিজ্ঞানের প্রয়োগে ভবিষ্যতে হয়ত এমন কোনও পদ্ধতি বের করা যাবে, যা কম খরচে এবং অধিক কার্যকরভাবে সমুদ্র থেকে সোনা আহরণ করতে সক্ষম হবে। আবার অনেকের মতে, সমুদ্র থেকে সোনা তোলার চেয়ে মহাকাশে থাকা গ্রহাণুতে (Asteroids) লুকিয়ে থাকা ধাতব ভান্ডার উত্তোলন অনেক বেশি সহজ ও লাভজনক হতে পারে। ইতিমধ্যেই মহাকাশ গবেষণায় নিয়োজিত বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, বিভিন্ন গ্রহাণুতে সোনা, প্ল্যাটিনাম, লোহা, তামা-সহ অগণিত ধাতু সঞ্চিত রয়েছে।সমুদ্রবিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, “সাগরের নোনা জলে সোনা মজুত থাকা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। কিন্তু প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে এটি আপাতত স্বপ্নের মতোই।” ভবিষ্যতে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে হয়ত সেই স্বপ্ন বাস্তব রূপ নেবে। তবে আপাতত সোনা আহরণের প্রচেষ্টা মূলত গবেষণার কক্ষেই সীমাবদ্ধ।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী




