সঞ্জয় সান্যাল ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : রাজকীয় আমন্ত্রণ মানে সাধারণত সবার কাছেই এক বিরল সম্মান। বিশেষ করে আমন্ত্রণ যদি আসে ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের কাছ থেকে, তবে সেই আহ্বান এড়ানো প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ভারতের প্রখ্যাত শিল্পপতি রতন টাটা (Ratan Tata) দেখিয়েছিলেন অন্যরকম দৃষ্টান্ত। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে লন্ডনের বাকিংহাম প্যালেসে (Buckingham Palace) একটি অনুষ্ঠানে তাঁকে আজীবন সম্মান জানাতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিল ব্রিটিশ এশিয়ান ট্রাস্ট (British Asian Trust) ও তাঁকে পুরস্কার তুলে দেওয়ার কথা ছিল তৎকালীন প্রিন্স চার্লস (Prince Charles), বর্তমান ইংল্যান্ডের রাজা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেই সফর বাতিল করেছিলেন রতন টাটা। এর কারণ শুনলে যে কেউ বিস্মিত হবেন।

রাজকীয় সম্মান প্রাপ্য হওয়ার মুহূর্তে টাটা নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন একটি ব্যক্তিগত কারণের জন্য। তাঁর প্রিয় পোষ্য কুকুর ট্যাঙ্গো ও টিটোর মধ্যে একজন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। সেই সময় রাজকীয় পুরস্কারের আকর্ষণও তাঁকে টানতে পারেনি। নিজের অসুস্থ পোষ্যের পাশে থাকা, সেটাকেই জীবনের বড় দায়িত্ব মনে করেছিলেন তিনি। টাটার ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, খবরটি যখন প্রিন্স চার্লসের কাছে পৌঁছেছিল, তিনি একটুও বিরক্ত হননি। তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিল, এ কারণেই রতন টাটা সবার থেকে আলাদা।

উল্লেখ্য, পশুদের প্রতি রতন টাটার মমত্ববোধ শুধু ব্যক্তিগত ভালবাসায় সীমাবদ্ধ ছিল না। জীবদ্দশায় তিনি প্রাণীদের জন্যও সমাজসেবামূলক কাজে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। মুম্বইতে (Mumbai) স্থাপন করেন একটি অত্যাধুনিক পশু হাসপাতাল, যেখানে প্রতিদিন হাজারও প্রাণীর চিকিৎসা হয়। তাঁর নীতি ছিল, “জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।” স্বামী বিবেকানন্দের (Swami Vivekananda) এই বাণীকে তিনি জীবনে বাস্তবায়ন করেছিলেন।এমনকী মৃত্যুর আগেও রতন টাটা নিজের পোষ্যের জন্য একটি আর্থিক নিরাপত্তা রেখে যান। টিটোর যত্ন নেওয়ার জন্য বরাদ্দ করেন প্রায় ১২ লক্ষ টাকা। বর্তমানে টিটো রতন টাটার দীর্ঘদিনের সঙ্গী ও রাঁধুনি রাজেন শা (Rajan Shah) -এর তত্ত্বাবধানে রয়েছে। টাটার কাছের মানুষদের মতে, মানুষের সঙ্গে যেমন আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারতেন তিনি, ঠিক তেমনই প্রাণীদের প্রতিও তাঁর ভালোবাসা ছিল সীমাহীন।

শুধু রতন টাটা নয়, টাটা পরিবারের ইতিহাসেই মানবিকতার বহু নজির রয়েছে। জামশেদজি টাটা (Jamsetji Tata) থেকে শুরু করে জেআরডি টাটা (JRD Tata) প্রত্যেকেই সমাজের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। ক্যান্সার হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য খাতে অসংখ্য অবদান রেখেছে টাটা গ্রুপ। রতন টাটাও (Ratan Tata) সেই ধারাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন নতুন উচ্চতায়। তবে বাকিংহাম প্যালেসের অনুষ্ঠানে না গিয়ে পোষ্যের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত তাঁর মানবিকতার যে ছবি তুলে ধরে, তা অন্য কোনও পুরস্কারের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই ঘটনাটিই প্রমাণ করে, রতন টাটার কাছে সম্মান, সম্পদ বা পদমর্যাদাই নয়, সবচেয়ে বড় মূল্যবোধ ছিল ভালবাসা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ। সমাজসেবার পাশাপাশি তিনি প্রাণীদের জন্য যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। অনেকে বলেন, ব্যবসায়ী হিসেবে টাটার সাফল্য অসাধারণ হলেও, একজন মানুষ হিসেবে তাঁর মানবিকতা তাঁকে প্রকৃত উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।প্রসঙ্গত, আজও রতন টাটার জীবনের নানা কাহিনি মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। কিন্তু বাকিংহাম প্যালেসের সেই আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়া নিঃসন্দেহে তাঁর জীবনের সবচেয়ে মানবিক ও ব্যতিক্রমী পদক্ষেপগুলির মধ্যে একটি। কারণ তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, সম্মানের আসল মাপকাঠি মানুষের অন্তরের দয়া আর মমত্ববোধেই।
সব ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Ratan Tata : রতন টাটা একটি অনন্য জীবনের নীরব রূপকথা




