পারিজাত গঙ্গোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক : যেন সিনেমার চিত্রনাট্য। শনিবারের নায়ক রবিবার হয়ে ওঠেন খলনায়ক। আর তারপর সোমবার আবার সেই ‘খলনায়ক’-ই হয়ে ওঠেন দলের একমাত্র ত্রাতা। এটাই হয়ত টেস্ট ক্রিকেটের রোমাঞ্চ, আর এটাই মহম্মদ সিরাজ (Mohammed Siraj)-এর চরিত্রগঠনের গল্প। ওভাল টেস্টে শেষ দিনে দুরন্ত স্পেলে ইংল্যান্ডের স্বপ্নভঙ্গ করলেন হায়দরাবাদের এই জোরে বোলার। ভারত ও ইংল্যান্ড টেস্ট সিরিজ ২০২৫ ইংল্যান্ড শেষ হল ২-২ স্কোরলাইনে। সিরিজ ড্র হলেও শেষ টেস্টে ভারতীয়দের লড়াই ও সিরাজের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন নতুন বিশ্বাস তৈরি করল ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে।
লর্ডসে টেস্ট হেরে গিয়েছিল ভারত। মাত্র ২২ রানের জন্য। শেষ ব্যাটার হিসেবে সিরাজ (Mohammed Siraj) যখন আউট হন, তখন হাহাকার নেমে আসে ভারতীয় শিবিরে। রবীন্দ্র জাদেজা (Ravindra Jadeja) ও জসপ্রীত বুমরাহ (Jasprit Bumrah)-এর লড়াই তখনও আশা জাগাচ্ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিরাজ আউট হতেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল সেই প্রতিরোধ। একটানা ৩০ বল ধরে চেষ্টা করেও সেদিন পারেননি দলকে জয় এনে দিতে। সেই রাতের পর দু’দিন ঘুম আসেনি সিরাজের। তবুও হাল ছাড়েননি।
ওভালের মাটিতে সিরিজ নির্ধারক পঞ্চম টেস্টে বল হাতে মিরাকল ঘটালেন। ম্যাচের পঞ্চম দিনে মাত্র এক ঘণ্টার ঝড়ো স্পেলে তুলে নিলেন ৩টি মূল্যবান উইকেট। ইংল্যান্ড যখন ৩০০/৩, তখনও ভরসা হারাননি। সে কথাই ম্যাচের শেষে জানালেন দীনেশ কার্তিক (Dinesh Karthik)-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে, “ইংল্যান্ড যখন এত রান করছিল, তাও বিশ্বাস ছিল কিছু একটা হবে। হাল ছাড়িনি। আমাদের দলেও বিশ্বাস ছিল, বোলাররা সঠিক জায়গায় বল করলে ওরা চাপ অনুভব করবে।” সিরাজের স্পষ্ট কথা, “আমার খুব সাধারণ পরিকল্পনা ছিল। কিছু নতুন ভাবিনি। শুধু একটা জিনিস মাথায় রেখেছিলাম, সঠিক জায়গায় বল করতে হবে। ওটা ঠিক থাকলে, উইকেট আপনি পাবেনই। না হলে চার বা ছয় খাবেন। কিন্তু বেসিক ভুল করা যাবে না।”
উল্লেখ্য, রবিবার হ্যারি ব্রুক (Harry Brook)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাচ নিতে গিয়ে বাউন্ডারির দড়িতে পা দিয়েছিলেন সিরাজ। ফলে ব্রুক বেঁচে যান, আর সমালোচনার ঝড় ওঠে সোশ্যাল মিডিয়ায়। অনেকেই সরাসরি তাঁকেই দায়ী করতে শুরু করেন ম্যাচের দিক পাল্টে যাওয়ার জন্য। একটা সময় মনে হয়েছিল, সেই ক্যাচ মিসই ভারতের পরাজয়ের কারণ হয়ে উঠবে। কিন্তু সোমবার সকালটা একেবারে বদলে দিল ছবিটা। মাত্র ৫৭ মিনিট খেলেই ভারত জিতে নিল ম্যাচ। ইংল্যান্ডের শেষ সাত উইকেট গুটিয়ে গেল মাত্র ৪১ রানে। এর মধ্যে সিরাজের ছিল তিনটি। সেই চাপের সময়ও ঠান্ডা মাথায় বোলিং করে যান সিরাজ। ডানহাতি এই পেসার স্বীকার করেছেন, ওই চাপ ও সমালোচনার ভিতর দিয়েই তিনি নিজেকে নতুন করে তৈরি করেছিলেন। গলায় তখনও উত্তেজনার রেশ। হাঁপিয়ে উঠছিলেন কথা বলার সময়েও। তবু মুখে ছিল প্রশান্তির হাসি, “অনেক কিছু শুনতে হয়েছে লর্ডসের পর। নিজেকেই প্রশ্ন করছিলাম, আমি কি সত্যিই দলের জন্য ব্যর্থ? আজকের দিনটা সেই সব প্রশ্নের উত্তর। এতদিনের পরিশ্রমের ফল পেলাম।”
ভারতীয় দলের টেস্ট অধিনায়ক শুভমন গিল (Shubman Gill) ম্যাচের শেষে স্পষ্ট বলেন, “সিরাজ যেভাবে চাপের মধ্যে দায়িত্ব পালন করল, সেটাই দলের চরিত্র। ও শুধু বল করে না, দলকে লড়তে শেখায়।” আর সহঅধিনায়ক জসপ্রীত বুমরাহ-এর কথায়, “সিরাজের ফিরে আসাটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওনা। এমন প্লেয়ারই বড় ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেয়।” সিরিজের শেষে, ইংল্যান্ডের মাঠে দাঁড়িয়ে, চার টেস্টের শেষে যখন সিরিজ ড্র হয়, তখন একটাই নাম উঠে আসে সবার মুখে, মহম্মদ সিরাজ। একটানা পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস আর ভুল থেকে শেখার মানসিকতা সিরাজকে আবার প্রমাণ করল, কেন তিনি ভারতের টেস্ট বোলিংয়ের অন্যতম বড় অস্ত্র। এই টেস্ট সিরিজ শুধু স্কোরবোর্ডের লড়াই ছিল না, ছিল আত্মবিশ্বাসের লড়াইও। আর সিরাজ দেখিয়ে দিলেন, যাঁরা সমালোচনার জবাব দিতে পারেন নিজের পারফরম্যান্সে, তাঁরাই প্রকৃত নায়ক।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India England series draw, India vs England Test 2025 | সিরাজদের জাদুতে ইংল্যান্ডে সিরিজ় ড্র ভারতের




