পারিজাত গঙ্গোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ, ওভাল : ভারত বনাম ইংল্যান্ড টেস্ট সিরিজ় যেন এক উপন্যাসের শেষ অধ্যায়। চূড়ান্ত নাটকীয়তার আবহে, পঞ্চম দিনে মাত্র ৬ রানে জিতে ভারত সিরিজ় ২-২ ড্র করল ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে। সোমবার ওভাল (Oval)-এর মাঠে হৃদ্স্পন্দন বাড়ানো উত্তেজনার সাক্ষী থাকল গোটা ক্রিকেট বিশ্ব। মহম্মদ সিরাজ (Mohammed Siraj)-এর বল রচনা করল শেষ দৃশ্যের চূড়ান্ত ক্লাইমেক্স। বল হাতে দাপটে, উইকেট নেওয়ার ক্ষুধায়, সিরিজ়ে তিনিই হয়ে উঠলেন নায়ক। সোমবার ম্যাচ শুরুর আগে দুই দলের হাতে ছিল সম্ভাবনার সমীকরণ। ইংল্যান্ড চাইছিল মাত্র ৩৫ রান। ভারতের দরকার ছিল ৪ উইকেট। রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে ক্রিকেট যুদ্ধে মাঠে নেমে গেল দুই দল। তারপর রুদ্ধশ্বাস ৫৭ মিনিট। এক এক করে উইকেট পড়ছিল আর ভারতীয় সমর্থকদের হৃদস্পন্দন চড়ছিল। শেষে গাস অ্যাটকিনসন (Gus Atkinson)-এর স্টাম্প ছিটকে যাওয়ায় চূড়ান্ত উল্লাসে ফেটে পড়েন সিরাজ। আকাশের দিকে দু’হাত ছড়িয়ে ভারতীয় পেশার যেন নিজের লড়াইয়ের পুরস্কারকে স্বাগত জানালেন।

গোটা সিরিজ়টা-ই যেন সিরাজময়। পাঁচ ম্যাচের প্রত্যেকটি খেলেছেন। ১২০০-এর বেশি বল করে ২৩টি উইকেট সংগ্রহ করেছেন। দু’দলের মধ্যে তিনিই একমাত্র পেসার যিনি প্রতিটি ম্যাচে খেলেছেন। সিরাজের ধারাবাহিকতা এই সিরিজ়ের অন্যতম প্রাপ্তি।ওভালের চতুর্থ দিনে ভারতের ফর্ম ভালই ছিল। ইংল্যান্ডের দরকার ছিল ৩২৪ রান, ভারতের দরকার ছিল ৮ উইকেট। প্রথম সেশনে বেন ডাকেট (Ben Duckett) ও অলি পোপ (Ollie Pope) ফিরতেই ভারতীয় শিবিরে আশার আলো জ্বলে ওঠে। কিন্তু হ্যারি ব্রুক (Harry Brook)-এর ক্যাচ হাতছাড়া করেন সিরাজ। তাতে ব্যাকফুটে চলে যায় ভারত। ব্রুক সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মারমুখী ব্যাটিং শুরু করেন। পাশে ছিলেন নির্ভরযোগ্য জো রুট (Joe Root)। দুই ব্যাটারের মধ্যে গড়ে ওঠে ১৯৫ রানের বিশাল পার্টনারশিপ। চা-বিরতির আগে শতরান করে ব্রুক তাণ্ডব শুরু করেন। শেষমেশ ১১১ রানে আকাশদীপ (Akash Deep)-এর বলে আউট হন। সিরাজই ক্যাচ ধরেন। রুট নিজের ১৩তম টেস্ট শতরান করেন ভারতের বিরুদ্ধে, চলতি সিরিজ়ে এটি তাঁর তৃতীয়। তবে এই দু’জনের বিদায়ের পরই ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়। প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ (Prasidh Krishna) দ্রুত উইকেট তুলে নিয়ে ফের ম্যাচ টানেন ভারতের দিকে।
এর মাঝেই নেমে আসে বৃষ্টি। খেলা থেমে যায়। গড়ায় পঞ্চম দিনে। ক্রিকেটীয় নাটকীয়তার পারদ চড়তে থাকে। ভারতীয় পেসারদের তীক্ষ্ণ লাইন ও লেংথে ধরা পড়ে শেষ চার উইকেট। সিরাজ ও প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ ৬ রানের ঐতিহাসিক জয় এনে দেয় দেশকে। দেখবার বিষয়, গোটা সিরিজ়ে ভারত খেলে গিয়েছে বুক চিতিয়ে। হেডিংলে (Headingley), লর্ডস (Lords)-এ জেতার সম্ভাবনা থাকলেও ছোটখাটো ভুলে সেসব হাতছাড়া হয়েছে। কিন্তু ব্যাটে-বলে তরুণদের দৃপ্তভাব স্পষ্ট। অধিনায়ক শুভমন গিল (Shubman Gill)-এর ফর্ম, ঋষভ পন্থ (Rishabh Pant)-এর প্রত্যাবর্তন, আকাশদীপের প্রথম সিরিজ়েই আত্মবিশ্বাসী বোলিং, সব মিলিয়ে ভবিষ্যতের দল গড়ে তোলার ভিত তৈরি হয়েছে। এখানে মনে রাখতে হবে, রবীন্দ্র জাডেজা (Ravindra Jadeja) ও ওয়াশিংটন সুন্দর (Washington Sundar)-এর অলরাউন্ডার ভূমিকা দলকে অনেক অনেক ভারসাম্য দিয়েছে। ম্যাঞ্চেস্টারে (Manchester) ভারতের প্রায় দু’দিন ব্যাট করে ম্যাচ বাঁচানোর ঘটনাও চিহ্নিত হবে সিরিজ়ের মোড় ঘোরানো মুহূর্তগুলোর অন্যতম।
কিন্তু, সমালোচনাও থাকছে। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে একাধিকবার পরিকল্পনায় ঘাটতি দেখা গিয়েছে। শুভমন চার নম্বর পেসার না রাখার সিদ্ধান্তে শেষ দিকে সমস্যায় পড়ে যান। স্পিনারদের কোনও প্রভাব না থাকায় তাঁকে নির্ভর করতে হয় সিরাজ, প্রসিদ্ধ, আকাশদীপের উপরেই। ঘন ঘন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বল করতে হয় ওঁদেরই। হয়ত আর এক পেসার থাকলে ম্যাচ আরও আগেই শেষ করা যেত!কিন্তু, ভারতীয় দলের লড়াই নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। সিরিজ়ের ৩১টি সেশন জিতেছে ভারত, ইংল্যান্ড জিতেছে ২২টি। তার পরেও ইংল্যান্ডের মাটিতে ভারতীয় ক্রিকেটারদের ব্যাট-বলের লড়াই নিঃসন্দেহে আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর লড়াই তো বটেই।অন্যদিকে, গৌতম গম্ভীর (Gautam Gambhir)-এর কোচিংয়ে ভারতের এটিই ছিল চতুর্থ টেস্ট সিরিজ়। শুরু করেছিলেন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জয় দিয়ে, কিন্তু পরের দুটো সিরিজ়ে হেরেছেন নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার কাছে। এবার ইংল্যান্ড সফরও শুরু হয়েছিল চাপের ভেতর দিয়েই। সিরিজ় হারলে গম্ভীরের কোচিং নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠত। তবে শুভমন-সিরাজদের লড়াই তাঁকে সেই লজ্জা থেকে কিছুটা রক্ষা করল। ভারত বা ইংল্যান্ড দুই দলের কেউ-ই সিরিজে জয় পেল না ঠিকই, কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটে এটি একটি বিজয়গাথা। প্রতিটি সেশন, প্রতিটি স্পেল আর প্রতিটি বলেই যে হৃদয়ের স্পন্দন লুকিয়ে ছিল, তা নতুন করে মনে করাল ওভাল টেস্ট।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Gautam Gambhir Coaching Controversy | রোহিত ও কোহলিকে ফেরানোর কৌশল, ইংল্যান্ড টেস্টে ব্যর্থতার জন্য দায়ী গম্ভীর? প্রশ্ন চিহ্নের সামনে বিসিসিআই কর্তারা!




