তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ : একটা শহরকে চেনা যায় তার গন্ধ, স্বাদ, আর স্মৃতির মোড়ক দিয়ে। কলকাতার ক্ষেত্রেও তা কিন্তু ব্যতিক্রম নয়। শহরের প্রতিটি মোড়, প্রতিটি অলিগলি যেন একেকটা ইতিহাসের পাতায় বন্দী হয়ে আছে। আর এই ইতিহাসের পাতায় অজান্তেই হারিয়ে যাচ্ছে এক সময়ের অতি পরিচিত, ঢাকাই পরোটা (Dhakai Parota)। এক সময় যা ছিল কলকাতার স্ট্রিট ফুড সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ সেটি রীতিমতো বিরল স্বাদের স্মৃতি মাত্র।
কলকাতার অলিগলিতে এক সময় ঢাকাই পরোটার জন্য যে ভিড় জমত, সেটা এখন কল্পনাতীত। বিশেষ করে উত্তর কলকাতার (North Kolkata) বিধান সরণির ধারে বা হাতিবাগান (Hatibagan) অঞ্চলের দোকানগুলিতে সন্ধে হলেই ঢাকাই পরোটার জন্য লাইনে দাঁড়াতেন ভোজনপ্রেমীরা। তার সঙ্গে গাঢ় ছোলার ডাল বা খোসাওয়ালা আলুর তরকারি ছিল যেন অভেদ্য জুটি। আজ, সে লাইনের জায়গা দখল করেছে মোমো, চাউমিন, রোল আর বার্গার। বা বলা ভাল, ফাস্ট ফুড সংস্কৃতি। শহরের মানুষের খাদ্যপ্রীতির স্বাদ বদলেছে, সঙ্গে বদলে গিয়েছে স্ট্রিট ফুডের চরিত্রও। একটা সময়ে যখন কলকাতায় রোল বা চাইনিজ খাওয়ার তেমন প্রচলন ছিল না, তখন ঢাকাই পরোটা ছিল ভরসা। রাস্তার ধারে ছোট ছোট দোকানগুলোতে সন্ধেবেলা সিঙাড়া, কচুরি আর ঢাকাই পরোটার গন্ধে ম ম করত। বিশেষ করে ‘জলখাবার (Jol Khabor)’, ‘প্রিয়াঙ্কা (Priyanka)’, বা ‘গদার দোকান (Gada’s shop)’ এইসব পুরনো দোকানগুলির নাম এখনও নস্টালজিয়ায় আবৃত অনেকের স্মৃতিতে।
ঢাকাই পরোটার উৎপত্তি নিয়ে খাদ্যগবেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ বলেন, এর জন্ম ঢাকায় (Dhaka)। বাংলাদেশের (Bangladesh) রাজধানীতে একসময় মোগল ‘কুট্টি’ (Mughal Kuttis) সৈন্যরা যুদ্ধের আগে এই ধরনের খাবার তৈরি করতেন। অন্য এক কাহিনি অনুযায়ী, লখনউ (Lucknow) থেকে আগত ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন (Alauddin) ঢাকায় এই পরোটা তৈরি শুরু করেন। আবার কিছু গবেষক মনে করেন, এর জন্ম মেদিনীপুর (Medinipur)। ঢাকাই পরোটার বহুস্তরীয় গঠন ঢাকনার মতো বলেই এর নাম ‘ঢাকাই’। কিন্তু নাম যা-ই হোক না কেন, স্বাদ নিয়ে বিতর্ক নেই। ঢাকাই পরোটা দেখতেও যেমন আকর্ষণীয়, খেতেও তেমনই। দেখতে অনেকটা বড়সড় লুচির মতো, মাঝখানটা ফাঁপা। বাইরে খাস্তা, ভেতরে নরম। বিশেষ প্রণালিতে তৈরি হয় এই পরোটা। ময়দা দিয়ে লেচি বানিয়ে তাতে ঘি আর শুকনো ময়দা মিশিয়ে বেলা হয়, তারপর স্তর তৈরি করতে ছুরি দিয়ে কাটা হয়। তারপর তেলে ভাজা। এই প্রক্রিয়াটি যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনই দক্ষতা দাবি করে।
সম্ভবত এই সময় আর শ্রমসাধ্যতার কারণেই এখনকার খাবারের বাজারে ঢাকাই পরোটা হারিয়ে যাচ্ছে। স্ট্রিট ফুডের দুনিয়ায় দ্রুত রাঁধো-দ্রুত খাও’-এর যুগে ঢাকাই পরোটার জন্য কেউ অপেক্ষা করতে চায় না। তার বদলে মোমো বা রোল হয়ে উঠেছে ‘তরতাজা পছন্দ’। ফলত, একসময়ের জনপ্রিয় এই পরোটা এখন ‘সংখ্যালঘু’ খাবারের তালিকায়।
কিন্তু তা হলে কী হবে, অনেকেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে হাল ছাড়েননি। এখনও কিছু দোকান আছে, যারা এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে। যেমন ‘জলখাবার (Jol Khabor)’ রাসবিহারী মোড়ের সাদার্ন অ্যাভিনিউর ধারে অবস্থিত, এই মিষ্টির দোকানে এখনও পাওয়া যায় ঢাকাই পরোটা, মাত্র ৩০ টাকায়। সঙ্গে গাঢ় ছোলার ডাল, বোঁদে ও টক দই। বিকেলের দিকে গেলে খদ্দেরের ভিড়ে দোকান সরগরম। তেমনই আরেকটি জনপ্রিয় নাম ‘প্রিয়াঙ্কা (Priyanka)’। কালীঘাট মন্দির দর্শনের পর ঢাকাই পরোটা না খেলে যেন তীর্থ সম্পূর্ণ হয় না! ৬০ টাকায় এক পিস ঢাকাই পরোটা ও ছোলার ডালের প্যাকেজ আজও বিক্রি হয় গড়ে ২০০টির বেশি প্রতিদিন। আরও আছে ‘গদার দোকান (Gada’s Shop)’। বিধান সরণির এই দোকানে বিগত ৬০ বছর ধরে ঢাকাই পরোটা বিক্রি হচ্ছে। একসময় বাংলাদেশের একটি মিষ্টির দোকান থেকে শেখা এই রেসিপি আজও বাঁচিয়ে রেখেছে কলকাতার ঐতিহ্য। এখনও মাত্র ৩০ টাকায় এখানে মেলে ঢাকাই পরোটা। এছাড়াও নিউ জলখাবার, শ্যামনগর বা মায়াপুরের মতো কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় এই পরোটা এখনও পাওয়া যায়। তবে তা শহরের মূল লাইনে আর নেই। ঢাকাই পরোটা এখন শহরের এক প্রান্তে প্রায় বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্য।
ঢাকাই পরোটার হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটা খাবারের অন্তর্ধানই নয়, তা এই শহরের স্মৃতি, ঐতিহ্য এবং খাদ্যসংস্কৃতির ক্ষয়ে যাওয়াও। বর্তমানে যখন আমরা মেশানো ফ্লেভারের খোঁজে ব্যস্ত, তখন প্রাচীন, গভীর স্বাদের এই খাবারটি আমাদের স্মৃতির মেঘে ছায়া ফেলে চলে যাচ্ছে। এই হারিয়ে যাওয়া স্বাদের কাছে ফিরে যাওয়াটাই হয়ত বাঙালির নতুন আত্ম-অন্বেষণ।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Darbaari Mutton recipe | নবাবি দরবারী মটন, সহজ রেসিপিতে রাজকীয় স্বাদ




