তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক : ভারতের অন্যতম রহস্যময় তীর্থক্ষেত্র বৈষ্ণোদেবী মন্দির (Vaishno Devi Temple)। হাজার হাজার বছরের পুরনো এই পাহাড়ি গুহা-মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পৌরাণিক গল্প, বিশ্বাস, লোকজ সংস্কৃতি ও দেবীর ভক্তদের অসীম আস্থা। জম্মু ও কাশ্মীরের (Jammu and Kashmir) রেজি (Reasi) জেলার কাটরা (Katra) থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার উপরে ত্রিকূটা পর্বতে অবস্থিত এই মন্দিরে প্রতিবছর কোটি কোটি তীর্থযাত্রী উপস্থিত হন ‘মাতারানি’র (Mata Rani) দর্শনের জন্য।
লোককথা অনুযায়ী, বৈষ্ণোদেবী ছিলেন রত্নাকর সাগর (Ratnakar Sagar) ও তাঁর স্ত্রীর কন্যা ত্রিকূটা (Trikuta)। জন্মের পরেই তাঁরা শপথ করেছিলেন, সন্তানের জীবনে কোনওরকম হস্তক্ষেপ করবেন না। মাত্র ৯ বছর বয়সে তিনি কঠোর তপস্যা শুরু করেন রাম (Ram) ও বিষ্ণুকে (Vishnu) তুষ্ট করার জন্য। শ্রীরামের আশীর্বাদেই তিনি গুহা আশ্রমে বাস শুরু করেন। এই গুহাই আজ বৈষ্ণোদেবীর মন্দির হিসেবে পরিচিত। এপ্রসঙ্গে, প্রফেসর ট্রেসি পিন্চম্যান (Prof. Tracy Pintchman) তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন, প্রায় ৯০০ বছর আগে বৈষ্ণোদেবী যুবতী রূপে হান্সালি গ্রামের (Hansali) এক ব্রাহ্মণ শ্রীধরকে (Shridhar) স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেছিলেন, গ্রামের সকলের জন্য ভোজের আয়োজন করতে। সেই ভোজে উপস্থিত হয়েছিলেন গোরক্ষনাথের (Gorakhnath) শিষ্য ভৈরবনাথ (Bhairavnath)। তিনি মাংস ও মদ চাইলে, বৈষ্ণোদেবী তা অস্বীকার করেন ও পালিয়ে যান ত্রিকূটা পর্বতের দিকে। পথে তিনি বিশ্রাম নেন বঙ্গগঙ্গা (Banganga), চরণপাদুকা (Charan Paduka), এবং অর্ধকুমারী (Ardhkuwari) অঞ্চলে। কথিত আছে, অর্ধকুমারী গুহায় তিনি নয় মাস ধ্যান করেন, যেভাবে গর্ভে শিশু থাকে। ভৈরবনাথের কামনায় বিরক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত বৈষ্ণোদেবী চামুন্ডারূপে (Chamunda) তাঁর শিরচ্ছেদ করেন। গুহার প্রবেশদ্বারে তাঁর দেহ ও পাহাড়ের উপরে মাথা স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে অনুতপ্ত ভৈরবনাথকে দেবী আশীর্বাদ করেন, ‘যতক্ষণ না ভক্তরা তোমারও দর্শন করবে, তাঁদের বৈষ্ণোদেবী দর্শন পূর্ণ হবে না।’
মন্দির চত্বরে রয়েছে দেবী লক্ষ্মী (Lakshmi), সরস্বতী (Saraswati) ও কালী (Kali)-রূপী তিনটি শিলা পিন্ডি। এগুলিকেই ‘পিন্ডি রূপে মা’-এর প্রকাশ বলে মানা হয়। ভক্তরা লাল ওড়না, নারকেল, নকুলদানা, কাজুবাদাম, মেওয়া, এলাচ, কিশমিশ, শুকনো আপেল, মিছরি আর রুপোর মুদ্রা প্রসাদ হিসেবে পান। প্রসাদ বিতরণ হয় পাটের কাপড়ের থলে করে। ভক্তরা কাটরা থেকে পায়ে হেঁটে এই মন্দিরে পৌঁছন। পাহাড়ি পথে প্রথমেই আসে বঙ্গগঙ্গা নদী, যেখানে বলা হয়, বৈষ্ণোদেবী তীর নিক্ষেপ করে গঙ্গাকে আহ্বান করেছিলেন হনুমানজীর (Hanumanji) তৃষ্ণা মেটাতে। এরপর চরণপাদুকা, যেখানে দেবীর পায়ের ছাপ আছে বলে বিশ্বাস। অর্ধকুমারীতে নয় মাসের ধ্যানের পর ভৈরবনাথের হাত থেকে বাঁচতে তিনি অবশেষে ভবন গুহায় প্রবেশ করেন। সেখানেই মন্দির, যেখানে তিনটি পিন্ডির পূজা হয়।
মন্দির কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বছরে প্রায় এক কোটি তীর্থযাত্রী এখানে আসেন। হেলিকপ্টার, রেল ও সড়কপথে কাটরায় পৌঁছে, তাঁরা পাহাড়ি পথে চড়াই শুরু করেন। নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য আধুনিক ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হয়েছে। তবে, পরম বিশ্বাসই এই তীর্থযাত্রার প্রধান শক্তি।
ভক্তদের মধ্যে তীর্থযাত্রীর কথায় বলেন, ‘প্রথমবার যাওয়ার আগে ভয় পেয়েছিলাম শারীরিকভাবে পারব কিনা। কিন্তু মাতারানির শক্তিতেই ১২ কিমি হেঁটে যেতে কোনও ক্লান্তি বোধ করিনি।’ বিশিষ্ট ধর্মতাত্ত্বিক অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় (Abhijit Mukhopadhyay) বলেন, ‘ভারতের তীর্থসংস্কৃতিতে বৈষ্ণোদেবী এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এখানে বৈষ্ণব ও শাক্ত দুই ধারাই মিলে গিয়েছে। বৈষ্ণো অর্থে বিষ্ণুর ভক্ত হলেও, এখানে তিনি চামুন্ডারূপেও পূজিতা।’
অন্য একটি কাহিনী অনুযায়ী, বৈষ্ণোদেবী জন্মেছিলেন মহিষাসুরমর্দিনীর (Mahishasuramardini) অংশরূপে, শিব (Shiva) ও বিষ্ণুর নির্দেশে। তাই তিনিই ত্রিদেবীর সমন্বিত শক্তি। মন্দিরের পুরোহিত কিরণ সিং (Kiran Singh) জানালেন, ‘এই গুহায় তিনটি গর্ত আছে, যেটি তিনটি যুগের প্রতীক। মানুষের পাপমোচন ঘটে এই তীর্থে।’ তীর্থযাত্রীরা মন্দিরে যাওয়ার পর ভৈরবনাথের মন্দিরে (Bhairavnath Temple) যান। কারণ, দেবী তাঁকে বর দিয়েছিলেন যে, তাঁর মাথার দর্শন না করলে ভক্তদের বৈষ্ণোদেবী দর্শন পূর্ণ হবে না। এই বিশ্বাস আজও অটল। তাই প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ বৈষ্ণোদেবী মন্দিরে পুজো দেওয়ার পর ভৈরবনাথ মন্দিরে যান। জন্ম থেকে তপস্যা, তপস্যা থেকে দেবত্ব, বৈষ্ণোদেবীর জীবনগাথা এক গভীর আধ্যাত্মিক বোধ জাগায়। পাহাড়ের গহীনে গুহামন্দির, পিন্ডিরূপী মা, তীর্থযাত্রীদের ভক্তির চোখে তিনি আজও ত্রিকূটা পাহাড়ের চিরন্তন দেবী। কথায় আছে, “যাঁরা একবার বৈষ্ণোদেবীর দর্শন পান, জীবনে আর কিছু চাইবার থাকে না।’
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Manali | মানালি: পাহাড়ি রূপকথার পাতায় ছুটি কাটানোর ঠিকানা




