তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ ওয়াশিংটন, ১৫ জুলাই: আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে (International Space Station) ১৮ দিনের বর্ণময় অভিযান শেষে সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরলেন ভারতীয় মহাকাশচারী শুভাংশু শুক্লা (Subhangshu Shukla)। এই ঐতিহাসিক সফর তাঁকে শুধু মহাকাশের গভীরে পৌঁছে দেয়নি, তাঁকে এনে দিয়েছে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার এক নতুন অধ্যায়ের মুখোমুখি হওয়ার গর্বও। সোমবার সন্ধ্যায় আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো উপকূলে সফল স্প্ল্যাশডাউন (Splashdown) করে তাঁদের মহাকাশযান ‘ড্রাগন গ্রেস’ (Dragon Grace)। এই স্পেসক্র্যাফটেই ছিল মহাকাশচারী শুভাংশুসহ মোট চারজন মহাকাশ অভিযাত্রী।
অ্যাক্সিয়ম স্পেস (Axiom Space)-এর চতুর্থ প্রাইভেট মিশন ‘Axiom Mission 4’ বা ‘Ax-4’-এর অংশ ছিলেন শুভাংশু শুক্লা। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তিন আন্তর্জাতিক মহাকাশচারী। গত ১৪ জুলাই (রবিবার) বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন থেকে পৃথিবীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন তাঁরা। প্রায় ২২ ঘণ্টা যাত্রার পর সোমবার তাঁদের স্পেসক্র্যাফট অবশেষে সান দিয়েগোর সাগরে নামে। উল্লেখ্য এই স্পেস মিশনটির আসল উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে গবেষণাধর্মী কাজ। প্রায় ১৪ দিন ধরে তাঁরা মাইক্রোগ্র্যাভিটির (Microgravity) প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও গবেষণা করেন, যার মধ্যে ছিল মানবদেহের উপর মহাকাশের প্রভাব, নতুন জেনেটিক উপাদান নিয়ে গবেষণা, ও অরগান অন চিপ প্রযুক্তির (Organ-on-a-chip) পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
শুভাংশুর এই কৃতিত্বে গোটা ভারত আজ গর্বিত। তাঁর পরিবার, যাঁরা উত্তরপ্রদেশের কানপুরে থাকেন। তাঁরা ইতিমধ্যেই সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, এই সাফল্য তাঁদের স্বপ্নের চেয়েও বড়। তাঁর বাবা বলেন, “ছেলেকে ছোট থেকে মহাকাশে যেতে দেখতে চেয়েছিলাম। আজ সেই স্বপ্ন সত্যি হল।” মহাকাশ থেকে ফিরে এক আবেগঘন বার্তায় শুভাংশু শুক্লা বলেন, “আমি সবসময় রাকেশ শর্মা (Rakesh Sharma) স্যারের কথা মনে রেখেছি। আজ আমি নিজেও বলতে পারি, মহাকাশ থেকে ভারত এখনও সব দেশের থেকে সেরা লাগে। আমাদের দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যে জায়গায় পৌঁছেছে, তা অভূতপূর্ব।” শুভাংশুর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় তাঁর দেশপ্রেম ও বিজ্ঞানপ্রীতি।
শুভাংশুর ফিরে আসা ছিল পরিকল্পনার কিছুটা বাইরে। প্রথমে ঠিক ছিল ১০ জুলাই তাঁরা পৃথিবীতে ফিরবেন। কিন্তু আবহাওয়াগত ও প্রযুক্তিগত কারণের ফলে তাঁদের স্পেস স্টেশনে আরও ক’য়েকদিন থাকতে হয়। ফলে স্প্ল্যাশডাউন পিছিয়ে যায় চারদিন। এই গোটা অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন অ্যাক্সিয়ম স্পেস ও স্পেসএক্স (SpaceX), যাঁরা যৌথভাবে বেসরকারি মহাকাশ ভ্রমণের সম্ভাবনা আরও সম্প্রসারিত করতে উদ্যোগী হয়েছেন। শুভাংশুর মতো ভারতীয়দের অংশগ্রহণ ভবিষ্যতের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ বলে মনে করছেন মহাকাশ বিজ্ঞানীরা।
ইতিমধ্যেই ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন বা ইসরো (ISRO)-এর পক্ষ থেকেও শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে শুভাংশুকে। ইসরোর এক পদস্থ কর্তা জানান, “এই ধরনের আন্তর্জাতিক মিশনে ভারতীয় অংশগ্রহণ আমাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরে। শুভাংশুর কৃতিত্ব আগামী প্রজন্মকে মহাকাশ বিজ্ঞানে উৎসাহিত করবে।” মহাকাশ অভিযানের শেষে এই সফল মিশন শুধু শুভাংশু শুক্লার ব্যক্তিগত জয় নয়, এটি ভারতের জন্যও এক গর্বের মুহূর্ত। বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সাহসিকতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন শুভাংশু শুক্লা। তাঁর বক্তব্যেই ধরা পড়ে ভবিষ্যতের ডাক, “যেখানে ভারতীয়দের মহাকাশজয় শুধু কল্পনা নয়, প্রতিদিনের বাস্তব হতে চলেছে।”
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Shubhanshu and Kamna Shukla | তৃতীয় শ্রেণির বেঞ্চ থেকে মহাকাশে : শুভাংশুর ও কামনার সম্পর্কের অন্দর মহল




