Condom| জন্মনিয়ন্ত্রণে কণ্ডোম, প্রাচীন সভ্যতা থেকে আধুনিক ভারতের পথে

SHARE:

শিবপ্রসাদ মণ্ডল ★ সাশ্রয় নিউজ : একবিংশ শতাব্দীর ভারতবর্ষে জন্মনিয়ন্ত্রণ এখন শুধুমাত্র চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির চিহ্ন নয়। সামাজিক সচেতনতারও প্রতিফলন। তবে জন্মনিয়ন্ত্রণের এই ভাবনা আজকের নয়, তার শিকড় প্রাচীন সভ্যতার অনেক গভীরে। কণ্ডোম (Condom) নামক সহজ ও অ-আক্রমণাত্মক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ইতিহাসও একরকম মনোমুগ্ধকর ও বিস্ময়কর।

ছবি : সংগৃহীত

আজকের ভারতবর্ষে যখন স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে শুরু করে ফার্মেসি কিংবা অনলাইন স্টোরেও সহজে কণ্ডোম পাওয়া যায়, তখন অনেকে জানেন না যে জন্মনিয়ন্ত্রণের ধারণা প্রাচীন ভারতীয় সমাজেও বিদ্যমান ছিল।

ছবি : সংগৃহীত

আয়ুর্বেদিক গ্রন্থ চরক সংহিতা (Charaka Samhita) এবং সুশ্রুত সংহিতা (Sushruta Samhita)-তে কিছু ভেষজ পদ্ধতির উল্লেখ রয়েছে, যা প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্র অনুসারে গর্ভধারণ রোধে সহায়ক হতে পারে।

ছবি : সংগৃহীত

একাধিক ঐতিহাসিক গবেষণা বলছে, সে সময়ে বিভিন্ন প্রাকৃতিক নির্যাস, গাছের ছাল বা তেলজাতীয় পদার্থ ব্যবহার করে নারীদের গর্ভধারণ রোধের ব্যবস্থা নেওয়া হতো। অন্যদিকে, পুরুষদের জন্য কোনও নির্দিষ্ট যন্ত্র বা প্রতিরোধক ব্যবহারের প্রমাণ প্রাচীন ভারতীয় নথিতে তেমনভাবে না থাকলেও, যৌন সংযম ও “গৃহস্থ আশ্রমে” পরিবার পরিকল্পনার ধারণা যে তখনই সমাজে বিদ্যমান ছিল, তা একাধিক সনাতন ধর্মগ্রন্থে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

ছবি : সংগৃহীত

বিশ্বের ইতিহাসে কণ্ডোমের ব্যবহার নিয়ে প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায় প্রাচীন মিশরে। প্রায় ৩০০০ খ্রিষ্টপূর্বে মিশরীয় পুরুষেরা পশুর অন্ত্র (animal intestine) বা চামড়া দিয়ে তৈরি কোনও প্রতিরক্ষামূলক আস্তরণ ব্যবহার করতেন, যা পরবর্তীকালে কণ্ডোমের আদিম রূপ হিসেবে ধরা হয়। মিশরের টেম্পল ওয়াল পেন্টিংয়েও এমন কিছুর চিত্র আছে বলে গবেষকেরা দাবি করেছেন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হল রেনেসাঁ যুগ। ষোড়শ শতকে ইতালীয় চিকিৎসক গ্যাব্রিয়েল ফেলোপিয়াস (Gabriello Falloppio) প্রথম কাপড়ের তৈরি কণ্ডোম ব্যবহারের লিখিত বর্ণনা দেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, লিনেন কাপড়ে একপ্রকার রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে কাণ্ডোম তৈরি করা হতো, যা সিফিলিস (Syphilis)-এর মতো যৌন রোগ প্রতিরোধেও সাহায্য করত। পরবর্তীকালে ইউরোপজুড়ে পশুর অন্ত্র ও ত্বক দিয়ে তৈরি কণ্ডোম ব্যবহৃত হতে শুরু করে। ১৮৫৫ সালে যখন চার্লস গুডইয়ার (Charles Goodyear) রাবার ভলকানাইজেশন প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেন, তখন থেকেই রাবার কণ্ডোমের উৎপাদন শুরু হয়, যা তুলনামূলকভাবে দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর ছিল। আর ১৯২০-এর দশকে তৈরি হয় পাতলা ল্যাটেক্স (Latex) কণ্ডোম, যা আধুনিক যুগে ব্যবহৃত কণ্ডোমের পূর্বসূরি।আবার, ভারতে কণ্ডোম ব্যবহারের সূচনা ঘটে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে। ১৯৩০-এর দশকে কলকাতায় (Calcutta) কিছু ব্রিটিশ-চালিত ফার্মেসিতে বিদেশি কণ্ডোম বিক্রি শুরু হয়। তবে সেগুলি মূলত ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য ছিল। উচ্চবিত্ত ভারতীয়দের মধ্যেও খুব সীমিত ব্যবহারে দেখা যেত। স্বাধীনতার পর ভারত সরকার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে একটি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার রূপে ঘোষণা করে। ১৯৬০-এর দশকে কেন্দ্রীয় সরকার “পারিবারিক পরিকল্পনা” (Family Planning) প্রোগ্রাম শুরু করে এবং কণ্ডোম বিতরণে মনোযোগ দেয়। ১৯৬৮ সালে ভারত সরকার নিজস্ব কণ্ডোম ব্র্যান্ড ‘নিরোধ’ (Nirodh) চালু করে।

ছবি : সংগৃহীত

এই ব্র্যান্ডের উৎপাদন ও বিতরণ ছিল সম্পূর্ণভাবে সরকারের তত্ত্বাবধানে এবং এটি দ্রুত ভারতের জনসাধারণের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ‘নিরোধ’-এর মাধ্যমে কণ্ডোম একটি গোপন পণ্য থেকে সরকারি স্বাস্থ্য নীতির অঙ্গ হয়ে ওঠে। তবে, শুরুতে কণ্ডোম নিয়ে ভারতীয় সমাজে প্রচুর ট্যাবু ও সঙ্কোচ ছিল। কিন্তু টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন, শিক্ষামূলক কর্মসূচি ও এনজিও-এর প্রচারের ফলে কণ্ডোম আজ গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। বর্তমান সময়ে বাজারে ড্যুরেক্স (Durex), ম্যানফোর্স (Manforce), কামসূত্র (Kamasutra), মাচো (Macho) প্রভৃতি বেসরকারি ব্র্যান্ডও প্রচুর জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র মতে, কণ্ডোম হল একমাত্র জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি যা গর্ভনিরোধ ও যৌন রোগ প্রতিরোধ দু’দিকেই কার্যকর। ভারতীয় চিকিৎসাবিদ ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও কণ্ডোমকে জন্মনিয়ন্ত্রণে একটি নিরাপদ, সস্তা ও কার্যকর পন্থা বলে মনে করেন।

ছবি : সংগৃহীত

ডিজিটাল যুগে কণ্ডোম এখন শুধু ওষুধের দোকানে নয়, অনলাইনেও সহজলভ্য। ভারতের মতো জনবহুল দেশে এটি কেবল স্বাস্থ্য সুরক্ষার উপায় নয়, যৌন স্বাধীনতার প্রতীকও হয়ে উঠছে। নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যে কণ্ডোম ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা বাড়ছে।তবে এখনও বহু এলাকায় কণ্ডোম নিয়ে সঙ্কোচ, ভ্রান্ত ধারণা ও লজ্জাবোধ কাজ করে। এ কারণেই কণ্ডোম ব্যবহারের ইতিহাস জানার পাশাপাশি এর সামাজিক স্বীকৃতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে আরও শিক্ষামূলক উদ্যোগ প্রয়োজন।

ছবি : সংগৃহীত

উল্লেখ্য, প্রাচীন মিশর, রোম, ভারত সব সভ্যতাই জন্মনিয়ন্ত্রণের পথ খুঁজেছে। কিন্তু সেই পথ আজ আরও বিস্তৃত, বৈজ্ঞানিক এবং গ্রহণযোগ্য হয়েছে কণ্ডোমের মাধ্যমে। ভবিষ্যতের ভারত সেই পথেই হাঁটুক: সচেতনতা, স্বাস্থ্যের সুরক্ষা আর ব্যক্তিস্বাধীনতার আলোকে।

সব ছবি : প্রতীকী 

আরও পড়ুন : Pregnancy Test Kit : প্রেগন্যান্সি টেস্ট কিট: এখনকার নারীদের নির্ভরতা ও বাস্তবতা

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন