রাখী নাথ কর্মকার-এর ছোটগল্প ‘বিনিময়’

SHARE:

রাখী নাথ কর্মকার সাম্প্রতিক সময়ের একজন শক্তিশালী কথা শিল্পী।

সাহিত্যিক রাখী নাথ কর্মকার

বিভিন্ন আঙ্গিকে লিখতে ভালোবাসেন।অসস্র পত্র-পত্রিকায় লেখেন। ছোটগল্প তাঁর হাতে অন্যমাত্রা পায়। অনুবাদ সাহিত্যে সিদ্ধহস্ত। গদ্য সাহিত্য বিষয় নানান গবেষণা ওঁর লেখায় পাঠকরা চাক্ষুষ করেন। তেমনি এই সাহিত্যিক ছোটদের জন্য লিখতে গিয়ে গভীর নিমগ্নতায় ঢুব দেন। 

 

রাখী নাথ কর্মকার

বিনিময়

 

-“হ্যাঁরে, খবরটা শুনেছিস ?”

নিজের ডেস্কে মৌজ করে বসে বিকেলের গরম চায়ের মৌতাত নিচ্ছিল তন্ময় । মৈনাকের প্রশ্নটা শুনে ওর কাপ্তানসুলভ ট্যারা দৃষ্টিটা হেনে টেরাবাইটের হার্ডড্রাইভটা মৈনাকের হাতে তুলে দিয়ে বেশ ফুরফুরে গলায় তন্ময় বলে উঠল- “শুনেছি বইকি! আরে আমাদের তো ব্যাটা ‘ওল’ ওর বিয়ের কার্ডও দিয়ে গেছে রে। তুই জানিস না? আমাদের গ্রুপের সক্কলের নেমন্তন্ন। সোমবার রিসেপশন। তবে এইচ. আর ছোটন গাঙ্গুলীর কাছে হাজার ছোটাছুটি করেও ওর এক হপ্তার বেশী ছুটি মঞ্জুর হয়নি, তাই রিসেপশনের পরের দিনই বেচারাকে হানিমুনে ছুটতে হবে!” একটা দুষ্টুমিষ্টি হানিকারক হাসি চুঁইয়ে পড়ছিল তন্ময়ের ঠোঁটের কোল বেয়ে।

তারপরই চোখ নাচিয়ে বলে উঠল- “তবে একদম চিন্তা করিস না বাবা মৈনাক, বুনো ওলের জন্যে বাঘা তেঁতুলের ব্যবস্থা করে ফেলেছি আমরা!”
তন্ময়ের কথাটা শুনে কী বলবে ঠিক বুঝে পেল না মৈনাক ! এমনিতে আলেখ্যর মত ছেলে হয় না – অমায়িক, পরোপকারী, মিশুকে, হাসিখুশী। কিন্তু বেচারার একটাই দোষ – ওর ওলের মত কুটকুটে মজারু প্র্যাঙ্কগুলো মাঝে মাঝেই সজারুর কাঁটার মত সুতীক্ষ্ণ আর বিরক্তিকর হয়ে ওঠে অনেকের কাছে।  আলেখ্যর এই মজারু স্বভাব আর নামের হাইটের জন্যে অফিসে ওর হাইটেক নামই হয়ে গেছে ‘ওল’!  সারাক্ষণই ছেলেটা কারোর না কারোর পিছনে লেগে চলেছে ! ব্যাটা একাই পুরো অফিস মাতিয়ে রাখে!  ক্যাম্পাস ইন্টারভিউএ গত মাসে যে কয়েকটা ফ্রেশ ছেলে জয়েন করেছে ওদের অফিসে, তাদের মধ্যে আলেখ্য হল গিয়ে ‘অফিস ফ্রেশনার’! আর তারপর থেকেই অফিসে ওদের গ্রুপের প্রায় সবাই প্রতিদিন রীতিমত সন্ত্রস্ত হয়ে থাকে!

এই যেমন দুদিন আগেই অবিনাশের অফিস কম্পিউটারে ওর অজান্তে একটা সফটওয়্যার ইন্সটল করে দিয়ে ব্যাটা কী কান্ডটাই না ঘটিয়েছিল ! বেচারা অবিনাশের অবিনাশী কম্পিউটার কিছুতেই আর ওর কথা শোনে না । কারণ ওর কম্পিউটারের কন্ট্রোল তখন অন্য কারোর হাতে! অবশেষে ওদের গ্রুপ হেড রূপদা এসে ট্রিকের স্বরূপটা বুঝতে পেরে ওলকে দাবড়ানি দিতে ব্যাপারটা স্বাভাবিক হল! জানা গেল, কদিন আগে অবিনাশের সঙ্গে ওলের একটু কথাকাটাকাটি হয়েছিল।

অবশ্য ওলের এই সব প্র্যাঙ্কগুলো যে অনেক সময়েই নিছক কথাকাটাকাটির এই ছকে ফেলা কাটাকুটির হিসেবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না সেটা ওরা কমবিস্তর সকলেই প্রায় বুঝে গিয়েছে! যেমন কিছুদিন আগেই মৈনাকের অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে ব্যাটা কোন ফাঁকে ওর নতুন স্মার্টফোনের সেটিংয়ে ল্যাঙ্গোয়েজটা বদলে ‘রাশিয়ান’ সেট করে দিয়েছিল। প্রথমে ঊর্ধ্বগামী একপ্রস্থ ভ্যাবাচাকার পর থৈ হারিয়ে, মই হারিয়ে মৈনাক অবশেষে যখন ব্যাপারটা বুঝতে পারল, ততক্ষণে ক্যান্টিনের এগ রোলের গন্ধ ছাপিয়ে অফিসে হাসির রোল উঠেছে!

এছাড়াও হঠাৎ হঠাৎ কাজের ফাঁকে এর পিছনে লাগা, ওর পিছনে লাগা, নির্বিষ ঠাট্টা-তামাশা তো হামেশাই চলছে! তবে এটাও ঠিক, এর ফলে ওদের কাজের দমবন্ধকর পরিবেশটাও হঠাৎ কেমন জানি বদলে গিয়ে এক পরিতুষ্ট সকালের মত ঝলমলে হয়ে উঠেছে। হাসিঠাট্টা, গল্পগুজব – এসব এখানে এর আগে কাজের ফাঁকে ভাবাই যেত না! এমনকি ওদের গ্রুপ হেড গোমড়ামুখো রূপদাও এখন আর মেঘলা দিনের রূপক পছন্দ করেন না! এখন তাই চায়ের ফাঁকে গল্প চলে আর টায়ের ফাঁকে কল্পনা !

তো সবকিছু ওলোটপালোট করে দেওয়া এমন ওলের বিয়েতে সবাই মিলে একটু বাঘা তেঁতুলের ব্যবস্থা না করলে হয় ! কিন্তু… কী যেন এক অজানা আশঙ্কায় চুপচাপ নিজের ডেস্কে গিয়ে বসল মৈনাক !

* * *
ওলের মাবাবা নেই, মামাবাড়িতে থেকেই সে মানুষ।  ওদের পাড়ারই একটি ছোট্ট ম্যারেজহল ভাড়া করে ততোধিক ছোট্ট রিসেপশনের আয়োজন করা হয়েছিল । নিজেদের পছন্দে বিয়ে, পিতৃহীনা পাত্রীর তরফ থেকে পাত্রীর মা আর পছন্দমাফিক সামান্য কিছু বন্ধুবান্ধব ছাড়া আর তেমন কেউই আসেনি ! ইচ্ছুকদের জন্যে হলের একপ্রান্তে সামান্য পানীয়ের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল । তবে ওলের শরীরটা আজ তেমন জুৎসুই ঠেকছিল না, অপরিমিত পানের কল্যাণেই হোক বা বৃষ্টিভেজা পানসে রাত্রিটার জন্যেই হোক, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওর মাথাটাও কেমন যেন পাল্লা দিয়ে তার অ্যাক্সিলারেশন বাড়াচ্ছিল !

অবশ্য ইতিমধ্যে মোটামুটি সব ভালোয় ভালোয় মিটে এসেছে । ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে এসেছে অতিথিঅভ্যাগতদের ভিড়, ফাঁকা হয়ে এসেছে
চারপাশ । অনেক রাতে মত্ত আর উন্মত্ত অফিসকলিগদের সকলকে বিদায় জানিয়ে তাদের গাড়িতে তুলে দিতে এসেছিল ওল ।

আর ঠিক তখনই … দুর্ঘটনাটা ঘটে গেল ! তন্ময়দের গাড়ির কাছে… হঠাৎই একটা শক্ত পাথরে হোঁচট খেয়ে ওল ধরাশায়ী হল ।

জ্ঞান যখন ফিরল ওর, ওল তখন নার্সিংহোমে শয্যাশায়ী । সেই টালমাটাল মুহূর্তে অবশ্য পাশে ছিল তন্ময়রা সকলেই …!

ডাক্তার মুখার্জী অত্যন্ত কমবয়সী এক সুপুরুষ । অনাবিল হেসে তিনি জানালেন – “বিশেষ কিছু ক্ষতি হয়নি, শুধু ডানহাতের কনুইএর হাড়টায় সামান্য চির ধরেছে । তবে হার মানার ছেলে তো নও তুমি ! প্লাস্টার করে দিয়েছি, কোনো চিন্তা নেই।”

সুতরাং সকলেই জানাল, এর জন্যে হানিমুনের প্ল্যান বদলানোর কোনো প্রয়োজনই নেই । রাতেই ট্রেন। বাক্সপ্যাঁটরাও সব বাঁধাছাঁদাই আছে-কেবল তা বগলদাবা করে নিয়ে বেরিয়ে পড়ার অপেক্ষা ।

অতএব ‘দুগগা, দুগগা’ বলে তাও হয়ে গেল !
ট্রেন পরের দিন দুপুরেই ভাইজ্যাগ পৌঁছে যাবে।

আর এদিকে আজ অফিসে পৌঁছেই তন্ময়দের ডেস্কে একটা হাসির হুল্লোড় উঠল । অবিনাশের বন্ধু অমিত মুখার্জী এমবিবিএস পাশ করে কিছুদিন হল আলেখ্যদের পাড়ার ঐ নার্সিংহোমে যোগ দিয়েছিল । সেটা মাসখানেক আগে অবিনাশই জানিয়েছিল তন্ময়দের ।

সুতরাং দুইয়ে দুইয়ে চার ! ওলকে ছিপে ধরার জন্যে এই চার বানানোর প্ল্যান তখন থেকেই শুরু !

-“আর বলিস না তন্ময়, জ্ঞান ফেরার পর নিজের হাতটার দিকে তাকিয়ে ওলের মুখের চেহারাটা কীকরম হয়েছিল তা যদি একবার খেয়াল করতিস – ওলও যে শুকিয়ে আমসি হয়ে যেতে পারে তা এই প্রথম হাতেনাতে টের পেলাম !”

অবিনাশের হাসি ছাপিয়ে উঠেছে তন্ময়ের অট্টহাসি- “আর সে ব্যাটা সেটা যে বেমালুম বিশ্বাসও করে নিল – সেটাই এখনো আমাদের বিশ্বাস হচ্ছে না !”
-“বারে, বিশ্বাস না করে উপায়ই বা কী ! আমাদের কারোর অভিনয়েই কিন্তু এতটুকু ফাঁক ছিল না ! ফাঁক পেয়ে কখন ওর ড্রিঙ্কসে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেওয়া হল, ফাঁকা রাস্তায় কখন ওকে ল্যাং মারা হল, ফাঁকি মেরে কখন ওকে চেনা নার্সিংহোমের চেনা ডাক্তারের সাহায্যে ফাঁদে ফেলা হল – এসব বোঝার সুযোগটাই তো বেচারা পায়নি ।” সুদীপ্ত মিটিমিটি হেসে যোগ করল ।

মৈনাক এতক্ষণ চুপচাপ ওদের কথা শুনছিল । সে অবশ্য প্রথম থেকেই এই পাগলামির বিপক্ষে ছিল । কিন্তু মেজরিটি ভোটে হেরে গিয়ে এই কদিন আর নিজের ইচ্ছে ফলানোর সুযোগ পায়নি। এবার সে একটু সচেতন হয়েই বলল- “আচ্ছা বেশ, সে না হয় হল । এবার অন্তত বেচারাকে একটা ফোন করে জানিয়ে দাও আমাদের প্র্যাঙ্কটার কথা । ওর ডান হাতে যে কিছুই হয়নি, স্রেফ একটা নকল প্লাস্টার করা হয়েছে সেটা এবার ওকে জানিয়ে দেওয়া ভাল । আজ দুপুরেই নবদম্পতি ভাইজ্যাগে পা রাখবে, হানিমুনের মানহানি আর কোরো না !”

নাহ, এই এতক্ষণে মৈনাকের কথাটা সকলের মনে ধরল !

কিন্তু মুশকিলটা যে দেখা দিল অন্য জায়গায় ! দিনসাতেক ধরে ক্রমাগত ফোন করেও ওলকে অফিসের কারোর ফোনেই পাওয়া গেল না ! অগত্যা প্র্যাঙ্ক প্লাস্টারের বিস্ফোরক গল্পটা এবং ব্যর্থ ফোনের কাহিনিটা তাই কঠিন প্লাস্টারের নীচেই চাপা পড়ে রইল !

অবশেষে নতুন সপ্তাহে, নতুন উদ্যমে, পুরোন প্লাস্টার হাতে অফিসে এসে আলেখ্য তার নিরুদ্দেশী ফোনের রহস্যটা ফাঁস করল – “তোমাদের ভয়েই এই কটাদিন আমি আমার ফোনটা সুইচড অফ করে রেখেছিলাম । কেন জানো ? তোমরা যাতে কোনোভাবে নাক গলিয়ে আমাকে নাকাল করতে না পারো, বিরক্ত করতে না পারো সেই ভেবেই আগাম সাবধানতা নিয়েছিলাম আমি, বুঝলে !”

অলঙ্করণ : প্রীতি দেব 

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন