সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ দুর্গাপুর, পশ্চিম বর্ধমান : পশ্চিমবঙ্গ আবারও কেঁপে উঠেছে এক নির্মম অপরাধে। দুর্গাপুর (Durgapur) মেডিক্যাল কলেজ সংলগ্ন জঙ্গলে দ্বিতীয় বর্ষের এক মেডিক্যাল ছাত্রীর উপর সংঘটিত নৃশংস গণধর্ষণ কাণ্ডে অবশেষে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর নাম। পুলিশি তদন্ত ও টেস্ট আইডেন্টিফিকেশন প্যারেড (Test Identification Parade – TI Parade) -এর রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছে, এই জঘন্য অপরাধের মূল ষড়যন্ত্রী বা মাস্টারমাইন্ড হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ফিরদৌস শেখ (Firdous Sheikh) নামে এক যুবক।
উল্লেখ্য, একই সঙ্গে আরও পাঁচজনকে এই মামলায় সহঅভিযুক্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ওই তরুণীর সহপাঠী ও প্রেমিকও, যাঁকে পুলিশ সূত্রে ‘মূল পরিকল্পনাকারী’ হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে। ঘটনাটি ঘটেছিল গত ১০ অক্টোবর রাতে, দুর্গাপুরের এক বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের পাশের জঙ্গলে। অভিযোগ, ওই ছাত্রীকে কৌশলে সেখানে ডেকে নিয়ে গিয়ে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর গোটা রাজ্যে ক্ষোভ ও তীব্র প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে। এই মামলার ভার্চুয়াল শুনানি অনুষ্ঠিত হয় সোমবার দুর্গাপুর মহকুমা আদালতে (Durgapur Sub-Divisional Court)। শুনানিতে যখন টিআই প্যারেড রিপোর্ট পাঠ করা হয়, তখনই সামনে আসে মূল অভিযুক্ত ফিরদৌস শেখের নাম এবং তার সঙ্গে যুক্ত আরও পাঁচজনের পরিচয়।
মামলার আইনজীবী পার্থ ঘোষ (Partha Ghosh) আদালতে জানান, “আমাদের হাতে থাকা তথ্য ও পুলিশের তদন্ত স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, এই অপরাধটি পরিকল্পিত ছিল। ওই ছাত্রীর প্রেমিকই ঠিক করেছিল কোথায় ও কীভাবে ঘটানো হবে ঘটনাটি। ফিরদৌস শেখ এবং বাকি অভিযুক্তরা সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করেছে।” প্রসঙ্গত, এদিন শুনানির সময় কোনও অভিযুক্তের পক্ষে আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না। অভিযুক্তরা নিজেরাই বিচারকের কাছে জামিনের আবেদন জানায়, কিন্তু আদালত সেই আবেদন সরাসরি খারিজ করে দিয়ে বিচার বিভাগীয় হেফাজতের মেয়াদ বাড়িয়ে দেয় আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত।
বিচারক নির্দেশ দেন, “চার্জশিট দ্রুত দাখিল করতে হবে যাতে বিচার বিলম্বিত না হয়।” এই নির্দেশের প্রেক্ষিতে পার্থ ঘোষ জানান, “যদি পুলিশ ৩১ অক্টোবরের আগেই চার্জশিট জমা দেয়, তবে খুব দ্রুত বিচার শুরু হবে এবং ট্রায়াল প্রক্রিয়াও এগোবে।” অন্যদিকে, অভিযুক্ত ফিরদৌস শেখের নাম প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই দুর্গাপুরের বিভিন্ন মহলে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা কঠোর শাস্তির দাবিতে সরব হয়েছেন। এক স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যেভাবে একটি মেয়ের জীবন শেষ করে দেওয়া হয়েছে, তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। যাতে কেউ ভবিষ্যতে এমনটা ভাবতেও না পারে।”
হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, ওড়িশা (Odisha) থেকে পড়তে আসা ওই মেডিক্যাল ছাত্রী বর্তমানে মারাত্মক মানসিক ট্রমায় (Mental Trauma) ভুগছেন। তাঁকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য বিশেষ মহিলা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এই ঘটনা সামনে আসার পর রাজ্যজুড়ে প্রশাসনিক তৎপরতা বেড়েছে। রাজ্য মহিলা কমিশন, মানবাধিকার সংস্থা এবং ছাত্র সংগঠনগুলি একযোগে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছে। ছাত্র সংগঠনগুলির দাবি, “এই মামলার তদন্ত যেন রাজনৈতিক প্রভাবে প্রভাবিত না হয় এবং দোষীদের দ্রুততম সময়ে কঠোরতম সাজা দেওয়া হয়।” রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনাকে ঘিরে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিরোধী দলনেতারা প্রশ্ন তুলেছেন প্রশাসনের তৎপরতা নিয়ে। তাঁদের দাবি, রাজ্যে মহিলাদের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। যদিও পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, “অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রমাণ জোগাড়ের কাজ দ্রুত চলছে, এবং প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে।”
এই মামলার পর দুর্গাপুরে পুলিশের নজরদারি আরও কড়া করা হয়েছে। মেডিক্যাল কলেজ সংলগ্ন এলাকা ও আশেপাশের হোস্টেলগুলিতে বাড়ানো হয়েছে সিসিটিভি নজরদারি এবং রাতের টহলদারি। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, এমন অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে দ্রুত নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। দুর্গাপুর গণধর্ষণ কাণ্ড এখন রাজ্যজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। একদিকে পুলিশের তদন্ত গতি পাচ্ছে, অন্যদিকে সমাজে নারী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গোটা পশ্চিমবঙ্গ তাকিয়ে আছে আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে, কত দ্রুত এবং কত কঠোরভাবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায়, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
ছবি: সংগৃহীত




