আপনি যদি আত্মবিশ্বাসী হন যে আপনি কিছু করতে পারেন তবে আপনি তা করবেনই : জর্জো পারিসি

SHARE:

আপনি যদি আত্মবিশ্বাসী হন যে আপনি কিছু করতে পারেন তবে আপনি তা করবেনই : জর্জো পারিসি

কোয়ান্টাম ফিল্ড থিয়োরি নিয়ে গবেষণারত, ২০২১ এর পদার্থবিদ্যায় নোবেলজয়ী ইতালীয় পদার্থবিদ জর্জো পারিসির সঙ্গে কিছু কথোপকথন। Nobelprize.org নোবেলজয়ী পদার্থবিদের যে সাক্ষাৎকার নিয়েছিল, নিচে রইল তারই ভাষান্তর। প্রতিবেদককে জর্জো পারিসি প্রথমেই যে কথাটি বলেছিলেন, সেটি হল, আত্মবিশ্বাস হল জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান! পারিসির সাক্ষাৎকারটি ভাষান্তর করেছেন : রাখী নাথ কর্মকার 

 

আপনার শৈশব সম্বন্ধে একটু বলবেন কি? আপনি কি ছোটবেলায় বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ ছিলেন?  

জর্জো পারিসি : হ্যাঁ, সেটাই বলা যাক। যদিও ছেলেবেলা নিয়ে আমার সেরকম সুনির্দিষ্ট কোনও স্মৃতি নেই, কিন্তু আমার মা আমাকে বলতেন যে, আমি আমার তিন বছর বয়সেই সংখ্যা পড়তে শিখে গেছিলাম। সে সময় নাকি যখন আমরা বাসস্ট্যান্ডে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতাম, তখন আমি যে বাসগুলো আসছে, তার নাম্বার পড়তে পারতাম। আমি মনে করি এটা সত্যি – এটা আমার মা বলতেন। তবে এই বিষয়ে আমি নিশ্চিত যে আমি যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন আমি জ্যোতির্বিদ্যায় খুব আগ্রহী ছিলাম। আমি জ্যোতির্বিদ্যার ওপর ছোটদের জন্যে লেখা বইগুলো পড়তে ভালবাসতাম। সে সময়েই সূর্য থেকে গ্রহদের দূরত্ব সম্পর্কে আমার একটা ধারণা তৈরি হয়ে গিয়েছিল, এমনকি গ্রহগুলির ব্যাস সম্পর্কেও কমবেশি ধারণা  গড়ে উঠেছিল। আমার দশ বছর বয়সেই আমি সায়েন্স ফিকশন পড়তে শুরু করেছিলাম।  

আপনি যখন পদার্থবিদ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সেটা কি কোনো বিশেষ মুহূর্ত ছিল?   

জর্জো পারিসি : আমার মনে আছে যে হাই স্কুলে পড়ার সময় আমি গণিত এবং পদার্থবিদ্যায় আগ্রহী ছিলাম, কিন্তু আমি বেশিরভাগই অ-পেশাদার বই পড়তাম।  আমি গণিতের ইতিহাস, পদার্থবিদ্যার ইতিহাস নিয়ে কিছু বই পড়েছিলাম। গণিতের ইতিহাসের উপর একটি বিশেষ বই ছিল যেটা আমার খুব পছন্দ হয়েছিল। আমি যখন হাই স্কুল শেষ করি, তখন আমি ভাবতে শুরু করি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি কী নিয়ে পড়ব। আমার বাবা চেয়েছিলেন আমি ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ি। কিন্তু আমার কাছে ইঞ্জিনিয়ারিং মোটেই ততটা আকর্ষণীয় মনে হয়নি। আমি জানতাম যে আমি গণিতে খুব ভালো, কিন্তু সেই মুহূর্তে গণিতের সম্ভাবনা সম্বন্ধেও আমার বিশেষ কোনও ধারণা ছিল না।  শেষ পর্যন্ত আমি পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়ারই  সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।  

আপনার প্রথম কর্মজীবনে কি কোনও একজন বিশেষ ব্যক্তি, একজন শিক্ষক বা রোল মডেলের প্রভাব রয়েছে? 

জর্জো পারিসি : না, তেমন বেশি কিছু না। আমার মনে আছে,  যে যখন আমি হাই স্কুলে ছিলাম, আঠেরো বছর বয়স অবধি আমি পদার্থবিদ্যা এবং গণিত নিয়ে লোকেদের সঙ্গে আলোচনা করতাম না। কারণ তখন আমার মনে হত,  আমি যা করছি তাতেই আমি সন্তুষ্ট। মাঝে মাঝে আমি লাইব্রেরিতে যেতাম এবং এনসাইক্লোপিডিয়ার প্রয়োজনীয় প্রবন্ধ পড়তাম, কিন্তু এ বিষয়ে কারও সঙ্গে আমার বিশেষ কোনও যোগাযোগ ছিল না।  আমি বলব একমাত্র ব্যক্তি যিনি পরোক্ষভাবে হলেও আমার উপর প্রভাব ফেলেছিলেন তিনি হলেন আমার পরিবারের একজন বন্ধু যার কাছে মাইক্রোস্কোপ ছিল। তারা আমাকে একটি ছোট মাইক্রোস্কোপ দিয়েছিলেন যার সাহায্যে আমি অত্যন্ত ছোট প্রাণীও দেখতে পেতাম, এক মিলিমিটারের একটি ভগ্নাংশেরও কম যা সাধারণত খালি চোখে দেখা যায় না।  একটা সময় গেছে যখন আমি নোংরা জল সংগ্রহ করে, মাইক্রোস্কোপে রেখে তাদের দিকে তাকিয়ে অনেক সময় কাটিয়েছি। আমার মনে হয় যা প্রকৃতির সম্ভার এক আশ্চর্যজনক সম্ভার, প্রকৃতি সর্বদাই কৌতূহল-উদ্দীপক… এই ধারণার ওপর এক ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল!  আমার মনে হত আমি নিজেই অনেক কিছু আবিষ্কার করতে পারি, তবে এটা ছিল এমন কিছু যা পদার্থবিদ্যা বা গণিতের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না। সেদিক থেকে দেখতে গেলে আমি ছিলাম স্বশিক্ষিত।   

আপনার কি এমন কোনও পরামর্শ আছে যা আপনি একজন তরুণ গবেষক বা তরুণ বিজ্ঞানীকে দিতে পারেন যা কেবলমাত্র ফিল্ডেই শুরু হয়?

জর্জো পারিসি : আমার পরামর্শ হল সবাইকে তার নিজের সুপ্ত ক্ষমতাকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে, বুঝতে হবে কোন বিষয়ে তাদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। এটা ঘটনা যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একজন ব্যক্তির আগ্রহও পরিবর্তিত হতে থাকে, কিন্তু সে কী করতে সক্ষম, কোন ক্ষেত্রে সে তার অবদান রাখতে পারে সেই বিষয়ে তার নির্দিষ্ট একটা কিছু ধারণা থাকতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ, প্রোগ্রামিং করতে ভালো এমন কারোর জন্যে, হাত দিয়ে অনেক গণনা করাটা সেরকম সুবিধেজনক নয়।  অথবা যে কেউ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে খুব পছন্দ করে, তার জন্যে নীরস তত্ত্ব অনুসন্ধানের পরিবর্তে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাই ভাল।  সবাইকে তার তাদের নিজস্ব গুণাবলী বোঝার চেষ্টা করতে হবে,  আত্মবিশ্বাসী হতে হবে, কারণ কখনও কখনও আত্মবিশ্বাস খুব গুরুত্বপূর্ণ।  আপনি যদি আত্মবিশ্বাসী হন যে আপনি কিছু করতে পারেন তবে আপনি তা করবেনই। যদিও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস কখনও-ই কাম্য নয়, কিন্তু আত্মবিশ্বাস থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন।  আত্মবিশ্বাসের বলে কেউ প্রাথমিকভাবে অসফল হলেও যার কোনও সমস্যা সমাধান করার ক্ষমতা আছে, সে অবশ্যই তা সমাধান করতে সক্ষম হবে। 

আপনার কাজের মধ্যে সবচেয়ে আপনার কী ভাল লাগে?   

জর্জো পারিসি : হ্যাঁ, অনেক কিছুই আছে যা আমার ভাল লাগে।  আমি মনে করি যে বিজ্ঞানের সাধনা করা হল ধাঁধা বা গোয়েন্দা গল্প পড়া,  লেখক আপনাকে বলার আগেই কে দোষী তা বোঝার চেষ্টা করা। আমার মনে হয় যে বেশিরভাগ লোকেরা ধাঁধা পছন্দ করে তবে একজন বিজ্ঞানী হিসাবে আমি মনে করি এটি একটি ভিন্ন মাত্রার কারণ আমরা যে ধরনের ধাঁধাতে আগ্রহী সেগুলির ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল আমরা শুধু নিজেরাই সেই ধাঁধা নিয়ে মেতে থাকি না, সমস্ত বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ই সেই ধাঁধা সমাধান করার চেষ্টা করে চলে।  তাই আমরা একসঙ্গে কাজ করি যা শুধু আগ্রহব্যঞ্জকই নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক আনন্দদায়কও যা খুবই প্রয়োজন।  এই একসঙ্গে কাজ করার ব্যাপারটা কিন্তু বেশ তৃপ্তিদায়কও।    

কাজের বাইরে আপনি কী উপভোগ করেন? 

জর্জো পারিসি : হুঁম, এটা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।   এই যেমন গত দুই বছর পরিস্থিতি কিছুটা কঠিন ছিল কারণ, কোভিডের সঙ্গে, অনেক কার্যক্রম অনুসরণ করাই সম্ভব ছিল না। আমি সবসময় বই পড়তে পছন্দ করি – উপন্যাস, বিজ্ঞানের ইতিহাস, কল্পবিজ্ঞান ইত্যাদি। উদাহরণস্বরূপ, গত বছরে, আমি আসিমভের অনেক কিছু পড়েছি, অসিমভের কিছু উপন্যাস যা আমি আগে পড়িনি। এছাড়াও আমি ফাউন্ডেশন সিরিজের সবকটি ক্রমানুসারে পড়ি, একের পর এক, যা আমি সবসময় সংলগ্নভাবে পড়ি না।  আমি স্কিইং করতে, সমুদ্রতীরে যেতে, এই ধরনের কার্যকলাপ করতে খুব পছন্দ করি।  এবং, পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বছরের পর থেকেই আমি ঐতিহ্যগত নৃত্যে প্রবলভাবে আগ্রহী হতে শুরু করি, উদাহরণস্বরূপ, আমি যে নাচ করতে পছন্দ করি তা হল গ্রীক নৃত্য।  আমি কিছু ‘কাপল ডান্স’ করতেও পছন্দ করি, যেমন আমি কোভিডের আগে একধরনের ব্রাজিলীয় নৃত্য অনুশীলন করতাম তা হল Forró ।

এছাড়াও আমি হাঁটতে পছন্দ করি।  আমি বেশ ভাগ্যবান যে আমার বাড়ির কাছে একটি বড় ভিলা রয়েছে, ‘ভিলা অ্যাডা’, আমি সেখানে হাঁটতে খুব পছন্দ করি। 

আপনি কি মনে করেন যে কাজের সাথে সাথেই বিনোদন বা নিজের জন্য সময় কাটানোটাও গুরুত্বপূর্ণ? 

জর্জো পারিসি : এটা স্পষ্ট যে বিনোদন আমাদের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।  এমন কিছু ক্রিয়াকলাপ থাকে যা কোনও না কোনওভাবে আপনাকে আপনার শরীরের সাথে ভালো সংযোগ স্থাপন করতে সাহায্য করে… মানে, আপনি যখন নাচছেন, তখন আপনাকে আপনার শরীরের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এটাও ভালো যে এমন কিছু আছে যা স্বাভাবিক চিন্তাভাবনার থেকে একেবারেই আলাদা, এই যেমন নাচের সময় আপনাকে মাটিতে পা রাখার অ্যাঙ্গেল নিয়ে ভাবতে হয়, অনেক সময় আপনাকে ভাবতে হয় যে মাটিতে পা রাখার আগে আপনি কয়েক সেন্টিমিটার পিছিয়ে যাবেন! অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি, যে এমন নয় যে এরকম করার দরকার আছে, তবে আপনি যদি শৈলীর সঙ্গে তা করতে চান তবে আপনাকে এই ধরনের সমস্ত জিনিসকে মাথায় রাখতে হবে। সঙ্গীত অনুসরণ করার চেষ্টা করতে হবে, কারণ সঙ্গীতের সঙ্গেই সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপটি নিতে হবে। তাই এই সমস্ত ক্রিয়াকলাপগুলি আপনাকে সম্পূর্ণরূপে অভিনিবিষ্ট করে নেবে।  শুধু তাই নয়, কিছু কিছু কার্যকলাপ রয়েছে যা আপনার দৈনন্দিন কাজের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা তাই মন ভাল রাখার জন্যে, কাজের চাপ প্রশমিত করার জন্যে বিনোদনের খুবই প্রয়োজন।   

আপনি নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হওয়ার পর আপনার কী মনে হয় আপনার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিতে কিছু পরিবর্তন এসেছে?

জর্জো পারিসি : এখন একটা জিনিস দেখে আমি আশ্চর্য হয়ে যাই, যে ইতালিতে সাধারণত এই মহামারী পরিস্থিতিতে মানুষজন মুখোশ পরে রাস্তায় হাঁটে। কিন্তু মুখোশ পরে থাকলেও মাঝে মাঝে আমি দেখতে পাই যে লোকেরা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বা আমার কাছাকাছি চলে এসে আমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছে, ‘অভিনন্দন অধ্যাপক’ বলছে।  যাদের আমি চিনিই না, কখনও পরিচয়ই ছিল না যাদের সাথে, রাস্তায় তাদের কাছ থেকেও পরিচিতি ও স্বীকৃতি পাওয়াটা বেশ আশ্চর্যজনকই আমার কাছে!  

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন