সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : দিল্লির যমুনা বাজার (Yamuna Bazar) এলাকায় বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই শুরু হল বড়সড় উচ্ছেদ অভিযান। দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (Delhi Development Authority) বা ডিডিএ (DDA)-এর উদ্যোগে চালানো এই বুলডোজার অভিযানে নদীর তীরবর্তী একাধিক ঘাট সংলগ্ন বসতি ভেঙে ফেলার কাজ শুরু হয়। প্রশাসনের দাবি, যমুনার বন্যাপ্রবণ এলাকা দখলমুক্ত করতেই এই পদক্ষেপ। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বহু বছর ধরে বসবাস করা এই জায়গা থেকে হঠাৎ করে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাঁদের। বুধবারই ডিডিএ (DDA) নতুন করে নোটিস জারি করে যমুনা বাজার ঘাট এলাকার বাসিন্দাদের স্বেচ্ছায় এলাকা খালি করার নির্দেশ দেয়। সেই নির্দেশ কার্যকর করতেই বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা নাগাদ অভিযান শুরু হয়। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘সকাল হতেই আমরা দেখি পুলিশ ও প্রশাসনের লোকজন এসে পৌঁছেছে, সঙ্গে বুলডোজারও রয়েছে। এখানে প্রায় ৮০টি পরিবার বহু বছর ধরে বসবাস করছে।’
এই অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এক শীর্ষ পুলিশ আধিকারিক জানিয়েছেন, ‘অভিযান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে যথেষ্ট বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।’ এলাকা জুড়ে নিরাপত্তার কড়াকড়ি ছিল চোখে পড়ার মতো, যাতে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়। প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, যমুনা নদীর তীরবর্তী এই অংশটি ‘ও-জোন’ (O-Zone) হিসেবে চিহ্নিত, যা সম্পূর্ণভাবে সংরক্ষিত এলাকা। এই অঞ্চলকে বন্যাপ্রবণ এবং নির্মাণ নিষিদ্ধ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। জাতীয় সবুজ ট্রাইব্যুনাল (National Green Tribunal)-এর নির্দেশ অনুসারেই এই এলাকা থেকে সমস্ত ধরনের অবৈধ দখল সরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ২৩ জুন জারি করা নোটিসে উল্লেখ করা হয়, ‘যমুনা বাজার ঘাট নম্বর ২ থেকে ৩২ পর্যন্ত এলাকায় বসবাসকারী সকলকে জানানো হচ্ছে যে, ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ অনুযায়ী এই বন্যাপ্রবণ এলাকা সম্পূর্ণভাবে দখলমুক্ত করতে হবে।’ ডিডিএ (DDA) সূত্রে খবর, এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের কাছাকাছি আশ্রয় শিবিরে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে সেই প্রস্তাবে সাড়া দিতে নারাজ অনেকেই। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা এখানে বসবাস করছেন এবং হঠাৎ করে উচ্ছেদ হলে তাঁদের জীবিকা ও দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। স্থানীয়দের একাংশ অভিযোগ করেন, ‘মে মাস থেকেই আমাদের নোটিস দেওয়া হচ্ছিল, কিন্তু আমরা ভেবেছিলাম কোনও সমাধান হবে। আদালতও বলেছিল আমাদের কথা শুনতে, কিন্তু তা মানা হয়নি। আজ হঠাৎ করে তিন-চারটি বুলডোজার এনে ভেঙে ফেলা শুরু হয়েছে।’ এই মন্তব্যে তাঁদের অসন্তোষের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
গত মাসেও ডিডিএ (DDA) ও দিল্লি ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (Delhi Disaster Management Authority) একই ধরনের উচ্ছেদের নোটিস টাঙিয়েছিল এই এলাকায়। ফলে বাসিন্দাদের কাছে এই পরিস্থিতি নতুন নয়, কিন্তু এদিনের হঠাৎ অভিযানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
যমুনা তীরবর্তী এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নগর উন্নয়নের টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দু। একদিকে নদীর বন্যাপ্রবণ এলাকা দখলমুক্ত রাখা প্রয়োজন, অন্যদিকে বহু বছর ধরে সেখানে বসবাসকারী মানুষের পুনর্বাসনের প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
এই অভিযানের ফলে বহু পরিবার অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। তাঁদের মধ্যে অনেকেই দিনমজুর, ছোট ব্যবসায়ী বা নিম্ন আয়ের মানুষ, যাঁদের পক্ষে নতুন করে বাসস্থান খোঁজা কঠিন। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্রয় শিবিরের কথা বলা হয়েছে, তবুও সেখানে থাকার উপযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। রাজনৈতিক অঙ্গনেও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিরোধীরা উচ্ছেদ অভিযানকে অমানবিক বলে আক্রমণ শানিয়েছে, অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে আদালতের নির্দেশ মেনেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যমুনা বাজারের এই উচ্ছেদ অভিযান আবারও সামনে এনে দিল শহরের প্রান্তিক মানুষের বাসস্থান সংকটের বিষয়টি। উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষার নামে উচ্ছেদ অভিযানের প্রভাব যে সরাসরি মানুষের জীবনে পড়ে, তা এই ঘটনার মাধ্যমে আরও একবার সামনে এল। দিল্লির মতো মহানগরে নদীর তীরবর্তী এলাকা দখলমুক্ত রাখা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই সঙ্গে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিও প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেকেই। যমুনা বাজারের এই ঘটনার পর প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে সাধারণ মানুষ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Delhi Roadshow Launches UPITS 2026, Setting the Stage for Uttar Pradesh’s Global Trade Showcase



