WTC Final 2025 | South Africa : লর্ডসে ইতিহাস গড়ল দক্ষিণ আফ্রিকা

SHARE:

পারিজাত গঙ্গোপাধ্যায় ★ লন্ডন : লর্ডসে রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশের নীচে ৮৪তম ওভারের চতুর্থ বল কাইল ভেরেইনে (Kyle Verreynne) মিচেল স্টার্কের (Mitchell Starc) বলটি পয়েন্ট ও কভার ফিল্ডারের মাঝ দিয়ে চালিয়ে দেন। সেই ড্রাইভে একটি রান নিয়েই দক্ষিণ আফ্রিকা ইতিহাস লিখল। ২৮২ রানের লক্ষ্য পূরণ করে অস্ট্রেলিয়াকে পাঁচ উইকেটে হারিয়ে জিতে নিল বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা। ব্যালকনিতে বসে অধিনায়ক টেম্বা ব্যাভুমা (Temba Bavuma) মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। মাঠে তখন জয়জয়কার। সতীর্থদের উল্লাসে ফুটে উঠল যে গর্ব। “এটাই আমাদের দেশ, এটাই আমাদের ঐক্য। গত পাঁচ দিনে যা দেখেছি, তা স্বপ্ন ছাড়া কিছু নয়,” কেশভ মহারাজ (Keshav Maharaj) বলছিলেন কান্না চেপে। মার্কো জনসেন (Marco Jansen) সংক্ষিপ্তভাবে আবেগের সঙ্গে বললেন, “এটা একেবারেই স্বপ্নের মতো।”

অন্যদিকে, ফাইনালে দুর্দান্ত ১৩৬ রানের ইনিংস খেলা এইডেন মারক্রাম (Aiden Markram) তাঁর ছোট্ট মন্তব্যে, “এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস।” ইতিহাসের সেরা ব্যাটারদের তালিকায় থাকা এবি ডি ভিলিয়ার্স (AB de Villiers), ছেলে কোলে নিয়েই জয় উদযাপন করলেন। ধারাভাষ্যকার হিসেবে মাঠে থাকা গ্রায়েম স্মিথ (Graeme Smith) গর্জে উঠলেন গর্বে। এর আগে ১৯৯৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা একবার চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জিতেছিল। টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়েও একাধিকবার শীর্ষে ছিল দলটি। কিন্তু বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের মাহাত্ম্য তার চেয়েও অনেক বেশি। এই জয় যেন পুরনো ব্যর্থতার, তিক্ত অতীতের, টানাপোড়েনের আর অবহেলার হিসাব মিটিয়ে দিয়ে গেল। এটা শুধুই একটি ক্রিকেট মাঠের জয় নয়। একটি দেশের পরিবর্তনের গল্পও। ইতিহাসে এই প্রথম একজন কৃষ্ণাঙ্গ ক্রিকেটার ব্যাভুমা টেস্ট ট্রফি হাতে তুলে ধরলেন। ব্যাভুমা এমন একজন অধিনায়ক, যাঁর নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক চলেছে, প্রশ্ন উঠেছে তাঁর যোগ্যতা নিয়ে, “কোটা ক্যাপ্টেন” বলে কটাক্ষ করা হয়েছে, তিনি আজ সবার জবাব দিয়ে দিলেন মাঠে। যেমনটা তিনি নিজেও বলেছিলেন, “দীর্ঘদিন ধরে যেভাবে বিচার করা হয়েছে, আজ হয়ত সেই মূল্যায়নটা বদলাবে।” শুধু ব্যাভুমা নন, কৃষ্ণাঙ্গ পেসার কাগিসো রাবাডা (Kagiso Rabada) ও লুঙ্গি এনগিদি (Lungi Ngidi)-ও ছিলেন ম্যাচ ঘোরানোর কেন্দ্রে। রাবাডা পুরো টুর্নামেন্টে ৫৬টি উইকেট তুলে নেন ১৮.৫৩ গড় নিয়ে। এনগিদির দ্বিতীয় দিনের শেষবেলায় করা স্পেলই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। স্পিনার কেশভ মহারাজ। তাঁর বংশধররা ভারতের সুলতানপুর থেকে এসেছিলেন, তিনিও ছিলেন অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। ২০.৯৫ গড়ে ৪১টি উইকেট শিকার করেন মহারাজ

আর সাদা চামড়ার খেলোয়াড়দের কথা বললে, মারক্রাম, জনসেন, ডেভিড বেডিংহ্যাম (David Bedingham), ভেরেইনে তাঁরাও দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেছেন। এই জয় যেন দক্ষিণ আফ্রিকার সেই বিখ্যাত “রেইনবো নেশন”-এর প্রতিচ্ছবি। এই জয় আরও গভীরতর হয়ে ওঠে যখন স্মরণ করা হয় গত বছরের টি২০ বিশ্বকাপ স্কোয়াডে মাত্র একজন কৃষ্ণাঙ্গ ক্রিকেটার ছিলেন, যা নিয়ে প্রবল বিতর্ক হয়। প্রাক্তন ক্রিকেট দক্ষিণ আফ্রিকা ও আইসিসি প্রেসিডেন্ট রে মালি (Ray Mali) তখন বলেছিলেন, “আমরা ঐক্যের নামে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, তা যেন আমরা নিজেই ভেঙে দিয়েছি।” তবে এই জয় শুধুই রাজনীতির পাল্টা উত্তর নয়, অনেক ব্যক্তিগত লড়াইয়েরও জয়। ব্যাভুমাকে দুর্বল নেতৃত্বের কারণে অপমানিত হতে হয়েছে, রাবাডা কোকেন কাণ্ডে তিন মাস নির্বাসিত ছিলেন, সেই সমস্ত খেলোয়াড়রা আজ হলেন জাতির গর্ব। মারক্রামের ওপর ‘প্রতিভার প্রত্যাশা’ একপ্রকার অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, অবশেষে পেলেন স্বীকৃতি। অনেকের মতে, দক্ষিণ আফ্রিকার এই দলটি ছিল তারকাবিহীন। রাবাডা ছাড়া কেউই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তেমন বড় নাম নয়। বেডিংহ্যাম এক দশক ধরে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেছেন, তারপর এসেছেন টেস্ট দলে। ব্যাটিং লাইনআপকে অনেকেই বলেছিলেন সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্বল। যেখানে স্টিভ স্মিথের (Steve Smith) একার টেস্ট ম্যাচের সংখ্যা ১১৬। সেখানে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং লাইনআপের (ব্যাভুমা বাদে) সম্মিলিত ম্যাচ সংখ্যা ছিল তার চেয়ে মাত্র দু’টি বেশি। এমন পরিস্থিতিতে দক্ষিণ আফ্রিকার এই দলটাই সেই কাজ করে ফেলল, যা ক্যালিস (Jacques Kallis), গিবস (Herschelle Gibbs), আমলা (Hashim Amla), গ্রায়েম স্মিথ ও এবিডিভি-র মতো কিংবদন্তীরা পারেননি বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ ট্রফি ঘরে তুলতে।

ক্রিকেট বিশ্বকে মনে রাখতে হবে যে, এটা শুধুই ক্রিকেট নয়। এটা পুনর্জন্মও। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট গত কয়েক বছর ধরে ভুগেছে অব্যবস্থা, খেলোয়াড়দের আগাম অবসর, অস্ট্রেলিয়া-ইউরোপে চলে যাওয়া। আর টি২০ ফ্র্যাঞ্চাইজির আকর্ষণ। এই জয় নতুন প্রজন্মকে সাহস দেবে। লাল বলের ক্রিকেট, এই মুহূর্তে যখন বিশ্বজুড়েই একরকম অবহেলিত, তখন দক্ষিণ আফ্রিকার এই জয় বড় আশার আলো।

সবচেয়ে বড় কথা, ওঁদের এই জয় এল অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। সেই অস্ট্রেলিয়া, যারা ১৯৯৯ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ভেঙে দিয়েছিল। যারা বহুবার তাদের দুঃখের কারণ হয়েছে। সেই দলকে হারিয়ে ফাইনালে জয় মানে মানসিক মুক্তিরও চূড়ান্ত রূপ। এইভাবেই, ১৪ জুনের সেই সন্ধ্যা শুধু একটি খেলার জয় নয়, ক্রিকেট মাঠে লেখা একটি জাতির ইতিহাস পুনর্লিখনের মুহূর্ত হয়ে রইল।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Cherthala Travelog : সবুজ জলরেখায় হারিয়ে যাওয়া, চের্থালা ভ্রমণ

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন