সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: পর্যটনকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগের সম্ভাবনা আরও বাড়াতে কলকাতায় বসছে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগকারী সম্মেলন। বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষ্যে ২৭ সেপ্টেম্বর আয়োজিত এই বৈঠকে রাজ্যের পর্যটন পরিকাঠামোয় ২৫০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব আসতে পারে বলে জানিয়েছে রাজ্য সরকার (West Bengal Tourism Investment)। প্রায় ২৫ জন বিনিয়োগকারী এই সম্মেলনে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলির কয়েকজন বিনিয়োগকারীও রয়েছেন। প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০০ কোটি টাকা বা তার বেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব পাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ (Shankar Ghosh)। পর্যটন দফতরের পরিকল্পনায় শুধু হোটেল বা পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ নয়, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে যোগাযোগ, নদীপথ, ধর্মীয় পর্যটন, পাহাড়ি অঞ্চলের পরিকাঠামো এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকে ঘিরে একাধিক প্রকল্প রয়েছে। সরকারি পর্যটন পরিকাঠামোকে নতুন বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত করে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যও রাখা হয়েছে। রাজ্যের পর্যটন দফতরের সরকারি ওয়েবসাইটেও ধর্মীয় পর্যটন, নদী ও ক্রুজ পর্যটন, পরিবেশবান্ধব পর্যটন, পাহাড় এবং সাংস্কৃতিক পর্যটনকে পৃথক ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
কলকাতার বিনিয়োগকারী সম্মেলনে যে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তার অন্যতম কারণ হিসেবে রাজ্যের পর্যটন ক্ষেত্রের বিস্তৃত পরিধিকেই সামনে রাখা হচ্ছে। দার্জিলিং (Darjeeling), কালিম্পং (Kalimpong), কার্সিয়ং (Kurseong), মিরিক (Mirik), সুন্দরবন (Sundarban), বিষ্ণুপুর (Bishnupur), পুরুলিয়া (Purulia), দিঘা (Digha), কলকাতা (Kolkata) থেকে নদিয়া (Nadia) বিভিন্ন ধরনের পর্যটন গন্তব্যকে একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। রাজ্যের সরকারি পর্যটন পোর্টালেও এই অঞ্চলগুলিকে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে মিরিক হ্রদকে ঘিরে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের একটি বড় প্রকল্প রয়েছে। পর্যটনমন্ত্রী জানিয়েছেন, স্বদেশ দর্শন প্রকল্পের আওতায় মিরিক হ্রদের সৌন্দর্যায়ন ও ইকো-ট্যুরিজম পরিকাঠামো তৈরির জন্য কেন্দ্র ৫৭ কোটি টাকা অনুমোদন করেছে। হ্রদ ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ বজায় রেখে পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা বাড়ানোই এই প্রকল্পের লক্ষ্য।
মিরিককে ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা নতুন নয়। পাহাড়, চা-বাগান এবং হ্রদকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই পর্যটকদের আনাগোনা রয়েছে। সরকারি পর্যটন সংক্রান্ত তথ্যেও মিরিককে পাহাড়ি সৌন্দর্য ও হ্রদকেন্দ্রিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ফলে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন হলে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা, বিনোদন, স্থানীয় পরিষেবা এবং ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। নদীকেন্দ্রিক পর্যটনও রয়েছে সরকারের পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশে। কলকাতা, ব্যারাকপুর (Barrackpore), শ্রীরামপুর (Serampore), চন্দননগর (Chandannagar), হুগলি (Hooghly), নদীয়া ও বরানগর (Baranagar) -এ পর্যটক জেটি তৈরির জন্য জমি চিহ্নিত করা হয়েছে বলে পর্যটনমন্ত্রী জানিয়েছেন। গঙ্গা ও তার সংলগ্ন জলপথকে পর্যটনের কাজে আরও বেশি ব্যবহার করার উদ্দেশ্যেই এই পরিকল্পনা।
জেটি তৈরি হলে নদীপথে পর্যটকদের যাতায়াতের পরিধি বাড়ানো সম্ভব হতে পারে। কলকাতার ঐতিহাসিক ঘাট থেকে শুরু করে হুগলি ও নদিয়ার বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে জলপথে পর্যটন সংযোগ তৈরি করা গেলে স্থানীয় ব্যবসা, পরিবহণ, খাবারের দোকান, হস্তশিল্প এবং পরিষেবা খাতেও তার প্রভাব পড়তে পারে। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি পর্যটন পোর্টালেও নদী ও ক্রুজ পর্যটনকে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ধর্মীয় পর্যটনের ক্ষেত্রেও বড় পরিকল্পনা রয়েছে রাজ্যের। ১০৮টি ধর্মীয় সার্কিটের জন্য ডিটেলড প্রজেক্ট রিপোর্ট বা ডিপিআর তৈরির কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন শঙ্কর ঘোষ। এর ফলে মন্দির, তীর্থস্থান, ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপত্য ও সংশ্লিষ্ট এলাকার যোগাযোগ ও পর্যটন পরিষেবাকে একটি পরিকল্পিত পথে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সরকারি পর্যটন দফতর ইতিমধ্যেই রাজ্যের বিভিন্ন ধর্মীয় গন্তব্যকে একাধিক সার্কিটে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৬-২৭ সালের রাজ্য বাজেট নথিতে ১০০টির বেশি ধর্মীয় পর্যটন সার্কিটে ৪০০টিরও বেশি ধর্মীয় গন্তব্য অন্তর্ভুক্ত করার কথা উল্লেখ রয়েছে।
বিষ্ণুপুরকে ঘিরেও নতুন পরিকল্পনা রয়েছে। বাঁকুড়ার এই ঐতিহাসিক মন্দিরনগরীকে আরও পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে আইআইটি খড়গপুরের (IIT Kharagpur) সহযোগিতা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন পর্যটনমন্ত্রী। মন্দির, টেরাকোটা স্থাপত্য, ইতিহাস এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকে সামনে রেখে বিষ্ণুপুরকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য একটি সমন্বিত ডিপিআর তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। রাজ্যের সরকারি পর্যটন পোর্টালেও বিষ্ণুপুরকে অন্যতম প্রধান গন্তব্য হিসেবে রাখা হয়েছে। শুধু প্রচলিত পর্যটনকেন্দ্রের উপর নির্ভর না করে জেলার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। ‘এক জেলা, এক গন্তব্য’ মডেলের মাধ্যমে প্রতিটি জেলার নিজস্ব পর্যটন সম্ভাবনাকে সামনে আনার কথা বলা হয়েছে। কোনও জেলার ঐতিহাসিক স্থাপত্য, কোনও জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, কোথাও লোকসংস্কৃতি বা খাবার, স্থানীয় বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পর্যটনের নতুন প্যাকেজ তৈরির সুযোগ রয়েছে।
উপজাতীয় পর্যটনের ক্ষেত্রেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাহাড়, জঙ্গল ও প্রত্যন্ত এলাকার স্থানীয় গ্রামগুলিকে পর্যটন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য আয়ের নতুন পথ খুলতে পারে। হোমস্টে, স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প, লোকসংগীত, নৃত্য এবং গ্রামীণ জীবনযাত্রাকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা হলে পর্যটনের আর্থিক সুফল শহরকেন্দ্রিক না থেকে প্রত্যন্ত এলাকাতেও পৌঁছতে পারে। পাহাড়ি পর্যটনের ক্ষেত্রেও নতুন পরিকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা সামনে এসেছে। দার্জিলিং-কালিম্পং-কার্সিয়ং অঞ্চলে রোপওয়ের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব রাইটস-কে (RITES)-কে দেওয়া হয়েছে। পুরুলিয়াতেও রোপওয়ের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দার্জিলিং, কালিম্পং ও কার্সিয়ং এমনিতেই পাহাড়, চা-বাগান, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। সরকারি পর্যটন তথ্যেও এই অঞ্চলগুলির পাহাড়ি পর্যটন, সংস্কৃতি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের কথা তুলে ধরা হয়েছে। ফলে রোপওয়ের মতো পরিবহণ ব্যবস্থা চালু হলে পর্যটকদের যাতায়াতের অভিজ্ঞতায় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ফল এবং পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পরেই প্রকল্পগুলির বাস্তব রূপ সম্পর্কে চূড়ান্ত ছবি পাওয়া যাবে। পুরুলিয়াকেও এই পরিকল্পনার আওতায় রাখা হয়েছে। অযোধ্যা পাহাড় ও পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে পর্যটনের বিস্তার ঘটানোর সুযোগ রয়েছে। রোপওয়ে প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পাহাড়ি পর্যটনকে আরও বিস্তৃত করার একটি নতুন পরিকাঠামো তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় পরিবহণ, থাকার জায়গা, খাবারের দোকান এবং অন্যান্য পরিষেবা ক্ষেত্রেও চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কলকাতার বিনিয়োগকারী সম্মেলনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সরাসরি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরকারি আধিকারিকদের আলোচনা। পর্যটন প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী সংস্থাগুলি তাঁদের প্রস্তাব, প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো ও সরকারি সহযোগিতার বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ পাবেন। রাজ্য সরকারও বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী নীতি ও পরিকাঠামোগত সহযোগিতার বিষয়টি তুলে ধরবে।
শঙ্কর ঘোষ জানিয়েছেন, পর্যটন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থান তৈরি করাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। প্রায় ২৫ জন বিনিয়োগকারী যদি ১০০ কোটি টাকা বা তার বেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব দেন, তাহলে সম্ভাব্য মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ২৫০০ কোটি টাকার গণ্ডি পেরোতে পারে। তবে সম্মেলনে প্রস্তাব আসা এবং সেই প্রস্তাব বাস্তবে বিনিয়োগে পরিণত হওয়া এক বিষয় নয়। প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন, জমি, অর্থায়ন, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরেই প্রকৃত বিনিয়োগের পরিমাণ জানা যাবে। রাজ্যের পর্যটন অর্থনীতিতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়লে তার প্রভাব শুধু বড় হোটেল বা পর্যটন প্রকল্পে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবহণ, রেস্তরাঁ, হোমস্টে, স্থানীয় বাজার, হস্তশিল্প, গাইড পরিষেবা এবং বিনোদনভিত্তিক নানা ব্যবসায় তার প্রভাব পড়তে পারে। তবে পর্যটন সম্প্রসারণের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কলকাতার এই সম্মেলনের মাধ্যমে তাই পশ্চিমবঙ্গের পর্যটনকে নতুন বিনিয়োগের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছে রাজ্য সরকার। মিরিকের ইকো-ট্যুরিজম থেকে গঙ্গার জেটি, ১০৮টি ধর্মীয় সার্কিট থেকে বিষ্ণুপুরের মন্দিরনগরী, পাহাড়ের রোপওয়ে থেকে উপজাতীয় পর্যটন, বিভিন্ন ক্ষেত্রকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এখন নজর থাকবে বিনিয়োগকারীদের প্রস্তাব কতটা বাস্তব প্রকল্পে রূপ নেয় এবং আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন মানচিত্রে তার কী প্রভাব পড়ে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal UCC latest news, Suvendu Adhikari latest announcement | মাদ্রাসা থেকে ইউসিসি, গোশালা : তিন সিদ্ধান্তে নতুন দিশার ইঙ্গিত শুভেন্দু সরকারের




