সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ও সরকার-পোষিত স্কুলগুলিতে শিশুদের জন্য রান্না করা খাবার পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছেন হাজার হাজার মহিলা রান্নাকর্মী (West Bengal school cooks)। সকাল থেকে স্কুলে এসে চাল-ডাল-সবজি প্রস্তুত করা, রান্না করা, পরিবেশন ও রান্নাঘর গুছিয়ে রাখার মতো একাধিক কাজ সামলান তাঁরা। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পরেও তাঁদের পারিশ্রমিক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ, কাজের সময় ও পরিশ্রমের তুলনায় তাঁদের প্রাপ্য অর্থ অত্যন্ত কম। তার সঙ্গে নেই নিয়মিত বোনাস, অবসরকালীন সুরক্ষা কিংবা দীর্ঘদিন কাজ করার পরে সম্মানজনক আর্থিক সুবিধার নিশ্চয়তা। একজন দিনমজুরের দৈনিক মজুরি যদি ৫০০ টাকার কাছাকাছি হয় এবং ছোট বা মাঝারি হোটেলে একজন রাঁধুনির পারিশ্রমিক দৈনিক ৭০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে, সেখানে স্কুলের রান্নাকর্মীদের পারিশ্রমিকের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একজন রান্নাকর্মীর দৈনিক হিসাবে পাওয়া অর্থ আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ টাকার মতো। আবার একটি স্কুলে রান্নার কাজ সামলাতে রাঁধুনি ও সহায়তাকারী মিলিয়ে তিন থেকে চারজন কর্মীর প্রয়োজন হলে মাথাপিছু হিসাব আরও কমে যায়। ফলে যে কাজের সঙ্গে প্রতিদিন বহু শিশুর খাবারের গুণমান ও সময়মতো খাবার পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি জড়িত, সেই কাজের আর্থিক মূল্যায়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ।
স্কুলে রান্নার কাজকে বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তার পরিধি অনেক বড়। নির্দিষ্ট সময়ে রান্না শেষ করতে হয়। বিপুল পরিমাণ খাদ্যসামগ্রী পরিষ্কার করা, কাটা, ধোয়া, রান্না করা ও শিশুদের মধ্যে পরিবেশন প্রতিটি ধাপেই শ্রমের প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রেই সকাল থেকে স্কুল ছুটি পর্যন্ত তাঁদের ব্যস্ত থাকতে হয়। ফলে বাড়ির দৈনন্দিন কাজের পাশাপাশি স্কুলের দায়িত্ব সামলানো মহিলা কর্মীদের জন্য শারীরিক ও সময়ের চাপও কম নয়। মিড-ডে মিল বা বিদ্যালয়ের মধ্যাহ্নভোজ প্রকল্পের উদ্দেশ্যই হল স্কুলপড়ুয়া শিশুদের পুষ্টিকর খাবার দেওয়া এবং একই সঙ্গে বিদ্যালয়ে তাঁদের উপস্থিতি ধরে রাখতে সহায়তা করা। সেই ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগে রান্নাকর্মীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশুর প্লেটে খাবার পৌঁছনোর আগে রান্নাঘরের যে দীর্ঘ পরিশ্রমের পর্ব রয়েছে, তার বড় অংশই সামলান এই কর্মীরা। অথচ তাঁদের কাজের স্বীকৃতি যদি শুধু নামমাত্র পারিশ্রমিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্নটি সামনে আসবেই।
রাজ্যে বিদ্যালয়ভিত্তিক খাদ্য পরিষেবা চালুর ইতিহাসও দীর্ঘ। বামফ্রন্ট সরকারের সময় স্কুলের খাদ্য পরিষেবাকে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে রান্নার কাজ পরিচালনার ব্যবস্থাও একসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। পরবর্তী সময়ে তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) সরকারও বিদ্যালয়ের খাদ্য পরিষেবা চালু রাখে। কিন্তু রান্নাকর্মীদের পারিশ্রমিক, বোনাস এবং অবসরকালীন সুবিধার মতো বিষয়গুলি নিয়ে প্রত্যাশিত পরিমাণে আলোচনা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, এই কর্মীদের জন্য কি একটি নির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো তৈরি করা যায় না? দৈনিক মজুরির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাঁদের পারিশ্রমিক নির্ধারণ, নির্দিষ্ট সময় অন্তর বেতন পুনর্বিবেচনা, বছরে একটি বোনাস এবং নির্দিষ্ট বয়সে অবসরের সময় এককালীন সম্মানধনের ব্যবস্থা করা হলে তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা অনেকটাই বাড়তে পারে। কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে কোনও আর্থিক সহায়তা না পাওয়ার পরিস্থিতি থেকেও তাঁদের বের করে আনা সম্ভব হতে পারে।
আরও পড়ুন : Aadhaar Card Update Rules: আধারে ঠিকানা-মোবাইল কতবার বদলানো যায়? UIDAI-র নিয়ম জানলে এড়াবেন ঝামেলা
এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। স্কুলের রান্নাকর্মীদের বড় অংশই মহিলা। ফলে তাঁদের শ্রমের মূল্যায়ন কেবল একটি কর্মসংস্থান সংক্রান্ত বিষয় নয়, এর সঙ্গে পারিবারিক অর্থনীতি ও মহিলাদের আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে। সংসারের কাজ সামলে যাঁরা প্রতিদিন স্কুলে গিয়ে শিশুদের জন্য রান্না করেন, তাঁদের উপার্জন যদি পরিবারের অর্থনৈতিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তবে সেই আয়ের স্থায়িত্বও জরুরি। সরকারের পক্ষ থেকে যদি তাঁদের পারিশ্রমিককে বর্তমান দৈনিক মজুরির কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে তা নিয়ে নতুন করে আশার জায়গা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে কর্মীদের কাজের মেয়াদ, বয়স, দায়িত্ব এবং উপস্থিতির ভিত্তিতে অবসরকালীন সুবিধা নির্ধারণ করা যেতে পারে। বছরে নির্দিষ্ট বোনাস চালু হলে উৎসবের সময়ও তাঁদের পরিবারের হাতে অতিরিক্ত অর্থ পৌঁছবে। অবসরের সময়ে নির্দিষ্ট সম্মানধন দেওয়া হলে দীর্ঘ কর্মজীবনের একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও তৈরি হবে।
রাজ্যের স্কুলগুলিতে শিক্ষকদের বেতন কাঠামো ও রান্নাকর্মীদের পারিশ্রমিকের মধ্যে যে বড় ব্যবধান রয়েছে, সেটিও আলোচনায় আসছে। অবশ্য দুই ধরনের কাজের দায়িত্ব, যোগ্যতা ও পরিষেবার কাঠামো এক নয়। তবু শিশুদের দৈনন্দিন খাদ্য পরিষেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে যুক্ত কর্মীদের জীবনযাত্রা এবং ন্যায্য পারিশ্রমিকের বিষয়টি আলাদা করে বিবেচনা করা যেতে পারে। বর্তমান বিজেপি (Bharatiya Janata Party) সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) -এর নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের সামনে তাই স্কুলের রান্নাকর্মীদের আর্থিক সুরক্ষার প্রশ্নটি নতুন করে উঠছে, এমন দাবি করা হচ্ছে। মহিলা কর্মীদের জন্য বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের রান্নাঘরে কর্মরত মহিলাদের পারিশ্রমিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা তাঁদের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে বলে মত উঠেছে।
কিন্তু, এই ধরনের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সরকারি নীতি, বাজেট, কর্মীদের প্রকৃত সংখ্যা এবং বর্তমান পারিশ্রমিক কাঠামো পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। শুধু বেতন বাড়ানো নয়, কর্মীদের পরিচয়, কাজের সময়, ছুটি, বোনাস, অবসরকালীন সুবিধা এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক সুরক্ষা, সবকটি বিষয়কে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনা গেলে ব্যবস্থা আরও কার্যকর হতে পারে। স্কুলের রান্নাঘরে প্রতিদিন যে শ্রম দেওয়া হয়, তার ফল সরাসরি পৌঁছয় শিশুদের থালায়। তাই রান্নাকর্মীদের আর্থিক অবস্থার প্রশ্নটি শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের সমস্যা নয়; এটি বিদ্যালয়ের খাদ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত বৃহত্তর শ্রমব্যবস্থার প্রশ্ন। ন্যায্য পারিশ্রমিক, বাৎসরিক বোনাস এবং অবসরের সময়ে সম্মানধনের মতো ব্যবস্থা নিয়ে সরকার যদি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে অল্প পারিশ্রমিকে কাজ করে যাওয়া এই মহিলা কর্মীদের জীবনে আর্থিক স্বস্তির নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাঁদের শ্রমের সামাজিক মূল্যায়নও তখন আরও দৃঢ় ভিত্তি পাবে।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : VB-G RAM G scheme, Dilip Ghosh | ‘১০০ নয়, এবার ১২৫ দিনের কাজ’! VB-G RAM G প্রকল্পে গ্রামে কর্মসংস্থানের নতুন সমীকরণ, উদ্বোধনে কোদাল হাতে দিলীপ




