সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠা দিবস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক টানাপোড়েন। রাজ্যের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং বাঙালির নিজস্ব পরিচয়ের প্রশ্নে বারবার সুর চড়িয়ে এসেছে তৃণমূল কংগ্রেস (TMC)। সেই ধারাকে আরও প্রবল করেই রাজ্যসভায় মুখ খুললেন তৃণমূল সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (Ritabrata Banerjee)। সোমবার শীতকালীন অধিবেশনের জিরো আওয়ারে তিনি জোরালো দাবি তুললেন, ১ বৈশাখকে কেন্দ্রীয়ভাবে ‘পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ইতিমধ্যেই ১ বৈশাখকে প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় অনুমোদন না থাকায় সরকারিভাবে সর্বভারতীয় মর্যাদা পায়নি দিনটি। সেই স্বীকৃতিই এবার সংসদে দাবি করলেন ঋতব্রত। তৃণমূলের পক্ষ থেকে বহুদিন ধরে বাংলা ও বাঙালির পরিচয়কে কেন্দ্র করে যে রাজনীতি তৈরি হয়েছে, ঋতব্রতের বক্তব্যে তা যেন আরও শক্তিমান হয়ে উঠল।
রাজ্যসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে ঋতব্রত বলেন, “১ বৈশাখ শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়; এটি বাঙালির পাঁচ হাজার বছরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর বাণিজ্য-প্রথার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।’’ তাঁর মন্তব্যে উঠে এল বাংলার প্রাচীন সভ্যতা, সমৃদ্ধ সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইতিহাস। তিনি মনে করিয়ে দেন, এশিয়ার প্রথম কলেজ, প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রথম মেডিক্যাল কলেজ, সবই কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বাঙালির আত্মপরিচয় বোঝাতে তিনি টেনে আনেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore)-এর নামও। বক্তব্য রাখতে রাখতে ঋতব্রত অভিযোগ করেন, বাংলাভাষাকে অপমান করা হচ্ছে নানা স্তরে। যদিও তিনি সরাসরি বিজেপি (BJP)-র নাম নেননি, কিন্তু তাঁর বক্তব্য চলাকালীন উচ্চকক্ষের শাসকদলীয় সাংসদদের হট্টগোল স্পষ্ট করে দিয়েছে, ইস্যুটি কতটা সংবেদনশীল। তৃণমূল সাংসদ যখন রাজা রামমোহন রায়কে (Raja Rammohan Roy) অপমানের প্রসঙ্গ তোলেন, তখন সেই হট্টগোল আরও বাড়ে। কিন্তু কোনও বাধা না শুনেই তিনি বলেন, “ইউরোপের বাইরে একমাত্র নবজাগরণ হয়েছিল বাংলাতেই। সেই গৌরব বাঙালির ইতিহাসে অম্লান।”
তৃণমূল সরকার ইতিমধ্যেই বাংলা সংস্কৃতিকে জোর দেওয়ার উদ্দেশ্যে একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১ বৈশাখকে প্রতিষ্ঠা দিবস ঘোষণার পাশাপাশি রাজ্য সরকার স্বীকৃতি দিয়েছে, রবীন্দ্রনাথের ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’ গানকে রাজ্য সঙ্গীত হিসেবে। এখন থেকে রাজ্যের যেকোনও সরকারি অনুষ্ঠানের শেষে এই গান গাওয়া বাধ্যতামূলক। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সব পদক্ষেপই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)-এর দীর্ঘদিনের বাংলা-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক আখ্যানকে আরও সারবত্তা দিচ্ছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল বাংলা ও বাঙালির পরিচয়ের প্রশ্নকে নির্বাচনী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটেও সেই একই সুর বজায় ছিল। নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, কয়েক মাসের মধ্যেই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। তার আগেই সংসদে ঋতব্রতের বক্তব্য সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে, তৃণমূল আবারও বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সামনে রেখেই রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শীতকালীন অধিবেশনের জিরো আওয়ারে এই দাবি তুলে ঋতব্রত যেন ঘোষণাই করলেন, বাংলা ও বাঙালির মর্যাদার লড়াই আরও জোরদার করবে তৃণমূল। আর কেন্দ্র যদি প্রতিষ্ঠা দিবসকে স্বীকৃতি না দেয়, তাহলে তা নিয়েও রাজনৈতিক সংঘাত বাড়বে পরবর্তীতে। বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে কেন্দ্র করে তৃণমূলের এই আক্রমণাত্মক অবস্থান নিঃসন্দেহে আগামী দিনের রাজনীতিতে বড় ভূমিকা নেবে।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : CM Mamata Banerjee Post, West Bengal Communal Unity | মদনমোহন মন্দিরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় : ‘সর্বধর্মে শান্তির বাংলা গড়াই আমাদের সংকল্প’




