সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ উত্তর কাশী: উত্তরাখণ্ডের (Uttarakhand) উত্তর কাশী (Uttarkashi) জেলায় আবারও প্রকৃতির ভয়াল রূপ। হর্ষিল (Harsil) অঞ্চলে মেঘভাঙা বৃষ্টির (Cloudburst) জেরে ধস নেমে সৃষ্টি হয়েছে হড়পা বান (Flash Flood)। এই হড়পা বানে ইতিমধ্যেই নিখোঁজ অন্তত ৬০ জন। ধরালি (Dharali) গ্রামের একাংশ জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে। নদীতে নেমে আসা কাদা আর পাথরের প্রবল স্রোতে একাধিক বাড়ি, হোটেল চোখের পলকে গড়িয়ে পড়েছে খাদের দিকে। এলাকাজুড়ে আতঙ্ক আর বিষণ্ণতা।

ঘটনাস্থলের ভিডিও ইতিমধ্যেই ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সেখানে দেখা যাচ্ছে, কীভাবে পাহাড়ি নদীতে বয়ে আসা ভয়ংকর কাদা-পাথরের স্রোত একের পর এক স্থাপনা ধ্বংস করে এগিয়ে চলেছে জনবসতির দিকে।

এই ঘটনা উত্তর কাশী থেকে গঙ্গোত্রী (Gangotri)-র রাস্তায় অবস্থিত ধরালি গ্রামে ঘটেছে, যা হর্ষিল ভ্যালির (Harsil Valley) অংশ। প্রসঙ্গত, এই অঞ্চলটি অতীতে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্য বহুবার সংবাদ শিরোনামে এসেছে। স্থানীয় প্রশাসনের মতে, প্রবল বর্ষণের কারণে কোনও উঁচু পাহাড়ি অংশে ভূমিধস (Landslide) হয়েছে ও তার ফলেই নদীতে নেমে এসেছে কাদা ও পাথরের ঢল। এতে নদীর গতিপথ একেবারে বদলে গিয়েছে। প্রচণ্ড স্রোতে স্রোতের মুখে পড়ে গেছে গ্রাম। হোটেল, রিসর্ট, বাজারের দোকান- সবই নদীতে গড়িয়ে পড়েছে। জেলা শাসক (District Magistrate) অভিষেক রুহেলা (Abhishek Ruhela) সংবাদমাধ্যমকে জানান, “এই মুহূর্তে উদ্ধার কাজ আমাদের প্রধান লক্ষ্য। বিপর্যস্ত এলাকায় সেনা ও SDRF-এর দল মোতায়েন করা হয়েছে। নিখোঁজদের খোঁজে তল্লাশি চলছে। তবে প্রবল জলের তোড়ে কাজ ব্যাহত হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “মেঘভাঙা বৃষ্টির ফলে ধস নেমেছে বলেই প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিস্তারিত রিপোর্ট এখনও আসেনি।” ধরালি গ্রামের এক স্থানীয় বাসিন্দা বিনোদ কুন্ডু (Vinod Kundu) বলেন, “সকাল পর্যন্ত সব ঠিকঠাক ছিল। হঠাৎ করেই বিকট শব্দে গর্জন করে নেমে এল স্রোত। চোখের সামনেই হোটেল ভেসে যেতে দেখেছি। অনেকে তো কিছু বুঝে ওঠার আগেই জলে গা ভাসিয়ে দিয়েছে।” তাঁর গলা কাঁপছিল আতঙ্কে।

গত ক’য়েক বছরে উত্তরাখণ্ডে এই ধরনের হড়পা বানের ঘটনা বারবার ঘটেছে। ২০১৩ সালের কেদারনাথ বিপর্যয় এখনও অনেকের মন থেকে মুছে যায়নি। ২০২১ সালে চামোলি (Chamoli) জেলাতেও একটি ভয়ঙ্কর হিমবাহ ধস (Glacial Burst) ঘটেছিল, যাতে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন (Climate Change) ও অবৈজ্ঞানিক নির্মাণকাজ এই ধরনের বিপর্যয়ের হার বাড়িয়ে তুলছে।

হর্ষিল এলাকার এক পরিবেশ গবেষক দীপ্তাশু রায় (Diptashu Roy) বলেন, “এই পাহাড়ি অঞ্চলে লাগাতার আবহাওয়ার পরিবর্তন, বেশি পর্যটন, রাস্তা প্রশস্তকরণ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প পাহাড়ের ভৌগোলিক কাঠামোকে দুর্বল করে তুলেছে। এর ফলে একটু ভারী বৃষ্টি হলেই বড় ধরনের ধস ও বানের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “প্রতিবছর উত্তরাখণ্ডের কোনও না কোনও অংশে এই ধরনের ঘটনা ঘটছে। প্রশাসনের উচিত একে গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া।” প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে পাহাড়ে নির্মাণকাজের নিয়ম মানা হচ্ছে কি না। ধরালি এলাকায় গঙ্গোত্রী হাইওয়ে সম্প্রসারণের কাজ চলছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই নির্মাণ কাজের সময় যথাযথ পরিবেশ সমীক্ষা হয়নি। তার জেরেই এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF)। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে বলেও সূত্রের খবর। ইতিমধ্যে আশপাশের পর্যটকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে পরবর্তী বৃষ্টিপাত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলে এই ধরনের হড়পা বান আসার সম্ভাবনা প্রতি বছরই বাড়ছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই ধ্বংসের মিছিল চলতেই থাকবে। এবং তার সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হবে পাহাড়ে বসবাসকারী সাধারণ মানুষদের।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Himachal landslide 2025, Dog Saves Lives | কুকুরের তৎপরতায় বাঁচল ৬৭ প্রাণ! হিমাচলে ধসের আগে সতর্ক করে ‘নীরব নায়ক’




