সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নয়াদিল্লি, ৩০ অক্টোবর: ভারত মায়ানমার বিষয়ে জাতিসংঘের এক বিশেষজ্ঞের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনকে “ভিত্তিহীন, পক্ষপাতদুষ্ট ও বিভ্রান্তিকর” বলে কড়া ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে জম্মু ও কাশ্মীরের পাহালগাঁওয়ে (Pahalgam) সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে ভারতে অবস্থানরত মায়ানমারের শরণার্থীরা তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছেন, যদিও ওই হামলার সঙ্গে মিয়ানমারের কোনও নাগরিকের সম্পৃক্ততা ছিল না।

ভারতের সাংসদ দিলীপ সাইকিয়া (Dilip Saikia) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটির আলোচনায় ভারতের পক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রতিবেদনটির পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি-এর কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “আমার দেশ সম্পর্কে প্রতিবেদনে ভিত্তিহীন এবং পক্ষপাতদুষ্ট পর্যবেক্ষণের প্রতি আমি গুরুতর আপত্তি জানাই। ২০২৫ সালের এপ্রিলে পহেলগাঁওয়ে সন্ত্রাসবাদী হামলার শিকার নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের প্রতি বিশেষ প্রতিবেদকের সাম্প্রদায়িক মনোভাবের তীব্র নিন্দা জানাই।”
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষ দূত থমাস অ্যান্ড্রুজ (Thomas Andrews) তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, “হিন্দু পর্যটকদের উপর হামলার পর ভারতে মায়ানমারের শরণার্থীরা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের চাপ, জিজ্ঞাসাবাদ, আটক ও নির্বাসনের হুমকির মধ্যে রয়েছেন।” প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মে মাসের প্রথম দিকে দিল্লিতে নারী ও শিশুসহ প্রায় ৪০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আটক করে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এমনকী কিছু শরণার্থীকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয় বলে অভিযোগ তোলা হয়। এই দাবিকে “অযাচাইকৃত এবং বিকৃত” বলে উড়িয়ে দেন সাংসদ সাইকিয়া। তাঁর বক্তব্য, “পাহালগাঁও হামলা মায়ানমারের শরণার্থীদের প্রভাবিত করেছে, এই অভিযোগের কোনও বাস্তব ভিত্তি নেই। এটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।” তিনি আরও বলেন, “বিশেষ প্রতিবেদককে আমি অনুরোধ করব, যেন তিনি অযাচাইকৃত ও বিকৃত মিডিয়া রিপোর্টের উপর নির্ভর না করেন, যেগুলির একমাত্র লক্ষ্য ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা।”
ভারত দাবি করেছে, জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনে দেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে “সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।” দিল্লির বক্তব্য অনুযায়ী, শরণার্থীদের মধ্যে কিছু উগ্রপন্থী কার্যকলাপের উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা গিয়েছে, যা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। “আমরা বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর মানবিক সহায়তার পক্ষে, তবে নিরাপত্তা উদ্বেগ উপেক্ষা করা সম্ভব নয়,” বলেন সাইকিয়া। উল্লেখ্য, ভারত বরাবরই মায়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে জনকেন্দ্রিক ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখেছে। দিলীপ সাইকিয়া জানান, “আমরা বিশ্বাস করি, মায়ানমারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে তার জনগণই। ভারত প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আস্থা, স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তাদের পাশে থাকবে।” তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে মায়ানমারে বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পর ভারত তাৎক্ষণিকভাবে ‘অপারেশন ব্রহ্মা’ (Operation Brahma) চালু করে, যেখানে ১,০০০ মেট্রিক টনেরও বেশি ত্রাণ সামগ্রী এবং চিকিৎসক দল পাঠানো হয়েছিল। এর আগে টাইফুন ইয়াগি (Typhoon Yagi) ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও ভারত মায়ানমারকে দ্রুত মানবিক সহায়তা দিয়েছে।
ভারত বারবার আহ্বান জানিয়েছে যে, মায়ানমারে চলমান সংঘাতের সমাধান হতে হবে রাজনৈতিক আলোচনা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ‘সাইকিয়া বলেন, “সহিংসতা বন্ধ, রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি এবং মানবিক সহায়তার অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। কেবলমাত্র একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোচনার মাধ্যমেই মজবুত শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।” ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে যে, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের উচিত তাদের মূল্যায়ন প্রস্তুত করার আগে ‘বিশ্বস্ত ও যাচাইকৃত উৎস’ ব্যবহার করা। একটি সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ভারত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আলোচনায় ইতিবাচকভাবে অংশগ্রহণ করে, কিন্তু ভ্রান্ত ও রাজনৈতিকভাবে অনুপ্রাণিত পর্যবেক্ষণকে কখনও সমর্থন করবে না।” নতুন দিল্লির মতে, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উপস্থাপিত তথ্যের অনেকটাই অনুমাননির্ভর এবং তা আঞ্চলিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দেশটি বলেছে, “ভারত একটি বহুত্ববাদী গণতন্ত্র যেখানে ২০ কোটিরও বেশি মুসলিম নাগরিক শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করেন, যা বিশ্বের মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ।” দিল্লি স্পষ্ট করেছে, কোনও অবস্থাতেই ভারত তার জাতীয় নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্বকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক এজেন্ডার কাছে নত করবে না।
ছবি : সংগৃহীত


