সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : দীর্ঘ টানাপোড়েন, পাল্টা শুল্ক, রফতানি নিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার পর আমেরিকা ও চিনের সম্পর্ক ফের আলোচনার টেবিলে নতুন মোড় নিল। ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) এবং চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (Xi Jinping)-এর বৈঠকের পর দুই দেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একাধিক নতুন পদক্ষেপ সামনে এসেছে। সবচেয়ে বড় বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে ৩০০০ কোটি ডলার মূল্যের অ-সংবেদনশীল পণ্যের উপর তুলনামূলক সুবিধাজনক শুল্ক ব্যবস্থার জন্য ঐকমত্য, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত পৃথক সরকারি বোর্ডকে কার্যকর করা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি ও সম্ভাবনা নিয়ে নতুন সংলাপ এবং দুই দেশের মধ্যে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ সংক্রান্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
মার্কিন প্রশাসনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশ একে অপরের বাজারে ৩০০০ কোটি ডলার মূল্যের অ-সংবেদনশীল পণ্যের জন্য আরও সুবিধাজনক শুল্ক ব্যবস্থার সুপারিশে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। এখানে দু’দিকেই ৩০০০ কোটি ডলারের পণ্যের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, বিষয়টি শুধু আমেরিকা থেকে চিনে রফতানি হওয়া পণ্যের ক্ষেত্রে নয়, চিন থেকে আমেরিকায় যাওয়া নির্দিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মার্কিন রফতানির তালিকায় রয়েছে কৃষিপণ্য, মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্য, কাঠ ও কাঠজাত পণ্য, প্রসাধনী এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম। অন্য দিকে চিনা পণ্যের মধ্যে ছোট বৈদ্যুতিক যন্ত্র, খেলনা, উৎসবের সাজসজ্জার সামগ্রী এবং শিশুদের গাড়ির আসনের মতো ভোগ্যপণ্য রয়েছে। বাণিজ্য নিয়ে আলোচনাকে নিয়মিত কাঠামোর মধ্যে আনার জন্য দুই দেশের ‘বোর্ড অব ট্রেড’ এবং ‘বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট’-এর কাজও এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থার লক্ষ্য হল দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত সমস্যাগুলি সরকারি পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে মেটানোর একটি নির্দিষ্ট পথ তৈরি করা।
মে মাসের বৈঠকে এই দুই কাঠামো তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সেপ্টেম্বরের ওয়াশিংটন বৈঠকে সেগুলিকে কার্যকর করার দিকে আরও এক ধাপ এগিয়েছে দুই দেশ। শুধু শুল্ক নয়, বিরল খনিজ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং বিরল মাটির উপাদানের সরবরাহে যে ঘাটতি নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ রয়েছে, তা নিয়েও চিনের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। লক্ষ্য হল সরবরাহকে উপযুক্ত মাত্রায় ফিরিয়ে আনা। এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বৈদ্যুতিক গাড়ি, আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও নানা ধরনের উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পে বিরল খনিজের ব্যবহার রয়েছে। একইভাবে, বাণিজ্যিক সমঝোতার পাশাপাশি কয়লা নিয়েও একটি বড় সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চিন ২০২৭ এবং ২০২৮ দুই বছরেই আমেরিকা থেকে অন্তত ১ কোটি মেট্রিক টন করে কয়লা আমদানি করবে। এর ফলে আমেরিকার জ্বালানি রফতানি এবং চিনের শিল্পক্ষেত্রে কয়লার চাহিদার মধ্যে নতুন একটি বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ওয়াশিংটন বৈঠকের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলির একটি বাণিজ্য নয়, প্রযুক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ নিয়ে আমেরিকা ও চিনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিযোগিতা চলছে। এবার সেই আলোচনাকে আরও উচ্চস্তরে নিয়ে যেতে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ শব্দটি সামনে এসেছে। মার্কিন প্রশাসনের প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, দুই রাষ্ট্রনেতা সংশ্লিষ্ট উদীয়মান প্রযুক্তিকে বর্ণনা করতে ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’-এর পরিবর্তে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ শব্দ ব্যবহারে সম্মত হয়েছেন। পাশাপাশি আমেরিকা-চিনের মধ্যে একটি পৃথক ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স ডায়ালগ’ তৈরি করা হয়েছে। এই নতুন আলোচনার উদ্দেশ্য শুধু প্রযুক্তির উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা না। প্রযুক্তির সম্ভাব্য সুবিধার পাশাপাশি ঝুঁকিও আলোচনার আওতায় থাকবে। আগামী নভেম্বরের মধ্যে পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। কোনও গুরুতর প্রযুক্তিগত বা নিরাপত্তাজনিত ঘটনা ঘটলে দুই দেশের আধিকারিকদের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগের জন্য একটি দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে প্রযুক্তি নিয়ে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও এখন দুই দেশের সরকারি আলোচনার অংশ হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক মঞ্চেও সহযোগিতার জায়গা তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে। আমেরিকা ও চিন চলতি বছরে জি-২০ (G20) ও এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কোঅপারেশন বা অ্যাপেক (APEC) -এর আয়োজক দেশ হিসেবে একে অপরকে সহযোগিতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সূত্রের খবর, দুই দেশের রাষ্ট্রনেতাই একে অপরের আয়োজিত শীর্ষ বৈঠকে উপস্থিত থাকার পরিকল্পনা করেছেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জলপথে কোনও দেশ বা প্রতিষ্ঠান যেন নিজেদের ইচ্ছামতো ট্রানজ়িট টোল বসাতে না পারে, সেই অবস্থানও দুই দেশের আলোচনায় উঠে এসেছে। এই সমঝোতাগুলির পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের শুল্ক সংঘাতের ইতিহাস। ২০১৮ সাল থেকে আমেরিকা ও চিনের মধ্যে বাণিজ্যিক দ্বন্দ্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে। বাণিজ্য ঘাটতি, চিনের বাণিজ্যনীতি, মেধাস্বত্ব এবং বাজারে প্রবেশের মতো বিষয় নিয়ে ওয়াশিংটনের অভিযোগের পর চিনা পণ্যের উপর একের পর এক শুল্ক চাপানো হয়েছিল। পাল্টা ব্যবস্থা নেয় বেজিংও। পরবর্তী সময়ে বিরল খনিজের রফতানি নিয়ন্ত্রণ, মার্কিন সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তি সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সংঘাত আরও জটিল হয়। ২০২৫ সালে এই টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পায় এবং দুই দেশ একাধিক দফায় শুল্ক ও পাল্টা শুল্ক আরোপ করে।
২০২৫ সালের শেষ দিকে দুই দেশের মধ্যে একটি বাণিজ্যবিরতি তৈরি হলেও তা স্থায়ী সমাধান ছিল না। ২০২৬ সালের মে মাসে ট্রাম্প ও শি-র আলোচনায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য নতুন সরকারি কাঠামো তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছিল। চিন মার্কিন কৃষিপণ্য কেনার বিষয়ে একাধিক প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল। একই সময়ে বোয়িং বিমান কেনা এবং বিরল খনিজ সরবরাহের মতো বিষয়ও আলোচনায় আসে বলে উল্লেখ। বর্তমান সমঝোতার গুরুত্ব তাই শুধু ৩০০০ কোটি ডলারের পণ্যের শুল্কে সীমাবদ্ধ নয়। দুই দেশের মধ্যে আলোচনার জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হচ্ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বিরল খনিজ, কৃষিপণ্য, জ্বালানি ও উচ্চপ্রযুক্তি সহ একাধিক ক্ষেত্রকে একই আলোচনার পরিসরে আনার চেষ্টা চলছে। তবে এগুলির কতটা বাস্তবে কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে পরবর্তী আলোচনায় দুই দেশ কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেয় তার উপর।
ট্রাম্প-জিনপিং বৈঠকের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, প্রতিদ্বন্দ্বিতা পুরোপুরি শেষ না হলেও যোগাযোগের রাস্তা খোলা রাখা। রয়টার্সের আগের প্রতিবেদনেও দেখা গিয়েছিল, নভেম্বরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বাণিজ্যবিরতি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নতুন সমঝোতার প্রয়োজন রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন বৈঠকে বাণিজ্যিক কাঠামো, প্রযুক্তি সংলাপ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একাধিক বিষয় সামনে আসা তাৎপর্যপূর্ণ। ফলে ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক বৈঠককে শুধু একটি শুল্ক আলোচনার পর্ব হিসেবে দেখলে ছবির অনেকটাই বাদ পড়ে যায়। একদিকে ৩০০০ কোটি ডলারের অ-সংবেদনশীল পণ্যে তুলনামূলক সুবিধাজনক শুল্ক ব্যবস্থার সুপারিশ, অন্য দিকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বোর্ডের কাজ শুরু, বিরল খনিজ সরবরাহ নিয়ে আলোচনা, আমেরিকা থেকে চিনে কয়লা রফতানির পরিকল্পনা এবং ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ নিয়ে নতুন আলোচনা একাধিক স্তরে সম্পর্ককে নতুন কাঠামোয় আনার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক কুটনৈতিক মহল মনে করছে। আমেরিকা ও চিনের দীর্ঘ বাণিজ্য সংঘাতের জায়গা থেকে এই সমঝোতাগুলি স্থায়ী সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটায় কি না, তার উত্তর মিলবে আগামী কয়েক মাসের বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী আলোচনায়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Narendra Modi BRICS bilateral meetings, Modi seven countries meeting | ব্রিক্সের শেষ দিনে মোদীর ম্যারাথন কূটনীতি, সাত দেশের সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্য-প্রতিরক্ষা থেকে মহাকাশে নজর




