সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা/নয়াদিল্লি: বিধানসভা নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত ফলের ধাক্কা কাটতে না কাটতেই নতুন সঙ্কটে জড়াল তৃণমূল কংগ্রেস (TMC)। দলীয় অন্দরে শুরু হওয়া ভাঙনের রেশ এবার সরাসরি ছড়িয়ে পড়ল সংসদীয় রাজনীতিতেও। সোমবারের নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহে লোকসভার মোট ২৮ জন তৃণমূল সাংসদের মধ্যে প্রায় ২০ জনই বিদ্রোহী শিবিরে নাম লেখানোর সিদ্ধান্ত নেন বলে জানা গেছে। এই শিবিরের নেতৃত্বে রয়েছেন বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার (Kakoli Ghosh Dastidar) এবং বীরভূমের সাংসদ শতাব্দী রায় (Satabdi Roy)। একই দিনে রাজ্যসভার সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায় (Sukhendu Sekhar Roy) ও কোয়েল মল্লিক (Koel Mallick) পদত্যাগ করেছেন বলে খবর, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রাজনৈতিক মহলে এই ঘটনাকে বড় মোড়বদল হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিদ্রোহী সাংসদেরা ইতিমধ্যেই লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা (Om Birla) -এর কাছে চিঠি পাঠিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। গত ৩ জুন পরিষদীয় দলে ভাঙনের সূচনা হয়েছিল, আর মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই ভাঙন সংসদীয় স্তরেও ছড়িয়ে পড়ায় তৃণমূলের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। দলীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বিদ্রোহী সাংসদেরা নিজেদের পরবর্তী রণকৌশল ঠিক করেন। এই বৈঠকে কাকলি ও শতাব্দীর পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় (Prasun Banerjee), অসিত মাল (Asit Mal), বাপি হালদার (Bapi Halder), জুন মালিয়া (June Malia), জগদীশচন্দ্র বর্মা বসুনিয়া (Jagadish Chandra Barma Basunia), কালীপদ সোরেন (Kalipada Soren), অরূপ চক্রবর্তী (Arup Chakraborty), পার্থ ভৌমিক (Partha Bhowmick) এবং শর্মিলা সরকার (Sharmila Sarkar)-সহ আরও অনেকে। এ ছাড়া ইউসুফ পাঠান (Yusuf Pathan), রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় (Rachna Banerjee) ও দেব (Dev)-এর নামও বিদ্রোহীদের তালিকায় ঘুরছে বলে রাজনৈতিক অন্দরে চর্চা চলছে। শর্মিলা সরকারের দাবি, ‘২০ জনের বেশি সাংসদ ইতিমধ্যেই আমাদের সঙ্গে এসেছেন।’ এই বক্তব্যে স্পষ্ট যে বিদ্রোহী গোষ্ঠী নিজেদের শক্তি নিয়ে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী। অন্যদিকে, তৃণমূল নেতৃত্ব এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বড় কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি, যদিও পরিস্থিতির দিকে তারা নজর রাখছে।
এই রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসছে,,দলের নাম ও নির্বাচনী প্রতীক ‘জোড়াফুল’ (Twin Flowers) কী প্রতিষ্ঠাতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) -এর হাতছাড়া হতে চলেছে? ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ছেড়ে নিজস্ব দল গড়ার সময় ‘জোড়াফুল’ প্রতীকই ছিল তৃণমূলের পরিচয়ের মূল ভিত্তি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনপ্রতিনিধি যদি বিদ্রোহী শিবিরে চলে যান, তা হলে নির্বাচন কমিশনের কাছে ‘আসল দল’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার লড়াই তৈরি হতে পারে।
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন নজির একাধিকবার দেখা গেছে। ১৯৭৮ সালে কংগ্রেসের ভাঙনের সময় ইন্দিরা গান্ধী (Indira Gandhi) সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন হারানোর ফলে দলীয় প্রতীক হারিয়েছিলেন এবং নতুন করে কংগ্রেস (আই) গঠন করতে হয়েছিল। আবার অন্ধ্রপ্রদেশে ১৯৯৫ সালে চন্দ্রবাবু নাইডু (Chandrababu Naidu) সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কদের সমর্থনে তেলুগু দেশম পার্টি (Telugu Desam Party)-এর নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন। সাম্প্রতিক সময়েও মহারাষ্ট্রে একই ধরনের ঘটনা রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছে। শিবসেনা (Shiv Sena) ভেঙে একনাথ শিন্দে (Eknath Shinde)-এর নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী দলের নাম ও প্রতীক দখল করে নেয়। একইভাবে এনসিপি (NCP)-র ক্ষেত্রেও শরদ পওয়ার (Sharad Pawar)-এর পরিবর্তে অজিত পওয়ার (Ajit Pawar)-এর গোষ্ঠী ‘আসল’ দল হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই নজিরগুলি সামনে রেখে অনেকেই মনে করছেন, তৃণমূলের ক্ষেত্রেও একই পথ অনুসৃত হতে পারে।
রাজনৈতিক সূত্রে আরও জানা যাচ্ছে, বিদ্রোহী সাংসদেরা ভবিষ্যতে বিজেপি (Bharatiya Janata Party)-এর সঙ্গে সমঝোতার পথে হাঁটতে পারেন। ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব (Bhupender Yadav)-এর বাসভবনে বিদ্রোহী শিবিরের বৈঠক হয়েছে বলে খবর। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)-র উপস্থিতিও রাজনৈতিক জল্পনাকে আরও উস্কে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ও আলোচনায় উঠে আসছে। শিবসেনার প্রতীক সংক্রান্ত মামলায় আদালত নির্বাচন কমিশনকে ‘আসল দল’ নির্ধারণের ক্ষমতা দিয়েছিল। সেই আইনি কাঠামো ব্যবহার করে তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদেরাও কমিশনের দ্বারস্থ হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, এই টানাপোড়েনের মাঝেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লিতে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA)-র বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে আসছে, একদিকে জাতীয় স্তরে বিরোধী ঐক্যের প্রচেষ্টা, অন্যদিকে নিজ দলের অন্দরে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ, এই দ্বিমুখী চাপ সামাল দেওয়া এখন তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। পরিস্থিতি যে দ্রুত বদলাচ্ছে, তা পরিষ্কার। দলীয় ভাঙন কোথায় গিয়ে থামবে, এবং ‘জোড়াফুল’ প্রতীক কার দখলে থাকবে, এই প্রশ্নের উত্তরই এখন নজর কেড়েছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Humayun Kabir Offers Rejinagar Seat to Mamata Banerjee, Bengal Political Twist 2026 | শেষ পর্যায়ে মমতার পাশে হুমায়ুন!



