সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: বাংলার দুগ্ধ শিল্পে বড়সড় বিনিয়োগের খবর। হাওড়ার উলুবেড়িয়ায় নতুন উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি করতে চলেছে ঠাকার ডেয়ারি (Thacker Dairy)। সংস্থার পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই প্রকল্পে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে। আগামী এক বছরের মধ্যে নতুন কেন্দ্রটিতে উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। উৎপাদন কেন্দ্রটি চালু হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক হাজারের বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। শুধু রাজ্যের বাজার নয়, নতুন কারখানার উৎপাদন মূলত বিদেশের বাজারে পাঠানোর লক্ষ্যেই তৈরি করা হবে বলে জানা গিয়েছে। বাংলার শিল্প মানচিত্রে হাওড়ার গুরুত্ব দীর্ঘদিনের। কলকাতার সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগ, শিল্পাঞ্চলের বিস্তার এবং বন্দরকেন্দ্রিক পরিকাঠামোর সুবিধার কারণে হাওড়া বিভিন্ন ধরনের উৎপাদন ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। সেই উলুবেড়িয়াতেই এবার দুগ্ধজাত পণ্যের জন্য নতুন উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঠাকার ডেয়ারি। ২৫০ কোটি টাকার এই বিনিয়োগ রাজ্যের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প এবং দুগ্ধ ব্যবসায় নতুন গতি আনতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সংস্থার পরিকল্পনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে রয়েছে রফতানি। অর্থাৎ উলুবেড়িয়ার কারখানায় উৎপাদিত দুধ ও বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্য শুধু পশ্চিমবঙ্গ কিংবা দেশের অন্য রাজ্যে বিক্রির জন্য তৈরি হবে না। আন্তর্জাতিক বাজারেও সেই পণ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। ফলে নতুন কারখানাকে কেন্দ্র করে উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্যাকেজিং, পরিবহণ এবং রফতানির মতো একাধিক ক্ষেত্রে ব্যবসার পরিসর বাড়তে পারে। ঠাকার ডেয়ারি পূর্ব ভারতের দুগ্ধ শিল্পে পরিচিত নাম। দুধের পাশাপাশি দই, ঘি, পনির-সহ একাধিক দুগ্ধজাত পণ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছে সংস্থাটি। উলুবেড়িয়ায় নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাজার সম্প্রসারণের দিকেও এগোতে চাইছে তারা। রফতানিমুখী উৎপাদনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সংস্থার ব্যবসার পরিধি দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বড় আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছতে পারে।
এই প্রকল্পের প্রভাব শুধু কারখানার ভিতরের কর্মসংস্থানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। দুগ্ধ শিল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কৃষক ও দুধ উৎপাদনকারী খামারগুলিও এর সুফল পেতে পারেন। নতুন উৎপাদন কেন্দ্রের জন্য কাঁচামালের প্রয়োজন বাড়লে স্থানীয় ও আশপাশের এলাকার দুধ সংগ্রহের পরিমাণও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষকের কাছ থেকে নিয়মিত দুধ সংগ্রহের ব্যবস্থা তৈরি হলে দুধ বিক্রির জন্য তাঁদের আরও একটি বড় বাজার তৈরি হবে। নিয়মিত সরবরাহ ও ক্রয়ের সুযোগ থাকলে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে। দুধ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত কৃষকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিশ্চিত বাজার। অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় বাজারের চাহিদা, দামের ওঠানামা এবং সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতা দুধ উৎপাদনকারীদের সমস্যায় ফেলে। বড় প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রের সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি হলে সেই সমস্যা কিছুটা কমার সম্ভাবনা থাকে। উলুবেড়িয়ার নতুন কারখানাকে ঘিরে দুধ সংগ্রহের পরিকাঠামো তৈরি হলে হাওড়া এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার পশুপালন ও দুগ্ধ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
কর্মসংস্থানের দিক থেকেও এই প্রকল্পকে ঘিরে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। কারখানায় সরাসরি কর্মী নিয়োগের পাশাপাশি দুধ সংগ্রহ, পরিবহণ, প্যাকেজিং, গুদামজাতকরণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। স্থানীয় যুবক-যুবতীদের একাংশ এই নতুন কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। একটি বড় খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রকে ঘিরে ছোট পরিবহণ সংস্থা, প্যাকেজিং পরিষেবা এবং অন্যান্য সহযোগী ব্যবসার চাহিদাও বাড়তে পারে। উল্লেখ্য যে, পশ্চিমবঙ্গে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগের মধ্যেই ঠাকার ডেয়ারির এই বিনিয়োগের খবর সামনে এসেছে। রাজ্যে শিল্প স্থাপনের জন্য জমি, পরিকাঠামো, বিনিয়োগ সহায়তা এবং বিভিন্ন প্রণোদনার বিষয় নিয়ে সরকারি স্তরে কাজ চলছে। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে বিনিয়োগ বাড়লে গ্রামীণ উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে শিল্পের যোগাযোগও আরও শক্তিশালী হতে পারে।
হাওড়ার উলুবেড়িয়াকে বেছে নেওয়ার পিছনে যোগাযোগ ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। কলকাতা ও সংলগ্ন শিল্পাঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থান, জাতীয় সড়ক ও রেল যোগাযোগ এবং বিভিন্ন বাজারে দ্রুত পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ উৎপাদন কেন্দ্রের জন্য সুবিধাজনক। রফতানির ক্ষেত্রে বন্দর ও পরিবহণ পরিকাঠামোর সঙ্গে সহজ যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে উলুবেড়িয়ায় তৈরি পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানোর পাশাপাশি বিদেশের বাজারে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। রফতানিমুখী উৎপাদন বাড়লে বাংলার খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের জন্য নতুন বাজারের দরজা খুলতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে দুগ্ধজাত পণ্যের চাহিদা থাকলেও সেখানে গুণমান, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মান মেনে উৎপাদনের মতো বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন কারখানায় সেই ধরনের পরিকাঠামো তৈরি হলে সংস্থার পণ্য বিদেশের বাজারে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে দেশের দুগ্ধ শিল্পের সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গেও নতুন উৎপাদন কেন্দ্রটি যুক্ত হবে।
২৫০ কোটি টাকার বিনিয়োগের ফলে উলুবেড়িয়ায় যে শিল্প পরিকাঠামো তৈরি হবে, তার প্রভাব স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। কারখানাকে কেন্দ্র করে দোকান, পরিবহণ, পরিষেবা, খাদ্য সরবরাহ ও অন্যান্য ছোট ব্যবসার চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শিল্পাঞ্চলে নতুন বিনিয়োগ এলে জমি, পরিকাঠামো এবং পরিষেবা ব্যবস্থার ব্যবহারও বাড়ে। ফলে একটি কারখানার বাইরেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ থাকে।
দুগ্ধ শিল্পের সঙ্গে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির সরাসরি যোগ রয়েছে। গরু ও মহিষ পালন, পশুখাদ্য, দুধ সংগ্রহ, ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা, পরিবহণ ও প্রক্রিয়াকরণ একটি বিস্তৃত সরবরাহশৃঙ্খলের মাধ্যমে এই শিল্প পরিচালিত হয়। উলুবেড়িয়ায় নতুন উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি হলে সেই সরবরাহশৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরে কাজের পরিমাণ বাড়তে পারে। স্থানীয় উৎপাদকদের সঙ্গে শিল্প সংস্থার যোগাযোগও বাড়বে। তবে ২৫০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে কারখানা কত দ্রুত চালু হয় এবং উৎপাদন কতটা লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এগোয় তার উপর। আগামী এক বছরের মধ্যে উৎপাদন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়িত হলে পশ্চিমবঙ্গের দুগ্ধ শিল্পে এটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হতে পারে।
বাংলার বাজারে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের চাহিদা দীর্ঘদিনের। তার সঙ্গে যদি রফতানির বাজারও যুক্ত হয়, তাহলে উৎপাদক থেকে কৃষক, দুগ্ধ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত একাধিক স্তরে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। ঠাকার ডেয়ারির উলুবেড়িয়া প্রকল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, কৃষকের বাজার, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্ভাবনাও। আগামী দিনে এই ২৫০ কোটি টাকার প্রকল্প বাংলার দুগ্ধ শিল্পকে কতটা নতুন বাজারের দিকে এগিয়ে দেয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Gujarat dairy sector development, Amul cooperative success | গুজরাটের দুগ্ধ বিপ্লব: প্রতিটি ফোঁটা দুধে বদলাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি, সমৃদ্ধির পথে পশুপালক সমাজ




