মেধা পাল, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ হুগলি: বসন্ত পঞ্চমী মানেই বাংলার ঘরে ঘরে বিদ্যার দেবী সরস্বতীর আরাধনা। শ্বেতপদ্মাসনে বসে থাকা বীণাধারিণী দেবীর ছবিই সাধারণত চোখে ভাসে। কিন্তু বাংলারই এক প্রান্তে আজও পূজিত হন ভিন্ন রূপের সরস্বতী বা নীল সরস্বতী (Neel Saraswati)। হুগলি (Hooghly) জেলার হরিপাল (Haripal) ব্লকের একটি গ্রামে শতাব্দীপ্রাচীন এই পূজার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাধনা, তন্ত্র এবং বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নাম কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (Tarashankar Bandopadhyay)। লোককথা ও বিশ্বাস অনুযায়ী, নীল সরস্বতীর আশীর্বাদেই জন্ম হয়েছিল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সেই বিশ্বাস আজও বহমান হুগলির এই গ্রামে, যেখানে বসন্ত পঞ্চমীর দিন নিষ্ঠা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে পূজিতা হন মা নীল সরস্বতী।
স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, হুগলির হরিপালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সাধক ভৈরব জ্ঞানানন্দ মহেশ্বর (Bhairab Gyanananda Maheshwar)। তিনি তান্ত্রিক সাধনার উদ্দেশ্যে বীরভূমের তারাপীঠে (Tarapith) দীর্ঘদিন তপস্যা করেন এবং সিদ্ধিলাভ করেন বলে বিশ্বাস। সাধনালাভের পর নিজ গ্রাম হরিপালে ফিরে এসে তিনি একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। এই আশ্রমেই প্রথম নীল সরস্বতী পূজার সূচনা হয়। জ্ঞানানন্দ বাবার তিরোধানের পরও তাঁর অনুগামী ও গ্রামবাসীরা আজও একই রীতি মেনে বসন্ত পঞ্চমীর তিথিতে নীল সরস্বতীর আরাধনা করে চলেছেন।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, নীল সরস্বতী মা তারারই একটি বিশেষ রূপ। তাই এই পূজা সাধারণ সরস্বতী পূজার মতো সর্বজনীন নয়। কথিত আছে, একমাত্র সাধক বা তান্ত্রিকরাই নীল সরস্বতীর আরাধনা করতে পারেন। সেই কারণে এই পূজার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গূঢ় সাধনা ও তন্ত্রমন্ত্রের আবহ। নীল সরস্বতী পূজার ইতিহাস শুধু হুগলিতেই সীমাবদ্ধ নয়। জানা যায়, এই পূজার প্রথম প্রচলন হয়েছিল বীরভূমের লাভপুরে (Labhpur)। সেখানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম স্তম্ভ কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর জন্ম তারিখ ১৩০৫ বঙ্গাব্দের ৮ শ্রাবণ। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, তার ঠিক ১০ মাস আগে সতীপীঠ ফুল্লরার (Phullara Shakti Peeth) সাধক ও তান্ত্রিক রামজী গোঁসাইয়ের (Ramji Gosai) পরামর্শে লাভপুরের জমিদার হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায় (Haridas Bandopadhyay) ও তাঁর স্ত্রী প্রভাতী দেবী (Prabhati Devi) সন্তানলাভের আশায় নীল সরস্বতীর পূজা করেছিলেন।
বিশ্বাস করা হয়, মা তারার তথা নীল সরস্বতীর কৃপায় তাঁদের কোল আলো করে জন্ম নেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই কৃতজ্ঞতাতেই ছেলের নাম রাখা হয় ‘তারাশঙ্কর’। এই কাহিনি আজও লাভপুর ও হরিপাল অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে ফেরে এবং নীল সরস্বতী পূজাকে ঘিরে বিশ্বাসের ভিত আরও দৃঢ় করে। নীল সরস্বতীর মূর্তির রূপও সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী। দেবীর গাত্রবর্ণ নীল। সমগ্র দেহ জুড়ে সাপ জড়ানো থাকে। দেবীর পায়ের নীচে অবস্থান করেন জটাধারী শবরূপ মহাদেব। গলায় থাকে মুন্ডমালা, এক হাতে নরমুণ্ড এবং পরনে বাঘছাল। এই রূপে তিনি বিদ্যার দেবী হলেও তাঁর মধ্যে প্রকাশ পায় তন্ত্র ও শক্তির ভয়াল অথচ মাতৃস্নেহময় দিক। পূজার ভোগেও রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। নীল সরস্বতীকে নিবেদন করা হয় খিচুড়ি, লুচি ও সুজি। বসন্ত পঞ্চমীর রাতে গ্রামের প্রায় সমস্ত মানুষ পাত পেড়ে বসে মায়ের প্রসাদ গ্রহণ করেন। এই প্রসাদ গ্রহণ শুধু ধর্মীয় আচার নয়, গ্রামীণ মিলন ও সামাজিক ঐক্যেরও প্রতীক।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, ‘এই পূজা শুধু ধর্মের নয়, আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমরা এই রীতি পালন করে আসছি।’ আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক আচার হারিয়ে গেলেও হুগলির এই গ্রামে আজও অটুট রয়েছে নীল সরস্বতী পূজার ঐতিহ্য।বাংলার সংস্কৃতির বৈচিত্র্য যে কত গভীর, নীল সরস্বতীর এই আরাধনাই তার প্রমাণ। যেখানে বিদ্যা, সাহিত্য, সাধনা ও লোকবিশ্বাস মিলেমিশে এক অনন্য ঐতিহ্যের জন্ম দিয়েছে, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো কিংবদন্তী সাহিত্যিকের নাম।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Sasraya News Sunday’s Literature | Edition 95| 11th January 2026| সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল, ১১ জানুয়ারি ২০২৬| সংখ্যা ৯৫




