Sunday Story By Runa Tasmina : রুনা তাসমিনা-এর গল্প শিশিরের নিঃশব্দ পতন

SHARE:

সাম্প্রতিক সময়ের জনপ্রিয় সাহিত্যিক রুনা তাসমিনা। বাংলাদেশের চট্টগ্রামে থাকেন। ওঁর গল্পের ভাঁজে গল্পের রহস্যময় টান পাঠকের কৌতুহলকে পাঠের অন্দরে টেনে নিয়ে যায়। ওঁর লেখায় পাঠকের প্রাত্যহিক চেনা দৃশ্যগুলিই কখন গল্প হয়ে যায়। সাশ্রয় নিউজ-এর এই রবিবার রইল রুনা তাসমিনা-এর গল্প…

হাঁটুর ওপর মাথা রেখে কাঁদছে বৃষ্টি। ভুলে গেছে সে বসে আছে গলির পাশে সিঁড়িতে। কত মানুষ আসা-যাওয়া করছে এই পথে। শাওনের অসহায় হাত তার পিঠের ওপর। পথচারীদের চোখ পড়লে নার্ভাস হয়ে সরিয়ে নিচ্ছে হাতটি। তার চোখে জল নেই। কিন্তু ওই চাহনিতে ছেয়ে আছে তীব্র কষ্ট। 

কষ্টও যে দেখা যায়, এই প্রথম বুঝলাম। বুঝলেন স্যার? সাথী ডেস্ক গোছাতে গোছাতে কথাগুলো বলছিল। 

মেয়েটিকে ওভাবে রাস্তায় কাঁদতে দিয়ে চলে এলেন! মিদুল স্যার আশ্চর্য হয়ে গেলেন। 

তো? কী করব? 

ওকে বাসায় পাঠিয়ে দিতেন। 

আশ্চর্য! আমি কী ওর বাসা চিনি? কী যে বলেন না স্যার! সাথী খুঁজে পাচ্ছে না স্যারের অবাক হওয়ার কারণ।

আপনি বললেন না, বৃষ্টি কাঁদছে। আপনি নাম জানলেন কী করে! চেনাজানা নিশ্চয়। 

সাথী এবার হেসে দিল। হাত দুটো বুকের কাছে ভাঁজ করে যেন প্রস্তুতি নিল। বলল,নামগুলো আমার দেয়া। আমি ওদের একজনকেও চিনি না। এবার ক্লিয়ার স্যার? 

একেবারে ক্রিস্টাল ক্লিয়ার। মৃদুল স্যারও হাসছেন। আপনারা শুধু লেখার প্লট খোঁজেন। আমি তো বলব,  হাঁটতে হাঁটতে গল্প উপন্যাস দেখেন। 

শুধু দেখি না স্যার, উপলব্ধিও করি। কিন্তু আমি জানি ওদের কিছু বলা যাবে না। কারণ ওদের ইগো। ওরা মাত্রাতিরিক্ত আত্ম-অহংকারী। নিজেরা যা বুঝবে তার বাইরে আপনি বুঝাতে যাবেন তো খবর আছে। 

এই যে কথাগুলো বললেন, এগুলো কি আপনার গল্পে লিখবেন? স্যার হাসছেন। 

না। এসব লেখা যাবে না। তখন আমার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগবে সব। সাথী আবার কাজে মন দিয়েছে। 

কী বলেন! জেনে-বুঝেও ওদের ভুলটা দেখিয়ে দেবেন না? লিখবেন না? 

মৃদুল স্যারের প্রশ্নগুলো সাথী চুপচাপ শুনলো। ঘড়িতে সময়টা দেখে নিয়ে বলল, চলেন স্যার। ছুটির সময় শুরু হল। দু’দিন একেবারে ঝক্কি ছাড়া কাটানো যাবে। 

হাতের কাজটা শেষ করতে আরও যে সময় লাগবে। আপনি তাড়াতাড়ি বাসায় যান। ছুটির দিনগুলো আমাদের মতো ম্যাংগো পিপলের ম্যাডাম। আপনি তো সভা-সমিতি নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন। 

খোঁচাটা নীরবে হজম করল সাথী। ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বেরিয়ে এল টিচার্স রুম থেকে। লেখালেখি শুরু করার পর থেকে কলিগদের এরকম খোঁচা খায়। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে অনেকটা। অথচ সময়কে কিছুটা পেছনে ঠেলে দিলে দেখা যাবে, এই কলিগরাই কত আপন ছিলো! পত্রিকায় দু’একটা লেখা বের হতে না হতেই কেমন বদলে গেল ওদের কথাবার্তার ভঙ্গী।  এরপর সময় যত গড়িয়েছে দুরত্বটা আলগোছে বসে গেছে। অথচ মনে হবে কোথাও কিছু হয়নি! মানুষ কত দ্রুত বদলে যেতে পারে! কথাটা মনে আসতে হাসি পেল। বুদ্ধিজীবী বুদ্ধিজীবী টাইপ ভাবনায় নিজের ওপর নিজেই যেন হাসল সাথী। 

____________
ছোট ভাইটা মাঝে মাঝে স্কুল থেকেএসে জানতে চাইত, আপু ধর্ষণ কী রে? মেজ আপুকে নাকি কারা ধর্ষণ করেছে? প্রশ্ন করতে করতে একদিন সে নিজেই শিখে যাবে ধর্ষণ মানে কী! 
____________

বিষ্যুদবার সকালটা অন্য দিনের চাইতে একটু বেশি ঝকঝক করে। বাসার পাশের মেহগনি গাছের পাতাগুলোয় বসন্ত যেনো হাসে। সকালের রোদে কিশোর পাতাগুলো আরও দুরন্ত হয়ে ওঠে বাতাসের সঙ্গে। এত সুন্দর করে চিকচিক করে বাতাসে দোলে! চোখ ফেরানো যায় না সহজে। কিন্তু ওদিকে তাকিয়ে তো আর জীবন চলে না। পৃথিবীর রূপ দেখে যদি পেট ভরে যেত, তাহলে মানুষ শুধু তাতেই মজে থাকত। দূর! কী সব উল্টো পাল্টা চিন্তা যে আজ মাথায় ঘুরছে! স্কুল থেকে অল্প এগুলেই গলির মুখ। এখানে আসলে বদলে যায় গম্ভীর পরিবেশ। শবজি, মাছ, লেবু, পেঁয়াজ রসুনের ভ্যানে চলে ক্রয়-বিক্রয়। চলে ক্রেতা-বিক্রেতার বাক বিতণ্ডা। এগুলো প্রতিদিনের দেখা ছবি। মাঝে মাঝে সাথী নিজেও অন্য কারোর চোখে এই ছবির অংশ হয়। চেরাগির পাশ ধরে নেমে আসে সাথী। পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষের মুখে কত গল্প! জায়গা জমির দখল নিয়ে ক্ষমতার দাপট, রিক্সাওয়ালার সঙ্গে তিনজন যুবকের কথা কাটাকাটি, কারের ড্রাইভারের সঙ্গে সিএনজি ড্রাইভারের ঝগড়া এসব পাশ কাটিয়ে সামনে এগোয়। পট্ করে মৃদু একটা শব্দ তুলে ছিঁড়ে গেল স্যান্ডেলটা। খাস্তগীর স্কুলের সামনে সারি সারি ভ্যান। এখানে অন্যরকম জিনিসপত্র। কাপড়-চোপড়, জুতো-স্যান্ডেল, কসমেটিক কী নেই! সেদিন মহিমা ম্যাডাম বলছিলেন, কেউ কোনও দাওয়াতে যেতে চাইলে বাসায় যাওয়ার দরকার নেই। শুধু একটা চেঞ্জ রুম থাকলেই হয়। সাজগোছ, কাপড় চোপড়, জুতো স্যান্ডেল যা ইচ্ছে কিনে নিয়ে পরে চলে যাও। 

সঙ্গে সঙ্গে তরু ম্যাডাম বললেন, ভ্যানিটি ব্যাগও কিন্তু আছে! শুনে সবার সঙ্গে হেসেছে সাথীও। কিন্তু মনে মনে বলেছে, এই ফুটপাতটা আছে বলে আমাদের মতো স্বল্প আয়ের মানুষরা ভদ্র সমাজে ভদ্র হয়ে চলতে পারে।

মাসের শেষে এভাবে স্যান্ডেল ছিড়ে যাওয়ায় সাথীর হিসেবটাকেই যেন ছিড়ে ছিড়ে ফেলল। ভ্যান ভর্তি নানা ডিজাইনের জুতো-স্যান্ডেল। তবুও ওদিকে যাওয়া হয় না। অবস্থাটা সাগরের মাঝখানে তৃষ্ণায় মরে যাওয়ার মতো। চারদিকে পানি। কিন্তু খাওয়ার উপায় নেই! এই মুহুর্তে সুসজ্জিত ভ্যানগুলো মনে হচ্ছে এক একটি মঞ্চ। চমৎকার, আকর্ষণীয়। কিন্তু নাগাল পাওয়া সবার ভাগ্যে হয় না। শুধুমাত্র বড়দের জন্যে সাজে মঞ্চ। 

 

____________
মাসখানেক পর একদিন সন্ধ্যায় প্রীতি ঘরে এল ঝড়ো কাকের মতো। ওরা নাকি ঘুরতে গিয়েছিল। সেই ছেলের বন্ধুরা মিলে প্রীতিকে ধর্ষণ করেছে। বোনের  গলা জড়িয়ে ধরে সেদিন খুব কেঁদেছিল প্রীতি। বলেছিল, আপু, তুই আমাকে আরও কড়া শাসন করলি না কেন? কেন আমাকে ঘরে বেঁধে রাখিস নি? আমি তো ঘর ভেঙ্গে যেতে পারতাম না বাইরে! সাথীর মুখে কোন কথা ছিলো না। বোনের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে ভাবছিলো, ভোরটা কেমন ভয়ংকর হবে। প্রতিটা আঙুল এই ঘরের দিকে বন্দুকের মতো তাক করা থাকবে। কথা আসবে গুলির মতো।
____________

 

জামালখান মোড়ে এসে একটা পাকা বেঞ্চিতে বসে পড়ে। একটা কাগজ মুড়িয়ে নেয় স্যান্ডেল দুটো। দাঁড়িয়ে শাড়িটা টেনে আরেকটু নিচে নামিয়ে দেয়। যাতে খালি পা দুটি দেখা যা যায়।আবার শুরু করে হাঁটা। গীর্জা স্কুল পেরুলেই মনীষীদের বাণী। দৈনিক আজাদী একটি ভাল কাজ করেছে। কিন্তু এসব নীতিকথা এখন এভাবে দেয়ালেই সাঁটা হয়ে থাকে। মিসকিন শাহের মাঝারের নিচে লাইন করে বসে আছে এক ডজনেরও বেশি ভিক্ষুক। ওদের ভয়ে কুকুরগুলো আশ্রয় নিয়েছে রাস্তার ঠিক ওপাশে। পায়ের ওপর মাথা রেখে ওরাও আছে কিছুর অপেক্ষায়। দু’পাশে দুই রকম চাহিদার অপেক্ষাকে উপেক্ষা করে সাথীর গন্তব্য এখন শুধু ঘর। 

শুক্রবারের পত্রিকাটিতে একটু চোখ না বুলালে হয় না। প্রতিবেশী কাছ থেকে প্রতি শুক্রবার কিছুক্ষণের জন্যে ধার নেয় পত্রিকাটি। আজও নিয়ে এসেছে। প্রথম পাতায় ছোট্ট একটি সংবাদ। প্রেমিকের সঙ্গে অভিমান করে তরুণীর আত্মহত্যা। সংবাদটি দেখে সঙ্গে আশ্চর্য হল না সাথী। এই টিনএজ মেয়েগুলো কী যে বুঝে! ওরাই জানে। গত বছর এমন একটি শিরোনামের অংশ হয়েছিল প্রীতি। সাথীর একমাত্র ছোট বোন। পাড়ার বড়লোকের বখাটে এক ছেলের খপ্পরে পড়েছিল। সে বলত প্রেম হয়েছে। কিন্তু সাথী বুঝত ওই ছেলের চোখে প্রেম ছিল না। ছিল লোভ। বোনকে শত নিষেধ করেও সাথী ফেরাতে পারেনি। উল্টো রাগ করে প্রশ্ন ছুঁড়তো তীরের ফলার মতো। 

তোর জীবনে প্রেম আসেনি বলে আমাকে দেখে হিংসে হয়? তোর মাস্টারি নিয়ে তুই থাক। আমাকে শেখাতে আসিস না। 

প্রীতির কথার প্রতিটি শব্দ বুকের মাঝখানটায় গেঁথে যেত। ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দিতো হৃদপিণ্ড। আর মা! মা নিত প্রীতির পক্ষ। মায়ের কথা আরও তীক্ষ্ণ।

বাঁজা বলে জামাইর ঘর থেকে বিদেয় হলি বছর ঘোরার আগে। তুই আবার কোন আক্কেলে ওকে শাঁসাতে যাস? 

সাথী বুঝত অভাবের ঘরে বড়লোক জামাইয়ের লোভ মায়ের মনেও আছে। সেদিন থেকে প্রীতিকে আর কিছু বলেনি সাথী। 

মাসখানেক পর একদিন সন্ধ্যায় প্রীতি ঘরে এল ঝড়ো কাকের মতো। ওরা নাকি ঘুরতে গিয়েছিল। সেই ছেলের বন্ধুরা মিলে প্রীতিকে ধর্ষণ করেছে। বোনের  গলা জড়িয়ে ধরে সেদিন খুব কেঁদে ছিল প্রীতি। বলেছিল, 

আপু, তুই আমাকে আরও কড়া শাসন করলি না কেন? কেন আমাকে ঘরে বেঁধে রাখিসনি? আমি তো ঘর ভেঙে যেতে পারতাম না বাইরে! সাথীর মুখে কোনও কথা ছিল না। বোনের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে ভাবছিল, ভোরটা কেমন ভয়ঙ্কর হবে। প্রতিটা আঙুল এই ঘরের দিকে বন্দুকের মতো তাক করা থাকবে। কথা আসবে গুলির মতো। এই পাড়ায় আর থাকা হবে কিনা! স্কুলে যা বেতন পায় তা দিয়ে পাড়ার এই ছোট্ট ঘর চালাতে হিমসিম খেতে হয়। অন্য কোথাও এত কম ভাড়ায় ঘর জুটবে? অল্প আয়ের মানুষদের প্রতি পদে পদে পাপ। যে দোষ করল সে পার পেয়ে যাবে অনায়াসে। বিচার হবে তাদের। প্রতিদিন। প্রতিপদে। কিন্তু প্রীতি সে সময় কাউকে দিল না। সেদিন রাতেই ফ্যানের সঙ্গে ওড়না লাগিয়ে ঝুলে পড়েছিল। খবর শুনে বিলাপ করতে করতে মা ছুটে এসেছিল বাড়ি থেকে। মনে করেছিল দুই বোনের ঝগড়া। পরে যখন সব জানল সেই যে চুপ হল আজও আর কথা বলেনি। ছোট ভাইটা মাঝে মাঝে স্কুল থেকে এসে জানতে চাইত, 

আপু ধর্ষণ কী রে? মেজ আপুকে নাকি কারা ধর্ষণ করেছে? সাথী কোনও উত্তর দিতে পারত না। প্রশ্ন করতে করতে একদিন সে নিজেই শিখে যাবে ধর্ষণ মানে কী! 

পত্রিকাটি হাতে নিয়ে ভাবতে থাকে সাথী। যে মেয়েটি মরল সে কী গতকালের সেই মেয়েটি? প্রেম মানে কি শুধুই মৃত্যু! কলিগুলো ফুল হয়ে ওঠার আগেই ঝরে যাওয়া! ঘরের এই কান্না ঘরে রেখেই রবিবার আবার স্কুলে যেতে হবে। মৃদুল স্যারের খোঁচানো কথার উত্তরে হাসিমুখে বলতে হবে, 

স্যার, ঘণ্টা পড়ল। ক্লাস আছে এই পিরিয়ডে।

অঙ্কন : প্রীতি দেব 

[সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্বরচিত স্থানীয় সংবাদ, ফিচার, গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনী… 

ই-মেল : sasrayanews@gmail.com ]

 

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment