Socrates : স্ত্রী-সচেতন সক্রেটিস: সংসার, সমাজ ও দর্শনের টানাপোড়েন
সূর্য মিত্র ★ সাশ্রয় নিউজ : দার্শনিক বলতে আমরা যাঁদের কল্পনা করি, একটি দূরের শূন্যে তাকিয়ে থাকা এক নিঃসঙ্গ, বিমুখ মানুষ। কিন্তু কালজয়ী গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস (Socrates) ছিলেন বাস্তবজীবনের ঘনিষ্ঠ একজন মানুষ। তিনি ঘর করেছেন। সন্তান মানুষ করেছেন, এবং ঘরের ভিতর থেকেও গোটা পৃথিবীর চিন্তাধারাকে নাড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, বিশেষত স্ত্রী খান্তিপ্পে (Xanthippe)-এর সঙ্গে সম্পর্ক এবং তৎকালীন এথেন্সের (Athens) সমাজব্যবস্থার প্রেক্ষাপট আজও আলোচনার বিষয়।
সক্রেটিসের বিয়ে ও পারিবারিক জীবন ছিল তাঁর দর্শনের মতোই জটিল, প্রশ্নবিদ্ধ এবং গভীর এক রসায়নে ভরা। স্ত্রী খান্তিপ্পে সম্পর্কে নানা রকম কিংবদন্তী চালু আছে। ইতিহাস তাঁকে চিত্রিত করেছে একজন রাগী, অসন্তুষ্ট এবং খ্যাপাটে নারী হিসেসে। খান্তিপ্পে প্রায়শই সক্রেটিসের সঙ্গে উচ্চস্বরে ঝগড়া করতেন। অনেক লেখকই খান্তিপ্পেকে সক্রেটিসের চিন্তাচর্চায় এক প্রকার অন্তরায় হিসেবেই বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এই প্রতিকূল দাম্পত্য সম্পর্কই সম্ভবত সক্রেটিসের সহিষ্ণুতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মানবপ্রকৃতি নিয়ে ভাবনার অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছিল।
তবে সক্রেটিস (Socrates) স্ত্রীকে উপেক্ষা করতেন এমন নয়। প্লেটো (Plato) বা জেনোফন (Xenophon)-এর লেখায় দেখা যায়, তিনি সংসার পালনের দায় এড়িয়ে যাননি। তিনি তিন সন্তানের পিতা ছিলেন। এবং তাঁদের জীবনযাপন, শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে সচেতন ছিলেন। কিন্তু জীবিকা অর্জনের প্রচলিত পথে তিনি আগ্রহী ছিলেন না। তাই সংসারের আর্থিক দিকটি বরাবরই দুর্বল ছিল। খান্তিপ্পে এ নিয়েই ছিলেন অতিষ্ঠ। কারণ সক্রেটিস সমাজের প্রচলিত পেশা ব্যবসা বা রাজনীতি বর্জন করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতেন, আলোচনায় মাততেন এবং জনসাধারণকে আত্মজিজ্ঞাসায় উদ্বুদ্ধ করতেন।
তৎকালীন এথেন্স ছিল এক বর্ণময় নগর। গণতন্ত্রের সূচনাপর্ব, দার্শনিক জাগরণ ও সাংস্কৃতিক উত্তরণের কেন্দ্র। কিন্তু এর মধ্যেই সমাজে এক গভীর দ্বিধা ছিল। একদিকে আর্থিক সচ্ছলতা ও বিলাসিতা, অন্যদিকে বুদ্ধিজীবীদের প্রতি সন্দেহ ও অবিশ্বাস। সক্রেটিস এই দ্বৈত সমাজের মধ্যেই দাঁড়িয়ে এক বিপ্লবী দর্শন গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে তিনি বলতেন, “আমি জানি, আমি কিছুই জানি না।” আত্মজিজ্ঞাসা, যুক্তির সন্ধান এবং নৈতিক বোধকে তিনি মানুষের শ্রেষ্ঠ গুণ বলে মনে করতেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনেকের জন্যই ছিল হুমকিস্বরূপ। বিশেষত যখন সক্রেটিস যুব সমাজকে প্রশ্ন করতে শেখালেন, তখন প্রাচীন প্রথার রক্ষকরা তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খোলেন। তাঁর বিরুদ্ধে আনা হল ঈশ্বর-অবিশ্বাস ও যুব সমাজকে বিপথে পরিচালনার অভিযোগ। বিচারে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। যেখানে সক্রেটিস সম্মানের সঙ্গে বিষ পান করলেন, রাষ্ট্রদণ্ডকে অবজ্ঞা করলেন না।
এই সময়ে তাঁর স্ত্রীর অবস্থান একটি মানবিক দিক উন্মোচিত করে। সক্রেটিসের মৃত্যুর আগের দিন খান্তিপ্পে তাঁর সঙ্গে শেষ দেখা করতে এসে কেঁদে ফেলেছিলেন, বলেছিলেন, “তোমাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হচ্ছে।” সক্রেটিস তখনও ছিলেন স্থিতধী, স্ত্রীর চোখ মুছে দিয়ে বলেছিলেন, “তুমি চাইতে পারতে, আমাকে ন্যায়ভাবে হত্যা করুক।” সক্রেটিসের জীবন আমাদের দেখায়, ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন, সংসারের বাস্তবতা এবং বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে একটি চিন্তাশীল মানুষের দ্বন্দ্ব কীভাবে দর্শন ও ইতিহাসকে গড়তে পারে। খান্তিপ্পে হয়ত ইতিহাসে খ্যাতি পাননি সক্রেটিসের মতো। কিন্তু এই দার্শনিকের জীবনে তাঁর অবস্থান অস্বীকার করার উপায় নেই। তিনি ছিলেন সক্রেটিসের জিজ্ঞাসার বিপরীত মেরু। যার সঙ্গে সংঘর্ষেই বোধহয় জন্ম নিয়েছিল নতুন জিজ্ঞাসার, নতুন দৃষ্টিভঙ্গির। অর্থাৎ, সক্রেটিস শুধু সমাজ বা নৈতিকতা নিয়ে ভাবেননি। তিনি সংসারের কাঁটাতার ছুঁয়েই সেই চিন্তার স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়েছেন। এবং ঠিক এইখানেই সক্রেটিসের জীবন আমাদের করে তোলে আরও মানবিক, আরও জটিল, আরও সত্য।
-কাল্পনিক চিত্র
আরও পড়ুন : Sasraya News Sunday’s Literature Special | 1st June 2025, Issue 67 | সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল | ১ জুন ২০২৫, রবিবার। সংখ্যা ৬৮




