সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বিশ্বের নানা প্রান্তে আজকের দিনে তথ্য ও যোগাযোগের অন্যতম বড় হাতিয়ার হল, সোশ্যাল মিডিয়া। কিন্তু কয়েকটি দেশে এই মাধ্যমকে ব্যবহারকারীদের হাত থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে একেবারে আইন করে। কোথাও রাজনৈতিক কারণে, কোথাও ভুয়ো খবর রুখতে আবার কোথাও সেনা শাসনের চাপে, অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ। সম্প্রতি নেপালে সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ হওয়ার পর ফের সামনে এসেছে এই বিতর্ক। এবার দেখা যাক কোন কোন দেশে সোশ্যাল মিডিয়ার ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ডুবে গিয়েছে।
নেপালে গত বছর এক ঝটকায় বন্ধ হয়ে যায় জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলি। তার ফলস্বরূপ নেপালের রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে শুরু করে সাধারণ মানুষ। প্রতিবাদের তীব্রতায় পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি (K.P. Sharma Oli)। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যান হওয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে নেপালের তরুণ প্রজন্ম ও পর্যটন খাতে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, “ট্রাভেল ব্লগার, গাইড, হোটেল মালিক কিংবা হোমস্টে ব্যবসায়ী, প্রায় সবাই সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর নির্ভর করতেন। হঠাৎ করে সেটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপার্জনের রাস্তা কার্যত থমকে গিয়েছিল।”
মায়ানমার (Myanmar)-এর চিত্রও ভিন্ন নয়। ২০২১ সালে দেশটিতে সেনা শাসন জারি হওয়ার পর সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয় ফেসবুক, টুইটার (এখন এক্স) ও হোয়াটসঅ্যাপ। সামরিক সরকারের বক্তব্য ছিল, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ভুয়ো খবর ও গুজব ছড়িয়ে পড়ছিল, যা দেশের নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর। তবে সাধারণ মানুষের মতে, প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল বিরোধীদের কণ্ঠ রোধ করা।২০০৯ সালে ইরান (Iran) -এ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর শুরু হয় তীব্র বিক্ষোভ। তখনকার সরকার প্রথমে ব্যান করে দেয় টুইটার। পরবর্তীকালে জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ইন্সটাগ্রামও বন্ধ করে দেওয়া হয়। ইরানের তরুণ সমাজ তখনও এই নিষেধাজ্ঞাকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছিল। এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের কথায়, “আমাদের কণ্ঠস্বরকে চাপা দিতেই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যান করা হয়েছে। সরকারের ভয় ছিল আমাদের একতার শক্তি।”
চিন (China)-এর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, টুইটার বা ইউটিউব দীর্ঘদিন ধরেই নিষিদ্ধ। তবে চিন সরকার বিকল্প হিসেবে তৈরি করেছে নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম। যেমন, ফেসবুকের জায়গায় উইচ্যাট (WeChat), টুইটারের জায়গায় উইবো (Weibo), আর ইউটিউবের জায়গায় ইউকু (Youku)। সরকার নিয়ন্ত্রিত এই সোশ্যাল মিডিয়া সাইটগুলিই এখন চিনের মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চিনের এই “ডিজিটাল ওয়াল” আসলে নাগরিকদের উপর রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার এক পরিকল্পিত কৌশল।
উত্তর কোরিয়াতে (North Korea) তো সাধারণ মানুষের জন্য ইন্টারনেটই কার্যত নিষিদ্ধ। ফলে সেখানে ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করার কোনো সুযোগই নেই। ২০১১ সাল থেকে সিরিয়াতেও (Syria) বন্ধ সোশ্যাল মিডিয়া, যাতে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও ছড়িয়ে না পড়ে।
রাশিয়াও (Russia) সম্প্রতি এই তালিকায় নাম লিখিয়েছে। সেখানে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রাম দু’টোই নিষিদ্ধ। এর পেছনে সরকারের দাবি ছিল, এগুলি “চরমপন্থী সংগঠনের” মতো কাজ করছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, আসল কারণ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও পশ্চিমা প্রভাব থেকে দূরে থাকা।
ভারতও (India) এই দিক থেকে পিছিয়ে নেই। ২০২০ সাল থেকেই এখানে নিষিদ্ধ জনপ্রিয় অ্যাপ টিকটক (TikTok)। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই এই পদক্ষেপ। এরপর থেকেই ভারতীয় তরুণ প্রজন্ম মুশকিলে পড়ে। কারণ, অসংখ্য ক্রিয়েটর ও ছোট ব্যবসায়ী তাদের আয় ও প্রচারের জন্য নির্ভর করতেন টিকটকের ওপর।
বিশ্বজুড়ে সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধকরণের ঘটনা একেবারেই নতুন নয়। তবে এর প্রভাব সব দেশে সমান নয়। নেপালের মতো পর্যটন-নির্ভর অর্থনীতিতে এর অভিঘাত ভয়াবহ হতে পারে। আবার চিনের মতো দেশে সরকার বিকল্প প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখলেও নাগরিক স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, “সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করে সাময়িকভাবে সমস্যার সমাধান করা গেলেও, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক ক্ষতির আকারেই ফিরে আসে।” অতএব, বিশ্বব্যাপী সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধকরণের এই প্রবণতা আমাদের ভাবতে বাধ্য করছে, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে নাগরিক স্বাধীনতার সীমারেখা কোথায় টানা উচিত? একদিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, অন্যদিকে মানুষের কণ্ঠস্বর, এই দ্বন্দ্বে সোশ্যাল মিডিয়ার ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত।
-প্রতীকী চিত্র
আরও পড়ুন : Mobile Recharge Cost in India | মোবাইল রিচার্জের বাড়তি চাপ: সংকটে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবার, জরুরি পদক্ষেপের দাবি




