সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : আলিপুরদুয়ারে রাজনৈতিক ময়দান যেন আবারও গরম হয়ে উঠেছে। সদ্য শুরু হওয়া ‘স্বরাষ্ট্র উদ্যোগ র্যালি’ (SIR) কর্মসূচির আবহেই চাঞ্চল্যকর দলবদলের ঘটনা ঘটেছে জেলায়। জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের সহ-সভাপতি শ্যামল নাথ (Shyamal Nath) বৃহস্পতিবার ফের বিজেপিতে (BJP) যোগ করেন। তিনি একসময় বিজেপির সক্রিয় কর্মী ছিলেন। পরে তৃণমূল কংগ্রেসে (TMC) যোগ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন। কিন্তু এবার ফের পুরনো ঘরে ফিরে গিয়ে পদ্ম পতাকা হাতে তুলে নিলেন। এই ঘটনার পরেই জেলা রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে আলিপুরদুয়ার জেলা বিজেপি কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শ্যামল নাথকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান জেলা বিজেপির সভাপতি মিঠু দাস (Mithu Das)। এদিন তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা ও কর্মী বিজেপিতে যোগ দেন। দলের তরফে সবাইকে ফুল ও পতাকা দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়। শ্যামল নাথ মূলত রাজ্যের নাথ ও যোগী সম্প্রদায়ের একজন জনপ্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি এই সম্প্রদায়ের সংগঠনমূলক কাজে যুক্ত। তৃণমূলে থাকার সময়েও তিনি উত্তর-পূর্ব ভারতের ত্রিপুরা (Tripura) ও আসাম (Assam) সহ একাধিক রাজ্যে নাথ সম্প্রদায়ের সংগঠনের দায়িত্বে ছিলেন। পাশাপাশি, তিনি আলিপুরদুয়ার কলেজ হল্ট ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক হিসেবে সামাজিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন। ফলে, তাঁর দলবদলকে ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিতে প্রবল আলোড়ন তৈরি হয়েছে।বিজেপিতে যোগ দিয়ে শ্যামল নাথ বলেন, “আমি একজন সনাতনি হিন্দু মানুষ। যাঁরা এক বিশেষ সম্প্রদায়কে খুশি করার জন্য সব কাজ চালান, তাঁদের সঙ্গে থাকা সম্ভব নয়। পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশ বা পাকিস্তান বানানোর চেষ্টা চলছে। আমি সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হতে চাই না। তাই বিজেপিতেই ফিরে এলাম।” তিনি আরও যোগ করেন, “আমার কোনও ব্যক্তিগত বিরোধ নেই। তবে আদর্শের প্রশ্নে আপস করা যায় না। বিজেপিই এখন একমাত্র দল, যারা ভারতের সংস্কৃতি ও সনাতন মূল্যবোধ রক্ষা করছে।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, নাথ সম্প্রদায়ের মধ্যে শ্যামল নাথের প্রভাব যথেষ্ট গভীর। সেই কারণে তাঁর দলবদল বিজেপির সংগঠনকে উত্তরবঙ্গের এই এলাকায় আরও শক্তিশালী করে তুলবে। অন্যদিকে, তৃণমূল শিবিরে এই ঘটনায় কিছুটা অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। কারণ, সম্প্রতি আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়ি জেলায় নাথ সম্প্রদায়ের ভোটব্যাঙ্ক নিয়ে দুই দলের মধ্যে টানাপড়েন বাড়ছিল।
দলবদলের পর বিজেপির জেলা সভাপতি মিঠু দাস বলেন, “শ্যামলবাবুর মতো একজন সংগঠিত ও প্রভাবশালী নেতার যোগদান আমাদের দলের জন্য বড় প্রাপ্তি। আজ তাঁর সঙ্গে আরও ১৫ জন তৃণমূলের পদাধিকারি ও সক্রিয় কর্মী বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। মোদিজির (Narendra Modi) হাত আরও শক্তিশালী হলো।” তিনি আরও বলেন, “তৃণমূল এখন শুধু দুর্নীতি আর হিংসার প্রতীক। সাধারণ মানুষ বিরক্ত হয়ে বিকল্প হিসেবে বিজেপির দিকেই আসছেন।” রাজনৈতিক মহলে জল্পনা, এই দলবদল কেবল ব্যক্তিগত নয়, এর মধ্যে ভবিষ্যৎ নির্বাচনের প্রস্তুতির ইঙ্গিতও রয়েছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের জেলার রাজনৈতিক মানচিত্রে বিজেপি যে আবার সক্রিয়ভাবে সংগঠন গড়ে তুলছে, তা স্পষ্ট। তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও কিছু সম্প্রদায়ের অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি রাজ্যজুড়ে ‘ঘর ফিরে আসার’ প্রচার শুরু করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অরুণ মণ্ডল মনে করেন, “শ্যামল নাথের মতো নেতার প্রত্যাবর্তন বিজেপির সংগঠনে আত্মবিশ্বাস বাড়াবে। নাথ ও যোগী সম্প্রদায় রাজ্যের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে যথেষ্ট প্রভাবশালী। এই পদক্ষেপ কংগ্রেস ও তৃণমূল উভয় দলের জন্যই সতর্কবার্তা।” অন্যদিকে তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্ব অবশ্য এই দলবদলকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে নারাজ। তাঁদের মতে, “নাথ সাহেব আগে বিজেপিতে ছিলেন, পরে আমাদের দলে আসেন, আবার চলে গেলেন, এতে কোনও ক্ষতি হবে না। তৃণমূলের সংগঠন মজবুত এবং মানুষ এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) সঙ্গেই আছেন।” তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে, আলিপুরদুয়ারের মতো সংবেদনশীল এলাকায় এই ধরনের দলবদল শুধু প্রতীকী নয়, ভোটের অঙ্ককেও প্রভাবিত করতে পারে। কারণ উত্তরবঙ্গে নাথ, রাজবংশী এবং সাঁওতাল ভোটব্যাঙ্ক বরাবরই নির্বাচনী ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শ্যামল নাথের দলবদল ঘটেছে এমন এক সময়, যখন রাজ্যজুড়ে তৃণমূলের নতুন কর্মসূচি ‘SIR’ (Strengthen in Roots) শুরু হয়েছে। কংগ্রেস এবং বিজেপি, দু’দলই মনে করছে, তৃণমূলের এই প্রোগ্রাম আসলে সংগঠন ধরে রাখার চেষ্টা। আর এই সময়েই তৃণমূলের সহ-সভাপতির মতো নেতার দলত্যাগ নিঃসন্দেহে দলটির ভাবমূর্তিতে ধাক্কা দেবে।রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, “বিজেপি উত্তরবঙ্গে নিজেদের হারানো জমি পুনরুদ্ধার করতে চাইছে। সেই পরিকল্পনায় শ্যামল নাথের মতো নেতার প্রত্যাবর্তন তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ।” ফলে স্পষ্ট, আলিপুরদুয়ারের রাজনীতি আবার উত্তপ্ত হতে চলেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Amit Shah Bengal 2026 | ২০২৬-এ বাংলার মুখ কে? স্পষ্ট বার্তা দিলেন অমিত শাহ, আত্মবিশ্বাসী বিজেপি




