বিশেষ সংবাদদাতা, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ ঢাকা : বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফের তীব্র অস্থিরতা। দীর্ঘ ৩৯৭ দিনের বিচার-প্রক্রিয়া শেষে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল সোমবার দেশটির প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) -এর বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ে তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে। বহু বিতর্কের জেরে রায়টি ঘোষণা হওয়ার আগেই দেশজোড়া উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। আর রায় প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই তা যেন বিস্ফোরণের রূপ নিল।দেশান্তরী প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, এ রায় ‘‘সম্পূর্ণ পক্ষপাতদুষ্ট’’ এবং ‘‘রাজনৈতিক প্রতিশোধপরায়ণতার সর্বশেষ উদাহরণ’’। এর প্রতিবাদে মঙ্গলবার সকাল-সন্ধ্যা শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ।
প্রবাস থেকে পাঠানো লিখিত বিবৃতিতে শেখ হাসিনা দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কোনও বাস্তবসম্মত ভিত্তি নেই। তাঁর ভাষায়, “আমার সরকার মানবাধিকার উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন ও রাষ্ট্রীয় অগ্রগতির জন্য অসংখ্য কাজ করেছে। সেই কাজই আজ বিকৃত ও অপব্যাখ্যায় পরিণত হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, তাঁর বিচারটি পরিচালিত হয়েছে একটি ‘‘অনির্বাচিত সরকারের ছায়াতলে কাজ করা অবৈধ ট্রাইবুনালে’’ যার লক্ষ্য কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা। হাসিনার অভিযোগ, গত বছরের জুলাই-আগস্টে দেশের অস্থিরতার সময় বহু মানুষের মৃত্যুতে তিনি গভীরভাবে দুঃখিত হলেও কোনও রাজনৈতিক নেতা কখনওই সহিংসতার নির্দেশ দেননি। তবুও তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। তাঁর মতে, ট্রাইবুনাল তাঁকে তাঁর পছন্দের আইনজীবী ব্যবহার করার অনুমতিও দেয়নি। লিখিত বিবৃতিতে তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন, “যাঁরা পূর্ববর্তী সরকারের পক্ষে কখনও মত প্রকাশ করেছেন- সেসব বিচারপতি ও জ্যোষ্ঠ আইনজীবীদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু আওয়ামী লীগের সদস্যদের লক্ষ্য করে সাজানো চার্জশিট তৈরি করা হয়েছে।”
নিজের মৃত্যুদণ্ডকে তিনি আগাম নির্ধারিত ষড়যন্ত্র বলেও দাবি করেন। শেখ হাসিনার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস (Muhammad Yunus) ‘‘দেশের বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছেন’’। তিনি আরও মন্তব্য করেন, “বিশ্বের কোনও পেশাদার আইনজীবী এই রায়কে বৈধ বলতে পারবেন না। এটি কেবল অন্তর্বর্তী প্রশাসনের ব্যর্থতা ঢাকার উপায়।” শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, ইউনূসের আমলে বাংলাদেশ ‘‘সহিংস, অস্থির, বৈষম্যমূলক এবং সংখ্যালঘু-বিরোধী’’ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তাঁর দাবি, নির্বাচনে অযৌক্তিক বিলম্ব, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ, দমন-পীড়নের মাধ্যমে সম্পূর্ণ গণতন্ত্রবিরোধী পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। তাঁর কথায়, “বৈধ আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে গেলে আমি ন্যায়বিচার পেতাম- এটা অন্তর্বর্তী সরকার জানে বলেই তারা এই পথ নেবে না।”
বাংলাদেশে জাতীয় রাজনীতির অস্থিরতার সূত্রপাত গত বছর আগস্টে যখন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এর পর দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। পরে পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা চালু করে। দেশের বিভিন্ন আদালত ও থানায় তাঁর বিরুদ্ধে বর্তমানে ৫৮৬টি মামলা চলমান। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সোমবার ঘোষিত মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবীর নানক (Jahangir Kabir Nanak) বলেন, “এই আদালত সম্পূর্ণ অবৈধ। বাংলাদেশের জনগণ এ রায়কে মানছে না। আগামীকাল সকাল-সন্ধ্যা বাংলাদেশ শাটডাউন থাকবে। যতক্ষণ ইউনূসের অবৈধ সরকার ক্ষমতায় থাকবে ততক্ষণ আমাদের আন্দোলন চলবে।” তিনি আরও বলেন, “একদিন শেখ হাসিনা বীরের বেশে আবার ফিরবেন। আওয়ামী লীগের জয় অনিবার্য।”
বাংলাদেশ এখন রাজনৈতিক আবহে উত্তপ্ত। দেশের অভ্যন্তরে ইন্টারনেট সীমিত, গুজব ও পাল্টা-গুজব ছড়াচ্ছে দ্রুত। আন্তর্জাতিক মহলেও রায়ের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও সরকারের ভূমিকা নিয়ে নানান সংশয় প্রকাশ করছে। এদিকে ঢাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। বহু এলাকায় আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের আগাম রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা মূলত নির্ভর করছে আগামী কয়েক সপ্তাহের ওপর। ট্রাইবুনালের রায়ের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার আইনজীবীরা আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে সূত্রের দাবি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের বক্তব্য স্পষ্ট, ‘ন্যায়বিচার না হওয়া পর্যন্ত এক ইঞ্চিও পিছিয়ে নয়।’
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট যে অত্যন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক আকার নিয়েছে, সোমবারের রায় তারই সর্বশেষ পরিণতি। এখন দেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আইন, ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের সঠিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করা।
ছবি : সংগৃহীত




