🍂মহামিলনের কথা
শ্রীমতী রাণী গাঙ্গুলীর দুই মেয়ে, দুই ছেলে। বড় ছেলে শম্ভুর হাঁটা চলার বয়স হয়েছে, কিন্তু সে হাঁটতে দাঁড়াতে কিছুই পারে না, ঘসে ঘসে চলে, রিকেট রোগে ধরেছে। যথাসাধ্য চিকিৎসা করিয়েও কোন লাভ হয়নি। রাণীদি বড় ছেলেকে নিয়ে ঠাকুরের কাছে গেছেন, ছোট ছেলে স্বপন ঠাকুরের চৌকির পাশে দাঁড়িয়ে। রাণীদেবী গভীর মনোবেদনা নিয়ে ঠাকুরের কাছে বসে আছেন। ঠাকুর তো তাকে সে সামর্থ্য দেননি যে বড় বড় ডাক্তার দেখাবেন। সীতারাম ছাড়া কোন গতিও তো নেই তাঁর।
ভীড় কমে এল। রাণীদি ঠাকুরকে বললেন, “বাবা, একটা কথা বলার আছে।” শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন, “সীতারামকে কি বলবি?” রাণীদি নিজের বড় ছেলেকে দেখিয়ে বললেন, “বাবা, তোমার এ নাতি হাঁটতে পারে না। কৃপা করে ভাল করে দাও।”

শ্রীশ্রীঠাকুর– “এ কি করবে বল? এ তো নিজেই খোঁড়া, লাঠি নিয়ে হাঁটে। সীতারাম কি করবে? ডাক্তার দেখা।” রাণীদির মাতৃহৃদয় কাঁদছে, কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “বাবা, ডাক্তার দেখিয়েছি, কিন্তু তুমি তো সবই জানো–আমাদের সামর্থ্য কতটুকু। তুমি সব পার। এরকম ছেলে স্কুলে যাবে না, পড়াশুনা করবে না, কি ভাবে কি হবে, আমি আর ভাবতে পারছি না। বাবা, তুমি ছাড়া আমাদের আর কে আছে বল?” রাণীদি অঝোরে কেঁদে ফেললেন। ঠাকুর বসা ছেলের একটা কান ধরে এক হ্যাঁচকা টানে দাঁড় করিয়ে দিলেন এবং তখুনি সজোরে ধাক্কা দিলেন। ছোট বাচ্চা ছেলে দশ হাত দূরে গিয়ে পড়ল এবং মা মা করে কাঁদতে আরম্ভ করল। ছেলের মা হতভম্ব, হতবাক– রাগে অস্থির। এ কি বাবা! আমার রুগ্ন ছেলে– এইভাবে কেউ ধাক্কা দেয়? ততক্ষনে বড়ছেলে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল– মা মা বলতে বলতে মার কাছে এসে বসল– মা অবাক! ঠাকুর বললেন, “সীতারামের উপর খুব রাগ করছিলি, খুব রাগ হচ্ছিল না মা?”
রাণীদি, “হ্যাঁ বাবা, খুব রাগ হচ্ছিল। আমায় ক্ষমা করুন।” রাণীদি সুস্থ ছেলে নিয়ে বাড়ী ফিরলেন। 🍂(বানান অপরিবর্তিত)
🍁সূত্র : দিব্য লীলা | লেখক : কিঙ্করী গৌরী মা
🍁গদ্য
শরৎ যাপনে এ এক ভাষাহীন দাহ। প্রকৃতির কোলে নিজেকে উজাড় করে কোনো তপস্বীর মতো চেয়ে থাকা অনন্তের পানে। মানবজীবনের সবচেয়ে রসালো মধুর স্বপ্নময় এ এক গভীর পর্যটন। শৈশব থেকে বাণপ্রস্থ পর্যন্ত তার বাঁক পরিবর্তন করে, কিন্তু রহস্য থেকেই যায়। চঞ্চলতা থেকে নির্জনতা, মুখরতা থেকে নীরবতা একে একে ফিরে আসে। আজ সব সীমানা অতিক্রম করে নিসর্গ বিলাসের কোনো আধ্যাত্মলোকে মনোরথ পৌঁছে গেছে।
অনন্ত এই শরৎ যাপন

তৈমুর খান
শরতের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। আজও দেখা হয়। কত কথা হয়েছিল। আজও কত কথা হয়। কথা বলতে বলতে বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু শরৎ! শরৎ তো যুবতী! ওর শিউলি ফুল নিয়ে নাকছাবি বানায়। নীলআকাশ নিয়ে ও নীলশাড়ি তৈরি করে। আসন্ন রাত্রিকালে মাথার খোঁপা খুলে দেয়। ঝিকিমিকি তারার ফুল ফুটে ওঠে তখন। ওর স্নিগ্ধ নদী টলটলে ঊরুর মতন। ঝাঁপ দেবার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকি। প্রেমের পদ্ম ফুটে উঠলে ভ্রমর হবার সাধ জাগে। একা একা উদাসীন হয়ে বসে থাকি। গোধূলি রাঙা বিকেল সন্ধ্যার দিকে চলে যায়। দূর থেকে কারা যেন মনভুলানিয়া ডাক দেয়। শরৎ, সত্যি বলি, কবে তোর প্রেমে পড়ে গেছি। আমার যুবক বয়স, আমার মধ্যবয়স, আমার এই বাণপ্রস্থ সবই তোকে উৎসর্গ করলাম।
একটু দাঁড়া, স্মৃতিগুলি খুঁড়ে দেখি: কত আলো, কত বাতাস, কত প্রতিমার মুখ সেখানে যাওয়া-আসা করে। বাজনা বেজে ওঠে। হলুদ ফ্রকের লাল নীল ফুলগুলি পাপড়ি মেলে দেয়। প্রথম চোখ প্রথম চোখে পড়ে। আর সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। প্রথম ছোঁয়া প্রথম শিহরণ তোলে। আর বুকের ভেতর তরঙ্গের অভিঘাত শুরু হয়। তারপর প্রথম চুমু আসে। গোপন হ্রদের মিষ্টি জলে প্রথম স্নান। তারপর! তারপর কবে আলতা পরা পা নূপুর বাজাতে বাজাতে সম্মোহনের দরজা খুলে দেয়। ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে আমার প্রথম কদম বনে। হ্যাঁ কৃষ্ণ হই আমি। আমার কৃষ্ণজন্ম হয়। আমার এই লীলাভূমি তখন বৃন্দাবন। কাঁপা কাঁপা হাতে ছুঁই তাকে। বাজাতে পারি না বাঁশি। তবু বাঁশি বাজে। নিশি রাতে ডাক পাই জ্যোৎস্নার। অলৌকিক এক জাগরণ আসে। জাগরণগুলি শব্দে শব্দে বাঁধি। কিশোর চেতনা আর চঞ্চল দুর্মতি মিশে যায়। এত আছে! এত ভরা সাম্রাজ্য তার! তবু শূন্যতা ঘর বাহির করে। একতারায় কেটে কেটে যায় অনন্তের সুর। আমি শুধু আমি! আমাকে ঘিরেই স্বপ্ন সমারোহ! আমাকে ঘিরেই বন্দনা আমার! আত্মরতির ঘোর অভিলাষ। অন্ধ করে দিতে থাকে। শব্দ হাতড়াই শুধু। শব্দে শব্দে জীবনের এই সেতু। সেতুর উপরে দাঁড়াই:
‘কত জল, হেলেঞ্চা ফুলের গান
গ্রামের পুকুর পাড়ে শৈশব খুঁজে পাই
টুকরো টুকরো আকাশ নেমে আসে
শরতের শুভ্র হাসি, বিহঙ্গের নতুন উড়ান
মায়ের আঁচল ধরে থাকি
অনন্ত সময়ের তীরে মায়ের নিখুঁত মুখচ্ছবি
বহু ঢেউ, বহু রজনীর ঘুমভাঙা চোখ
সকাল হয়, সকালে সকালে নামে আলোর কপোত
সোনালি মার্বেলগুলি গড়ে যেতে থাকে
পুজো মণ্ডপের দিকে, জলরঙের ছবি হয়
স্মৃতির উঠোনে।’
(শৈশব)
যে শব্দগুলি জীবনচেতনার সেতু গড়ে দিত, আজ তা আধ্যাত্মিক প্রচ্ছায়ায় এক ভিন্ন দর্শনের পথ অনুসন্ধানে ব্যাপৃত। চলমান জীবন প্রবাহ ঋতুযাপনের শরৎপ্রবাহে তা জাগতিক ক্রিয়া নির্মাণ করে দেয়। তখন অভিব্যক্তির এক নতুন বিন্যাসে শব্দগুলিও চালিত হয়।
মার্বেলগুলি সোনালি রঙের। তারা পূজামণ্ডপের দিকে চলে যেতে থাকে। তাদের পেছনে পেছনে যাই। কখনো মনে হয় আলোর কপোত। ঝাঁক ঝাঁক নেমে এসেছে। খুঁটে খুঁটে খেয়ে নিচ্ছে আমাদের বোধ। অনুভূতি ও স্বপ্নগুলির তখন অঙ্কুরোদগমের সময়। আমরা নিজের ভেতর তার শিহরণ টের পাচ্ছি। পদ্মদীঘির পুকুরে স্নান করতে গিয়ে কাজল কালো জলের দিকে চেয়ে থাকছি দীর্ঘক্ষণ। ভেজা শরীর ভেজা কাপড়ে লেপটে উঠে আসছে জলপরী। জলের বিন্দুগুলি সোনালি মার্বেল হয়ে গড়ে গড়ে যাচ্ছে। বয়ঃসন্ধির দোলাচল উন্মন করে দিচ্ছে। মানবী হয়ে যাচ্ছে দুর্গা। মনের উঠোনে পুজোর মণ্ডপ সাজিয়ে ১০৮ টা নীলপদ্ম তুলে আনছি। তারপর সত্যি সত্যি প্রতিমা আসছে, রক্তমাংসের জীবন্ত প্রতিমা। প্রতিমা তখন আকাশ হয়ে, পদ্মদীঘি হয়ে, শান্ত স্নিগ্ধ ভোর হয়ে, গোধূলি রাঙা বিকেল হয়ে, অদ্ভুত এক স্বপ্ন হয়ে মাথার ভেতর ঘুরপাক দিচ্ছে। আমাদের দুঃখগুলি, না পাওয়াগুলি, মনখারাপ ও কষ্টগুলি শরতের আয়নায় বারবার মুখ দেখে নিচ্ছে। ভালো নেই তবুও ভালো আছি। শিউলি-কাশের সমারোহে ঠাণ্ডা বাতাসে মন-মাতোয়ারা আমরা যেন রাজপুত্তুর। জয় করতে এসেছিলাম রাজকন্যা। আমাদের সব ঠিকানা হৃদয়পুর। প্রথম চুম্বনের শিহরণ নিয়ে আজও কেঁপে উঠি। স্বরলিপি খুঁজে খুঁজে বাজে:
‘ও চুম্বন ,
বিশ্বাসের নদী পেরিয়ে
জাগরণের রাত্রি পেরিয়ে
চলে যাচ্ছি দূরে
শিহরনের ফুল ফুটছে
আমার শরীরে
পাপড়িঠোঁটে কী বিস্ময় আলো
স্বপ্নের ভ্রমর এসে
আমার হৃদয়ে গান রেখে গেল
সমস্ত সময় ধরে প্রেমের প্রবাহ
তোমারই স্পর্শে বেজে ওঠে
সে এক ভাষাহীন অনুভূতি
সে এক ভাষাহীন দাহ!’
(প্রথম চুম্বন)
শরৎ যাপনে এ এক ভাষাহীন দাহ। প্রকৃতির কোলে নিজেকে উজাড় করে কোনো তপস্বীর মতো চেয়ে থাকা অনন্তের পানে। মানবজীবনের সবচেয়ে রসালো মধুর স্বপ্নময় এ এক গভীর পর্যটন। শৈশব থেকে বাণপ্রস্থ পর্যন্ত তার বাঁক পরিবর্তন করে, কিন্তু রহস্য থেকেই যায়। চঞ্চলতা থেকে নির্জনতা, মুখরতা থেকে নীরবতা একে একে ফিরে আসে। আজ সব সীমানা অতিক্রম করে নিসর্গ বিলাসের কোনো আধ্যাত্মলোকে মনোরথ পৌঁছে গেছে। প্রতিমাগুলির উত্তরণ ঘটেছে। কোথাও গৃহিণী, কোথাও মাতৃমূর্তি জননীতে পরিণত হয়েছে। অনন্তের সমুদ্রের কিনারে যে শরৎ আজ দরজায় কড়া নাড়ে, তা রোমান্টিকতার শেষ চিহ্নটুকু মুছে ফেলে কর্তব্যপরায়নী নারায়ণীর মতো শ্বেতশুভ্র চন্দনের ফোঁটা ভালে নীল কলেবর চর্চিত দেহে এসে দাঁড়িয়েছে। তার পবিত্রতম হাসিতে মুগ্ধতা থাকলেও আজ আর চঞ্চলতা নেই। আত্মরতির নিবিড় সংযমে যার উষ্ণতায় ব্যাকুল হয়ে উঠতাম, তা আজ অনেকটাই ঠাণ্ডা। আরতির মন্ত্রপাঠের আকুতির মতো প্রেরণা এখন। হাত দুটি ছুঁয়ে দেখি: শিরা-উপশিরাময় জাদুহীন এক স্পর্শ লেগে আছে। নস্টালজিক হয়ে তখন পিপাসার কাছে যাই:
‘শরৎ তোমার কাছে
আমার অনেক ঋণ আছে’
মন কখনো বৃদ্ধ হয় না বুঝতে পারি। একবার মণ্ডপ ঘুরে আসি। আলো-আঁধারি রাস্তায় যুবক-যুবতীর কোলাহল। রাঙা চপ্পলের শব্দ। চুলের ঘ্রাণ। বাতাসে ছুটে আসা প্রাচীন কম্পন। বাড়ি ফিরে এসে আমার সেই প্রাচীন বাজনার কাছে বসি। কিছুক্ষণ জেগে জেগে কাটে। স্বপ্ন আর আসে না দুয়ারে। গোপনে গোপনে ইশারায় ডাকে না। আলো নিভিয়ে দিলে দেখি:
‘স্মৃতির সরোবর জুড়ে
পদ্মেরা ফুটেছে
ভ্রমর উড়ছে দলে দলে
জলের আয়নায় আমারই অতীতমুখ
চেয়ে চেয়ে আমাকেই দ্যাখে।’
এইটা দেখার হয়তো শেষ নেই। এই দেখার মধ্যে দিয়েই নস্টালজিক এক শরৎ যাপন চলতেই থাকবে আমৃত্যু। যে শব্দগুলি জীবনচেতনার সেতু গড়ে দিত, আজ তা আধ্যাত্মিক প্রচ্ছায়ায় এক ভিন্ন দর্শনের পথ অনুসন্ধানে ব্যাপৃত। চলমান জীবন প্রবাহ ঋতুযাপনের শরৎপ্রবাহে তা জাগতিক ক্রিয়া নির্মাণ করে দেয়। তখন অভিব্যক্তির এক নতুন বিন্যাসে শব্দগুলিও চালিত হয়। ‘সোনালি কপোত’ ‘হেমবর্ণ ঈশ্বরে’ পরিণত হয়:
‘এখন অনুমান করে নিতে পারছি
সব রমণীরাই এক একটি সাদা ঘোড়া
প্রেমিকেরা তাদের পিঠে চড়ে চলে যাচ্ছে
দূর নক্ষত্রের দেশে
আমরা বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে থাকছি
মাঠময় আমাদের কুঁড়ে ঘর
ঘরে ঘরে কোলাহল জেগে আছে
অভিব্যক্তির চড়া রোদে শুকিয়ে নিচ্ছি ব্যঞ্জনা
আর কৌশলগুলি নিরর্থক বহ্নিশিখা
আগুন জ্বালাবার তালে আছে
এক একবেলা মেঘের পাহাড়ে
কল্পনার ছেলেমেয়েরা খেলাধূলা করে
প্রেমিক প্রেমিকারা তাদের দিকে রুমাল ছুঁড়ে দেয়
সেইসব টুকরো রুমালে নৈসর্গিক ভাষা
চিকচিক করে ওঠে
আমরা সদর্থক জীবন ভিক্ষা পাই
আমরা গোধূলির পাঠশালায় হেমবর্ণ ঈশ্বরকে দেখি
যে আমাদের প্রত্যয় জাগায় প্রত্যহ’
(হেমবর্ণ ঈশ্বর)
‘কল্পনার ছেলেমেয়ে’ নিয়ে নৈসর্গিক ভাষায় জীবনের প্রত্যয় অন্বেষণই এই যাপনের মূল ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। ‘গোধূলির পাঠশালা’য় ‘হেমবর্ণ ঈশ্বরে’র সঙ্গে তখন দেখা হয়ে যায়। আধ্যাত্মিকলোকেও রোমান্টিকতার স্পর্শ শরৎকে এক নতুন ব্যঞ্জনায় উত্তরণ ঘটায়। সদর্থক ভাবনাগুলি কাম-কামনাবিহীন হলেও জীবনের বাঁকে বাঁকে উজ্জীবনের ধারাপ্রবাহ আঁকতে থাকে।🍂
🍂কবিতা
গৌর সান্যাল -এর একটি কবিতা

রাজনীতি ও মাটি
মাটিতে রক্তের দাগ,ধান গজায় না আর
ভোটের উৎসব শেষে কেবল শোকের বাজার
বক্তৃতার শব্দে ঢেকে যায় কান্নার সুর
গণতন্ত্রের মুখে এখন মুখোশের পুর
গরিবের পেটে আগুন,
নেতা হাসে টিভিতে
পোস্টারে লেখা স্বপ্ন ঝুলে থাকে দেওয়ালে
তবুও মানুষ যায়
লাইন ধরে ভোট দিতে
ভালো দিনের আশায় এখনও বুক পেতে।
রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ -এর একটি কবিতা
মেঘ
স্তূপীকৃত ভাবনায় মেঘাচ্ছন্ন স্মৃতিতে
জড়িয়ে আছে শতাব্দীর রামধনু
বাহ্যিক মিলগুলি খুঁজে
রচিত আলোয়
শিকল ছিড়ে নেয় চক্রটি…
আমিনা তাবাসসুম -এর একটি কবিতা

প্রিয় জোনাকিটি
গভীর অন্ধকারের ভেতর
প্রিয় জোনাকিটি
গলায় ওপর, বুকে নিয়ে
আমরা ভেসে যাচ্ছি
শান্তির চুম্বন বুকের ভেতর
ঈশ্বর প্রতিদিন উঁকি দিয়ে আড়াল হন
অতীত উড়ে আসে
মাথার বাঁদিকে, বালিশের ওপর
আমি একটা ফুঁ দিয়ে সরিয়ে দিই
আদরের মেয়ে
একটা স্বপ্ন নিয়ে ছুটে চলি ভবিষ্যতে
সেখানে কোনও পুরুষ নেই,
আধিপত্যের সাম্রাজ্য নেই
কেবল
আমি ও প্রিয় জোনাকিটি
মৈনাক মুস্তফা -এর তিনটি কবিতা

বৃষ্টির পর শহর
এই একাকীত্ব, প্রেমের আভাস
ভিজে রাস্তায় তোমার ছায়া
মেঘের মতো হালকা
চোখে জল জমে ব্যথা ক্ষয়
মাঠের ঘাসে বলাকা
ছাতার নিচে দু’জন বসে
শুনছে দূরে বাজে বাঁশি
ভালবাসা মানে যেন আট নয় আশি
তাকিয়ে দেখ বৃষ্টির পর শহর নতুন হয়ে যায়
রাস্তার ধুলো ধুয়ে
মন হালকা হয়ে যায়
তুমি বলেছিলে
ফিরব একদিন নিশ্চয়..
আমি জানি, প্রতিশ্রুতি আজও ভিজে রয়…

আলো
সীমান্তে আগুন জ্বলে, কাঁটাতারে রক্ত,
তবু দু-পারে শিশু হাসে, ফুটে ওঠে নতুন সূর্য।
সৈনিকের চিঠি আসে, মা, আমি ভালো আছি…
আকাশে তারা ঝরে, দেখি আর প্রার্থণায় ভাসি।
গোলার আওয়াজ থেমে গেলে ভোরের আলো নামে
যে যার কাজে স্বপ্ন বুকে বাঁচে, মরণের ঘেরাটোপে।
একদিন এই কাঁটাতার হবে ফুলের বাগান,
মানুষ চিনবে মানুষ সেটাই হবে এই পৃথিবীর আসল জয়গান।

মাটির গন্ধ
চাষীর হাতে রোদ পুড়ে রোজ, হাসে সে খুশিতে,
মাটির গন্ধে লুকানো গান, বাজে নীরব নীড়ে।
ধানের ক্ষেতে দোলে হাওয়া, আকাশে উড়ে ধুলো
এই মাটির ঘ্রাণেই আছে আমার মনেরই চালচুলও।
যে মাটি পায়ে মেখে আলপথে হেঁটেছে শৈশবে
আজও সেই পথেই ফিরি, স্মৃতি অনুবাদে বৈভব
পৃথিবীর খেলাঘরে ক্লান্ত হলে পরে, মন বলে ধীরে–
ফিরে যা মাটিতে, তোর জন্ম ওই শিকড়ে শিকড়ে।
চন্দন মিত্র -এর একটি কবিতা

গাছ নত জাগরুক
গাছের কোটরে দুই পাখি
মৃতপ্রায় কী করুণ মুখ
আরও জবুথবু।
মোহময় মুনিয়ার জুটি
পালকের মতো মৃদু রোম
আশ্লেষে ছুই ঠোঁট জোড়া
পাক খায় মরুত ও ব্যোম।
শ্বেতা বসু -এর একটি কবিতা

অস্তিত্বের প্রশ্ন
কে আমি, কিসে বাঁচি, কোথায় হারিয়ে যাই?
সময় বলে কিছু নয়, কেবলই ক্ষয়…
আয়নায় দেখি মুখ, চিনতে পারি না, নিজেদের
নিজেকে খুঁজে ফিরি ভাঙা ভাঙা শব্দ ধাঁধায়।
রাত নামে, চাঁদ ওঠে, আমি থাকি মাঝপথে
প্রশ্নেরা ঘোরে ফেরে শূন্য আকাশের তলে।
শান্তনু প্রধান -এর একটি কবিতা

লুকোচুরির চতুর্থ প্রহর
নষ্ট হয়ে যাওয়া লুকোচুরি— কাউকে বলিনি।
হয়তো তাই পাপ খসিয়ে, ব্রীজের ওপর দাঁড়িয়ে পড়েছে স্নিগ্ধ প্রতিমা,
আর আমাদের রুগ্ণ রোদ নিখুঁতভাবে জড়িয়ে ধরেছে তাকে।
ওহে শ্মশানচারী কাপালিক,
তোমার রুদ্রাক্ষে কি লেগে আছে সেই সব রাতে জেগে থাকা পাপ?
আমি কিন্তু কিছুতেই পুড়ে যাচ্ছি না।
ভোরের আলোয় লেগে আছে কুয়াশার তরল—
সেইসব দেখে কারা যেন নিচে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ছায়াহরিণের কণ্ঠ।
বিনিদ্র ডালপালা থেকে নেমে আসা
অজস্র আকাশ ভেঙে পড়েছে ব্রিজের ওপর—
ততই বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে জলজ পরিদের যাত্রায়।
বিশ্বাস করো, আমার তো কোনো আলো নেই—
বুকের ভেতর এক সমুদ্র জল,
মাঝেমধ্যে জ্যোৎস্না লেগে উপচে পড়ে হাড়-মাংস।
হয়তো তাই—
কষ্ট করে, কোনোদিন, কাউকে বলা হয়নি
নষ্ট হয়ে যাওয়া এক লুকোচুরির কথা।
প্রিয়াঙ্কা নিয়োগী -এর একটি কবিতা
জুবিন মানুষের গর্ব
জুবিন মানব জাতিকে
করেছে একত্রে–
আমার কোনো ধর্ম নাই,
আমার কোনো জাতি নাই,
আমি মুক্ত,
আমি কাঞ্চনজঙ্ঘা।
মনে জোর ছিলো,
বলার দম ছিলো,
সমস্ত জাতিকে ভালোবাসত,
পশু পাখিদের আপন ছিলো।
রাস্তার পাগলের কথা বলার মানুষ ছিলো,
সমস্ত মানুষের দাম ছিলো,
সমস্ত হৃদয়ের ভালোবাসা ছিলো,
সব জাতি,ধর্মকে এক সুতোয় গেঁথে ছিলো,
সব জাতিকে মানব ধর্মে আবদ্ধ করেছিলো।
ভালোবাসার তাৎপর্য বুঝিয়ে ছিলো।
🍁ধারাবাহিক উপন্যাস
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।
শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
৩.
অন্তর্গত অশ্রুজল
বিকেলের আলো তখন ঘরের দেওয়ালে ধীরে ধীরে হেলে পড়ছে, ঠিক যেন কোনও ক্লান্ত প্রেমিকার মতন, যে তার অস্তিত্ব কাউকে জানিয়ে নয়, আড়ালে হারিয়ে ফেলতে চায়। টেবিলের উপরে রাখা এক পিরিচ বিস্কুট আর আধখাওয়া আপেলের পাশে বেল্লা বসে আছে এক ধরনের অস্পষ্ট উদাসীনতায়। তার সামনে রাখা প্লেটে খাবার, তবে তার চোখ যেন খাবারের নয়, সে এক নির্দিষ্ট শূন্যতায় তাকিয়ে আছে, যেখানে স্মৃতি আর বাস্তবতা একসঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। সকালের পর থেকে এই প্রথম সে বসেছে একটা পরিপূর্ণ খাবারের সামনে। কিন্তু পেটের চেয়ে মন বেশি খালি, আর সেই শূন্যতা কোন খাবার পূরণ করতে পারে না। সে কাঁটাচামচে হাত রাখে, তুলে নেয় এক চামচ ভাত, তারপর থেমে যায়। তার মনে পড়ে যায়, এই মুহূর্তে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে কেউ হয়তো হাতে ধরে আছে এক কাপ চা, তুলনায় খুবই সাধারণ কিন্তু তাদের চারপাশে কথা আছে, স্পর্শ আছে, এমনকি হাসির শব্দও।
সে জানে, এই কান্না কেউ বুঝবে না। তার মা বলবেন, “ভদ্র মেয়েরা এমন করে না।” সমাজ বলবে, “এ বয়সে এসব নিয়ে ভেবে কী হবে?” কিন্তু বেল্লার কান্না সেইসব নিয়ম মানে না। তার কান্না অদৃশ্য বিদ্রোহ, যেখানে সে তার অস্তিত্বের প্রতিবাদ জানায়। এই কান্নায় কোনো শব্দ নেই, কেবল বুক ভাঙা নীরবতা।
আর এখানে? এখানে শুধু নিস্তব্ধতা। এই নিস্তব্ধতা যেন শব্দহীন চিৎকার, একটা অলিখিত প্রতীক্ষা। বেল্লা কখনও খাবার নিয়ে ভাবত না। আগে খাবার ছিল একটা যাপন, একটা নৈমিত্তিক আনন্দ। এখন তা হয়ে দাঁড়িয়েছে শুধু এক কাজ, একটা অভ্যাস। খাবার আর স্বাদ আনে না, আনে না সুখের আশ্বাস। বরং প্রতিটি চিবানো এখন যেন একটা অনুশোচনা, একটা স্মরণ, তার জীবনের সেই সময়গুলোর যা সে মুছে ফেলতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি। কখনও কখনও সেভাবে, খাবারের টেবিলগুলো কি সাক্ষী হয়ে থাকে মানুষের সম্পর্কের? একসঙ্গে খাওয়ার সময় আমরা কি সত্যিই আরও কাছাকাছি যাই? নাকি সেটা শুধু সামাজিক ভান?
তার মনে পড়ে, একটা সময় ছিল, যখন এই টেবিলেই সে ও সায়ো একসঙ্গে বসত। আলু ভাজার সসামনে নিয়ে পাশে বসত। গল্প জমত, ফাঁকে ফাঁকে হাসি। এখন সেই হাসিগুলো নেই, শুধু আছে শব্দহীনতা।একটা শুন্য চেয়ারের মতো, যার ওপরে ধুলোর আস্তরণ জমেছে।
সে একটু থেমে দম নেয়, গলার কাছে কিছু যেন আটকে আছে, না গিলে ফেলা যায়, না ফেলে দেওয়া যায়। খাবারের চেয়ে যন্ত্রণাটা বড় হয়ে উঠেছে।
বেল্লা জানে, এই খাওয়া শুধু দেহ বাঁচিয়ে রাখার জন্য নয়। এ এক প্রহসন। সে অভিনয় করে চলেছে, যেন সব স্বাভাবিক। কিন্তু ভিতরে ভিতরে, প্রতিটি চামচ, প্রতিটি চিবোনো, তা যেন নিজেকে বোঝানো, “তুমি এখনও বেঁচে আছো।”
একটা শূন্য প্লেট আর নিঃশব্দ ঘর, এই ছিল তার আজকের সন্ধ্যাবেলা।
বাইরে তখন পাখিরা ঘরে ফিরছে। জানালার কাঁচে ধাক্কা খেয়ে হালকা শব্দ হয়, একটা পোকা আলোতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
আর ভেতরে? বেল্লা আলো নিভিয়ে দেয়। খাবার শেষ হয়নি, তবু আর খেতে ইচ্ছে করে না। কারণ সে জানে, সে যা খুঁজছে, তা কোনও রান্নায় নেই।তা হারিয়ে গেছে। আর সে খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত।
রাতের ঘর অন্ধকারে ডুবে যায়। জানালার ফাঁক গলে ছিটকে আসা চাঁদের আলো বিছানার চাদরে সাদা দাগ কেটে দিয়েছে, যেন কোনও দুঃখ জমে থাকা পত্র লিখে রেখে গেছে। বেল্লা চুপ করে শুয়ে আছে। তার চোখ খোলা, কিন্তু ছাদ দেখা হচ্ছে না—সে তাকিয়ে আছে নিজের ভেতরের কোনো দূরতম আকাশে, যেখানে কেবল দুঃখের মেঘ জমে। তার শরীর নিঃশব্দ, মুখে কোনো শব্দ নেই। কিন্তু বুকের ভেতরে একটা ঝড় চলছে। সেই ঝড়ের শব্দ কেউ শুনতে পায় না, না তার মা, না তার ছোট ভাই, না বাইরের কোনো মানুষ।
হঠাৎ এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে তার কপাল বেয়ে। সে কান্না শুরু করে না, বরং কান্না তাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে নেয়, একটা নীরব ঢেউয়ের মতো, যা কোনও শব্দ ছাড়াই বুকে আছড়ে পড়ে।
সে জানে, এই কান্না কেউ বুঝবে না। তার মা বলবেন, “ভদ্র মেয়েরা এমন করে না।” সমাজ বলবে, “এ বয়সে এসব নিয়ে ভেবে কী হবে?” কিন্তু বেল্লার কান্না সেইসব নিয়ম মানে না। তার কান্না অদৃশ্য বিদ্রোহ, যেখানে সে তার অস্তিত্বের প্রতিবাদ জানায়। এই কান্নায় কোনো শব্দ নেই, কেবল বুক ভাঙা নীরবতা।
সে ভাবে, যদি কেউ জিজ্ঞেস করত, “তুমি কেমন আছ?” যদি কেউ বলত, “তোমার দুঃখটুকু আমায় দাও,” তাহলে হয়তো কান্নাটা এমন হয়ে উঠত না, এত একা, এত গোপন। সে মুখ গুঁজে দেয় বালিশে, যেন কান্নাকে আড়াল করে রাখতে পারে।
কিন্তু জানালার ওপার থেকে চাঁদও তাকে দেখে। চাঁদের চোখেও যেন একটা নরম দুঃখ, যেন সে বলে, “তোমার কান্না আমি বুঝি।” এই রাতে, এই নিঃশব্দ কান্নার মাঝখানে, বেল্লা আস্তে করে নিজের হাত চেপে ধরে বুকের ওপর, যেন নিজের হৃদয়কে বোঝায়, “তুমি একা নও, আমি আছি।”🍁 (চলবে)
🍁ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস
সাহিত্যিক তাপস রায়। সাম্প্রতিককালের একজন বিশিষ্ট কথাশিল্পী ও কবি। লেখকের প্রকাশিত ভিন্নধর্মী পুস্তকগুলি পাঠকদের মনে জাগরণ তৈরি করে। রহস্য কাহিনিতে লেখক প্রাণের ছোঁয়া পান। তেমনি একটি রহস্য উপন্যাস সাশ্রয় নিউজ-এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর পাঠকদের জন্য।
কিশাণগঞ্জের ফেলুদা

তাপস রায়
১৯
সন্ধ্যার আগেই হেভেন হোকাস-পোকাস-এ এসেছে প্রথমে জন লুইস। সে কোরিয়ান। রাত সাতটার সময় কলকাতা থেকে আসবে বৌধায়ন চট্টোপাধ্যায়। নেট থেকে নাম ঠিকানা আর নিজেদের মুখের ছবি মিলিয়ে আইডেন্টিটি কার্ড মানে আধার কার্ড বানাতে বিহারে যে-কোনও কম্পিউটার সেন্টারের সময় লাগে স্রেফ পনেরো মিনিট। আলাদা আলাদা কটেজে ঢুকে গেছে। জন লুইস মানে পঙ্কজ থাপা সব দিক সতর্কতার সাথে দেখছে। সব কিছু সে খুঁটিয়ে দেখছে। দেয়ালে টানানো ছবি দেখছে। ঘরের চাল দেখছে। বিকেলের ম্লান আলোয় অর্কিড বাগানের ছবি তুলছে। ম্যাডাম কর্মা পরিচয় করতে এলে তার কুকুর বেড়ালের ছবি তুলেছে। জুম লেন্স লাগিয়ে সে সব প্রিয়, তুলতুলে ছবি। পঙ্কজের মনে হল হলুম্বা হেভেন-এর তুলনায় এই রিসর্টটা ঢের ভালো। কত নতুন নতুন জিনিস যে চোখ জুড়িয়ে যায়। ক্যামেরায় টেলিলেন্স লাগানো আছে। যেভাবে বিদেশীরা করে, সেভাবে ক্যামেরায় চোখ রেখে পঙ্কজদেখল একটা অদ্ভূত রংয়ের প্রজাপতি। তারপর আরো একটা, আরো উড়ে উড়ে চলে যাচ্ছে পাহাড়ের নীচের দিকে। সেখানে কি ফুলের বাগান আছে! কোথায় থাকে রাতের বেলায় প্রজাপতি। এই প্রজাপতিদের বাড়ি ফেরাটা বেশ মজার লেগেছে।
খুব শান্ত স্বরে পঙ্কজ বলল, “ স্যার, মনে হয় খুব বেশি সময় পাওয়া যাবে না। আপনার সিভিল ড্রেসের ফোর্স, সকাল ন’টার মধ্যে ওদের রিসেপসনে দু’জন দুজন করে পাঠিয়ে দেবেন। সঙ্গে মহিলা ফোর্স, মানে একজন পুরুষের সঙ্গে একজন মহিলা থাকলে ভাল। সন্দেহ হবে না। মানে রুম বুক করার অজুহাতে ওদের অফিসঘরের লোকজনকে আটকে রাখতে হবে।”
পঙ্কজ থাপা টেলি লেন্সে চোখ রেখে রিসর্টের পেছনে চলে গেছে। পঙ্কজ দেখল ক্যামেরায় কী যেন বিদ্যুতের মতো সরে গেল। বনের ভেতর রুপোলি রেখা কেন হবে! আকাশের দিকে তাক করে নেই তো। তবে! লেন্স আবার সেট করে বনের ভেতর ফোকাস করতে গিয়ে অবাক। রুপোলি রেখাটা এবার বড়ো হয়েছে। একটা ঝর্ণা পাহাড়ের নীচের দিকে নেমে যাচ্ছে। অর্কিড আর ফার্ণের বাগানের ভেতর দিয়ে। পাহাড়ের ঢালে কয়েক ধাপ নামতেই পঙ্কজ দেখে ঝর্ণাটা গিয়ে পড়েছে নদীতে। নদী মানে তিস্তা হবে। বাঃ। মুখ দিয়ে প্রশস্তি বেরিয়ে এল। টেলি লেন্স এবার নজর করতে থাকে ওই দিকে পথ-ঘাট আছে কিনা। দেখবে। ঝর্ণাটা ভাল করে এক্সক্যাভেট করতে হয়। এতদিন কালিম্পং-এ আছে, এখানে একটা ঝর্ণা আছে, জানা ছিল না। এরকম মুগ্ধতা একটু আগে ম্যাগনোলিয়া ফুলের ঝাড় দেখেও হয়েছে। এরকম রং সাধারণত হয় না। কেমন চেরি ফুলের মতো মিষ্টি রং। ‘ম্যাগনোলিয়া’ নামে একটা কটেজ ও আছে এখানে। বোঁদের বুকিং ওই ‘ম্যাগনোলিয়া’কটেজে।
পঙ্কজ ফোনে বোঁদেকে বলে দিয়েছে রাতের বেলায় যেন কিছু করতে না যায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে বেড়াতে বেড়াতে গিয়ে অচেনা লোকের মতো আলাপ করবে তারা। ডিনার করতে গিয়ে একপ্রস্থ ডাইনিং-এ ওদের শুনিয়ে শুনিয়ে, দেখিয়ে আলাপ করবে। যেমন বিদেশী ট্যুরিস্টরা করে আর কি। ততক্ষণ ধীরে বন্ধু ধীরে। ধীরে বললেই কী ধীরে হয়। বোঁদে প্রথম থেকেই উত্তেজিত । ট্রি টপ কটেজে, মানে রিসর্টের রিসেপসনে ম্যাডাম কর্মা একদম প্রথমেই পরিচিত হন অতিথিদের সাথে। ম্যাডাম কর্মা বেড়াল কুকুর ভালবাসেন। তার সঙ্গে সঙ্গে থাকে বেড়াল কুকুরের দল। অতিথিদের ঘরেও চলে যায়। অতিথিরা সুন্দর সুন্দর বেড়ালদের গায়ে হাত দিয়ে আদর করে। তবে ম্যাডাম কর্মা প্রথমে সতর্ক করে দেন নেকড়ের মতো কুকুরটি সম্পর্কে। বলেন যেন কুকুরটিকে বিশেষ উত্তেজিত না করা হয়। এমনিতে ও ক্ষতি করে না। ম্যাডাম কর্মা বোঁদের সঙ্গে পরিচিত হবার পর বললেন, “ভয় পাবেন না। ও একটু শুঁকবে। কিছু বলবে না।” দুই থাবা নিয়ে বুকের কাছে এসে যখন শুঁকছিল, বোঁদে দেখেছে ছবির কুকুরের গলার সেই কলার। ফলে সে তো উত্তেজিত হবেই। বোঁদে পঙ্কজ কে নিজের মোবাইলের থেকে সেই ভিডিও কলের রেকর্ডিংগুলি পাঠিয়ে দিল। সে রাতের ভেতর এগিয়ে থাকুক খানিকটা। আর বোঁদে ডিনার খেতে যখন পাহাড়ের একেবারে উঁচু ধাপে ওই ‘অর্কিড কটেজ’-এ যাবে। তখন একবার নিজের মতো করে গঙ্গারামের অনুসন্ধান চালাবে। বোঁদে এর মধ্যে শুনে নিয়েছে ওই ‘অর্কিড কটেজ’ মানে ডাইনিং-এর পাশেই ম্যাডাম কর্মার নিজের থাকার জায়গা। মানে সেখানেই গঙ্গারামের থাকার সম্ভাবনা প্রবল। হ্যাঁ ওটাই গঙ্গারাম, একশ শতাংশ নিশ্চিত। বোঁদে নিজের সঙ্গে এনেছে এক শিশি ক্লোরোফর্ম। ডিওর ফাঁকা শিশিতে ভরে এনেছে। দরকার হলে স্প্রে করে দেবে। তারপর ভেবে নিয়েছে বড় ট্রলি ব্যাগটার ভেতর ভরে চোখের সামনে দিয়েই গঙ্গারামকে নিয়ে ভোকাটা হবে। দেখি কে কী করে! পঙ্কজ থাপা কেঁপে উঠেছে বোঁদের মোবাইল থেকে পাঠানো ভিডিও দেখে। এত দেখছি ব্লু হোয়েলের মতো ফাঁদ। নিজের মনেই বিড়বিড় করে। কটেজের রুমের দিকে যাচ্ছিল পঙ্কজ। না গিয়ে রিসর্টের বাইরের দিকে যায়। না সময় নষ্ট করা যাবে না। এক্ষুনি জানাতে হবে। ব্লু হোয়েলের ফাঁদে কত ছেলের প্রাণ গেছে পঙ্কজ জানে। এই পাহাড়েই দু’টি ছেলে চাপ সামলাতে না পেরে খাদে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল । অ্যাসিস্টান্ট এস পি সাহেব-এর ড্রাইভারের নাম্বার ছিল। রিসর্টের বাইরে
***
ন্যাশনাল হাইওয়েতে নেমেই ফোন করে। তাকে বলে খুব দরকার, একবার সাহেবকে ধরিয়ে দিতে হবে। সাহেবকে জানাতে হবে যে গ্রাহামস স্কুলে তার ছেলে বিপদে পড়েছে। পঙ্কজকে সময় দিলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট এস পি সাহেব সমীর লেপচা। কালিম্পং নতুন জেলা হবার পর সুপার পেয়েছে, অ্যাসিস্টান্ট সুপার ও পেয়েছে লেপচা একজনকে। পঙ্কজ যে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ মাস্টার্স করে এখানে নিজেই ব্যাবসা করছেন, জেনে খুশি হলেন। তার গ্যারেজে দশ জন কাজ পেয়েছে। সেটাও ভালো দিক। গোটা কালিম্পং-এর বিশ্বস্ত গ্যারেজ যে এই পঙ্কজেরটা তা পুলিশের এই কর্তা জানেন। তিনি ধৈর্য ধরে সবটা শুনলেন।
পঙ্কজ বলল, “ছেলেকে নিয়ে এখনই উত্তেজিত হবেন না। পুরো গ্যাংটা ধরা না পড়লে অন্য স্কুলের ছেলেদের ক্ষতি করে দেবে ওরা।” ওই রিসর্টের মালকিনের হাত যে লম্বা তা পুলিশ কর্তাও জানেন। ফলে তিনি পঙ্কজের ইচ্ছেকে গুরুত্ব দিলেন।
“আমি আপনাকে সম্পূর্ণ সাহায্য করব। সময় আর স্থান শুধু আমাকে জানাতে হবে। ফোর্স নিয়ে চলে যাব।”
খুব শান্ত স্বরে পঙ্কজ বলল, “ স্যার, মনে হয় খুব বেশি সময় পাওয়া যাবে না। আপনার সিভিল ড্রেসের ফোর্স, সকাল ন’টার মধ্যে ওদের রিসেপসনে দু’জন দুজন করে পাঠিয়ে দেবেন। সঙ্গে মহিলা ফোর্স, মানে একজন পুরুষের সাথে একজন মহিলা থাকলে ভালো। সন্দেহ হবে না। মানে রুম বুক করার অজুহাতে ওদের অফিসঘরের লোকজনকে আটকে রাখতে হবে।”
পুলিশ অফিসার বললেন, “কিন্তু ভাবনা হচ্ছে, ওদের মাথা তো ওই লেডি। সে যদি ভিড় দেখে পাকদন্ডি পথে ভেগে যায়। তারপর মন্ত্রী-সান্ত্রী ডেকে নিয়ে আসে!”
“ আমিও ভেবেছি স্যার। কিন্তু বিষয়টা হলো কোনো গেস্ট এলেই ম্যাডাম কর্মা কীভাবে যেন ভুতের মতো গেস্টের কাছে তার কুকুর বিড়াল নিয়ে হাজির হয়ে যান। মনে হয় তিনি তাঁর ডেরায় বসে সিসিটিভি তে সব কিছু নজরে রাখেন।”
“হ্যাঁ তাহলে তো আমাদের ফোর্সের ঢোকা প্রথমেই নজর করে ফেলবেন ম্যাডাম কর্মা।”
“সে জন্যই প্রথমে যে দু’জন ঢুকবেন, তারা যেন একটু মেক-আপ টেক-আপ নিয়ে ঢোকেন। মানে ঝট করে সন্দেহ করতে না পারেন ম্যাডাম। আর প্রথম দুজন ঢোকার মিনিট দশেক পরে যেন বাকিরা ঢোকে। আমার পরিকল্পনাটা বলি স্যর, দশ মিনিটের মধ্যেই ম্যাডাম কর্মা চলে আসবেন রিসেপসনে। তখন তাকে নিয়ে গল্প করার ছলে মহিলা ফোর্স রিসেপসনের ঘর থেকে বের করে নিয়ে আসবে। পুরুষ ফোর্স অনুসরণ করবে। ততক্ষনে আপনার পরের ফোর্স দুজন দুজন করে ঢুকে পড়বে। আর হ্যাঁ ঐ মহিলাকে গান পয়েন্টে নিয়ে ওর নিজের ঘরেই ওকে আটকে রাখতে হবে। ওখানে বসেই, আমার যতদূর ধারণা হেভেন হোকাস-পোকাস-এর সবটা যে নিয়ন্ত্রিত হয়, তা জানা যাবে।”
অফিসার সম্মত হলেন। 🍁(চলবে)
🍂গল্প
মহেশ ভুবন কাকার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তারপর ভোলকুকে জড়িয়ে ধরে বলে ভোলকু আর তোর কষ্ট হবে না এবার আমি কাজ করব তোকে খাওয়াবো। আমার নিজের রোজগারে খাওয়াবো তোকে। ঠিক আছে? ভোলকু কি বুঝল কে জানে। তারপর ভোলকু আবার মহেশের গাল চাটতে থাকে। এদিকে সূর্য ঢলে পড়েছে পশ্চিম দিকে রক্তিম লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। চারিদিকে কেমন একটা স্নিগ্ধ শান্ত পরিবেশ।
খিদে

মমতা রায় চৌধুরী
আজ মহেশকে বড়ই উতলা করল। খিদেয় পেটটা জ্বলছে। পাশের মাঠটাতে বসে আছে অথচ মাঠ থেকেই এত সুগন্ধ পাচ্ছে বোধহয় বাড়িতে কোন পায়েস ফায়েস রান্না হচ্ছে। এইতো সেই গোবিন্দভোগ চালের সুমিষ্ট একটা গন্ধ। তাতে এলাচ, ঘি এর গন্ধ আছে। এই গন্ধটা কতদিন সে পায় না ।এই গন্ধের সাথে মিশে আছে তার মায়ের হাতের গন্ধ। আজ মায়ের কথা বড্ড মনে পড়ছে। মনে পড়ে মা খাওয়া নিয়ে কত বকাবকি করত ঠিক সময়ে খাবার না খেলে ।মনে পড়ে সন্ধ্যেবেলায় পড়তে বসলে মা এক গ্লাস দুধ এনে কত ভাবে খাওয়ানোর চেষ্টা করত তারপরেও সে খেতে চাইত না তবুও মা জোর করে খাওয়াতো আর সেই খাওয়ানোর কথা বারবার মনে পড়ছে আর চোখ দিয়ে জল পরছে। এমন সময় ওর পাশে এসে কে যেন গাল চেটে দিচ্ছে। যত খারাপ সময়ে এরাই ওর পাশে থাকে ওরা মুখে কিছু বলতে পারে না কিন্তু অনুভব করে মহেশের দুঃখ কষ্টটাকে। কেমন ওদের ভেতরে যেন একটা অস্থিরতা লক্ষ্য করা যায় মহেশের ভেতরে যদি কষ্ট হয় ।মহেশ ওদের দেখে নিজের কষ্টের কথাই ভুলে যায়। অথচ এদেরও কত কষ্ট একটু খাওয়ার জন্য মানুষের কাছে কত আবেদন জানায়। কেউ ইচ্ছে হল দিল ,কেউবা গালাগাল, কেউ বা লাঠিপেটা করল। সেগুলো সহ্য করতে পারে না। মহেশ ভাবি এই পৃথিবীটা তো সবার জন্য কেন মানুষের শুধু একাই রাজত্ব করবে এর প্রতিকার কি সে ভেবে পায় না।মহেশের কথা কে শুনবে। মহেশের নিজেরই খাওয়া জোটে না। যেটুকু খাবার কোন রকমে তার মা মানে সৎ মা দেয় সেই খাবারটুকু সবাই মিলে ওরা ভাগ করে খায়। এই নিয়ে কম কথা শুনতে হয় না ।এই তো আজ দুদিন ধরে ওকে কিছু খেতেই দিচ্ছে না। ওদেরকে কি খাওয়াবে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন একটা কষ্ট দলা পাকিয়ে উঠছে। কি করবে ও এইসব সাত পাঁচ ভাবছে এমন সময় কে যেন মহেশের নাম ধরে ডাকছে’ ‘কিরে মহেশ, কি করছিস? সারাদিন মাঠে বসে থাকলে হবে, লেখাপড়া তো এখন কিছুই করছিস না, তোকে যে কথাটা বলেছিলাম মনে আছে। মহেশ ঘুরে তাকিয়ে দেখে ভুবন কাকা। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।
‘কিরে তাকিয়ে আছিস, কাজটা করবি? দু’মুঠো খাবার পাবি হাতে ত্রিশটা করে টাকাও দেবে।‘
দেখ যদি কাজ করিস তাহলে বল, না হলে অন্য ছেলে দেখব।
সহদেব এই কথার কোন প্রতিবাদ করল না। মহেশ শুধু ওর বাবার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল বাবার কাছ থেকে একটু সহানুভূতি আর সত্যের দাবী করেছিল সেখান থেকেও বঞ্চিত হলো বরং ওর ছোট ভাই গণেশ বলল দাদা কিছুই করেনি কেন ভোলুকে মারলে। বলেই কাঁদতে থাকল।
মহেশ ভেবেছিল লেখাপড়াটা করবে কিন্তু বোধহয় বেশি দূরে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না তবুও দোকানের কাজটা করেও চেষ্টা করবে লেখাপড়াটাকে চালিয়ে যাবার শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাবে। পেটের খিদে যেমন মানুষকে উতলা করে তেমনি ওর মনের কি দেওয়া আছে ওর মনের খিদে অসহায় জীব গুলোর প্রতি অবিচার অন্যায় দেখেছে তাদের প্রতিকারের ব্যবস্থা করা অসহায় জীব গুলোর জন্য যদি কিছু করতে পারতো তাহলে ও অনেক পরিতৃপ্তি পেত।
মহেশ কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। বাবা কি বলবে মা কি বলবে সাত পাঁচ ভাবছে।
ভুবন কাকা খৈনি মুখে দিয়ে বলল ‘দেখ, আজকের মধ্যে যদি কথা না বলিস তাহলে কিন্তু আমি অন্য ছেলে দেখতে বাধ্য হব। নেহাতই তোর এই দুরবস্থা যাচ্ছে ,তোর মাও তো তোকে দেখতে পারে না ।আর বাবাটাও হয়েছে মায়ের কথার বাধ্য। ছেলেটার যে কি হবে সেদিকে কারো হুশ নেই ।যাইহোক কি বলছিস বল।
মহেশ মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
কিছু একটা বলতে যায়
‘কিছু বলবি?’
‘না মানে আমি যেখানে কাজ করব যদি আমার ভোলকুটা যায় কেউ মারবে না তো।’
ভুবন কাকা বুঝতে পারে সত্যিই তো ভোলকুকে খুব ভালোবাসে মহেশ।
‘আচ্ছা সে আমি কথা বলে নেব যদি রাজি থাকে তুই রাজি তো।’
আবারও মাথা নাড়ে।
তাহলে ওই কথাই রইলো ‘তুই কাল সকাল ছটার মধ্যে দোকানে চলে যাবি।‘
মহেশ ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়।
ভুবন এককারী থুতু ছিটিয়ে দিয়ে ‘ওরে মন পাগল
তুই কেন কেঁদে মরিস /পরশ পাথর খুঁজতে গিয়ে বারে বারে হারিস/ওরে মন পাগল, ওরে মন পাগল‘ গান গাইতে গাইতে চলে যায়।
মহেশ ভুবন কাকার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তারপর ভোলকুকে জড়িয়ে ধরে বলে ভোলকু আর তোর কষ্ট হবে না এবার আমি কাজ করব তোকে খাওয়াবো। আমার নিজের রোজগারে খাওয়াবো তোকে। ঠিক আছে? ভোলকু কি বুঝল কে জানে। তারপর ভোলকু আবার মহেশের গাল চাটতে থাকে।
এদিকে সূর্য ঢলে পড়েছে পশ্চিম দিকে রক্তিম লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে ।চারিদিকে কেমন একটা স্নিগ্ধ শান্ত পরিবেশ। পাশে গরুর পাল নিয়ে ধুলো ছিটিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিয়েছে বাসু পাগলা।’ গ্রাম ছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ /আমার মন ভুলায় রে’’গান গাইতে গাইতে।
আস্তে আস্তে চারিদিকটা অন্ধকার হয়ে আসে ।মহেশ এবার ভয়ে ভয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ায় বাড়ির কাছাকাছি আসতেই শঙ্খ ,উলুধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়। বেশ কিছু ছেলে মেয়ের আওয়াজও আসছে। মহেশ মনে মনে ঠিকই ভেবেছে আজ গণেশের জন্মদিন।
কি সুন্দর একটা জামা পরেছে ওর ভাই সবাই নিমন্ত্রিত। শুধু মহেশ ছাড়া।
মহেশ বাড়িতে আসতেই কেমন বাজখাই গলার স্বর কানে এসে বাজলো ‘ওই দেখো নবাব পুত্তরএসে গেছে, আর কি খাবার রেডি আছে, খেয়ে নিয়ে উদ্ধার কর।
গণেশ মহেশের কাছে এসে বলল’ দাদা চল না কেক কাটবো।’
ভোলকুটা দূরে দাঁড়িয়ে।
ওই দেখো নিজের খাওয়া জোটে না আবার আর একজনকে সঙ্গে করে নিয়েছে। হ্যাঁরে, তোদের পেটের উনুন যদি সব সময় জ্বলতে থাকে আমি কি করে পেরে উঠবো বলতে পারিস।
‘আহ আজকের দিনে এসব কথা না বললেই নয়।’
সহদেবের কথায় কান না দিয়ে স্ত্রী গোলাপী বলে উঠলো ‘তাহলে কি বলব?
তুমি তাকিয়ে দেখো, ওই দেখো ওই হারামজাদা কুকুরটা ওখানে আছে।’
মহেশকে যা বলছিল, বলছিল কিন্তু ভোলকুকে কিছু বললে ওর মাথায় রক্ত চড়ে যায়।
তারপরেও সে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে আর মাটিতে পা ঘষতে থাকে
‘কিরে তুই কি ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকবি ভাইয়ের কেক কাটা হচ্ছে ওখানে এসে দাঁড়া’।’ ‘সহদেববাবু একটু সাহসের সঙ্গেই কথাটা বলল।
গণেশ বলল’ আয় নারে দাদা, আয় সবাই এখানে আছে। তুইও আয়।’
মহেশ কে খুব ভালোবাসে গণেশ।
সকাল থেকে দানাপানি পেটে পরেনি এসব দেখে ওর যেন খিদের মাত্রা আরও দ্বিগুণ হয়ে গেল। ওদিকে ভেতর থেকে চিংড়ি মাছ, ইলিশ মাছের গন্ধ পাচ্ছে। তার মানে ভাইয়ের জন্মদিনে ইলিশ মাছ ,চিংড়ি মাছ হয়েছে।
আজকে গণেশের জন্মদিনে তার সৎ মা তাকেই খাওয়ার থেকে বঞ্চিত করবে না এটুকু বিশ্বাস।
এবার ভোলকু ঘেউ ঘেউ করতে শুরু করল কয়েকজন অচেনা বাচ্চাকাচ্চা কে দেখে আর ওরাও ভয় পেয়ে ভয়ে সিটিয়ে ঘরে ঢুকে গেল। এবার গোলাপি লাঠি নিয়ে দিনে দুই চার ঘা ভোকুর পিঠে। মহেশ কিছুতেই সহ্য করতে পারলাম না জোরে চিৎকার করে উঠলো মা ওকে আর মারবে না।
তুই কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছিস।
আবারো মারতে যাচ্ছে দেখে এবার মহেশ কে লাঠিটা চেপে ধরল।
ওর মা চিৎকার করে সারা বাড়ি লোক জড়ো করলো এই সৎ ছেলে আমাকে মেরে ফেলবে ।
তখনো মহেশের হাতে লাঠি। সবাই এসে এই দৃশ্য দেখে মহেশকে খুব দোষারোপ করলো। সহদেব এই কথার কোন প্রতিবাদ করল না। মহেশ শুধু ওর বাবার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল বাবার কাছ থেকে একটু সহানুভূতি আর সত্যের দাবী করেছিল সেখান থেকেও বঞ্চিত হলো বরং ওর ছোট ভাই গণেশ বলল দাদা কিছুই করেনি কেন ভোলুকে মারলে। বলেই কাঁদতে থাকলো। শুধু শিশুটি সত্যের মুখোমুখি হল কিন্তু ছোট্ট শিশুর কথা কেউ বিশ্বাস করল না ।সেই সন্ধ্যের রাতে মহেশকে বাড়ি ছাড়তে হলো। পেটের খিদের জ্বালা তখন নিভে গেছে মনেতে জ্বলছে তখন ন্যায় আর সত্যের জ্বলন। ভোলকু নিয়ে মহেশ বাড়ি ছাড়লো।
বারবার সন্ধ্যের আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলতে লাগলো আর মায়ের কথা মনে পড়তে লাগলো তার জন্মদিনে তার মায়ের এই আয়োজন আজ বড্ড বেশি মনে পড়ছে। মাটিতে বসে থাকা পায়েসের গন্ধ এক নিমিষে বিষাদে পরিণত হল। 🍁
সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সম্পাদকীয় ঋণ : মহামিলনের কথা বিভাগের লেখা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।







