Sasraya News Sunday’s Literature Special | 8th March 2026, Sunday ★ Issue 102 | সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল, ৮ মার্চ ২০২৬। রবিবার, সংখ্যা ১০২

SHARE:

সম্পাদকীয়

ই সময় মানুষের মুখ বদলে গিয়েছে, কথার রং বদলে গিয়েছে, চোখের ভেতরের সত্যও যেন অচেনা হয়ে উঠেছে। আমরা এমন এক যুগে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে প্রতিদিনের জীবনের চেয়ে খবরের শিরোনাম বড় হয়ে যাচ্ছে, যেখানে মানুষের প্রয়োজনকে মাপা হচ্ছে সংখ্যায়, আর সম্পর্ককে মাপা হচ্ছে সুবিধার তুলাদণ্ডে। অথচ এই সময়ই আমাদের শেখাচ্ছে অস্থিরতার মধ্যেও জীবনকে বুঝে নিতে হয়। এ-যেন ছুটে চলা মানুষের মন-মানচিত্র। সবাই দৌড়চ্ছে বেঁচে থাকার তাগিদে, প্রমাণের প্রয়োজনে, সমাজের চোখে সফল হবার দাবিতে। অথচ আমরা ভুলে যাচ্ছি, জীবনের আসল মানে আসলে থেমে গেলেই বোঝা যায়। সময়ের স্রোত যেমন বয়ে যায়, তেমনি আমরা বয়ে যাই একদল উদ্বিগ্ন মানুষ হয়ে, যে মানুষ নিজেরই মুখ খুঁজে পায় না আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে।

তবু এই সময়ের মধ্যেই আছে অজস্র আলো। অসহিষ্ণুতার ভিড়ে এক মুঠো সহানুভূতির হাত এখনও বাড়ে, বিভেদের অন্ধকারে এখনও কেউ কেউ বিশ্বাসের প্রদীপ জ্বালায়, অশান্তির কেন্দ্রেও কিছু মানুষ ভালবাসতে শেখে নীরবে, নিভৃতে। এই সময় আমাদের মনে করায় মানুষের উন্নতি শুধু প্রগতির গ্রাফে নেই, আছে হৃদয়ের ভিতরেও। মানুষের শক্তি শুধু মেশিনে নেই, আছে বিশ্বাসের ভাঁজেও। মানুষের ভবিষ্যৎ কেবল যন্ত্র আর নতুন প্রযুক্তির জয়যাত্রায় নয়, রয়েছে মানবিকতার পুনর্জাগরণে। এই সময় আমাদের চোখ খুলে দেয় সোশ্যাল মিডিয়ার শোরগোল যতই বাড়ুক, একজন মানুষের সত্যিকারের সান্ত্বনা আসে আরেকজন মানুষের কাঁধে মাথা রাখার উষ্ণতায়। যে পৃথিবীকে আমরা প্রতিদিন ভয় পাই,
সেই পৃথিবীকেই বদলাতে পারে আমাদের ভেতরের মমতা, আমাদের নীরব সিদ্ধান্ত। সময়ের অনিশ্চয়তা আমাদের ভেঙে দেয়, আবার তৈরি করে। এই সময় আমাদের শিখিয়েছে ক্ষমতা যতই বড় হোক, মানুষের ভয় ততই গভীর; সম্মান যতই পাওয়া যাক, মানুষের একাকিত্ব ততই তীক্ষ্ণ। এই সময়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা মানুষের পাশে মানুষ ছাড়া আর কেউ নেই। অথচ আমাদের মন এখনও শিখছে। শিখছে কাউকে শুনতে, শিখছে সহ্য করতে, শিখছে ক্ষমা করতে। এই সময় হতাশার হলেও, এটি একই সঙ্গে নতুন সচেতনতারের সময়। এটি পরীক্ষার সময়, আবার প্রস্তুতির সময়ও। এটি প্রশ্নের সময়, আবার উত্তর খোঁজার সময়ও।আমরা হয়তো এখনই বুঝতে পারছি না, কিন্তু ক’য়েক বছর পর পিছনে তাকালে বুঝব এই সময়ই আমাদের মানুষ করে দিচ্ছে।
এই সময়ই আমাদের শেখাচ্ছে কীভাবে ছোট ছোট মুহূর্তে শান্তি খুঁজে নিতে হয়, কীভাবে ব্যস্ত পৃথিবীর ভিড়ে নিজের জন্য একটু নরম জায়গা তৈরি করতে হয়।সময় কেবল বাহ্যিক নয়, এটি ভেতরেরও। যে মানুষ নিজের ভেতরের সময়কে বুঝতে পারে, সে কোনও অনিশ্চয়তাকেই ভয় পায় না।

এই সময় তাই যতই অস্থির হোক,
এই সময়ের ভেতরেই আছে আগামী দিনের সমস্ত বীজ।
আমাদের শুধু দরকার: একটু ধৈর্য,
একটু মানবতা,
একটু ভালবাসা,
আর বিশ্বাস যে প্রতিটি অন্ধকার পথও একদিন আলোয় ভরে উঠবে।🍁

 

 

🍂মহামিলনের কথা

শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
পুরাকালে দ্বাপর যুগে আদিত্যসমান তেজসম্পন্ন মার্ত্তণ্ডনামা কোন ব্রাহ্মণ স্নান করিয়া তুলসীকে জলদান করত গৃহে গমন করেন। এই সময় তৃষ্ণার্ত্ত এক কুক্কুর আসিয়া তুলসীমূলের জল পান করত নিষ্পাপ হয়।

শ্রীশ্রীঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব। 

এই সময় অসিমর্দ্দন নামে এক ব্যাধ আসিয়া বলিল, ‘আমার অন্ন খাইয়াছিস ও ভাণ্ডও ভাঙ্গিয়াছিস কেন? হিংসক, তোর এই শাস্তি’ এই বলিয়া তাহাকে বাণবিদ্ধ করিল। শমনের আজ্ঞায় পাশ-মুদ্গরপাণি যমদূতগণ তাহাকে লইতে আসিয়া বন্ধন করিয়া লইয়া যাইতে ইচ্ছা করিল। এমন সময় বিষ্ণুদূতগণ আসিয়া চর্ম্মপাশ ছেদন পূর্ব্বক কুক্কুরকে রথে আরোহণ করাইয়া লইয়া চলিল। যমদূতগণ বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা করিল হে সাধুগণ, কোন্ পুণ্যে ইহাকে লইয়া যাইতেছ? বিষ্ণুদূতগণ বলিলেন— পূর্ব্বে এ রাজা ছিল, বহুতর পুণ্য করিয়াছিল। কিন্তু এক সুন্দরী অঙ্গনা-হরণ পাপে নরকে যায়, তোমরা সে স্থানে শমনের আজ্ঞায় বহু ক্লেশ দিয়াছ। এই নৃপ সেই কর্ম্মের ফলে তপ্ত লৌহশয্যায় শয়নপূর্ব্বক তাম্রময়ী স্ত্রীকে আলিঙ্গন করিয়াছিল। যমের আজ্ঞানুসারে অতি ভীষণ তপ্ত লৌহস্তম্ভ আলিঙ্গন করিয়া বৈক্লব্যগ্রস্থ হইয়াছিল। তারপর এই নৃপ শমনালয়ে অন্য দূতগণ কর্ত্তৃক ক্ষারাম্বুধারায় সিক্ত হইয়াছিল। এইভাবে বহুকাল দুঃখ ভোগ করিয়াছে। পরে নরক শেষে পাপযোনিতে মুহুর্মুহুঃ জন্মলাভ করত স্বকর্ম্মবশে চিরদুঃখ ভোগ করিয়াছে। কিন্তু এক্ষণে তুলসীমূলের জল পান করিয়া হরিগৃহে যাইতেছে। যমদূতগণ এই কথা শুনিয়া যথাগতস্থানে গমন করিল। বিষ্ণুদূতগণ তাহাকে লইয়া বিষ্ণুমন্দিরে যাইল। এই আমি তুলসীর পাপনাশন মাহাত্ম্য কহিলাম। মুনে, যাহারা ভক্তি সহকারে তুলসীর সেবা করে জানি না তাহাদের কি গতি হয়!হেলায় তুলসীসেবায় এইরূপ অনুত্তম গতির কথা শাস্ত্র বলিয়াছেন। জানি না যাহারা ভক্তিসহকারে শ্রীমতী বৃন্দার সেবা করেন তাঁহারা কিরূপ পরমা গতি লাভ করেন!
🍁শ্রীশ্রীতুলসীমহিমামৃত | শ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী
(বানান সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত)

 

 

🍂ধারাবাহিক উন্যাস
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।

 

শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব ঙ্গোপাধ্যায়

২১.

স্মৃতির ভেতর দিয়ে হাঁটা

ইমেলা থেকে ফিরে সোমদত্তা বুঝেছিল, সে আসলে বাড়ি ফেরেনি। শরীরটা ঠিকই দরজার ভেতরে ঢুকেছে, আলো জ্বালিয়েছে, ব্যাগ নামিয়েছে, জুতো খুলে এক পাশে রেখেছে, কিন্তু মনটা এখনও সেই ভিড়ের মধ্যেই রয়ে গেছে, যেখানে হঠাৎ করে অতীত বর্তমানকে ছুঁয়ে দিয়েছিল। দরজা বন্ধ করার শব্দটা কেমন ফাঁকা শোনাল। এই ঘরটা তার চেনা, বহুদিনের, তবু আজ যেন অচেনা লাগছে। যেন অনেকদিন পরে এখানে ফিরে এসেছে সে নিজেই। চেয়ারে বসে সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। বুকের ভেতরে একটা অদ্ভুত কাঁপুনি, যেটা সে প্রথমে বুঝতেই পারছিল না। তারপর ধীরে ধীরে বুঝল এটা ভয় নয়, এটা উত্তেজনাও নয়, এটা সেই পুরনো কাঁপন, যেটা সে একসময় খুব ভাল চিনত। নীলাঞ্জনের মুখটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। বয়সের ছাপ পড়েছে, চোখের কোণে ভাঁজ, চুলে সাদা রেখা, তবু কোথাও একটা সেই পুরনো নীলাঞ্জন। সে চোখ সরিয়ে নিয়েছিল, ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু এখন এই নিঃশব্দ ঘরে আর পালানোর কোনও জায়গা নেই। স্মৃতি কখনও তাড়া করে আসে না, তারা অপেক্ষা করে। জানে, একদিন মানুষ একা হবে, আর ঠিক তখনই তারা দরজায় কড়া নাড়বে।

সোমদত্তা হালকা করে হাসল। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে চিঠির কথা ভাবলে নিজেরই অদ্ভুত লাগে। তখন মোবাইল ছিল না, বা থাকলেও এইভাবে জীবনের সঙ্গে মিশে যায়নি। নীলাঞ্জনের প্রথম চিঠিটা সে আজও মনে করতে পারে। কলেজের লাইব্রেরিতে, একটা বইয়ের ভেতরে রেখে দেওয়া। বইটা খুলতেই ভাঁজ করা কাগজটা পড়ে গিয়েছিল। সে প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিল, কেউ দেখছে কি না।

নীলাঞ্জনের সঙ্গে প্রথম প্রেমটা সোমদত্তার জীবনে কোনও একদিন হঠাৎ করে নেমে আসেনি। সেটা তৈরি হয়েছিল খুব ধীরে, প্রায় চোখের আড়ালে। কলেজের প্রথম দিকের দিনগুলোতে তারা দু’জনেই নিজেদের মতো ছিল। আলাদা আলাদা বন্ধু, আলাদা আলাদা জগৎ। কিন্তু কিছু মানুষ থাকে, যাদের উপস্থিতি একটু বেশি করে চোখে পড়ে। নীলাঞ্জন ঠিক তেমনই ছিল। ক্লাসের শেষে দাঁড়িয়ে থাকা, ক্যান্টিনে বসে চা খেতে খেতে অকারণে সময় নষ্ট করা, লাইব্রেরির সিঁড়িতে বসে বইয়ের পাতা উল্টানো- এইসব সাধারণ দৃশ্যের মধ্যেই তার উপস্থিতি সোমদত্তার মনে গেঁথে যাচ্ছিল। তখন সে বুঝত না, কেন নীলাঞ্জন থাকলে চারপাশটা একটু আলাদা লাগে! কেন তার কথা শুনলে মনটা অকারণে হালকা হয়ে যায়!
একদিন সে বুঝেছিল। খুব ছোট একটা মুহূর্তে। কলেজের করিডোরে দাঁড়িয়ে নীলাঞ্জন তাকে জিজ্ঞেস করেছিল,
“তুমি কবিতা পড়ো?” প্রশ্নটা খুব সাধারণ ছিল, কিন্তু সেই প্রশ্নের পরেই সোমদত্তার বুকের ভেতরে একটা হালকা কাঁপুনি উঠেছিল। সে বুঝতে পারেনি কেন। শুধু জানত, এই কাঁপুনি অস্বস্তির নয়। সেদিন বিকেলে বাড়ি ফিরে সে বারবার সেই প্রশ্নটার কথা ভেবেছিল। এই ভাবনাটা নতুন ছিল, অচেনা ছিল, আর সেই কারণেই একটু ভয়ও লাগছিল।তারপর ধীরে ধীরে তাদের দেখা হওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছিল। খুব পরিকল্পিত কিছু নয়। কখনও ক্লাসের পর, কখনও কলেজ ছুটির পরে। কখনও পাঁচ মিনিট, কখনও আধঘণ্টা। কথা খুব গভীর হত না। তবু সেই অল্প কথার মধ্যেই একটা অদ্ভুত টান ছিল। নীলাঞ্জনের কথা বলার ভঙ্গি সোমদত্তার খুব পরিচিত হয়ে গিয়েছিল। কথা বলার সময় সে মাঝেমধ্যে থেমে যেত, যেন শব্দ বেছে নিচ্ছে। সেই থেমে যাওয়াগুলো সোমদত্তার ভাল লাগত। মনে হত, এই মানুষটা কথা বলার আগে ভাবে।

চিঠির কথা মনে পড়তেই সোমদত্তা হালকা করে হাসল। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে চিঠির কথা ভাবলে নিজেরই অদ্ভুত লাগে। তখন মোবাইল ছিল না, বা থাকলেও এইভাবে জীবনের সঙ্গে মিশে যায়নি। নীলাঞ্জনের প্রথম চিঠিটা সে আজও মনে করতে পারে। কলেজের লাইব্রেরিতে, একটা বইয়ের ভেতরে রেখে দেওয়া। বইটা খুলতেই ভাঁজ করা কাগজটা পড়ে গিয়েছিল। সে প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিল, কেউ দেখছে কি না। তারপর কাগজটা খুলে পড়েছিল। খুব সাধারণ লেখা। কোনও বড় প্রতিশ্রুতি নেই, কোনও প্রেমের ঘোষণা নেই। শুধু লেখা ছিল, “আজ তোমার সঙ্গে কথা বলতে ভাল লেগেছে।” এই এক লাইনে তার মনে হয়েছিল, কেউ যেন তার ভেতরের দরজাটা হালকা করে খুলে দিল। চিঠি আসা-যাওয়ার দিনগুলো খুব তাড়াতাড়ি তাদের জীবনের অংশ হয়ে গিয়েছিল। চিঠির অপেক্ষাটা ছিল সবচেয়ে বড় অনুভূতি। কলেজে ঢুকে প্রথম কাজ হত, আজ চিঠি আসবে কি না। নীলাঞ্জনের হাতের লেখা সে চিনে ফেলেছিল। খামের ওপর সেই লেখা দেখলেই বুকের ভেতরে কেমন একটা আনন্দ হতো। কোনওদিন চিঠি না এলে মনটা ভারী হয়ে থাকত। তখন সে বুঝত না, এই মনখারাপটার নাম কী। শুধু জানত, নীলাঞ্জনকে না দেখলে, তার লেখা না পড়লে দিনটা ঠিক পূর্ণ হয় না।

একদিন না দেখলে মনখারাপ, এই কথাটা তখন তাদের কাছে খুব স্বাভাবিক ছিল। ক্লাসে নীলাঞ্জন না এলে সোমদত্তার মন বসত না। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকত, অকারণে ঘড়ি দেখত, বন্ধুদের কথা শুনেও শুনত না। আবার পরে জেনেছিল, নীলাঞ্জনও নাকি এমন দিনগুলোতে অকারণে কলেজ ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াত, যেন হঠাৎ দেখা হয়ে যাবে। এইসব ছোট ছোট অভ্যাসই তাদের প্রেমের আসল রূপ ছিল। প্রথম হাত ধরা হয়েছিল খুবহঠাৎ। কলেজ থেকে ফেরার পথে, রাস্তা পার হওয়ার সময়। গাড়ির ভিড় ছিল, নীলাঞ্জন তার হাতটা ধরে টেনে নিয়েছিল। সেই স্পর্শটা খুব অল্প সময়ের ছিল, কিন্তু সোমদত্তার মনে হয়েছিল, কেউ যেন তার শরীরের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ বইয়ে দিয়েছে। সেই হাত ছাড়ার পরেও তার হাতটা অনেকক্ষণ গরম ছিল। সে রাতে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষণ। এত সাধারণ একটা হাত, অথচ কত অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে এসেছে। তখন ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা খুব একটা কথা বলত না। ভবিষ্যৎটা যেন খুব দূরের কিছু ছিল। বর্তমানটাই ছিল সব। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চাপ বাড়তে শুরু করেছিল। পরীক্ষা, চাকরি, বাড়ির প্রত্যাশা সবকিছু একসঙ্গে এসে পড়েছিল। তখন থেকেই নীলাঞ্জনের সঙ্গে সোমদত্তার কথাবার্তায় একটা অদ্ভুত দূরত্ব ঢুকে পড়েছিল। বড় ঝগড়া হয়নি কোনওদিন। শুধু কথা কমে গিয়েছিল। চিঠি কমে এসেছিল। দেখা হলেও আগের মতো স্বচ্ছ ছিল না।

একদিন কোনও বিশেষ ঘটনা ছাড়াই সবকিছু বদলে গিয়েছিল। কোনও নাটকীয় বিচ্ছেদ নয়, কোনও শেষ কথাও নয়। শুধু ধীরে ধীরে তারা একে-অপরের জীবনের প্রান্তে সরে গিয়েছিল। সেই দিনটার কথা সোমদত্তা আজও ভুলতে পারেনি। কলেজ ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে সে বুঝেছিল, নীলাঞ্জন আর আসবে না। সেই বুঝে ফেলার মুহূর্তটাই ছিল সবচেয়ে কষ্টের। কারণ সেখানে কোনও উত্তর ছিল না, কোনও কারণ ছিল না। আজ বইমেলা থেকে ফিরে সেই সব স্মৃতি একে একে তার ভেতরে ফিরে এসেছে। চিঠির কাগজের গন্ধ, কলেজের করিডোর, একদিন না দেখলে মনখারাপ। সবকিছু। সোমদত্তা বুঝতে পারছিল, নীলাঞ্জনের সঙ্গে তার প্রেমটা কোনওদিন শেষ হয়নি, শুধু অসমাপ্ত থেকে গিয়েছে। আর অসমাপ্ত জিনিসগুলোরই স্মৃতি সবচেয়ে বেশি থাকে। সে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাল। অন্ধকার জমেছে। রাস্তার আলো জ্বলছে। নীলাঞ্জন এখন অন্য জীবনে, অন্য কারও সঙ্গে। সে নিজেও নিজের জীবন বেছে নিয়েছে। তবু এই স্মৃতিগুলোই তাকে গড়ে তুলেছে। প্রথম প্রেম মানুষকে ভেঙেও দেয়, আবার শক্তও করে।

সোমদত্তা ধীরে শ্বাস নিল। বুকের ভেতরের কাঁপনটা একটু শান্ত হল। স্মৃতি আজ কথা বলে নিল। কাল আবার চুপ করে যাবে। কিছু প্রেম পাওয়া যায় না, শুধু মনে পড়ে। আর কিছু প্রেম সারা জীবন নীরবে থেকে যায়। 🍁 (ক্রমশঃ)

 

 

🍂গদ্য 

 

সত্যজিৎ রায় বাংলা সাহিত্যে ‘প্রফেসর শঙ্কু’ ও ‘ফেলুদা’ নামে দুটি জনপ্রিয় চরিত্রেরও স্রষ্টা। প্রফেসর শঙ্কুর বৈজ্ঞানিক কাহিনীগুলি ডায়েরির আকারে লিপিবদ্ধ। বিজ্ঞানীর রহস্যজনক অন্তর্ধানের পর ডায়রিটি উদ্ধার করা হয়। এছাড়াও লিখেছেন, ছোটগল্প, প্রবন্ধ… উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধের মধ্যে ‘our films’ , ‘ their films’, ‘একেই বলে শ্যুটিং’ প্রভৃতি। ওঁর পিতা কবি সুকুমার রায়ের মতোই সত্যজিৎও ধাঁধা ও শব্দকৌতুকের দিকে গভীরভাবে আকৃষ্ট ছিলেন।

 

সত্যজিৎ রায় : অনন্য ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব

রোনক ন্দ্যোপাধ্যায়

রায় পরিবারের সন্তান মানিক ওরফে সত্যজিৎ রায় জীবন শুরু করেছিলেন অন্নভাবে। ফরাসি পরিচালক জঁ রনোয়ারের সঙ্গে সাক্ষাতে ও পরবর্তীতে লন্ডনে গিয়ে ‘ভিত্তোরিও দে সিকার’ ও ‘লাদ্রি দি বিচিক্লেত্তে’ ছবি দু’টি দেখে চলচ্চিত্র পরিচালনায় অনুপ্রাণিত হন। সত্যজিৎ ৩৭ টি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’ অবলম্বনে তিনি তৈরি করেন, অপু ত্রয়ী-এর। নিজের পরিচালনায় প্রথম ছবি এটি। প্রথম ছবিতেই দর্শকদের মাত করে দেন। ‘পথের পাঁচালী’ ১১ টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করে। যার মধ্যে ‘কান চলচ্চিত্র উৎসব’-এ পাওয়া ‘শ্রেষ্ঠ মানব দলিল’। পন্ডিত রবিশংকর-এর সঙ্গীতাবহ, দুলাল দত্ত-এর সম্পাদনা ও সুব্রত মিত্রের চিত্রগ্ৰহণে রচিত ‘পথের পাঁচালী’ ভারতীয় চলচ্চিত্রের সামাজিক বাস্তবতার এক অভিনব ‘সমান্তরাল ধারা’ সৃষ্টি করে। ‘অপরাজিত’ ও ‘অপুর সংসার’ ‘অপু ত্রয়ী’-এর এই দ্বিতীয় ও তৃতীয় ছবি দর্শক-মহলে সুখ্যাতি অর্জন করে যা এখনও অব্যাহত। রাজশেখর বসু-এর ‘পরশুরাম’ অবলম্বনে রায়সাহেব মানে সত্যজিৎ রায় তৈরি করেন, এক পরাবাস্তব, হাসি ও যাদুর সিনেমা ‘পরশ পাথর’। ররবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর তিনটি ছোটগল্প নিয়ে রচিত ‘তিন কন্যা’। এটি তিনটি চলচ্চিত্রের সংকলন,যে চলচ্চিত্রসমূহে নারী জীবনের নানান দিক দৃশ্যায়িত। রবীন্দ্রনাথ-এর ‘নষ্টনীড়’ অবলম্বনে ‘চারুলতা’ ছবিটির সার্থক রূপায়ণে তিনি অর্জন করেন ‘বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব ‘ -এর ‘সিলভার বেয়ার পুরষ্কার’।

ভারতীয় ও বিশ্ব বাঙালির কাছে তিনি এক সাংস্কৃতিক প্রতিভূ। তা-ই নয়, ছিলেন বাঙালির আবেগের কারিগরও। গল্পের আসরে তারিণী খুঁড়োরুপে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। যেমন প্রফেসর শঙ্কুর মতো বৈজ্ঞানিক তত্ত্বভিত্তিক লেখা তেমনই ছোটদের জন্যে একের পর এক হাস্যরসাত্মক ছবি। বাঙালির ‘মানিকদা’ সমস্ত বয়সের সমস্ত শ্রেণীর মানুষের কাছে সমানভাবে উল্লেখযোগ্য ও সুদুরপ্রসারী চিন্তন মননের ফসল বুনে গেছেন।

সত্যজিৎ রায় ছিলেন একাধারে পৃথিবীখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, শিল্পনির্দেশক, সঙ্গীত পরিচালক ও সুদক্ষ লেখক। সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়-এর কাহিনী অবলম্বনে রচিত ‘জলসাঘর’ ছবিটিতে একদিকে যেমন জমিদার বিশ্বম্ভরবাবুর দম্ভ ও অহংকারের প্রকাশ ঘটেছে, অপরদিকে জমিদারের সঙ্গীতপ্রীতির পরিচয়ও সাবলীলভাবে দেখা গেছে। আধুনিক কালের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র স্রষ্টা এই মহান ব্যক্তিত্ব।

সত্যজিৎ রায় বাংলা সাহিত্যে ‘প্রফেসর শঙ্কু’ ও ‘ফেলুদা’ নামে দুটি জনপ্রিয় চরিত্রেরও স্রষ্টা। প্রফেসর শঙ্কুর বৈজ্ঞানিক কাহিনীগুলি ডায়েরির আকারে লিপিবদ্ধ। বিজ্ঞানীর রহস্যজনক অন্তর্ধানের পর ডায়রিটি উদ্ধার করা হয়। এছাড়াও লিখেছেন, ছোটগল্প, প্রবন্ধ… উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধের মধ্যে ‘our films’ , ‘ their films’, ‘একেই বলে শ্যুটিং’ প্রভৃতি। ওঁর পিতা কবি সুকুমার রায়ের মতোই সত্যজিৎও ধাঁধা ও শব্দকৌতুকের দিকে গভীরভাবে আকৃষ্ট ছিলেন। ফেলুদার গল্পে অনেক সময়ই ফেলুদাকে ধাঁধার সমাধান করে রহস্য উন্মোচন করতে দেখা গেছে। ফেলুদার সঙ্গীরূপে জটায়ু ও তোপসের ভূমিকাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ‘ফেলুদা’ চরিত্রটির পাশাপাশি জটায়ু ও তোপসে এই দুই চরিত্রকে তিনি নিপুণভাবে তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। তেমনি যেন ওদের জীবন্ত করেছেন কলমের দক্ষ ব্যবহারে। ‘জটায়ু’ চরিত্রটিকে হাস্যোজ্জ্বল ভূমিকায় অবতীর্ণ করে আদ্যোপান্ত গোয়েন্দা গল্পেও তিনি হাস্যরসের উপাদান বাঙালির মনে গেঁথে দিয়েছিলেন। জটায়ুর সেই বিখ্যাত উক্ত ‘হাইলি সাসপিসাস’ এই শব্দবন্ধটি আজও বহু বাঙালির মুখে মুখে ঘুরে চলেছে।

‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ সত্যজিতের এক বিশ্ববিশ্রুত চলচ্চিত্র। সাড়ে ছয় মিনিটের ভূতের নৃত্যের দৃশ্য ও ভারতীয় কায়দায় নির্মিত স্পেশাল ইফেক্টের সঙ্গে রায় সাহেবের নিজস্ব চিত্রনাট্য ও সঙ্গীত পরিচালনা শুধু ছোটদের নয়, বিভিন্ন বয়সের মানুষের মনে সুদীর্ঘ ছাপ ফেলে। ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ চলচ্চিত্রটি বেনারস শহরে ঘোষাল বাড়ির গণেশমূর্তি চুরি যাওয়াকে কেন্দ্র করে রচিত। গোয়েন্দা ফেলুদার হস্তক্ষেপে রহস্য সমাধানের অভূতপূর্ব উত্তেজনাময় চলচ্চিত্র হিসেবে এক বিশেষ সফলতা লাভ করে। ‘সোনার কেল্লা’ তাঁর নিজস্ব গোয়েন্দা উপন্যাস। এক জাতিস্মর বালককে কেন্দ্র করে কাহিনী আবর্তিত। ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ র জয়সলমিরের হাল্লা রাজার দুর্গ হয়ে ওঠে ‘সোনার কেল্লা’। সত্যজিৎ রায়ের আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ছবি হল ‘ চিড়িয়াখানা’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’ প্রভৃতি। রচনা করেছেন ‘রে রোমান’ ও ‘রে বিজার’ নামক দুটি টাইমপেস।

সত্যজিৎ রায় ছিলেন এক বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ব্যক্তিত্ব। ভারতীয় ও বিশ্ব বাঙালির কাছে তিনি এক সাংস্কৃতিক প্রতিভূ। তা-ই নয়, ছিলেন বাঙালির আবেগের কারিগরও। গল্পের আসরে তারিণী খুঁড়োরুপে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। যেমন প্রফেসর শঙ্কুর মতো বৈজ্ঞানিক তত্ত্বভিত্তিক লেখা তেমনই ছোটদের জন্যে একের পর এক হাস্যরসাত্মক ছবি। বাঙালির ‘মানিকদা’ সমস্ত বয়সের সমস্ত শ্রেণীর মানুষের কাছে সমানভাবে উল্লেখযোগ্য ও সুদুরপ্রসারী চিন্তন মননের ফসল বুনে গেছেন।

এই মহান ব্যক্তিত্ব জীবদ্দশায় পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। পেয়েছেন ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কার ‘দাদা সাহেব ফালকে’। এছাড়াও ‘লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট’, ‘পদ্মভূষণ’, ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’, ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মানসূচক পদক ‘ন্যাশনাল অর্ডার অব দ্য লেজিও অব অনার’, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডিগ্রিসহ আরও বিবিধ সম্মান ও পুরস্কার। তাঁর পরিচালনায় শেষ ছবি ‘আগন্তুক’। এই ছবিটি তাঁর লেখা ছোটোগল্প ‘অতিথি’ অবলম্বনে রচিত। সত্যজিৎ ছিলেন মনে প্রাণে বাঙালি। তাঁর সময়ে সুব্রত মিত্রের ‘বাউন্স আলোকসজ্জা’ কৌশল যথেষ্ট কৃতিত্বের পরিচায়ক। রায়সাহেবের অনুপুঙ্খ পরিকল্পনা ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বাংলা চলচ্চিত্রকে সবিশেষ উচ্চতা দান করে। ২০০৪ সালে বিবিসির সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির মধ্যে ত্রয়োদশ স্থান লাভ করেন।

অঞ্জন দত্ত তাঁর গানে গানে সত্যজিৎ রায়কে সম্বর্ধনা জানিয়েছেন : “বুদ্ধি আমার শানিয়ে নেয়া,কিছুই দৃষ্টি এড়ায় না….

গল্পে আমি দিব্যি ছিলাম, গ্ৰীষ্ম বর্ষা শরৎ শীত

আমার গল্প সঙ্গে নিয়ে চলে গেলেন সত্যজিৎ।”

সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টি, শিল্পকর্ম, সাহিত্যকর্ম আজও বাঙালির স্মরণে মননে চির জাগরুক। তিনি আজীবন থেকে যাবেন বাঙালির হৃদয়ে,বাংলা চলচ্চিত্রের রূপকার ও বাঙালির আবেগের কারিগররূপে। আজও তাঁর জন্মদিন ‘RAY DAY’ রূপে বাঙালির কাছে সম্মানের সঙ্গে পালিত হয়। বাংলা চলচ্চিত্র ও সাহিত্যজগতে ওঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে, থাকবেও একটি দীর্ঘ মাইলফলক হয়ে।🍁

 

 

🍂বিতা 

 

প্রণব মুখোপাধ্যায় -এর দু’টি কবিতা

শব্দহীনতা…

রাস্তার ধারে আমিও থেমে
মাটির গভীরে শিকড়…
একটি নিঃশব্দ বৃক্ষের মতো

সেদিন তুমি কার সঙ্গে কত কথা বলেছিলে…
সেই কথাগুলো হাওয়া হয়ে এসে
আমার পাতায় পাতায় দুলছিল

কিছু শব্দ পাখির মতো
উড়ে এসে ডালের কোণে ছোট্ট আশ্রয় বানাল

তোমার ঝলমলে মুখে সন্ধ্যার বাতাস
বুকের ভেতর জমে থাকা আলো খুলে দিলে
এক মুঠো আবীর ছুঁড়ে দিলে শব্দহীনতার দিকে

কে যেন তখন তোমার দিকে নত
খুলে দিল তার নীল দরজা

তুমি সেই দরজায় নীরব
একটি চুম্বন রেখে এলে

আমি দেখলাম সব কিছু বললাম না
শুধু মাটির ঘ্রাণে ভিজতে ভিজতে
ধীরে ধীরে আরও সবুজ হয়ে উঠলাম

 

এ অপেক্ষা

একটি দীর্ঘ ছায়া বৃক্ষের মতনই স্থির

তুমি অচেনা বন্ধুর সাথে গভীর আলাপে
তোমার উচ্চারিত শব্দগুলো
ছোট ছোট দৌড়ে আসা কাঠবিড়ালির মতো
আমার ওপর খেলছিল

কিছু বাক্য উড়ে গেল ভাষা-পাখি হয়ে
আমার ডালে ডালে নীড় বানাল…

তুমি হঠাৎ চুল খুলে দিলে
বুকের ভেতরের গোপন নদী
মুক্ত হল
সেই নদীর জলে
একটা অদৃশ্য অপেক্ষা

তোমার ঈশ্বর যেন দূর নক্ষত্রের পথে হাঁটছে
তুমি সেখানে পাঠালে কিছু…
আমি ততক্ষণে শব্দহীন ঘাসের মতন
মাটির মতন ধৈর্য শিখে নিয়েছি

 

 

বৃন্দাবন দাস -এর একটি কবিতা 

রাজার ভাগ্নে 

অনেক এ্যারিস্টোক্রেসির গল্প শুনেছি
অনেক অনেক গল্পের কথা আজও সত্যি নাকি
ওগুলো কেমন যেন রাতের গল্পই মনে হয়
ওগুলো রাতকে আরো কাছে আনে
রাতকে ঘুমরাত থেকে বহুময় করে তোলে
অনন্ত মোহিনী রহস্যময়ী করে তোলে

আমি কেন যে রাতের গল্প বানাতে পারি না
অনন্ত রাতেই আমাদের অনন্ত কৌতুক
রাতের পথ ধরেই আমাদের চলা
পথ খোঁজা
হয়তোবা কোথাও দিশার ইঙ্গিত

বন্ধুদের এত এত রাতের গল্প ভালো লাগে
বন্ধুটির এত এত এ্যারিস্টোক্রেসি ভালো লাগে
আমি সেই জঞ্জালের মানুষই রয়ে গেলাম
শুধু ক্ষুধার্ত শিশু অশ্লীল মা
বিপন্ন বোনের অসীম নোনাসমুদ্র

আমি আজও ঢেউ গুনতে থাকি
রাজার ভাগ্নে

 

 

নার্গিস পারভিন -এর একটি কবিতা

চোরাবালি

বাতাস গতিপথ বদলাবে;
স্বপ্ন দেখেছিল চায়ের দোকানী, মুদি- ময়রা, বেকার হাভাতে
স্বপ্ন দেখেছিল যুবক-যুবতী, কন্যা সন্তানের পিতা
স্বপ্ন বুনেছিল আবাল-বৃদ্ধা-বনিতা

চোরাবালির ভিতরে হাঁসফাঁস করছে প্রত্যাশা
নাভিশ্বাস উঠছে মধ্যবিত্ত বুকে
তার পরে যারা-
মানুষ না, ভোটারের স্তরে যদি ওঠে
ধন্য হবে বেঁচে থাকা

অজগরটা কি আরও ওপরে উঠে আসবে একে বেঁকে?
কিনে ফেলবে সম্পূর্ণ আকাশ?

 

 

বিবেকানন্দ দাশ -এর তিনটি কবিতা

গন্ধ

দীর্ঘ নীরবতা
তারপর ধূসর
আলোর আস্তরণ
তারপর
আমাদের অদৃশ্য রাত

কিছু স্বপ্ন
রেখেছিলাম একদিন
কোথায়? মনে পড়ে না…

হয়ত হৃদয়ের ভেতর
হয়ত ভাঙা সময়ের ওপর
হয়ত আরেকটি
স্বপ্নের পাশে।

 

স্থিরতা 

একটানা শূন্যতা
তারপর ফিকে হলুদের ছোঁয়া
নিঃশব্দ এক রাত্রি

কিছু পাতা
ছড়িয়েছিলাম কোথায়?
কি জানি…
হয়ত ধুলোয়
হয়ত স্মৃতির ওপর
হয়ত আরও কিছু পাতার ভিতর।

 

 

রাতের ইশারা 

লম্বা নির্জনতা
তারপর গাঢ় ছায়ার পরত
আমাদের ঘুমহীন রাত
কিছু আলো—
শ্বাসের কাছে
শেষ বিকেলের ওপর
আরও কিছু ঝর্ণার পাশে।

 

 

কেয়া চক্রবর্তী -এর একটি কবিতা

প্রতিজ্ঞা 

সব পথের হারিয়ে ফেলেছি
এখন ঈশ্বর ছাড়া কাউকে বিশ্বাস করি না।

পড়ে যাওয়ার পর আবার উঠে দাঁড়ানো
দিনের ভিতর রাত রাতের ভিতর আবার দিন—

তাঁর কাছেই আমরা মাথা ঝুঁকই
সব অলৌকিকতার আবরণ সরিয়ে
তিনি হঠাৎই আমাদের সামনে এসে দাঁড়ান

পুরনো চিহ্নগুলি মাটিতে পড়ে থাকে
আমরা আবার শৈশবের মতো কাঁপা পায়ে হাঁটি
হাতের উষ্ণতা ধরে নতুন পথ চিনে নিই।

আমি তো আমার না!

 

 

অসীম হালদার -এর একটি কবিতা

বীণা বাদকের মজলিস…

.

বীণাটি কাঁপে
স্পর্শে জেগে ওঠে তার সুর।
কার স্পর্শ?
ফুলের গন্ধ ভেসে যায় অনুক্ষণ,
সময় যেন থেমে থাকে বিস্ময়ের ঘোরে।
স্বপ্নেরা ডাকে–
মনে হয় তুমি একটি লম্বা গান

২.

অদৃশ্য ডানায় ভেসে আসছে ডাক
কার যেন অমল স্মৃতি জড়িয়ে ধরেছে মন।
বইয়ের পাতা কাঁপে আকাঙ্ক্ষায়
জেগে ওঠে গোপন ব্যাকুলতা।
অতল কোনো সুরে দুলে উঠল প্রাণ।

যেন অনন্তের দিকে ছুটে যায় সব।

.

অরণ্যে বুনো ফুলের হাসি
তার গন্ধে মিশে আকুলতা
বুকের ভেতর স্রোত
মুহূর্ত হয়ে ওঠে অনন্তের মতো…
স্বপ্ন উড়ে যায় সীমাহীন কল্পনায়
মানুষ তখন শুধু বিস্ময়ের সন্তান।

 

 

গৌরব সাহা -এর একটি কবিতা

জীবনের গোপন গন্ধ 

বনের বুকে ঝরে নরম সন্ধ্যা,
মলিন গোলাপের গন্ধে ভেসে ওঠে স্বপ্নের যান।
মেঘ যেন ধীর নীল বিষণ্নতা…
পাতার ফাঁকে বাজে পাখির গোপন ব্যাকুলতা।

ক্লান্ত দিনের শেষে নেমে আসে নরম সোনালি ঘুম
শিশিরের কাঁপা কাঁপা শব্দে জেগে ওঠে নীরব ভুবনভূমি।
একটি তারা জ্বলে ওঠে দূর অনন্ত ছায়ায়
মনে হয় স্বর্গের কোনও সুর হারিয়ে গেছে রাত্রির রথে।

এই ক্ষণিক সৌন্দর্যেই হৃদয় অনন্ত।
যাপনের ছায়াতেও থাকে জীবনের গোপন গন্ধ।

 

 

 

🍂ধারাবাহিক উপন্যাস /২
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হল সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।

 

হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা

মমতা রায় চৌধুরী

সুনয়নাদি

৮.

এক দুঃসহ রাত্রি যেন পার করল পবিত্র। কি অবস্থা তিথির!একদিকে ওর মায়ের শরীর খারাপ, অন্যদিকে ওর বোনজির এরকম একটা খারাপ খবর; তারপর আবার ও-নিজে এতটা কেয়ারলেস হয়েছে। শরীরের বারোটা বাজিয়েছে।
ঘুম কাতর পবিত্রর এক নিমিষে যেন সবকিছু হারিয়ে গিয়েছে। ও-আগে তিথিকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে প্রেশারটা চেক করে নিল। অন্যদিকে বুবুনও কাঁদছে মায়ের এই অবস্থা দেখে। প্রেসারটা অনেক হাই হয়ে গিয়েছে। এত রাত্রে ডক্টর অনির্বাণকে ফোন করবে, ঠিক হবে না। এর আগে একবার এরকম অবস্থা হয়েছিল ওর প্রেসারের ওষুধ ছিল খাইয়ে দিল। আগের থেকে একটু স্বাভাবিক আছে বুবনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে আর বলছে, আমার বোনটার কি হবে গো?
একবার ফোন করবে?
পবিত্র বলল, সকাল হোক ফোন করব। এখন তোমার নিজেরও শরীরটা খারাপ তুমি একটু স্টেবল হও। বুবুন মাকে ছেড়ে দাও। এসো আমি তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিই।
অন্যদিকে শ্বেতাম্বরী এসে তিথির পাশটাতে বসে থাকল কিছুতেই ওকে শোয়ানো গেল না।
শুধু মানুষেরই কি অনুভূতি থাকে? না। একদমই ভুল কথা সমস্ত জীবেরই থাকে। শ্বেতাম্বরীকে দেখে সেই ভাবনাটা দৃঢ় হল। বুবুন আর শ্বেতাম্বরীকে আদর করল পবিত্র তারপর তিথির পাশে শ্বেতাম্বরীকে শুইয়ে দিল। তিথির বালিশে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। পবিত্র সিগারেট ধরিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে টান দিল। কুয়াশায় চারিদিক ঢেকে আছে জীবনের কুয়াশার সঙ্গে যেন বাস্তবের কুয়াশার কিছুটা মিল পাচ্ছে। এই কুয়াশা কী ক্রমশ গাঢ় হবে, না রোদের উজ্জ্বল মুখ কুয়াশাকে সরিয়ে দেবে। কি যে হতে চলেছে কে জানে! এরপর যদি ঈশ্বর না করুন মায়ের কিছু হয়ে যায় তাহলে কি যে হবে বুঝতেই পারছে না পবিত্র। দিকভ্রান্ত নাবিকের মতো দিক খোঁজার চেষ্টা করছে কিন্তু যেন মনে হচ্ছে এ দিক খুঁজে পাবার নয়।
ব্যালকনি থেকে এসে দেখতে পেল তিথি ঘুমোচ্ছে এদিকে সকাল হয়ে গিয়েছে। না, ওকে ডাকলে চলবে না। একটু রেস্ট নিক। পবিত্র রান্নাঘরে গিয়ে চা করল, শ্বেতাম্বরীকে দুধ গরম করে সঙ্গে রুটিটা ছিঁড়ে মেখে দিল। বুবুনের জন্য হরলিক্স এনে খাইয়ে দিল। মাকেও এক কাপ চা দিয়ে আসলো।

খুব কষ্ট লাগে আমরা কী আর নিজের ইচ্ছেতেই ওখানে গেছি বলো? মানুষের জীবনে কার কী আসে কে বলতে পারে। আমরাই সেই হতভাগী যাদের পাঁকের মধ্যে গিয়ে পড়তে হয়েছিল। সেই পাঁকে যে পদ্মফুল ফুটতে পারে সেটা কল্পনা করতে পারিনি।

অন্যদিকে কলিং বেল বাজছে হরি হরায়ে নম কৃষ্ণ যাদবায় নমঃ। পবিত্র গিয়ে দরজা খুলতেই সুনয়না ঢুকে পড়ল।
–উফ কি ঠাণ্ডা হাত-পা অসাড় হয়ে যাচ্ছে। দাদা আপনি আজকে দরজা খুললেন বৌদি কোথায়?
–তোমার বৌদির শরীরটা খুব খারাপ
–ঘুমোচ্ছে।
–কী হয়েছে দাদা!
সুনয়না মনে মনে ভাবছে টাকার কথাটা কিভাবে বলবে? ভেবেছিল দু’দিন ছুটি নেবে সে কথাই বা কেমন করে বলবে?
যতই কাজ করুক মানবিকতা বলে তো একটা ব্যাপার আছে।
একবার তিথির ঘরের দিকে উঁকি মারল। তারপর আস্তে আস্তে নিজের কাজে হাত লাগাল।
–দেখো কাজগুলো সব ঠিকঠাক করে যেও বৌদি তো দেখতে পারছে না।
–হ্যাঁ দাদাবাবু আমি ঠিকঠাকই কাজ করব।
–আর একটা কথা বলি
এই সময় যেন আর কামাই ক’রো না। ওর মানসিক অবস্থাও ভাল নেই, আর শরীরটাও ভাল নেই।
সুনয়না কোন রা কাটল না।
পবিত্র ওর ভাগগতিক কিছু বুঝতে পারল না তারপর দেখল ও-একা একাই আস্তে আস্তে নিজের মনে গজগজ করছে। এখনও ওদিকে কান দিয়ে লাভ নেই।
পবিত্র বলল, তোমার বৌদির বোনের মেয়ে মারা গিয়েছে।
একবার অবাক হয়ে সুনয়না মুখের দিকে তাকাল,
কি বলবে ভেবে পেল না। শুধু মুখ থেকে বেরল, এ বাবা!
কিছুক্ষণ পর তিথি বলছে –সুনয়নাদি এসেছে?
–হ্যাঁ, এসেছে। থাক তুমি ঘুমাও তোমাকে এখন উঠতে হবে না
স্কুলের টাইম হয়ে যাবে। আরে যাক না বাবা কত ছুটি আছে, কত অন ডিউটি আছে তুমি তো নাওনি কিছু।
–না রে বাবা কাজও তো আছে। –কাজ তো থাকবেই জীবনের ও তো দাম আছে।
পবিত্র আর কিছু বলল না
আজকে আমিও যাব না। বুবুনকে স্কুলে দিয়ে আসি।
–মাম মাম স্কুলে যাব না।
–এই এক বায়না হয়েছে আমরা না গেলে,ও যাবে না।
আচ্ছা শোনো, আবার নতুন বায়না হয়েছে ও-আঁকার স্যারের কাছে যাবে না।
–এভাবে বলতো ঘনঘন টিচার চেঞ্জ করা যায়। তাহলে কার কাছে দেবে?
–ওতো বলছে আকাশ স্যারের কাছে শিখবে।
–তাই দাও আর কি করবে!
–তাহলে আজকে যখন ছুটি নিলে একবার আকাশের সঙ্গে কথা বলো গিয়ে।
–ওকে চিনব কি করে?
আরে সেদিন আমাদের বাড়িতে এসেছিল। আকাশ ওকে খুব আদর করছিল দিয়ে জিজ্ঞেস করছিল আঁকাআঁকির ব্যাপারে।
বুবুনও খুব উৎসাহী হয়ে আঁকার। খাতা দেখাচ্ছিল।
আকাশ খুব প্রশংসা করেছিল।
এবং একটা খুব সুন্দর ছবি এঁকেছিল ওর খাতায় তাই দেখে উনি এখন বায়না ধরেছেন ওর কাছেই আঁকা শিখবে।
–আচ্ছা তাই দাওনা ওর শিশু মনে আঘাত দিয়ে লাভ নেই।
এমন সময় সুনয়নাদি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে।
পবিত্র বলে, কি ব্যাপার তুমি এখানে দাঁড়িয়ে?
কোন কথা বলছে না।
তিথি বলল, কিছু বলবে?
বলছি, সেদিনকার কথাটা মনে আছে?
–ও হ্যাঁ হ্যাঁ। একটু দাঁড়াও দিচ্ছি
আর শোনো এই সময় কামাই করলে চলবে না আমি একটু বোনের বাড়ি যাব, আমার বোন জি মারা গেছে তো ও-খুব ভেঙে পড়েছে। তোমাকে কিন্তু বাড়িতে একটু থাকতে হবে। মা আছে মার একটু দেখাশোনা করতে হবে। –কাগুজি মাসি আসবে না?
–কেন এখন কাগজি মাসি আসবে কেন?
–কাগজি মাসি তো তোমাকে কাজে দিয়ে গেছে। আজ দুপুর বেলাতেই আমি বেরিয়ে যাব।
তুমি বাড়ি যাও বাড়ি গিয়ে রান্নাবান্না করে তারপরে এসো। মাকে একটু খেতে দিয়ে দেবে। বিকেলবেলা চা টা করে দেবে।
–রাত্রে ফিরবে তো?
–হ্যাঁ। ফিরব। আর শোন, শ্বেতাম্বরীকেও টাইমে খাবারটা দিয়ে দেবে।
–বেশ বেশ…
–কথার জন্য অন্যথা হয় না সুনয়না দি।
–না গো, আসবো।
টাকাটা বের করে তিথি ওর হাতে দিল।
–নাও গুনে নাও।
–আবার গুনে নিতে হবে! তুমি কি আর ভুল দেবে?
–তাহলেও টাকা পয়সার ব্যাপার তো গুনে নিতে হয় গুনে নাও।
–আমার যে কত উপকার হল, তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না।
–না না ঠিক আছে মানুষ তো থাকে মানুষের জন্যই।
–আসছি বৌদি।
তিথি শুনেছে কাগজি মাসির কাছে পরে ওর শাশুড়ি মেনে নিয়েছে। বর রাজমিস্ত্রির কাজ
করে। ওদের ঘরের কাজ চলছে কিন্তু শুনেছি সরকার থেকে ঘর করে দিচ্ছে। ওকে বলতে, ও বলেছিল, সব টাকা তো এখন দিচ্ছে না। কিছু টাকা তো নিজেদের খরচ করতে হবে। তাই ওরা সমিতি করে সেখান থেকে টাকা নিয়েছে। তবে ওদের মাসে মাসে সেই টাকা আবার শোধ ও দিতে হয়। না পারলে সুদ গুনতে হয়। যাক গরিব মানুষ সুদ যাতে না দিতে হয়। কথা শুনে চললে তো সবকিছু করতে ইচ্ছে করে এমনিতে মেয়েটা খুব আস্তে আস্তে কথা বলে। একদিন বলছিল বড় মেয়েটা ওর শাশুড়ির কাছেই থাকে। তখন ঠিকই বলেছিল, তাহলে তো তোমার শাশুড়ি মা ভাল গো।
–হ্যাঁ এমনি ভাল। আমিও শাশুড়ির হাতে পাতে করে দিই।
–বড় বউ কী করে
–বড় বউয়ের খুব নাক উঁচু?
–কেন?
–ওরা তোরা আমাদের মত গলির মেয়ে নয় তাই সারাক্ষণই আমাকে কথা শোনায়।
–তুমি কিছু বলো না?
–আমি কি বলব?
–ভাল কথা, সেদিন নিচে আমার জায়েদের কাজের লোক তোমাকে কি বলছিল অত চিৎকার করে?
–হ্যাঁ বলছিল, গলির মেয়ে গলির মেয়ে।
–আরো যত জোরে জোরে বলছিল আর তুমি আস্তে আস্তে কি বলছিলে?
–ওই বারোভাতারী মাগিদের কি বলব বলো?
তারপর তাকিই দেখল পবিত্র আছে কিনা, না কোথাও নেই।
–আরে ওরা যে আমাদের গলির মেয়ে বলে তা আমরা কি আর ভাল সমাজে এসে ভাল হতে পারি না বল? এখন স্বামীর সংসার করলেও আমাদের সেই গলির মেয়ে কথাটা শুনতে হয়। আমাদের যেন এ অপবাদ গায়ে লেখা আছে।
–ছাড় ওদের কথা চামড়ার মুখ তো, কোন কিছু আটকায় না।
–না গো বৌদি। খুব কষ্ট লাগে আমরা কী আর নিজের ইচ্ছেতেই ওখানে গেছি বলো? মানুষের জীবনে কার কী আসে কে বলতে পারে। আমরাই সেই হতভাগী যাদের পাঁকের মধ্যে গিয়ে পড়তে হয়েছিল। সেই পাঁকে যে পদ্মফুল ফুটতে পারে সেটা কল্পনা করতে পারিনি।
–মন খারাপ করো না।
–দেখো বৌদি এরপর যদি ওরকম কোনও কথা বলে আমার সাথে কিন্তু ঝগড়া লেগে যাবে।
–না না তুমি মুখ লাগতে যেও না ওর মুখে ভীষণ মিথ্যে কথা।
সুনয়না টাকাটা নিয়ে গেটটা খুলে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হল।
তিথি যেন লক্ষ্য করল, এক বিষাদহীন মুখের ছবি
এক নিমিষেই যেন রং বদলে দিল।🍁 (ক্রমশঃ)

 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক

 

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী  সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com 

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ বিভাগের লেখা  আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন