সম্পাদকীয়
বসন্ত মানেই শুধু ঋতুর পরিবর্তন নয়, ভালোবাসা ও নবজাগরণের ইশারা বটে। শীতের ক্লান্তি ঝরে গিয়ে যখন প্রকৃতি নতুন পাতায় নতুন ফুলে সেজে ওঠে তখন বাংলার মাটিতেও এক অদৃশ্য সুর বাজতে শুরু করে। সেই সুরের নামই হল বাংলা ভাষা। বসন্ত ও বাংলা ভাষা যেন একে অপরের সহোদর। দু’জনেই নবীন। দু’জনেই প্রাণময়। দু’জনেই চিরসবুজ। ফাল্গুনের হাওয়ায় যখন শিমুল-পলাশ রঙ ছড়ায়, তখন আমাদের মনে পড়ে যায় ভাষার জন্য আত্মত্যাগের ইতিহাস। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু একটি তারিখ ছিল না! এটি বাঙালির তথা বাংলা ভাষার আত্মপরিচয়ের দিন। বসন্তের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ভাষা আন্দোলনের সেই অগ্নিস্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বাংলা ভাষা কেবল আমাদের যোগাযোগের মাধ্যম এ কথায় শেষ করতে পারি না! এটা আমাদের মাতৃভাষা। আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। আমাদের চেতনার আলো। আমাদের প্রতীক।

বসন্ত উৎসব, দোলযাত্রা, কবিতা আবৃত্তি সবকিছুর মাঝেই বাংলা ভাষা প্রাণ পায় নতুন করে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কিংবা জীবনানন্দের কবিতায় যে বসন্তের বর্ণনায় ঋতুচিত্র তা এক সাংস্কৃতিক পুনর্জন্মের ভাষ্য। বসন্ত যেমন পুরোনো পাতা ঝরিয়ে নতুনকে আহ্বান জানায় আবার তেমনি বাংলা ভাষাও যুগে যুগে নিজেকে নবায়িত করে তুলেছে। নতুন শব্দ। নতুন ভাবনা। নতুন সৃষ্টির মাধ্যমে। আজকের বিশ্বায়নের যুগে যখন বহুভাষার ভিড়ে মাতৃভাষা অনেক সময় উপেক্ষিত হয় তখন বসন্ত আমাদের নতুন করে শপথ নিতে শেখায়। বাংলা ভাষাকে ভালোবাসা মানে কেবল আবেগ এ কথা বলা যায় না। বাংলা ভাষা চর্চা, তার শুদ্ধ ব্যবহার এবং তার সৃজনশীল বিকাশ নিশ্চিত করাও বোঝায় । অর্থাৎ বলতে পারি বসন্ত শুধু প্রকৃতির রঙের উৎসব নয়! এও আমাদের বাংলা ভাষার আত্মমর্যাদারও উৎসব। প্রকৃতির মতোই ভাষাকেও ভালোবাসতে হবে। লালন করতে হবে। তবেই বসন্তের সত্যিকারের অর্থ আমাদের জীবনে পূর্ণতা পাবে।🍁
🍂মহামিলনের কথা
শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
যখন গর্ভমধ্যে জন্ম-জন্মান্তরের কথা মনে পড়ে তখন জীব কি করে?
কাতর হয়ে বলে,”পূর্ব্বে সহস্রযোনি দেখেছি, বিবিধ আহার ভোজন করেছি, নানাবিধ স্তন্যপান করেছি, পুনঃ পুনঃ জন্মেছি, মরেছি; পরিজনগণের জন্য যে শুভাশুভ কর্ম্ম করেছি, ফলভাগিগণ চলে গেছে— আমি একা সেই কর্ম্মের জন্য দগ্ধ হচ্ছি। আমি দুঃখসাগরে মগ্ন, এর কোন প্রতিকার দেখছি না, যদি যোনি হতে মুক্ত হতে পারি, তাহলে অশুভক্ষয়কর্ত্তা ফল— মুক্তি-প্রদায়ক মহেশ্বরের শরণাগত হব। যদি যোনি হতে প্রমুক্ত হই, ফলমুক্তি প্রদায়ক নারায়ণের শরণাগত হব; যদি যোনি হতে নিষ্কৃতি পাই, তাহলে অশুভক্ষয়কর ফল-মুক্তিপ্রদাতা সাংখ্যযোগ অভ্যাস করবো। যদি যোনি হতে নির্ম্মুক্ত হই তাহলে সনাতন ব্রহ্মের ধ্যান করবো।” তারপর সূতি বায়ুর দ্বারা প্রেরিত হয়ে সে ভূমিষ্ঠ হয়।

একথা সবাই বলে?
হাঁ, প্রত্যেক মানুষই গর্ভকারাগারে এ’ আদি প্রতিজ্ঞা করে।
তুমি একথা কেন ভুলিয়ে দাও?
না ভোলালে খেলা করবার সুবিধা হয় না।
তোমার খেলার সুবিধার জন্য জীবকে কত কষ্ট দাও।
জীব কে? জানিস্ তো?
তুমি বল।
আমি, আমিই জীব সেজে ‘ভুল ভুল’ খেলা করি।
তোমার এ খেলা থেকে কি করে পরিত্রাণ পাবো?
কেবল ‘কৃষ্ণ কৃষ্ণ’ কর্, বল—
কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ রক্ষ মাম্।
কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ পাহি মাম্॥
🍁শ্রীশ্রীনামামৃত লহরী | শ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী
(বানান সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত)
🍂বিশেষ গদ্য
ভাষা হারালে ইতিহাস হারায়, ইতিহাস হারালে পরিচয় মুছে যায়। আর পরিচয়হীন মানুষ কেবল পরিসংখ্যান হয়ে থাকে : নামহীন, ভাষাহীন। আমাদের প্রশ্ন করা উচিত, কত আউরা আজও পৃথিবীর নানা প্রান্তে বেঁচে আছেন, যাঁদের ভাষা আমরা শুনতে পাই না! তাঁদের কণ্ঠস্বর রেকর্ড করার, বোঝার, মর্যাদা দেওয়ার দায় কী কেবল ভাষাবিদদের? নাকি মানবসমাজের? যতদিন আউরা বেঁচে আছেন, ততদিন একটি ভাষা বেঁচে আছে।
আমাজনের শেষ কণ্ঠস্বর: আউরা-আউরের ইতিহাস ও হারিয়ে যাওয়া ভাষার আর্তনাদ

সংবেদন শীল
ফেব্রুয়ারি মানেই মাতৃভাষার মাস। ভাষার জন্য আত্মত্যাগ, ভাষার অধিকার, ভাষার মর্যাদা এই শব্দগুলো আমাদের চেতনার গভীরে গেঁথে আছে। কিন্তু ভাষা কেবল রাজনৈতিক দাবিদাওয়ার বিষয় নয়; ভাষা মানুষের স্মৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি, পৃথিবীকে বোঝার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। একটি ভাষা বিলুপ্ত হলে শুধু কিছু শব্দ হারায় না, হারিয়ে যায় একটি সম্পূর্ণ জগৎ। এই সত্যের নির্মম প্রতিচ্ছবি লুকিয়ে আছে ব্রাজিলের আমাজনের অরণ্যে, দুই নামহীন মানুষের জীবনে, যাদের আমরা এখানে আউরা ও আউরে নামে চিনব। এই কাহিনির সূত্র জাপানের রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচার সংস্থা NHK-এর একটি তথ্যচিত্র। বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে জাপানে প্রদর্শিত এই প্রামাণ্যচিত্রে উঠে আসে ভাষা হারানোর একটি মর্মান্তিক বাস্তবতা। বহু বছর পরে, ২০১৯ সালে NHK World এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুন করে সামনে আনে। কিন্তু যে প্রশ্নটি থেকে যায়, তা সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে যায় একটি ভাষার শেষ দু’জন বক্তা বেঁচে থাকলে, তাঁদের নীরবতার দায় কার?
আউরার থাকার জন্য একটি টালির ঘর ছিল। একটি চেয়ার, একটি টেবিল, শোয়ার জন্য কাপড়ের দোলনা। আধুনিক জিনিসে তাঁর কোনও আগ্রহ নেই। শুধু বড় রঙিন পুঁতি দিলে মালা গেঁথে গলায় পরেন। সরকারি রান্না করা খাবার আসে। ঘরের পঞ্চাশ মিটার দূরে স্বাস্থ্যকেন্দ্র; দু’জন নার্স দিনরাত খোঁজ নেন। কখনও ভাল মেজাজে তিনি নিজে গিয়ে সকালের চা খান। তারপর ঘরে ফিরে অনর্গল বকবক করেন, যার অর্থ কেউ বোঝে না।
বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর অসংখ্য ভাষা চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বায়ন, আর্থিক সুযোগের লোভ, রাজনৈতিক চাপ, ধর্মীয় আধিপত্য বহু কারণে মানুষ নিজের ভাষা ত্যাগ করে অন্য ভাষা গ্রহণ করছে। স্বেচ্ছায় গ্রহণের প্রশ্নে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা আছে। কিন্তু যখন সংখ্যাগুরু সমাজের আর্থ-সামাজিক চাপে, ভূমি হারিয়ে, বেঁচে থাকার তাগিদে মানুষ নিজের ভাষা ছাড়তে বাধ্য হয়, তখন তা কেবল ভাষা পরিবর্তন নয়, তা সাংস্কৃতিক উচ্ছেদ। আন্দামান থেকে ছোট নাগপুর, পশ্চিমঘাট থেকে উত্তর-পূর্ব ভারত গত কয়েক দশকে বহু ক্ষুদ্র ভাষাগোষ্ঠী নিশ্চিহ্ন হয়েছে। তথাপি আমরা খুব কমই জানি তাঁদের কথা। একই সময়ে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে, ব্রাজিলের আমাজন অরণ্যে ঘটেছে এমন একটি ট্র্যাজেডি, যা ভাষাবিজ্ঞানীদের স্তম্ভিত করে দিয়েছে। আউরা ও আউরে! তাঁদের প্রকৃত নাম কেউ জানে না। ব্রাজিলের সরকারি কর্মীরাই এই দু’টি নাম দিয়েছিলেন, কারণ তাঁদের উচ্চারিত শব্দ কেউ ধরতে পারেনি। ভাষাবিদদের অনুমান, তাঁদের ভাষা সম্ভবত তুপি-গুয়ারানি ভাষা পরিবারের অন্তর্গত ছিল। কিন্তু সেই ভাষাপরিবারের বহু শাখাই ইতিমধ্যে বিলুপ্ত। ১৯৮৭ সাল থেকে ব্রাজিল সরকার আমাজনের বিস্তীর্ণ অরণ্যভূমি ভূমিহীন কৃষকদের বসতির জন্য খুলে দেয়। ফলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বহু ক্ষুদ্র আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাঁদের প্রাচীন বাসভূমি থেকে উৎখাত হন। কেউ সরকারি পুনর্বাসন গ্রামে ঠাঁই পান, কেউ অরণ্যের আরও গভীরে সরে যান। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৮৯ সালে এক ব্রাজিলীয় কৃষক দম্পতি প্রথম দেখেন দুই অদ্ভুত মানুষকে নগ্ন, হাতে বড় দা, উত্তেজিতভাবে অজানা ভাষায় কিছু বলছে।
কৃষক দম্পতির বর্ণনা ছিল, ‘এক সকালে দরজার কাছে দু’জন দাঁড়িয়ে। খুব উত্তেজিতভাবে কিছু বলছে, কিন্তু আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না।’ প্রথমে তাঁরা ভেবেছিলেন, হয়ত টাকা চাইছে। কিন্তু ভাষা না বোঝার আতঙ্ক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের নতুন বসতিগুলিতে। সরকার একটি অনুসন্ধানী দল গঠন করে। টোকানটিনস নদীর কাছে গভীর বনে বাঁশ ও পাতার কুঁড়েঘরে তাঁদের খুঁজে পাওয়া যায়। ঘরের মেঝেতে লতাপাতা বিছানো, আশপাশে ছোট প্রাণীর হাড়, এই ছিল তাঁদের জীবনচিহ্ন। দলের ফটোগ্রাফারের ক্যামেরার ফ্ল্যাশে আতঙ্কিত হয়ে তাঁরা পালিয়ে যান। পরে তাঁদের ধরে একটি মিনি-ট্রাকে করে অন্য গ্রামে আনা হয়। এই গ্রেপ্তারের খবর শুনে সেই কৃষক দম্পতির মন্তব্য ছিল, ‘যাক, এবার জমিটা সত্যিই আমাদের হল।’ আসলে এই বাক্যটি কেবল ব্যক্তিগত স্বস্তির প্রকাশ নয়; এটি ভূমি দখলের একটি বৃহত্তর ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত সার। ধরা পড়ার পর তাঁদের সঙ্গে কথা বলার জন্য আশেপাশের সাত-আটটি ভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ আনা হয়। কেউ তাঁদের ভাষা বোঝেনি। তাঁরাও কারও ভাষা বোঝেননি। অর্থাৎ তাঁরা সম্পূর্ণ আলাদা একটি ভাষাগোষ্ঠীর প্রতিনিধি।
আউরে ছিলেন তীক্ষ্ণদৃষ্টি, সন্দেহপ্রবণ, প্রায় সর্বদা রাগী চাহনির মানুষ। তাঁর চোখের ভাষাই গ্রামবাসীদের আতঙ্কিত করত। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে তাঁদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো। আউরা ছিলেন শারীরিকভাবে দুর্বল; পায়ের গঠনে ত্রুটির কারণে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারতেন না। শিকার করে খাবার জোগাড় করাও তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। সরকার খাবার, পোশাক ও চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়। দু’জনের সম্পর্ক কী ছিল? ভাই, বন্ধু, নাকি সহযোদ্ধা? তা কেউ জানে না। কিন্তু আচরণে বোঝা যেত, আউরে যেন আউরার রক্ষাকর্তা। সব সময় পাশে পাশে। সতর্ক। পাহারাদারের মতো। ভাষাবিদ নোরভাল অলিভিয়েরে দীর্ঘদিন তাঁদের সঙ্গে থেকে ভাষা বোঝার চেষ্টা করেন। বহু চেষ্টায় তিনি কয়েকটি শব্দের আনুমানিক অর্থ আন্দাজ করতে পারেন। কিন্তু পূর্ণ বাক্য? অর্থবহ বর্ণনা? তা অধরাই থেকে যায়। ২০১২ সালে আউরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। নিকটস্থ শহরে নিয়ে গেলে ধরা পড়ে ক্যান্সার। হাসপাতালের বিছানায় তাঁর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পাশে বসে ছিলেন আউরা। কিন্তু আউরের মৃত্যুর পর থেকে আউরা আর কখনও তাঁর নাম উচ্চারণ করেননি। যেন নাম উচ্চারণ করলেই স্মৃতির বিস্ফোরণ ঘটবে।
ডকুমেন্টারির সময় আউরার থাকার জন্য একটি টালির ঘর ছিল। একটি চেয়ার, একটি টেবিল, শোয়ার জন্য কাপড়ের দোলনা। আধুনিক জিনিসে তাঁর কোনও আগ্রহ নেই। শুধু বড় রঙিন পুঁতি দিলে মালা গেঁথে গলায় পরেন। সরকারি রান্না করা খাবার আসে। ঘরের পঞ্চাশ মিটার দূরে স্বাস্থ্যকেন্দ্র; দু’জন নার্স দিনরাত খোঁজ নেন। কখনও ভাল মেজাজে তিনি নিজে গিয়ে সকালের চা খান। তারপর ঘরে ফিরে অনর্গল বকবক করেন, যার অর্থ কেউ বোঝে না। মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে তিনি ভেঙে পড়েছেন। নোরভালের পর্যবেক্ষণ, আউরা সম্ভবত একটিই গল্প বারবার বলেন। একই শব্দ ঘুরে ফিরে আসে। মৃত্যু, শিশু, নারী, দাড়ি, বিদেশি, আলোর ঝলক, তীব্র শব্দ, জাগুয়ার, গরু, হাঁটা, দু’জনে অনেক হাঁটা, তির, নারকেল, শুয়োর, বন, পাখি। এই শব্দগুলো কী একটি গণহত্যার ইঙ্গিত? ‘আলোর ঝলক’ ও ‘তীব্র শব্দ’ গুলির শব্দ? ‘বিদেশি’ নতুন বসতি স্থাপনকারী? ‘দুজনে অনেক হাঁটা’ পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা? প্রশ্নের উত্তর নেই। জাপানি দল সম্ভাব্য প্রাচীন বসতির সন্ধানে গেলে দেখতে পায়, এলাকা এখন একটি খনি কোম্পানির দখলে। গাছপালা নেই; বিস্তীর্ণ ঘাসে ঢাকা চারণভূমি। অতীতের কোনও চিহ্ন অবশিষ্ট নেই।
এখন আউরার বয়স প্রায় পঁয়ষট্টি। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে হয়ত একটি ভাষা, একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, স্মৃতি, লোককথা, আচার সব চিরতরে হারিয়ে যাবে। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা হল পৃথিবীকে নাম দেওয়ার ক্ষমতা। কোনও কিছুকে নাম না দিলে তা ইতিহাসে টিকে থাকে না! মাতৃভাষার মাসে দাঁড়িয়ে আউরা-আউরের কথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভাষা রক্ষার লড়াই শুধু রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন নয়; এটি ক্ষুদ্রতম কণ্ঠস্বরের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। যে সমাজ সংখ্যাগুরুর শক্তিতে ক্ষুদ্র ভাষাকে গ্রাস করে, সে সমাজ নিজের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকেও গরিব করে। বিশ্বজুড়ে ভাষাবিদেরা ‘ল্যাঙ্গুয়েজ এন্ডেঞ্জারমেন্ট’ বা ভাষা বিপন্নতার মানচিত্র তৈরি করছেন। ডিজিটাল আর্কাইভ, অডিও রেকর্ডিং, শব্দকোষ প্রণয়ন সবই চলছে। কিন্তু যখন ভাষার শেষ বক্তা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, তাঁর স্মৃতি বিচ্ছিন্ন, তখন ভাষা সংরক্ষণ প্রায় অসম্ভব। আউরার মুখে উচ্চারিত অসংলগ্ন শব্দমালা আমাদের জন্য অসংলগ্ন; কিন্তু তাঁর কাছে তা সুসংহত একটি ইতিহাস। হয়ত সেখানে আছে এক সকালে হঠাৎ আগত সশস্ত্র মানুষের কথা; হয়তো আছে গ্রাম পুড়ে যাওয়ার স্মৃতি; হয়ত আছে শিশুদের আর্তনাদ।
ফেব্রুয়ারি আমাদের শিখিয়েছে ভাষার মর্যাদা রক্ষায় সংগ্রাম কীভাবে ইতিহাস বদলে দেয়। কিন্তু আমাজনের গভীর অরণ্যে, রাষ্ট্র ও পুঁজির চাপে নিশ্চিহ্ন হওয়া একটি জনগোষ্ঠীর ভাষা আমাদের সামনে অন্য প্রশ্ন তোলে, আমরা কী কেবল নিজেদের ভাষা নিয়েই চিন্তিত, নাকি মানবজাতির ভাষাবৈচিত্র্য রক্ষার দায়ও আমাদের? আউরা যখন কাপড়ের দোলনায় শুয়ে অনবরত নিজের ভাষায় কথা বলেন, তিনি হয়ত তাঁর মৃত বন্ধু আউরেকে সম্বোধন করেন। হয়ত বলেন, ‘আমরা ছিলাম।’ কিন্তু সেই ‘ছিলাম’ -এর সাক্ষী আর কেউ নেই। এখানে মনে রাখতে হবে, একটি ভাষার মৃত্যু মানে একটি সভ্যতার মৃত্যু। আর সেই মৃত্যুর শব্দ আমরা অনেক সময় শুনতেই পাই না। কারণ তা আমাদের ভাষায় অনুবাদযোগ্য নয়। মাতৃভাষার মাসে তাই আউরা-আউর-এর কথা শুধু দূরদেশের কাহিনি নয়; এটি সতর্কবার্তাও। ভাষা হারালে ইতিহাস হারায়, ইতিহাস হারালে পরিচয় মুছে যায়। আর পরিচয়হীন মানুষ কেবল পরিসংখ্যান হয়ে থাকে : নামহীন, ভাষাহীন। আমাদের প্রশ্ন করা উচিত, কত আউরা আজও পৃথিবীর নানা প্রান্তে বেঁচে আছেন, যাঁদের ভাষা আমরা শুনতে পাই না! তাঁদের কণ্ঠস্বর রেকর্ড করার, বোঝার, মর্যাদা দেওয়ার দায় কী কেবল ভাষাবিদদের? নাকি মানবসমাজের? যতদিন আউরা বেঁচে আছেন, ততদিন একটি ভাষা বেঁচে আছে। তাঁর মৃত্যুর পর হয়ত কেবল স্তব্ধতা থাকবে। সেই স্তব্ধতা যেন আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করতে থাকে, আমরা কী সত্যিই ভাষার মূল্য বুঝি? 🍁
🍂গল্প
কী এক অদ্ভুত আকর্ষণ আছে ঐ বইটার মধ্যে-মোটা বইটার কালো ভেলভেট কভারের ওপর জ্বলজ্বল করছে দুটো সম্মোহনী চোখ। ঐ বইটা যে ওর চাইই চাই!
-“কিন্তু আমি যে বিনামূল্যে কাউকে কিছু দিই না। বই আমি দিতে রাজী আছি, তবে তার বিনিময়ে আমিও তোমার কাছ থেকে কিছু চেয়ে নেব।”
খোলা জানালা

রাখী নাথ কর্মকার
নাহ, এই চাকরিটাও বোধহয় আর হল না!
তবে তার জন্যে সৌমেনের বুকের মধ্যে কোন মেঘলা দুপুর ছটফটিয়ে উঠল না। উলটে বরাবরের মতই ওর বেকার, বিন্দাস প্রাণে বেশ উড়ুৎফুড়ুৎ চিলতে রোদ্দুর স্বচ্ছ ফড়িংএর মত তিড়িংবিড়িং লাফে আকাশ ছোঁয়ার চেষ্টা করে চলল!
চাকরি আর চাকরগিরির মধ্যে তফাৎ যে সামান্যই,তা প্রাইভেট অফিসের ছাপোষা কেরানী বাবাকে দেখেই এতদিনে হাড়ে হাড়ে টের পেয়ে গেছে ও। তবু বাবার ঐ রোজকার নিত্য ফোড়নের ঝাঁঝ থেকে বাঁচার জন্যেই একটা সাময়িক ঢাল খুঁজছিল ও। ভারি তো একখানা সেলসম্যানের চাকরি, তারই জন্যে ওর আগে প্রায় বিরানব্বইজন এসে বডি ফেলে দিয়েছে!
শরীরটাও কেমন জানি ভাল লাগছে না, অদ্ভুত ভারী মনের ওপর ঝুলে রয়েছে তীব্র অবসাদের স্যিলুয়েট। নেতিয়ে পড়া গাছের মত বিছানা ছেড়ে উঠল ও। আজকের ঝিমধরা আকাশটাও মেঘলা তুলির বেহিসেবী টানে নিথর, নিরাশ হয়ে আলগোছে ছেয়ে আছে চারিপাশে।
বিস্বাদ, ঠান্ডা চায়ের মত ফিকে সকালটাকে ছুঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছিল ওর, কিন্তু পারল না। মা চির চনমনে সৌমেনের বিষণ্ণ, রক্তাভ চোখের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠলেন-“হ্যাঁরে, শরীরটা কী ভালো নেই তোর? কী হয়েছে?”
সুতরাং শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে ওর বেকারজীবনের আয়ু যে আরো বেশ খানিক বেড়ে গেল তা ছোট্ট কোম্পানীর ঝুরঝুরে অফিসখানায় পা দিয়েই বেশ বুঝে গেছিল ও। সে যাক গে,এটা হয়নি তো কী হয়েছে,আরেকটা জুটে যাবে! হাতখরচা চালিয়ে নেওয়ার মত হাতে গোটাতিনেক টিউশনি আছে,তাছাড়া আপদেবিপদে মাই ডিয়ার মা তো আছেই! জীবন আসলে এক অনুদ্বিগ্ন পাহাড়ি ঝরণা বই তো নয়-পাথরের রুক্ষতা অগ্রাহ্য করে আপন ফুর্তিতে বয়ে চলা জানাঅজানার পথে!
চাকরির খোঁজে জেরবার, হতাশ বন্ধুরা ওর ফুরফুরে, নিত্য যাপন দেখে মাঝে মাঝেই অবাক হয়ে বলে-“হ্যাঁরে,এমন চাপাচাপি পরিস্থিতিতেও রাতদিন অমন চাপলেস থাকিস কিকরে রে তুই?”
আসলে ওর ইচ্ছে নিজে কিছু একটা করার, কিন্তু আইডিয়া আর আইডির অভাবে (বেকার পকেটের তো কোন আইডি হয় না) এখনো অবধি কিছুই করা হয়ে ওঠেনি। নিশ্ছিদ্র বেকারত্বটুকুকেই উপভোগ করে চলেছে খালি!
আপাতত চনমনে পায়ে গলি তস্য গলি ধরে বাসরাস্তার উদ্দেশ্যে হাঁটা দিল সৌমেন। সবেমাত্র একপ্রস্থ বৃষ্টি হয়ে গেছে এদিকে,কিন্তু তাতে ভদ্র ভাদ্রের ভন্ডামি এতটুকু কমেনি-মেঘছেঁড়া ঝলসানো রোদ আর চটচটে ভ্যাপসা গরমে অস্বস্তিসূচকও বোধহয় রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে আজ!
এই গলিটা ধরে একটু এগিয়ে বাঁদিকে আরেকটা গলি,তারপর মোটামুটি পাঁচসাত মিনিট সোজা হেঁটে গেলেই বাসরাস্তা। অন্তত আসার সময় সেভাবেই এখানে এসেছে সৌমেন। কিন্তু এখন কেন জানি না ওর মনে হচ্ছে, উত্তর কলকাতার এইসব আদ্যিকালের রদ্দিবাড়িগুলির আঁকেবাঁকে উঁকি মারতে থাকা ঐ একফালি আকাশটার মতই এই গলিদের গলাগলিরও যেন আর শেষ নেই। যা বাব্বা! তবে কি পথ ভুল করল সৌমেন? ভাদ্রের এই ভর দুপুরে কোনো ভদ্রব্যক্তিও তো চোখে পড়ছে না কোথাও!
ঘুরপাক খেতে খেতে একটা কানাগলির মুখে এসে থমকে দাঁড়াল ও। ভাঙ্গাচোরা গলিটা হঠাৎই মুখথুবড়ে পড়েছে একটা পলেস্তারাখসা, দাঁত খিঁচোন, শ্যাওলাধরা একতলা বাড়ির সামনে। অসহায়ভাবে এদিক ওদিক তাকাতে গিয়ে নজরে পড়ল বাড়িটার ভেজানো দরজায় হাতে লেখা নোটিস ঝুলছে-“১৮-২৫ বছরের পরিশ্রমী, উদ্যমী সহকারী প্রয়োজন”।
আরিব্বাস! একটা দরজা বন্ধ হয়ে গেলে যে আরেকটা দরজা খুলে যায়, তা এতদিন শুধু শুনেই এসেছে ও, মালুম হল এই প্রথম! কী মনে করে দরজাটায় নক করতেই বিচ্ছিরি শব্দ করে সেটা এক পাশে হেলে খুলে গেল।
কৌতূহলী হয়ে সৌমেন উঁকি মারল ঘরের ভেতরে। এই ভরদুপুরেও ঘরটার মধ্যে ঝুপসি, অস্পষ্ট অন্ধকার! ঘরে কোন জানালা নেই! চারিদিকে ছড়ানোছিটানো ছোটবড় নানা আকারের ট্রাঙ্ক। ঘরের এককোণে একটা চৌকিতে বসে মোমবাতির আলোয় কতগুলো ভাঙ্গাচোরা পুতুল সারাইএর কাজ করছে এক বুড়ো!
গলা খাঁকারি দিল সৌমেন-“মাপ করবেন,বাইরে নোটিস দেখলাম..!” সৌমেনের কথাটা শেষ হল না, বুড়োর ম্লান মুখখানি মোমবাতির কাছে ঝুঁকে এল-উফফ! কতশত বছরের শতসহস্র নিরাশার হিজিবিজি আঁকিবুঁকি যেন তাতে! ঘোলাটে চোখের দৃষ্টিতে যেন বুনো আদিম সুর! বুড়োটা যেন কিছু বলতে যাচ্ছিল ওকে,কিন্তু তার আগেই ও দেখল এই ঘরলাগোয়া পাশের একটি অন্ধকার ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে রোগাটে চেহারার বছর চল্লিশের এক গোমড়ামুখো যুবক।
মাঝারি হাইট, শ্যামবর্ণ, গালে দুদিনের দাড়ি, ভাঙ্গা চোয়াল। তীক্ষ্ণ দুটো এক্সরে আই দিয়ে ওকে ভালভাবে জরিপ করে নিয়ে রুক্ষ গলায় বলে উঠল-“হ্যাঁ,নোটিসটা আমিই ঝুলিয়েছি। আমি হলাম ম্যাজিশিয়ান মি. তিমির। ম্যাজিক শোর প্রয়োজনে কিছু উদ্যমী ছেলে চাই আমার-এসো, এ ঘরে এসো।” লোকটার কর্কশ স্বরে কেমন যেন এক অদ্ভুত সম্মোহনী টান ছিল, বুড়োটাকে অগ্রাহ্য করে লোকটার পিছু পিছু পাশের আলোআঁধারি ঘরে ঢুকল সৌমেন। এ ঘরটাতেও ডাঁই করা গুচ্ছের ট্রাঙ্ক, বইখাতাপত্র। ঘরের কোণায় একখানি টেবিলচেয়ার, টিমটিমে একটা মোমবাতি জ্বলছে এ ঘরেও।
-“ম্যাজিক ভালবাসো?” তীক্ষ্ণ একখানি প্রশ্ন ছিটকে এল সৌমেনের দিকে!
এমন অপ্রত্যাশিত প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না সৌমেন। ম্যাজিক বলতে প্রথমেই যা ওর অনুভূতিতে প্রবল হয়ে ওঠে তা হল উচ্ছল ভালো লাগার এক চোরা স্রোত। ছোটবেলায় স্কুলে পারফর্ম করতে আসা এক ম্যাজিশিয়ানের তাক লাগানো ম্যাজিক দেখেই ম্যাজিকের প্রেমে পড়েছিল। তারপর ঘাট দিয়ে বয়ে গেছে কত জল, ছেলেবেলার হাজারো অপূর্ণ ইচ্ছের মতই কোথাও চাপা পড়ে গেছিল এই ইচ্ছেটাও। ইচ্ছেগুলো শুধু জমেছিল সমুদ্রগভীরে!
–“বিখ্যাত আমেরিকান ম্যাজিশিয়ান ‘জার নেইন দ্য উইজার্ড’এর নাম শুনেছো? তিনি বলেছিলেন ‘একমাত্র ম্যাজিকই হলো সৎ পেশা, একজন ম্যাজিশিয়ান প্রথমেই প্রতিজ্ঞা করে সে তোমাকে ঠকাবে এবং সত্যি সত্যিই সে সেটা করে’। ম্যাজিক জানলেই কিন্তু হুডিনি হয়ে ওঠা সম্ভব নয়৷ ম্যাজিকের প্রতি প্রয়োজন ডেডিকেশন, আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা৷ কৌশলের চেয়েও বড়ো হলো পরিবেশন, শোম্যানশিপ-যা শেখানো যায় না। অভিজ্ঞতা, নিয়মিত অনুশীলন এবং নিজস্ব প্রতিভার জোরে তা আয়ত্ত্ব করতে হয়। কাজেই আমার কাজে হান্ড্রেড পার্সেন্ট ডেডিকেশন চাই, না হলে দক্ষ সহকারীও হয়ে ওঠা সম্ভব নয়।”
-“আমি আমার হান্ড্রেড পার্সেন্ট দিতে রাজি আছি!” কেমন যেন স্বপ্নাবিষ্টের মত বলে ফেলল সৌমেন। ওর বুকের মধ্যে বুড়বুড়িয়ে ওঠা, এতদিনের পলিচাপা সেই ম্যাজিক নেশা ডালপালা মেলেছে। আড়চোখে চেয়ে ও দেখেছে, টেবিলের ওপরে ডাঁই করা রয়েছে নামীদামী, দুষ্প্রাপ্য নানা ম্যাজিকের বই। তার মধ্যে রেগিন্যাল্ড স্কটের ‘দ্য ডিসকভারি অফ উইচক্রাফ্ট’, ‘আর্ট অফ কনজিওরিং’, ‘আর্ট অফ জাগলারি’ যেমন আছে তেমনই আছে কোন অজ্ঞাত লেখকের-‘নো দ্য আননোন’। কী এক অদ্ভুত আকর্ষণ আছে ঐ বইটার মধ্যে-মোটা বইটার কালো ভেলভেট কভারের ওপর জ্বলজ্বল করছে দুটো সম্মোহনী চোখ। ঐ বইটা যে ওর চাইই চাই!
-“কিন্তু আমি যে বিনামূল্যে কাউকে কিছু দিই না। বই আমি দিতে রাজী আছি, তবে তার বিনিময়ে আমিও তোমার কাছ থেকে কিছু চেয়ে নেব।”
চমকে উঠল সৌমেন, লোকটা কি থট রিড করতে পারে নাকি? বেশ তো, ওর মত কপর্দকহীন বেকারের কাছ থেকে লোকটা কী আর চাইবে? ওভারটাইম করিয়ে টাকা দেবে না, এই তো! এসব কায়দা সৌমেনের বেশ জানা আছে!
২
বেশ কটাদিন মি. তিমিরের আন্ডারে ঐ বদ্ধ, স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর বইটা বাগে এসেছে ওর। গতকাল সারারাত জেগে বইটা শেষ করেছে সৌমেন। অসাধারণ একটা বই, কী নেই ওতে? হোয়াইট ম্যাজিক, প্রিভেন্টিভ ম্যাজিক থেকে শুরু করে ব্ল্যাক ম্যাজিক-সব কিছুরই বিস্তারিত বিবরণ আছে তাতে। বইটা শেষ করে বেশ কিছুক্ষণ তাতে বুঁদ হয়েছিল ও। এই বইটা ঠিকমত ফলো করতে পারলেই আর দেখতে হবে না, বড় ম্যাজিশিয়ান হওয়া ওর আটকায় কে! মি. তিমিরের হাবিজাবি ট্রেনিংএরও আর কোন প্রয়োজন নেই। ও ঠিকই করে নিয়েছে, সকালেই লোকটাকে বইটা ফেরত দিয়ে গিয়ে জানিয়ে আসবে, খিটখিটে ম্যাজিশিয়ানের সহকারী নয়-একেবারে খোদ ম্যাজিশিয়ান হওয়ারই সংকল্প নিয়েছে ও।
শেষ রাতের দিকে একটু যেন চোখটা লেগে এসেছিল সৌমেনের। মার ডাকে যখন ঘুমটা ভাঙ্গল, বেলা অনেক হয়ে গেছে। ভোরের ঘুমটা ঠিক যুত হয়নি, সারাক্ষণই ছেঁড়াছেঁড়া ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন দেখে গেছে ও। শরীরটাও কেমন জানি ভাল লাগছে না, অদ্ভুত ভারী মনের ওপর ঝুলে রয়েছে তীব্র অবসাদের স্যিলুয়েট। নেতিয়ে পড়া গাছের মত বিছানা ছেড়ে উঠল ও। আজকের ঝিমধরা আকাশটাও মেঘলা তুলির বেহিসেবী টানে নিথর, নিরাশ হয়ে আলগোছে ছেয়ে আছে চারিপাশে।
বিস্বাদ, ঠান্ডা চায়ের মত ফিকে সকালটাকে ছুঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছিল ওর, কিন্তু পারল না। মা চির চনমনে সৌমেনের বিষণ্ণ, রক্তাভ চোখের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠলেন-“হ্যাঁরে, শরীরটা কী ভালো নেই তোর? কী হয়েছে?”
কী হয়েছে ও নিজেও ঠিক জানেনা! মায়ের হাজার বারণ সত্ত্বেও আজ বইটা বগলে পুরে বেরোল সৌমেন।
নিমতলা ঘাট স্ট্রিটে নেমে নানা অলিগলি বেয়ে সেই বাড়িটার সামনে এসে যখন থামল সৌমেন, চূড়ান্ত অবাক হয়ে দেখল-গত কদিনের স্বল্পপরিচিত বেরঙ্গা, অন্ধকার, ম্যাড়মেড়ে বাড়িটার জায়গায় উথলে উঠেছে এক আলোঝলমলে চৌকাঠ আর মুঠো মুঠো রোদ্দুর কোলাহল জুড়েছে তার খোলা জানালার কার্ণিশে!🍁
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ১
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।
শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
১৯.
অভিমান, আলো অন্ধকার…
স্কুল ছুটির ঘণ্টাটা বাজার আগেই সোমদত্তা জানত, আজ সে অন্যদিনের মতো সোজা বাড়ি ফিরবে না। এই জানাটার মধ্যে কোনও উত্তেজনা ছিল না, কোনও নাটকীয়তা ছিল না, ছিল শুধু একধরনের স্থিরতা— যেটা বহুদিনের দোলাচলের পরে হঠাৎ করে তৈরি হয়। জানালার পাশে বসে শেষ ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীদের খাতা দেখার সময় সে বাইরে তাকিয়েছিল। মাঠে কয়েকটা শুকনো পাতা উড়ছিল, রোদটা একটু ঢলে পড়ছিল, আর তার মনে হচ্ছিল সময়টা যেন আজ অস্বাভাবিকভাবে ধীরে এগোচ্ছে। এই ধীরতাই তাকে ভাবার সুযোগ দিয়েছিল। কাল থেকে বইমেলা থাকবে না। আজ শেষ দিন। এই শেষ দিনের কথাটা তার মাথার ভেতরে এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে আর আলাদা করে যুক্তি খোঁজার দরকার পড়েনি।
এই আড়চোখে তাকানোর মধ্যেই কত না বলা কথা জমে ছিল। নীলাঞ্জন তখনও তাকে দেখেনি। এই না-দেখার মধ্যে একটা নিরাপত্তা ছিল, আবার একটা অদ্ভুত কষ্টও। তার মনে পড়ল, একসময় এই মানুষটিই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে স্বাভাবিক অংশ। স্কুল শেষ করে কলেজ, কলেজ থেকে চাকরি সবকিছুর মাঝখানে নীলাঞ্জনের উপস্থিতি ছিল অনিবার্য। কত কথা, কত তর্ক, কত স্বপ্ন সব যেন অন্য কোনও জীবনের ঘটনা। তারপর একসময় অভিমান এসেছিল। সেই অভিমান ধীরে ধীরে নীরবতায় বদলেছিল। নীরবতা দূরত্ব তৈরি করেছিল।
বইমেলায় যাওয়ার ইচ্ছে তার বহুদিনের, কিন্তু ইচ্ছেগুলো তার জীবনে বরাবরই এমন ভাবে আসে যে সেগুলোকে পূরণ করার মতো বাড়তি সময় বা সাহস কোনওটাই থাকে না। আজও সে ঠিক জানত না কেন বইমেলায় যেতে হবে, কী কিনবে, কার সঙ্গে দেখা হবে, শুধু জানত আজ না গেলে আর যাওয়া হবে না। এই সিদ্ধান্তটা যেন সে নিজে নেয়নি, সময় নিজেই তার হয়ে নিয়ে নিয়েছে।
ছুটি হলে অন্যদিনের মতো সহকর্মীদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প করেনি সে। কেউ চা খাওয়ার কথা বললেও সে এড়িয়ে গিয়েছে। ব্যাগটা কাঁধে তুলে স্কুলের গেট পেরিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল। হাঁটতে-হাঁটতে তার মনে হচ্ছিল এই হাঁটার মধ্যেই একটা আলাদা রকমের অনুভূতি আছে, যেটা সে অনেকদিন ভুলে গিয়েছিল। শহরের রাস্তাগুলো পরিচিত, প্রতিদিনের চলাচলের অংশ, তবু আজ সেগুলোকে নতুন করে দেখছিল সে। বাসের হর্ন, মানুষের ভিড়, দোকানের আলো— সব মিলিয়ে শহরটা আজ একটু বেশি জীবন্ত, একটু বেশি স্পর্শযোগ্য লাগছিল। বইমেলার গেটের কাছে পৌঁছতেই সেই পরিচিত গন্ধটা নাকে এল— নতুন বইয়ের কাগজ, পুরনো বইয়ের ধুলো, ভাজা খাবার আর মানুষের শরীরের উষ্ণতা মিলিয়ে তৈরি হওয়া এক অদ্ভুত গন্ধ, যেটা কেবল বইমেলাতেই থাকে। টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে তার মনে হচ্ছিল, এতদিন পরে সে যেন নিজের জন্য কিছু করতে এসেছে।
ভেতরে ঢুকে প্রথমে সে একটু থমকে দাঁড়াল। এত লোক, এত স্টল, এত আলো সবকিছু মিলিয়ে একটা অস্থির আনন্দ। কোথাও কেউ হাসছে, কোথাও কেউ তর্ক করছে, কোথাও বই উল্টে দেখছে কেউ। সোমদত্তা ধীরে ধীরে হাঁটছিল। কোনও তাড়াহুড়ো ছিল না। সে এক স্টল থেকে আরেক স্টলে যাচ্ছিল, বইয়ের মলাট দেখছিল, নাম পড়ছিল, কোনও কোনও বই হাতে তুলে একটুক্ষণ ধরে রাখছিল, আবার রেখে দিচ্ছিল। আজ কেনাকাটার চেয়ে দেখাটাই তার কাছে বেশি জরুরি মনে হচ্ছিল। এই দেখার মধ্যেই যেন সে নিজেকে খুঁজে পাচ্ছিল।
ঠিক এই সময়েই, খুব সাধারণ একটা মুহূর্তে, নীলাঞ্জনকে সে দেখতে পেল। প্রথমে পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারেনি। ভিড়ের মধ্যে অনেক মুখ, অনেক শরীর। কিন্তু কোনও একটা মুখ তার চোখে আটকে গেল। একটু তাকিয়ে থাকতেই সে বুঝে গেল—নীলাঞ্জন। বুকের ভেতরে হালকা একটা ধাক্কার মতো লাগল। এত বছর পর, এত মানুষের ভিড়ের মধ্যে, বইমেলার শেষ দিনে, এইভাবে দেখা হয়ে যাবে, সে ভাবেনি। নীলাঞ্জন তখন একটা বই হাতে নিয়ে স্টলের লোকটির সঙ্গে কথা বলছিল। তার কথা বলার ভঙ্গি বদলায়নি। মাথা একটু কাত করে শোনা, মাঝেমধ্যে হালকা হাসি, হাত নাড়ার ভঙ্গি সবকিছুতেই সেই পরিচিত মানুষটাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল। বয়স তার মুখে ছাপ ফেলেছে। চুলে পাক ধরেছে, চোখের কোণে ভাঁজ পড়েছে। তবু কোথাও একটা তারুণ্য এখনও বেঁচে আছে যেটা সময় পুরোপুরি মুছে দিতে পারেনি।
সোমদত্তার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া। সে নিজেকে বলল, দেখনি, চিনোনি, কিছুই হয়নি। এত বছর পর হঠাৎ কথা বলার মানে কী? কী বলবে? কেমন আছ? এই প্রশ্নটা কী সত্যিই কোনও অর্থ বহন করে? কিন্তু তার পা যেন নিজের কথা শুনছিল না। সে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার ভান করল, তবু আড়চোখে তাকাল। এই আড়চোখে তাকানোর মধ্যেই কত না বলা কথা জমে ছিল। নীলাঞ্জন তখনও তাকে দেখেনি। এই না-দেখার মধ্যে একটা নিরাপত্তা ছিল, আবার একটা অদ্ভুত কষ্টও। তার মনে পড়ল, একসময় এই মানুষটিই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে স্বাভাবিক অংশ। স্কুল শেষ করে কলেজ, কলেজ থেকে চাকরি সবকিছুর মাঝখানে নীলাঞ্জনের উপস্থিতি ছিল অনিবার্য। কত কথা, কত তর্ক, কত স্বপ্ন সব যেন অন্য কোনও জীবনের ঘটনা। তারপর একসময় অভিমান এসেছিল। সেই অভিমান ধীরে ধীরে নীরবতায় বদলেছিল। নীরবতা দূরত্ব তৈরি করেছিল। আর দূরত্বটাই শেষ পর্যন্ত সবকিছু গিলে নিয়েছিল। এই অভিমানটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমেনি, বরং আরও শক্ত হয়েছে। আজও সেই অভিমান পুরোপুরি গলে যায়নি। নীলাঞ্জনের সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছে তার হয়েছিল, খুব স্পষ্টভাবে হয়েছিল, কিন্তু সেই ইচ্ছেটাকে সে সঙ্গে সঙ্গে গুটিয়ে নিয়েছিল। কারণ কথা বললেই সব খুলে যাবে। পুরনো ক্ষত, পুরনো প্রশ্ন, পুরনো না-পাওয়ার ইতিহাস।
হঠাৎ নীলাঞ্জন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। চোখাচোখি হয়ে গেল। এই মুহূর্তটা খুব ছোট ছিল, কিন্তু তার ভেতরে অনেক বছর ঢুকে পড়েছিল। নীলাঞ্জনের চোখে প্রথমে বিস্ময়, তারপর ধীরে ধীরে চিনে নেওয়ার আলো। সে যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। মুখ খুলে কিছু বলতে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময়েই সোমদত্তা চোখ সরিয়ে নিল। সে ভিড়ের মধ্যে নিজেকে মিশিয়ে দিল। এই মিশে যাওয়াটাই তার প্রতিরক্ষা।
হাঁটতে হাঁটতে তার বুকের ভেতরে একটা চাপ জমে উঠছিল। সে জানত নীলাঞ্জন হয়ত এখনও দাঁড়িয়ে আছে, হয়ত তাকিয়ে আছে, হয়ত ডাকবে। কিন্তু সে পিছন ফিরে তাকাল না। এই না-তাকানোই তার সিদ্ধান্ত। বইমেলার শেষ দিনের ভিড়ের মধ্যে সে একা হাঁটছিল। চারপাশে আলো, মানুষ, বই আর ভেতরে তীব্র অভিমান, অসমাপ্ত সম্পর্ক আর না-বলা কথার দীর্ঘ ছায়া। আজ শেষ দিন- এই কথাটা আবার তার মাথার ভেতরে ফিরে এল। বইমেলার শেষ দিন, হয়ত এই দেখা হওয়ার সম্ভাবনারও শেষ দিন। সোমদত্তা জানত, আজ যদি সে কথা না বলে, তাহলে আর কোনওদিনই বলা হবে না। তবু সে বলল না। কারণ কিছু গল্প আছে, যেগুলো উচ্চারণে শেষ হয় না, নীরবতার মধ্যেই টিকে থাকে। 🍁 (ক্রমশঃ)
🍁কবিতা
আশিস সরকার -এর একটি কবিতা

মা
কি এক অভিমান হয়েছিল সেদিন-
আমি বেশ কদিন পর বাইরে থেকে
বাড়ি ফিরে দেখি: মা বাড়িতে নেই।
চিৎকার করে ডেকেছি মা: কোথায় তুমি
মা আমি এসেছি-তুমি কোথায়?
মা আমার খিদে পেয়েছে তাড়াতাড়ি এসো।
ক্লান্ত আমি বারান্দায় বসে থাকতে থাকতে
কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম -এর পর দেখি মা আমায় বাতাস করছে
পাশে ভাত গেলাশে জল আসন পাতা…!
আজো মাকে না পেয়ে অভিমানে তাকে ডাকলে
সে ত্রস্ত পায়ে আসে পাখার বাতাস করে এবং…!
কবে তাকে শুইয়ে এসেছি সাজানো চিতা কাঠে
দাও দাও চিতা কাঠে।
আজো তাকে ডাকলে সে খাবার খাবার জল
আর পাখা নিয়ে বসে থাকে।
অথচ আজ মনে পরে না
কোন দিন মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম : মা তুমি খেয়েছ
কোন দিন জিজ্ঞেস করেছিলাম: মা তোমার এতো
উপোষ কেন- মা কেন এতো ব্রত উপাচার!
আমিনা তাবাসসুম -এর একটি কবিতা

ঈশ্বর ও পুরুষ…
দেবতা ভেবে ভেবে যে অর্ঘ্য সাজিয়েছিলাম
অতি সন্তর্পনে
বুক বেঁধে
যেন অল্পতেও আঘাত না লাগে
ফুলের থেকেও নরম এই
দিকচক্রবালে
এখন যেদিকে তাকাই
দেবতার পশ্চাৎ অপসারণ
জানালার ওপারে
ঈশ্বরের বিশ্বাসঘাতকী আয়োজন
ধুলোর উপর মিশে যায়
আজ জেনেছি,
ঈশ্বর ও পুরুষ
যাদের কখনো বিশ্বাস করতে নেই
নার্গিস পারভিন -এর তিনটি কবিতা

মৃত্যুমুখী দরজাগুলো
কিভাবে মানুষ হেঁটে হেঁটে চলে
মৃত্যুর কোলে ঘুমিয়ে যায়—
সেই গল্প হতে হতে
আমরা এখন সবাই
একটা করে দরজা খুলে রেখে দিয়েছি,
মৃত্যুমুখী।
ক্রেনের মতো চতুর্দিক থেকে বন্দী করে
টেনে টেনে তোলা হচ্ছে—
জঞ্জাল ভেবে।
আজ আর আকাশের কোণে
ঝড়ের কোনো প্রস্তুতি নেই,
যন্ত্রের মতো ভেসে গেছে
সংঘটিত মেঘ।
সামনের পথটা যদিও
সংকীর্ণ থেকে
সংকীর্ণতর… ক্র ম শ,
তবুও
জীবন না হয় হোক বাতাস—
বয়ে যেতে দিলাম।
তাতেই বা কী হল!

যুদ্ধ নিরন্তর
হাতে পায়ে বেড়ি নিয়ে লোকটা আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখে
জেলে বসে ঝিমায় না, স্বপ্ন দেখে।
মুক্তির জন্য বন্ধনে বাঁধা পড়ে গেছে।
তার আকাশ ঢেকেছে কারাগারের বদ্ধতা।
খাবারে মিশেছে ঘুম পাড়ানি ওষুধ।
কানে মন্ত্রণা দিয়েছে সম্মোহনের সঙ্গীত
প্রাণপণ চেষ্টায় মনকে বেড়িমুক্ত রাখে।
তার যুদ্ধ এখন এটাই।

খুঁজে ফিরি
দেবদারু, অশোক, মেহগনি—
মুখ খুঁজে ফিরি।
মুখের ওপরে মুখোশ এঁটে বসে থাকে
পেলব-মসৃণ-হাসিমাখা
কান্নার ছলাৎ ছলাৎ-
হিংসা, ক্রোধ, ঘৃণার আদিম মুদ্রা
ভঙ্গিমার বলিরেখা হয়ে
ফুটে উঠতে চায়।
মুখোশ আরও চেপে বসে,
পেলব-মসৃণ-হাসিমাখা
মানুষ খুঁজে ফিরি
আম, জাম, বকুলের নিচে—
দ্বিপ্রাহরিক কাকের আর্তনাদ
গত জন্মের মুহূর্ত ধ্বনি
আমাকে ঠেলে দেয় জন্মান্তরে।
জন্মে জন্মে পরজন্মের হাতছানি—
তবুও মানুষের মুখে
মুখোশ এঁটে বসে থাকে
পেলব-মসৃণ-হাসিমাখা।
শর্বাণীরঞ্জন কুন্ডু -এর দু’টি কবিতা

নিরন্তর যে শুদ্ধিকরণের প্রয়াস
যত দিন যাচ্ছে
জীবনের প্রশ্নগুলোর জট
এক এক করে খুলে যাচ্ছে।
যখন যখন কোনো ঘটনা ঘটেছে
বুঝি নি তার কার্যকারণ।
সময় ছিল না বিশ্লেষণের।
করে যেতে হয়েছে কর্তব্যগুলো।
স্বভাবের বশবর্তী হয়ে করে গেছি,
পরিবারের বাধ্যবাধকতায় করে গেছি,
নিজের বিশ্বাসকে ছাপিয়ে
ন্যস্ত বিশ্বাসের ওপর ভর করে
করতে হয়েছে কত কিছু।
উপায় ছিল না।
শেকড় হারানো মানুষদের অনেক বিড়ম্বনা থাকে।
ডালপালা বড় তাড়াতাড়ি মেলতে হয়।
শেকড় উৎপাটিত লোকেদের দ্বারা সে সব কি সম্ভব?
উৎপাটিত শেকড় আলগা লোকেরা
সবাই কী দাঁড়াতে পারে?
পারে না গো পড়ে না।
উপার্জনী কাজ কিছু করতে হয় না এখন।
সরকারকে নিজের অবিচ্ছিন্ন ৩৫ টি বছর দেওয়ার কারণে
আজ সরকার অর্থনৈতিক ভাবে আমার দেখাশোনা করে।
তাই সুযোগ হয়েছে অতিবাহিত জীবনের পর্য্যালোচনা।
তাই প্রত্যেকটা কাজের প্রতিফলন স্পষ্ট হয় ক্রমে ক্রমে-
ভাল মন্দ যা কিছু।
সুযোগ এসেছে অনেক কাজের প্রায়শ্চিত্ত করার।
এযে কত বড় তৃপ্তি কি করে বোঝাই!
এই নিয়েই আছি।
তবে এও জানি
জীবনের অনেক কিছুই অজানা থেকে যাবে।
ফ্রয়েড বাবাজিও কিছু করতে পারবেন না।
তাই ভক্ত মানুষদের খুব নরম দৃষ্টিতে দেখি।
তাদের নিরন্তর চেষ্টাকে সম্মান করি।

মানুষের ত্রুটি-বিচ্যুতি
তোমার যারা ভুল ত্রুটি ধরছে সবসময়
তারাও হয়ত সমপরিমান ভুলত্রুটি করে।
হয়ত সে ভুলগুলো অন্যরকম।
কিন্তু সে সেগুলো বুঝতে পারে না।
তাই তোমার ভুলত্রুটির ওপরে নজর তার পরে কেবল।
হয়ত সেগুলো ভুলও নয়।
তুমি নিজের মত করে নিজ সময় সুবিধা অনুসারে সেগুলো সম্পাদিত করো।
কিন্তু একত্রে থাকলে
চলাচলের কাটাগুটিতে
তোমার অসামাপ্ত কাজের মাঝখানে
তাকে তার কাজ করতে প্রবেশ করতে হয়েছে হয়ত।
ব্যস, শুরু হয়ে গেল বাক্যবাণ ছোড়াছুড়ি!
মানুষের অসন্তোষ মানুষকে দিয়ে কত কিছু যে বলায়!
তখন ভুলে যাওয়া বিষয়ও উঠে আসতে পারে।
সব নির্বিবাদে মেনে নিলে
আগুন জ্বলে না।
ব্যত্যয়ে আগুন জ্বলে উঠতে পারে।
তখন সে আগুন নেভানো সহজ কাজ হয় না।
কখনো নেভে, কখনো নেভে না।
তখন সে এক অন্য গল্প।
বৃন্দাবন দাস -এর একটি কবিতা

মুখ
পরিচিত মুখ সরে যাচ্ছে
সরে যায়
বিহ্বল করা মুখ যদিও থাকে
একেবারে ক্ষীণ স্রোত
কত রকম আন্দোলন হলো
বলশেভিক, তেভাগা, নকশাল, হাংরি, নিম,
প্রয়োগবাদী
আরো কত টুকটাক
হলো তো হলোই
ধূমল মাফিয়াচক্রে ডুবে যেতে যেতে
এখনো কটা মুখ
জেগে আছে
ওদেরও সরাতে চাই
শুদ্ধ পথে বড্ড কাঁটা —
শুভজিৎ নাগ -এর দু’টি কবিতা

মানবী
গ্রীষ্মের দুপুরে তারিকথা ভেবে
শীতল বাতাস বইতে শুরু করেছে,
তাকে কল্পনা করে মরুভুমির বুকে
ফুটে উঠতে চাইছে হাজারটা গোলাপ।
তাকে স্পর্শ করার অনুভুতি নিয়ে
শিউলি ফুল গুলি ঝরে পড়ছে টুপটাপ।
তারি শান্ত শরীরের মতো খরোস্রোতা নদী
দিক পাল্টে হয়ে গেছে স্তিমিত।
তারই বিস্তৃত হৃদয়ের মতো আকাশ হতে চাইছে প্রসারিত
এতকিছুর পরেও সে হয়ে ওঠেনি কোনো দেবী,
রয়েগেছে আমাদের সকলের কাছে এক মানবী রূপে।

স্বপ্ন
স্বপ্নগুলো রোজ আসে,
দিন শেষে ঘুমের দেশে,
হয়ে ওঠে সে অভ্যেস।
স্বপ্ন গুলো নয় একপেশে,
আসে কখনো রঙিন বেশে
কখনো আবার সাদা কালো আবছায়ায়।
স্বপ্ন গুলো এগিয়ে চলে
নিজ ছন্দের তালে,
সময়ের সমনে সে না ডরায়।
কভু সে হাসির তালে,
কভু সে দুঃখের জালে,
বারবার রং বদলায়।
ঘুম ভেঙে চোখ মেলে দেখি,
স্বপ্ন গুলো দিয়েছে ফাঁকি,
জানি স্বপ্ন গুলো আসবে আবার ফিরে,
হৃদয়ের ইচ্ছে ও মস্তিষ্কের চিন্তা মিলবে যখন এক সুরে।
প্রিয়াংকা নিয়োগী সনি -এর একটি কবিতা

নেশা
নেশাতেই উত্থান, নেশাতেই পতন,
নেশাতে বুঁদ হয়ে প্রত্যেক জন।
নেশার ঘোরে থেকে বুঝতে পারে না যখন,
মদ-মাতালের দারুকে শুধু নেশা ভাবে যখন।
নেশার আছে বিভিন্ন ধরন,
নেশার রাস্তা থেকে ছাড় পায়নি একজন,
কালো, লাল, নীল, গোলাপী, আকাশী, সবুজ,
একেকজন একেক নেশার অনুবাদ।
নেশায় থেকে নেশার রাস্তা হচ্ছে অবলম্বন,
নেশা বাড়ি, গাড়ি ও অর্থ উপার্জন,
ডিগ্রীর পর ডিগ্রী করে হয়েছে বিদ্যান,
লেখা লেখির নেশাতে লেখক হিসেবে করেছে বেশ নাম।
প্রতিভা প্রদর্শনের আকর্ষণে সৃষ্টিশীল সৃজনশীল,
যেমন ভাবা ও নেশা ধরে সেটাই বাস্তব বর্তমান,
অনিন্দ্য ভালোলাগা ভাবনা গাঁথে সমান্তরাল,
নেশায় নেশায়িত হয়ে দিক প্রত্যাবর্তন।
জীবন ভালো রাখার নেশায় চারদিক করে নিয়ন্ত্রণ,
‘কিছু করে দেখানোর নেশা’- দৃষ্টান্ত উজ্জ্বল,
কেউ মন্ত্রী হবো নেশায় প্রধানমন্ত্রীর আসন সামলান,
টাকা উপার্জনের নেশায় প্রতিপত্তি অর্থবান।
বিজ্ঞানী আজ ‘গভীর ভালোবেসে বিজ্ঞান’,
বুঝে শুনে চলে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে বুদ্ধিমান,
উঁচু হওয়ার স্বপ্নের নেশায় উপার্জন শ্রেষ্ঠত্বের সম্মান,
গুণাবলী পারদর্শীর নেশা জেতায় প্রতিটি দর্পণ।
সময় নষ্টের নেশা- আবহাওয়া গুরুত্বহীন,
সাত-পাঁচ ভাবে না- যার কাছে জীবন অর্থহীন।
নেশা করে কেউ মাতাল-চাতাল,
কেউ নেশার তালে সব হারিয়ে ফকির।
জীবন কিছু না নেশায় চুবিয়ে- সব সর্বনাশ।
ফাজলামির নেশা ফাজলামির বাগান বানায়,
অভদ্রের নেশা রাখে অভদ্রের তকমায়,
‘অলসতার নেশা’ জীবন নদী অলস করায়।
নেশাতে দাপুটে, তুখোর নেতৃত্ববান,
নেশাতে সমাজসেবী, দায়িত্ববান,
নেশাতে সব সামলে রাখার কর্তৃত্ববান,
নেশাতে উর্ধ্বমুখী সাফল্যের জয় গান।
জেদের নেশায় নিজেকে চুবিয়ে বিত্তবান, মানী মানুষ,
‘জীবনের মানে মূল্যবান’ -এই নেশায় হয়েছে বলীয়ান,
‘এক নম্বর হওয়ার জেদের নেশা’ – করে পরিশ্রম,
‘বিশ্ব বিখ্যাত হওয়ার নেশা’ – বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্বের তালিকায়।
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ২
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হল সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ
হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা

মমতা রায় চৌধুরী
৫.
কাল রাত্রে বাড়ি থেকে ফোন এসেছিল তিথির মনটা অস্থির হয়ে আছে। মায়ের শরীরটা ভাল নেই। অনেক ভোরে উঠেছে কুয়াশায় চারিদিক ঢেকে গিয়েছে। অস্পষ্ট। কোনও দিক দেখা যাচ্ছে না। তিথির জীবনের দিকটাও কী এভাবে কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে যাবে যার জন্য এই পৃথিবীর আলো দেখতে পেরেছে? সে ছাড়া তার দিক কোন দিকে ধাবিত হবে কে জানে! শ্বেতাম্বরী তার দু’চোখে ঘুম চোখগুলো ছোট হয়ে আসছে। তবুও তিথি ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ানোতে সেও কোন ফাঁকেতে এসে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এতকিছুর মধ্যেও এদের ভালবাসা নতুন করে প্রাণের সাড়া জাগায়, ভাবতে শেখায় সব খারাপেরও ভাল দিক আছে। শ্বেতাম্বরীকে একটু আদর করে দিয়ে ক’য়েকটা বিস্কিট খাইয়ে দেওয়াতে সে আবার নিজের জায়গায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। এবার তিথি নিজের জন্য একটু কফি বানাল। এত সকালে তো পবিত্র উঠবে না। ওর জন্য অন্য কিছু বানাতে হবে। প্রকৃতির এই অস্পষ্ট কুয়াশাচ্ছন্ন দিক দেখতে দেখতে ঘড়ির কাঁটা ক্রমশ এগিয়ে চলেছে সাতটা বাজতে চলল। এখনও কেন সুনয়নাদি আসলো না। এবার চিন্তা বাড়ল, আজ থেকে স্কুল, না এবার কাজে হাত লাগাতে হয়। অন্যের ভরসায় তো আর নারায়ণ পুজো করা যায় না। কোন মহিলাকে যে কাজে দিল মাসি!
একদিকে চায়ের জল বসিয়ে দিল, অন্যদিকে মুগ-ডাল বসিয়ে দিল। তারপর বাসি ঘরটা ঝাড়ু দিয়ে ফেলল। অন্যদিকে, প্রেসার কুকারে সিটি বেজে উঠল সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে বেগুন ভাজাটা বসিয়ে দিল। চা টা নামিয়ে পবিত্রকে দিয়ে আসলো। বুবুনকে তুলল স্কুলে যেতে হবে
সাড়ে সাতটার মধ্যে রেডি হয়ে গেল। ঠাণ্ডায় কিছুতেই স্কুলে যেতে চাইছে না, কিন্তু যেতে তো হবেই। স্কুলের গাড়ি এসে হর্ণ দিচ্ছে তাড়াতাড়ি গিয়ে বুবনকে স্কুলের গাড়িতে বসিয়ে দিল। দরজা লাগাতে যাবে ঠিক তখনই পেছন থেকে খুব আস্তে গলায় বলল, বৌদি দরজা দিও না।
–ফার্স্ট জানুয়ারিতে তো কোথাও বেরনো গেল না।
–ঠিক আছে চলো কিন্তু মায়ের শরীরটা কেমন আছে একবার খবর নিতে হবে আগে।
–বাপরে কী জোরে জোরে জরজা ধাক্কা মারছে দেখো। আর শ্বেতাম্বরী দরজার পাশে গিয়ে বসে আছে।
–যাই যাই। হয়ে গিয়েছে।
–ওই দেখ তোমাকে কেমন শ্বেতাম্বরী আদর করছে দেখো।শ্বেতাম্বরীকে একটু আদর করে দে।
–লাভ ইউ। ওরে বাপরে।
পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখতে পায়, সুনয়না।
–এত দেরি করে আসলে হয়
-যা ঠাণ্ডা পড়েছে!
–ঠাণ্ডার দিনে তো ঠাণ্ডা পড়বেই।
আমার বাচ্চাটাও তো ভোরে উঠে পড়ল। কথা না বাড়িয়ে দু’জনে চলে আসল। সুনয়না চুপ করে আছে।
–গত কালকে আসলে না কেন?
বাসনগুলো এদিকে আছে, বাসনগুলো মেজে নাও। চা’টা খেয়ে নাও।
–ঠিক আছে।
–আমি কিন্তু আজকে দুধ চা করিনি।
–না না না আমি তো বলেছি যে আমি লিকার খাই।
–ঠিক আছে। তারপর বাটনাটা বেটে দেবে পেঁয়াজটা কেটে দেবে
আগে।
–তাহলে এগুলো করে দিই তারপর বাসনটা মাজি।
–তাই করো।
–আচ্ছা বৌদি, ঘরের কাজ করব তো।
–হ্যাঁ বাথরুমে দেখো ড্রেস রাখা আছে।
–প্রথমে পুজোর বাসনগুলো মেজে নাও।
–তারপর কি কাজ করব।
–বলছি বলছি বোসো, তারপর ঘরটা মুছে নেবে বারান্দাটা ধোবে মাংসটা কষাতে কষাতে। ওমা এরমধ্যেই সুনয়না এসে হাজির।
–সুনয়না সব কাজ কমপ্লিট
–হ্যাঁ। বৌদি আর কিছু কাজ আছে?
–তোমার কাজ হয়ে গেল?
–হ্যাঁ।
তিথি তো অবাক হয়ে গেল কি কাজ করল কে জানে।
–জামা কাপড় কাচা।
–ওটাতো শুনলাম ওয়াশিং মেশিনে কাচবে।
–রোজ কেন মেশিন চালাব।
–আজকে তো আর হবে না ।
–আমি আসছি।
আর কী বলবে তিথি, যা বুঝতে পারল এ সুবিধের নয় কিন্তু কাজ তো করাতেই হবে। দেখতে শুনতে তো চিকন চাকন অথচ কাজ এত নোংরা, বাসনে এটো লেগে রয়েছে। এ বাবা ঘরটা কীভাবে মুছেছে দেখে আসি তো
–ও বাবা যেখানকার জিনিস সেখানেই পরে রয়েছে। একটা কাগজ পরেছিল সেটাও রয়ে গিয়েছে।
–এই তো কাজের ছিরি।
ভেতরে ভেতরে রাগ হতে লাগল তিথির। এর সাথে কীভাবে চলবে রে বাবা। যাইহোক নিজেকে কন্ট্রোল করল। তাড়াতাড়ি কাজগুলো গুছিয়ে স্কুলে চলে গেল।
–কী ব্যাপার এতবার পবিত্রকে ফোন করছি ফোন তুলছে না কেন! ধেততেরি ভাল লাগে নাকি, ক্লাস আছে, যে কথাটা বলাও জরুরী। রিং হয়ে যাচ্ছে
–ধরো না বাবা ধরো।
–হ্যালো।
–কখন থেকে ফোন করছি।
–আমি ছিলাম না তো।
–হ্যাঁ! বলো।
বুবুন ফিরলে ওকে ভাত খাইয়ে দিও।
–আজকে জামাকাপড় কাচা হয়নি কেন?
–এই যে নতুন কাজের মহিলা উনি বললেন ওগুলো তো ওয়াশিং মেশিনে কাচার কথা আমাকে উপদেশ দিয়ে গেলেন আর বললেন পরের দিন এসে তাহলে কেচে দেব।
–কী বুঝছ?
–আমি কোন সুবিধের মনে করছি না। কাজ তো খুব একটা পরিষ্কার নয়। মা আসলে কী হবে কে জানে।
–শ্বেতাবরীকে খাবারটা খাইয়ে দিও।
আজ প্রথম দিন স্কুলে ভীষণ চাপ একদিকে মেয়েদের ভর্তি অন্যদিকে, রেজাল্ট নেওয়া এখনকার রেজাল্ট হলিস্টিক রেজাল্ট তুলে না নিলে ছিঁড়ে যাবে। অন্যদিকে বলছে বাংলায় শিক্ষা পোর্টালে নম্বর তুলে দিতে হবে। আগে থেকে বললে হয় এতদিন ছুটি গেল ছুটির মধ্যে কাজটা করে নেয়া যেত।
এরপর আবার সরস্বতী পুজো তার প্রস্তুতি। বাংলা শিক্ষা পোর্টালের পাসওয়ার্ড নিয়ে খোলার চেষ্টা করল। না খুলছে না
বাড়িতে গিয়ে চেষ্টা করতে হবে।
বাড়িতে আসতেই শ্বেতাম্বরী কিছুতে আদর করতে শুরু করল। ওকে শান্ত করে ঘরের দিকে এগুলো। দেখল বুবন ঘুমোচ্ছে ওকে আর বিরক্ত করল না। ফ্রেশ হয়ে নিল। শ্বেতাম্বরীকে কতগুলো বিস্কিট খাইয়ে ঘরটায় ঝাঁট দিতে শুরু করল। এরপর ফ্রেশ হল। সন্ধ্যেটন্ধে দিয়ে সবে মাত্র বসেছে কফিটা খাবে বলে, ঠিক তখনই ফোন বাজছে
–হ্যালো…
–দিদি আমি সুনয়না বলছি।
–হ্যাঁ বলো।
–কি করছিলে।
–ঘরের কাজ থাকে না সেগুলো করলাম ।
–বলছিলাম, কালকে আমাকে অ্যাডভান্স টাকা ধার দিতে পারবেন?
–অ্যাডভান্স টাকা!
–ভীষণ দরকার আসলে আমরা সমিতি করি তো ওই সমিতির থেকে টাকা নিয়েছিলাম কালকে দেয়ার কথা…
–ঠিক আছে কাল এসো তো দেখছি।
–কত টাকা?
–দশ হাজার।
–না গো এই মুহূর্তে দশ হাজার টাকা আমি দিতে পারব না।
–তাহলে বৌদি কত পারবে?
–দেখো তুমি কাজে লেগেছ একদিনও হয়নি। তারপর যেদিন কাজে আসার কথা সেদিন আসলে না তোমার সঙ্গে আমার সেই সম্পর্কটা কি তৈরি হয়েছে আর তাছাড়া এই মুহূর্তে আমি এত টাকা দেবার মত অবস্থায় নেই। তুমি ভাল করেই জানো যে আমার মা অসুস্থ।
–ঠিক আছে বৌদি, একটু বলো তাহলে কত দিতে পারবে আমাকে তো অন্য জায়গায় তাহলে দেখতে হবে।
–তিন হাজার টাকা।
বৌদি একটা কথা বলব।
–হ্যাঁ, বলো না। ওদিকে বুবুন কাঁদছে।
–কি হলো কাঁদছো কেন?
পবিত্র সাড়া দিল আরে ও-এখন পটি করতে যাবে। জামা-কাপড় ছাড়তে হবে সেই জন্য কাঁদছে।
–না বাবা জামা কাপড় তো ছাড়তেই হবে।
–ও জামাকাপড় ছাড়তে চাইছে না।
–হ্যাঁ গো।
–বলছি আর দু’হাজার টাকা ধরে দাও না।
–ঠিক আছে কালকে এসো তারপর দেখছি। আর একটা কথা বলি, এত কামাই করলে তো আমার হবে না শুরুতেই কামাই করেছ আমার তো আগেই ভয় লাগছে।
–না গো বৌদি কামাই করব না।
–ঠিক আছে।
–ও গেল পটি করতে…
–হ্যাঁ অনেক কষ্টে পাঠিয়েছি। কে ফোন করেছিল তোমার সুনয়না।
–আর বোলো না একদিনও কাজে লাগল না এর মধ্যেই টাকা ধার!
–তোমাকে আগেই বলেছিলাম, ওই ধরনের মহিলাদের কাজে নিও না। তোমার আবার বেশি বেশি, দয়ার শরীর।
–আর তাছাড়া কাজের লোকই বা কোথায় পাব।
–তাই বলে তোমাকে…
–ঠিক আছে। দেখো না, কিছুদিন কাজ করুক- তাহলেই তো বুঝতে পারব। আজকে আমারও স্কুলে যাওয়া হল না।
–ভালই হল আমিও যাচ্ছি না। রান্না কি তোমার হয়ে গেল?
–কেন?
–চলো কোথাও ঘুরে আসি।
–মাথা খারাপ আর শ্বেতাম্বরী ..
–ওকেও নিয়ে যাব।
–তাই হয় রান্না-বান্না রয়েছে।
–হ্যাঁ রে বাবা, খেয়ে দেয়ে বেরব। ঠিক রাত্রে খাবার খেয়ে ফিরব চলো।
–ফার্স্ট জানুয়ারিতে তো কোথাও বেরনো গেল না।
–ঠিক আছে চলো কিন্তু মায়ের শরীরটা কেমন আছে একবার খবর নিতে হবে আগে।
–বাপরে কী জোরে জোরে জরজা ধাক্কা মারছে দেখো। আর শ্বেতাম্বরী দরজার পাশে গিয়ে বসে আছে।
–যাই যাই। হয়ে গিয়েছে।
–ওই দেখ তোমাকে কেমন শ্বেতাম্বরী আদর করছে দেখো।শ্বেতাম্বরীকে একটু আদর করে দে।
–লাভ ইউ। ওরে বাপরে।
ঠিক আছে চলো চলো জামাকাপড় পরব। প্রচুর ঠাণ্ডা।
–আমায় বল।
–দাও ওর বলটা দাও তো।
–তাহলে এক কাজ করো ওই ছাদে যাও ছাদে গিয়ে খেলবে শ্বেতাম্বরীকে নিয়ে।
–যাই বলো, আমাদের বুবুন কিন্তু শ্বেতাম্বরীকে পেয়ে অনেকটা স্বাভাবিক হচ্ছে। তাই না বলো কেমন একা একা থাকতো আর কেমন হয়ে যাচ্ছিল।
–ও-বন্ধু হয়ে গেছে।
–দেখো তোমার ফোন বাজছে।
–হ্যালো।
–বাবা ফোন করলে।
–মা ঠিক আছে তো।
-ওই আছে ওরকম।
–কী বুঝছ? সেরকম হলেও নার্সিংহোমে ভর্তি করো।
–ভর্তি হতে চাইছে না।
–তাই বললে হবে…
–জোর করাও যাচ্ছে না।
–বলছে, আমার তো এরকম হয় মাঝে মাঝে শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।
–ইনহেলার নিচ্ছে না।
–হ্যাঁ নিচ্ছে তো।
–দেখো সেরকম বুঝলে আমার মনে হয় নার্সিংহোমে দেওয়াই ভাল, জানিও তাহলে মাকে ফোনটা দেওয়া যাবে? থাক এখন একটু ঘুমচ্ছে। আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে ভাল থেকো। জানিও কিন্তু কী রকম থাকে না থাকে! অত টেনশন করো না।
–ঠিক আছে…
ফোনটা রেখে তিথি যেন চিন্তার পাহাড় তার মাথার ওপর নেমে এসেছে আর্গুমেন্টে বেশি গেল না। আবার কী হয় কে জানে!🍁 (ক্রমশঃ)

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ বিভাগের লেখা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।




