সম্পাদকীয়
রঙের আড়ালে সমাজের প্রতিচ্ছবি। বসন্ত উৎসব একটি মহা আলোচিত অধ্যায়। আসলে বসন্ত এলে বাতাসে এক অদ্ভুত দোল লাগে। গায়ে অনুভব হয় অন্যরমক। কামনা বাসনা আনন্দে মিলিত হয় আবেগে আবেগে। এই সময় শিমুল-পলাশের আগুনরঙা ফুলে প্রকৃতি নিজেই যেন রাঙিয়ে ওঠে। সেই রঙেরই মানবিক উৎসব হল দোল বা আমাদের দক্ষিণ ভাষায় হুলি অথবা হোলি। কিন্তু হুলি কি কেবল আবির ও রঙের উচ্ছ্বাস ভেতরে লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজ, ইতিহাস ও মানসিকতার গভীর কোনও স্রোত?

হুলি বা দোল অথবা হোলি মূলত বসন্তের উৎসব। ঋতুপরিবর্তনের আনন্দ। শীতের ক্লান্ত ধূসরতা কাটিয়ে প্রকৃতি যখন নবীন হয়ে ওঠে মানুষও তখন নিজেকে নবায়নের আহ্বান জানায়। এই উৎসবের পৌরাণিক আখ্যান অসুর শক্তির বিনাশ, ভক্তির জয়। বলতেই হয় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে অরাজগতা যত গভীরই হোক স্বচ্ছতার পথ রুদ্ধ করা যায় না। শুভ শক্তি ও অশুভ শক্তির বিনাশ হয়। আগুনে পুড়ে যায় অহংকার। ছাই থেকে উঠে আসে বিশ্বাসের নতুন বীজ। কিন্তু সময়ের স্রোতে হুলির রূপ বদলেছে। শহুরে কোলাহলে কখনও এটি পরিণত হয়েছে কেবল একদিনের উন্মাদনায়। রঙের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে গেছে সংবেদনশীলতা। অনেক সময় দেখা যায় সম্মতির তোয়াক্কা না করে কাউকে রঙ মাখানো। জল অপচয়। কৃত্রিম রঙের ক্ষতিকর ব্যবহার। এইসব আচরণ উৎসবের প্রকৃত আত্মাকে আঘাত করে। আনন্দের নামে যদি কারও অস্বস্তি বা ক্ষতি হয় তবে সেই আনন্দ আর উৎসব থাকে না। উৎসব তখন হয়ে ওঠে অসচেতনতার প্রতিচ্ছবি। তবু আশার কথা। হুলি বা হোলি অথবা দোল উৎসব আজও মানুষের মিলনের দিন। বসন্ত উৎসব আনন্দের আর এক নাম। আমরা সকলে সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে প্রতিবেশী, বন্ধু, সহকর্মী সকলেই একে অপরের কাছে এগিয়ে আসে। রঙ যেন সামাজিক প্রাচীর ভেঙে দেয়। এই দিনে ধনী-গরিব, জাত-ধর্মের বিভাজন কিছুক্ষণের জন্য হলেও অস্পষ্ট হয়ে যায়। এক মুঠো আবির হাতে নিয়ে মানুষ যেন বলে ‘আমি তোমাকে আপন করে নিলাম।’ এই প্রতীকী স্পর্শের ভেতরে রয়েছে সহমর্মিতার গভীর বার্তা ও ভালোবাসার নরম আদর। আমাদের এই বাংলার মাটিতে হুলির এক অনন্য রূপ দেখা যায় বসন্তোৎসবে। রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় রঙ মানে কেবল বাহ্যিক উল্লাস ছিল না। ছিল অন্তরের জাগরণ। গানের সুর। নৃত্যের তাল। পীতবসনের সৌরভ। বন্ধুত্বযে অমোঘ টান। সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে নান্দনিকতার এক উৎসব। সেখানে রঙ মাখানোও এক ধরনের শিল্পময়তা। সকলের মধ্যে সংযত। সম্মান ও সুরেলা অভিনন্দন থাকে রঙের আবিরের কোণায় কোণায়। মর্যাদাবোধে উজ্জ্বল হয়ে উঠে জীবন।

এই সময় আমাদের প্রশ্ন করা উচিত কারণ আমরা কি হুলিকে কেবল সামাজিক মাধ্যমের ছবিতে সীমাবদ্ধ রাখছি? নাকি সত্যিই অন্তরের ধুলো ঝেড়ে নতুন করে বাঁচার অঙ্গীকার করছি? প্রকৃতির মতো আমরাও কি পুরোনো ক্ষোভ, বিদ্বেষ, হিংসা পুড়িয়ে ফেলতে পারছি? যদি না পারি, তবে রঙের বাহার নিছক প্রসাধন হয়েই থাকবে। কোন সংয়মের মাধ্যম না হয়ে ভেঙে যাবে হৃদয়ের বাঁধন। নেশায় ডুবে যাবে এই উৎসবের মূল্য-তা!

যাইহোক, আবারও বলি, এই দোল উৎসবে এখানে যেমন আছে উচ্ছ্বাস ঠিক তেমনি আছে দায়িত্বের প্রশ্ন। পরিবেশবান্ধব রঙ ব্যবহার জল সংরক্ষণ, পারস্পরিক সম্মানের চর্চা এসবই আজকের দিনে হোলি বসন্ত উৎসব বা হুলির নতুন মানদণ্ড হওয়া উচিৎ। আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায় যখন তা অন্যের আনন্দের সঙ্গে সুর মিলিয়ে এক মহা আনন্দের পথ চলে। রঙ শেষ হয়ে যায়। আবির ধুয়ে যায়। কিন্তু সম্পর্কের রঙ যদি স্থায়ী হয় তবেই হুলি বা বসন্ত উৎসব তার সার্থকতা পায়। আমাদের সমাজ আজ নানান বিভাজনে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে উঠছে রাজনৈতিক মতভেদ, ধর্মীয় উত্তেজনা, অর্থনৈতিক বৈষম্য। এই প্রেক্ষাপটে দোল উৎসব বা হুলি এক সম্ভাবনার বার্তা দেয়। মানুষ চাইলে একসঙ্গে হাসতে পারে। একসঙ্গে গান গাইতে পারে।একসঙ্গে রঙে রাঙতে পারে। অতএব বলতে পারি হুলির প্রকৃত অর্থ খুঁজতে হলে বাহ্যিক রঙের চেয়ে অন্তরের রঙকে গুরুত্ব দিতে হবে। সহিষ্ণুতা, সমতা, সম্মান এই তিন রঙে যদি আমরা নিজেদের রাঙাতে পারি, তবে উৎসব সত্যিই সফল হবে। বসন্তের এই রঙিন প্রহরে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক দোল বা হুলি অথবা হোলি হবে মানবতার, নান্দনিকতার ও দায়িত্ববোধের উৎসব। রঙ লাগুক গালে। কিন্তু, তার চেয়েও বেশি লাগুক হৃদয়ে। ভালোবাসা হয়ে উঠুক মনময়। আনন্দের পলাশে শিমুলে মিশে যাক প্রেমের গুঞ্জন। আদরে আদরে ছোট বড় সমতায় ফিরে যাক শ্রদ্ধার মানবিকতায়।🍁
🍂মহামিলনের কথা
এ মহামন্ত্র জানবা মাত্র মানুষ জীবন্মুক্ত হতে পারে, এ সকল মন্ত্রের মন্ত্রশুদ্ধির চিন্তা নাই— অরি-মিত্রাদি দোষ বিচার করতে হয় না। এ মন্ত্রের আরাধনাতে সময় অসময় বিবেচনা নাই, এবং অধিক অর্থব্যয় কিংবা অধিক কায়ক্লেশ করতে হয় না। যে সাধক সৰ্ব্বসিদ্ধিদাত্রী কালিকাকে চিন্তা করে তার হস্তে সৰ্ব্বদা সর্বসিদ্ধি বিদ্যমান থাকে এবং সভাতে সে ব্যক্তির মুখ হতে গদ্যপদ্যময়য় বাক্য নিঃসৃত হয়, তাকে দেখবা মাত্র প্রতিপক্ষগণ নিষ্প্রভ হচ্ছে যায়। রাজারাও তার দাস হয়ে থাকেন, অন্য সাধারণ মানব সম্বন্ধে আর কি বলব! সে সাধক দিবারাত্র ব্যত্যয় অর্থাৎ দিনকে রাত্রি, রাত্রিকে দিন করতে পারে— ত্রিভুবনকে বশ করতে সমর্থ হয়, দেহান্তে দুর্ল্লভ দেবীর গণত্ব লাভ করে।
একাক্ষরী কালীমন্ত্রের মহিমা

কালী কালী বল। কালীমন্ত্র জপ করলে যে যা চায় সে তা পায়।
কালীমন্ত্র জপে কি রোগ শোক দূর হয়?
নিশ্চয়ই হয়।
ভগবান শঙ্কর বলেছেন— কালীমন্ত্রের তুল্য বিদ্যা আর কোথাও নাই, কালীমন্ত্র জপে শান্তি পুষ্টি আদি কৰ্ম্ম অচিরে সিদ্ধ হয়।
মহাপদি মহাত্রাসে মহাদারিদ্র্য-সঙ্কটে।
বৈরিবৃদ্ধৌ ব্যাধিবৃদ্ধৌ মহাঘোরে ভয়ঙ্করে॥
রাজাদিভয়মাপন্নে রাজচক্রে বিশেষতঃ।
উক্তমন্ত্ৰমিমং দেবি লক্ষমাত্রং সমভ্যসেৎ॥
—পিচ্ছিলাতন্ত্র।
মহা-আপদে, মহাভয়ে, মহাদারিদ্র্য-সঙ্কটে, মহাদারুণ ব্যাধিবদ্ধিতে, ভয়ঙ্কর রাজভয়ে বিশেষত রাজচক্রান্তে, হে দেবি! উক্ত মন্ত্র লক্ষ জপ করবে। দেবতার ক্রোধে, ভীষণ গ্রহদোষ ভয়ে, ভয়ের সাগর প্রান্তরে দস্যুগণ কর্ত্তৃক আক্রান্ত হ’লে, সৰ্ব্বত্র শান্তিকাৰ্য্য, ধননাশ উপস্থিত হ’লে ও স্বজনগণের বিদ্বেষে “অযুতং প্রজপেন্মনুম্”— অযুত কালীমন্ত্র জপ করবে। কালী মন্ত্রজপকারীকে সযত্নে পালন করে থাকেন। সেজন্য পরম যত্নে কালিকাকে ভজন কর। জপ না করলে সিদ্ধবিদ্যাও হানি করেন; হোম ব্যতীত ঐশ্বর্য লাভ হয় না। “ন সির্দ্ধির্জ্জপনং বিনা” -জপ বিনা সিদ্ধি হয় না। সর্ব্বত্র পূজা বিনা পূজা হয় না।
মা তোর একাক্ষরী কালীমন্ত্রের প্রভাব তো খুব দেখছি!
একাক্ষরী মন্ত্র কল্পবৃক্ষ।
একাক্ষরী মন্ত্রের ধ্যান কি মা?
শবারূঢ়াং মহাভীমাং ঘোরদংষ্ট্রাং বরপ্রদাম্।
হাস্যযুক্তাং ত্রিনেত্রাঞ্চ কপালকর্ত্তৃকা-করাম্॥
মুক্তকেশীং ললজিহ্বাং পিবন্তীং রুধিরং মুহঃ।
চতুর্বাহুযুতাং দেবীং বরাভয়করাং স্মরেৎ॥
যিনি শবারূঢ়া, মহাভয়ঙ্কাকৃতি, ভীষণদশনা, বরদায়িনী, সহস্যবদনা, ত্রিনয়না; যাঁহার হস্তে কপালকর্ত্তৃকা বিরাজমান, যাঁহার কেশ আলুলায়িত ও জিহ্বা লোলা; যিনি বারংবার রুধির পান করিতেছেন, চারিটি বাহু,— তন্মধ্যে দুই হস্তে বর ও অভয় মুদ্রা ধারণ করিতেছেন, সেই দেবীকে স্মরণ করিবে।
আমার কালীমন্ত্রের মহিমা শোন্। এ মহামন্ত্র জানবা মাত্র মানুষ জীবন্মুক্ত হতে পারে, এ সকল মন্ত্রের মন্ত্রশুদ্ধির চিন্তা নাই— অরি-মিত্রাদি দোষ বিচার করতে হয় না। এ মন্ত্রের আরাধনাতে সময় অসময় বিবেচনা নাই, এবং অধিক অর্থব্যয় কিংবা অধিক কায়ক্লেশ করতে হয় না। যে সাধক সৰ্ব্বসিদ্ধিদাত্রী কালিকাকে চিন্তা করে তার হস্তে সৰ্ব্বদা সর্বসিদ্ধি বিদ্যমান থাকে এবং সভাতে সে ব্যক্তির মুখ হতে গদ্যপদ্যময়য় বাক্য নিঃসৃত হয়, তাকে দেখবা মাত্র প্রতিপক্ষগণ নিষ্প্রভ হচ্ছে যায়। রাজারাও তার দাস হয়ে থাকেন, অন্য সাধারণ মানব সম্বন্ধে আর কি বলব! সে সাধক দিবারাত্র ব্যত্যয় অর্থাৎ দিনকে রাত্রি, রাত্রিকে দিন করতে পারে— ত্রিভুবনকে বশ করতে সমর্থ হয়, দেহান্তে দুর্ল্লভ দেবীর গণত্ব লাভ করে।
দিবারাত্রব্যত্যয়ঞ্চ বশীকর্ত্তুংক্ষমো ভবেৎ।
অন্তে চ লভতে দেব্যা গণত্বং দুর্লভং নরঃ॥
— ভৈরবতন্ত্র।
যারা কালীসাধনা করে তাদের পিতৃগণ পর্যন্ত সন্তুষ্ট হন।
কে মে গোত্রে সমুৎপন্নাঃ কালীং সাধিতুমুদ্যতাঃ।
তৎ শ্রুত্বা পিতরঃ সৰ্ব্বে নৃত্যন্তি হৃষ্টমানসাঃ॥
—কুব্জিকাতন্ত্র।
আমার বংশে উৎপন্ন কারা কালীসাধনা করতে উদ্যত হয়েছে —তা শুনে তাদের পিতৃগণ আনন্দিত মনে নত্য করতে থাকেন।
মা তোর কালিমূর্ত্তি অমন ভয়ঙ্করী কেন?
যারা পাপী তারা আমায় ভীষণা দেখে ভয় পায়। ভক্তেরা ভীষণা দেখে না— ভয় পায় না, বাঘিনীকে দেখলে অন্য সকলে ভীত হয়, বাঘিনীর ছেলে মা’র প্রসন্ন মুখ দেখে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে।
ওরে, অসুর সংহার করবার জন্য ঐরূপ মূর্ত্তি ধারণ করতে হয়। তোদের কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ-মদ-মাৎসর্য্য রূপ শত্রুগুলোকে, অজ্ঞান রূপ মহাশত্রুকে ভীষণ মূর্ত্তি ধারণ করে সংহার করি আর স্নেহময়ী প্রেমময়ী মা হয়ে কোলে করে স্তন্যপান করাই।
তুই কেবল মা মা করে ডাক্, তা’হলে আমাকে ভয়ঙ্করী দেখবি না। অতিসুন্দর নয়ন-মন-বিমোহন আমার রূপ দেখে বুকে ঝাঁপিয়ে পড়বি।
এক কালীকে আশ্রয় করলে মানুষ একেবারে নির্ভয় হয়ে যায়। কালী মন্ত্র জপে মানুষ সমস্ত লোক কর্ত্তৃক পূজিত হয়। মহাবিদ্যা কালীর একাক্ষর মন্ত্র সারাৎসার, শ্রেষ্ঠ হতেও অতি শ্রেষ্ঠতর। যদি জাপক হেলা করেও কালীর একাক্ষর মন্ত্র জপ করে তাহলেও চতুর্বর্গ লাভে সমর্থ হয়।
তোর কালী মন্ত্রের ত যথেষ্ট শক্তি দেখছি, তবে লোকে কালীকে নিন্দা করে কেন ?
যারা কালী নিন্দা করে তাদের আয়ু ক্ষয় হয়, পুত্র কলত্র বিনষ্ট হয়ে যায় এবং শেষে নরকে গমন করে। তুই আমার নাম কর— দুর্গা দুর্গা বল্, কালী কালী বল্, মা মা মা বল্। তোর কোন চিন্তা নাই।
🍁মাতৃগাথা | শ্রীশ্রীসীতারামদাস ওঙ্কারনাথ।
**একাক্ষরী কালী মন্ত্র (ক্রীঁ)—
মা কালীর একাক্ষরী মন্ত্র (বীজ মন্ত্র) হলো “ক্রীঁ”। এটি মা কালীর সাররূপ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী মন্ত্র, যা জপ করলে সুরক্ষা, ভয় থেকে মুক্তি এবং আত্মজ্ঞান লাভ হয়। এই মন্ত্রে ‘ক’ জ্ঞান এবং ‘রেফ’ শক্তির প্রতীক। এই বীজ মন্ত্র দেবী কালীর সারাংশকে মূর্ত করে। সাধারণত “ॐ ক্রীঁ কালিকায়ৈ নমঃ” বা শুধু “ক্রীঁ” জপ করা হয়। এটি কালী পূজায় বা প্রতিদিনের উপাসনায় জপ করা যেতে পারে।
ॐ ক্রীঁ কালিকায়ৈ নমঃ॥
জয় মা কালী🍁
(বানান সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত)
🍂স্মরণ
সমাজবিজ্ঞানে বিশেষ কৃতিত্বের জন্য আন্দ্রে বেতে ২০০৫ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি ড. এ.পি.জে. আব্দুল কালাম-এর হাত থেকে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মভূষণ পেয়েছিলেন এবং ব্রিটিশ একাডেমি (FBA) এর ফেলোও নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ২০১০ সালে ইনফোসিস পুরস্কারের জন্য সামাজিক বিজ্ঞান জুরিতেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
সমাজতাত্ত্বিক আন্দ্রে বেতে স্মরণে

জয়দেব বেরা
সমাজতত্ত্বের আকাশে আন্দ্রে বেতে ছিলেন এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা। তিনি ছিলেন একজন জনপ্রিয় ভারতীয় নৃতাত্ত্বিক, সমাজতাত্ত্বিক, শিক্ষাবিদ এবং বই লেখক। সমাজবিজ্ঞানে তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। আন্দ্রে বেতে-এর জন্ম ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের ৩০ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ ভারতের অধুনা পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার চন্দননগরে। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃবিজ্ঞানে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।এরপর তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। আন্দ্রে বেতে দক্ষিণ ভারতের মানুষের জাতি ও বর্ণের কাঠামো, সামাজিক স্তরবিন্যাস, সাম্য-অসাম্য এবং ক্ষমতার বিভিন্ন দিক নিয়ে সারা জীবন গবেষণা করেছেন।তিনি তামিলনাড়ুর তাঞ্জোর (Tanjore) জেলার শ্রীপুরম (Sripuram) গ্রাম নিয়ে বিখ্যাত গবেষণা করেছেন।
আন্দ্রে বেতে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিল্লি স্কুল অফ ইকোনমিক্সে সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক ছিলেন এবং ২০০৩ খ্রিস্টাব্দ থেকেই তিনি সমাজতত্ত্বের প্রফেসর এমেরিটাস ছিলেন। ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকার তাঁকে জাতীয় গবেষণা অধ্যাপক (National Research Professor) হিসাবে নিযুক্ত করে। অধ্যাপক বেতে পরবর্তীতে মেঘালয়ের শিলং-এ অবস্থিত নর্থ ইস্টার্ন হিল ইউনিভার্সিটির আচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এর পূর্বে তিনি অশোক বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৬০-এর দশকে পরিচালিত এই গবেষণায় তিনি বর্ণ, শ্রেণী এবং ক্ষমতার আন্তঃসম্পর্ক (Caste, Class, and Power) নিয়ে বিশ্লেষণ করেছিলেন। ক্ষেত্র গবেষণা তথা গ্রাম গবেষণা নিয়ে তিনি খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি মূলত জি.এস.ঘুরে, এম.এন.শ্রীনিবাস, নির্মল কুমার বোস, লুই ডুমো প্রমুখ তাত্ত্বিকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।
আন্দ্রে বেতে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় এবং লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। আন্দ্রে কলকাতার সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস এবং দিল্লির ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্দ্রে বেতে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিল্লি স্কুল অফ ইকোনমিক্সে সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক ছিলেন এবং ২০০৩ খ্রিস্টাব্দ থেকেই তিনি সমাজতত্ত্বের প্রফেসর এমেরিটাস ছিলেন। ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকার তাঁকে জাতীয় গবেষণা অধ্যাপক (National Research Professor) হিসাবে নিযুক্ত করে। অধ্যাপক বেতে পরবর্তীতে মেঘালয়ের শিলং-এ অবস্থিত নর্থ ইস্টার্ন হিল ইউনিভার্সিটির আচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এর পূর্বে তিনি অশোক বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
সমাজবিজ্ঞানে বিশেষ কৃতিত্বের জন্য আন্দ্রে বেতে ২০০৫ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি ড. এ.পি.জে. আব্দুল কালাম-এর হাত থেকে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মভূষণ পেয়েছিলেন এবং ব্রিটিশ একাডেমি (FBA) এর ফেলোও নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ২০১০ সালে ইনফোসিস পুরস্কারের জন্য সামাজিক বিজ্ঞান জুরিতেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আন্দ্রে বেতে অসংখ্য বই লিখেছেন। তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বই: Caste, Class and Power: Changing Patterns of Stratification in a Tanjore Village, Inequality and Social Change,Social and Cultural Reproduction of Caste, Kinship and Occupation in India,The Backward Classes in Contemporary India প্রভৃতি। বাঙালি সমাজতাত্ত্বিক আন্দ্রে বেতে দিল্লির একটি হাসপাতালে ৯১ বছর বয়সে ৩ ফেব্রুয়ারি (২০২৬) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।উনার চলে যাওয়া সমগ্ৰ সমাজতাত্ত্বিক মহলের কাছে এক অপূরণীয় ক্ষতি। বিশ্ব সমাজতত্ত্বের পাশাপাশি ভারতীয় সমাজতত্ত্বের ক্ষেত্রে আমরা এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে হারালাম। উনি আমাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় আজীবন অমর হয়ে থাকুক।উনার চরণে জানাই একবুক শ্রদ্ধা।🍁
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ১
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।
শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
২০.
বইমেলার বিকাল
নীলাঞ্জনের বইমেলায় যাওয়ার সিদ্ধান্তটা খুব স্বাভাবিক ছিল। কোনও বিশেষ পরিকল্পনা বা আবেগ থেকে নয়, বরং মৈত্রীর একটা সাধারণ অনুরোধ থেকেই। মৈত্রী বলেছিল, আজ শেষ দিন, চল না, একবার ঘুরে আসি। নীলাঞ্জন প্রথমে একটু ইতস্তত করেছিল। ভিড় তার এখন আর খুব পছন্দ নয়, পা ব্যথা করে, মাথা ধরে, তবু শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গিয়েছিল। কোথাও যেন তার নিজেরও মনে হচ্ছিল, শেষ দিনের বইমেলায় যাওয়া মানে একটা পর্বের সমাপ্তিকে কাছ থেকে দেখে আসা। সে জানত না এই সমাপ্তির সঙ্গে তার নিজের জীবনের কোনও অসমাপ্ত অধ্যায় হঠাৎ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাবে। মৈত্রীর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে সে নিজেকে বেশ স্বস্তিতেই মনে করছিল।
মৈত্রীর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হচ্ছিল, সে একসঙ্গে দুটো সময়ের মধ্যে হাঁটছে। একদিকে বর্তমান, মৈত্রী। এই বইমেলা, এই শেষ দিনের আলো। অন্যদিকে অতীত। সোমদত্তা। না বলা কথা, জমে থাকা অভিমান। সে বুঝতে পারছিল, সে সোমদত্তাকে ডাকেনি শুধু ভদ্রতার জন্য নয়, নিজের বর্তমানটাকে বাঁচানোর জন্য। কিছু গল্পকে শেষ না করেই বাঁচতে হয়, নীলাঞ্জন সেটা শিখে নিয়েছে।
মৈত্রী বেশি কথা বলে না, কিন্তু যেটুকু বলে, সেটুকুর মধ্যে একটা মেপে নেওয়া উষ্ণতা থাকে। তার পাশে থাকলে নীলাঞ্জনকে নিজের বয়সটা খুব বেশি মনে হয় না, আবার অকারণ তরুণ সাজার চেষ্টাও করতে হয় না। দু’জনের মধ্যে একটা নীরব বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে এই ক’মাসে— কিছু অতীত না খোঁজা, কিছু প্রশ্ন না তোলা, বর্তমানটুকু যতটা সম্ভব আরাম করে কাটানো। বইমেলার গেটে ঢোকার সময় নীলাঞ্জন মৈত্রীর দিকে তাকিয়েছিল। মৈত্রী হাসছিল, ঠিক যেমন হাসলে মানুষটাকে একটু হালকা লাগে। নীলাঞ্জনের তখন মনে হয়নি, এই ভিড়ের মধ্যেই তার জীবনের সবচেয়ে পুরনো ছায়াটার সঙ্গে হঠাৎ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যেতে হবে। ভেতরে ঢুকে তারা ধীরে ধীরে হাঁটছিল। মৈত্রী বইয়ের নাম দেখছিল, কিছু বই হাতে তুলে উল্টেপাল্টে দেখছিল। নীলাঞ্জন পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। এই দাঁড়িয়ে থাকাটার মধ্যেই তার আরাম। একসময় সে নিজেও একটা বই তুলে নেয়, স্টলের লোকটির সঙ্গে দু’চারটি কথা বলে। তার কথা বলার ভঙ্গি বদলায়নি, এটা সে নিজেও জানে। বয়স তার শরীরে ছাপ ফেলেছে, চুলে পাক ধরেছে, হাঁটার গতি কমেছে, তবু কথা বলার সময় তার ভেতরের সেই পুরোনো সজীবতাটা এখনও জেগে ওঠে। সে বইটা হাতে নিয়ে কথা বলছিল, দাম জিজ্ঞেস করছিল, আর ঠিক সেই সময়েই তার চোখের কোণ দিয়ে কাউকে দেখতে পেল। প্রথমে সে নিশ্চিত হতে পারেনি। ভিড়ের মধ্যে কত মুখই তো চোখে পড়ে। কিন্তু পরের মুহূর্তেই বুকের ভেতরে একটা কেমন চাপ অনুভব করল। সেই মুখটা সে চিনত। এত বছর পেরিয়ে গেলেও কিছু মুখ এমন থাকে, যেগুলো চিনতে সময় লাগে না। সোমদত্তা। নীলাঞ্জনের হাতটা সামান্য কেঁপে উঠেছিল। স্টলের লোকটি কী বলছিল, সে আর ঠিক শুনতে পাচ্ছিল না। চোখের সামনে যেন সময়টা হঠাৎ ভেঙে পড়ল, বর্তমান আর অতীত একসঙ্গে মিশে গেল। সে দ্রুত তাকিয়ে দেখল। হ্যাঁ, সোমদত্তাই। বয়স তার ওপরও ছাপ ফেলেছে। আগের মতো তীক্ষ্ণতা নেই, চুলে সাদা রেখা, চোখে একটা গভীর ক্লান্তি। তবু কোথাও একটা পরিচিত দৃঢ়তা এখনও আছে, যেটা সে কোনওদিন ভুলতে পারেনি। নীলাঞ্জনের প্রথম ভাবনাটা ছিল, সে এখানে কী করছে? সে কী একা এসেছে? তারপরেই তার মনে পড়ল, এগুলো সবই অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা অন্য জায়গায়, এত বছর পর এইভাবে দেখা হয়ে যাবে, সে কোনওদিন ভাবেনি। নীলাঞ্জন হঠাৎ করেই সচেতন হয়ে উঠল মৈত্রীর উপস্থিতি নিয়ে। মৈত্রী তখন অন্য দিকে তাকিয়ে ছিল, কোনও স্টলে বই দেখছিল। এই ক’য়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নীলাঞ্জনের মাথার ভেতর কত কথা ঘুরে গেল। সে কী ডাকবে? সোমদত্তাকে দেখে হাসবে? কেমন আছ বলবে? এত বছর পরে এই প্রশ্নটা কি অর্থবহ? আবার একসঙ্গে একটা ভয়ও ঢুকে পড়ল, এই দেখা কী পুরনো ক্ষত খুলে দেবে? এই মুহূর্ত কী তার বর্তমানটাকে অস্বস্তিকর করে তুলবে?
নীলাঞ্জন দেখল, সোমদত্তা তাকে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইছে। কিন্তু পাশ কাটানোর ভান করলেও সে আড়চোখে তাকাচ্ছে। এই আড়চোখে তাকানোটা নীলাঞ্জনের কাছে অসম্ভব পরিচিত। একসময় এই তাকানোই ছিল তাদের সম্পর্কের ভাষা। বুকের ভেতর কোথাও একটা পুরনো ব্যথা চাড়া দিল। সে হঠাৎ বুঝে গেল, এত বছর পরেও কিছু অনুভূতি কেবল ঘুমিয়ে থাকে, মরে না। নীলাঞ্জন আর দেরি করল না। ঘাড় ঘুরিয়ে সরাসরি তাকাল। চোখাচোখি হয়ে গেল। এই মুহূর্তটা খুব ছোট ছিল, কিন্তু নীলাঞ্জনের মনে হল সময় যেন থমকে গিয়েছে। সোমদত্তার চোখে বিস্ময় দেখল, তারপর এক মুহূর্তের জন্য সেই পুরনো কঠিন অভিমান। সে মুখ খুলে কিছু বলতে যাচ্ছিল। কী বলবে ঠিক জানত না। হয়ত শুধু বলবে, সোমদত্তা? তুমি? এতদিন পরে…! কিন্তু ঠিক সেই সময়েই সোমদত্তা চোখ সরিয়ে নিল। ও-ভিড়ের মধ্যে নিজেকে মিশিয়ে দিল, যেন নীলাঞ্জনকে আর দেখতেই চায় না।
নীলাঞ্জন দাঁড়িয়ে রইল। ডাকবে কি না ভেবে দেখল। কিন্তু তার পা এগোল না। মৈত্রী তখন ফিরে এসেছে তার পাশে। মৈত্রী কিছু বুঝেছে কি না, সে জানত না। মৈত্রী জিজ্ঞেস করল, কী হল? নীলাঞ্জন বলল, কিছু না। এই ‘কিছু না’ বলার মধ্যেই সে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় মিথ্যেটা লুকিয়ে রাখল। বুকের ভেতরে একটা চাপ জমে উঠছিল। সে জানত, সোমদত্তা হয়ত আর ফিরে তাকাবে না। এই না-ফিরে তাকানোই তাদের সম্পর্কের শেষ বাক্য।
মৈত্রীর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হচ্ছিল, সে একসঙ্গে দুটো সময়ের মধ্যে হাঁটছে। একদিকে বর্তমান, মৈত্রী। এই বইমেলা, এই শেষ দিনের আলো। অন্যদিকে অতীত। সোমদত্তা। না বলা কথা, জমে থাকা অভিমান। সে বুঝতে পারছিল, সে সোমদত্তাকে ডাকেনি শুধু ভদ্রতার জন্য নয়, নিজের বর্তমানটাকে বাঁচানোর জন্য। কিছু গল্পকে শেষ না করেই বাঁচতে হয়, নীলাঞ্জন সেটা শিখে নিয়েছে। বইমেলার শেষ দিনের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে সে বুঝল, আজ শুধু মেলার শেষ দিন নয়, তার জীবনের একটা অধ্যায়েরও নীরব সমাপ্তি। সে জানে, আজ যদি সে ডাকত, সবকিছু ওলটপালট হয়ে যেতে পারত। কিন্তু সে ডাকেনি। কারণ এখন তার পাশে মৈত্রী আছে, আর সামনে একটা শান্ত, সংযত জীবন। যেখানে অতীতের ছায়ারা আর কথা বলে না, শুধু মাঝে মাঝে চোখের কোণে এসে দাঁড়ায়। 🍁 (ক্রমশঃ)
🍂কবিতা
বিভাস রায়চৌধুরী -এর দু’টি কবিতা

চাঁদের জানালায়
চাঁদের জানালায় ঘুম এসে থামে
কেউ কাঁপে, কেউ নড়ে নড়ে ওঠে…
বুকের ভেতর ঢেউ
কেউ যেন অদৃশ্য
ডাকছে আমায়।
শূন্য অগণিত প্রশ্ন
শূন্য তারারাও
যেন উত্তর জানে না।
বুকের গভীরে
জমে শব্দ
হঠাৎ বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ে।
এই হাত বৃষ্টির দিকে অন্ধকারের দিকে!
ভয় নয়! শুধু বিস্ময় জাগে…
চাঁদের জানালায়
আমি থুতনি রেখেছি

তাপ-অনুতাপ
দোলনার মতন ঝুলে আছে নীল অনুতাপ
গলিতে ঘুম ভাঙে
ক্লান্ত স্বপ্ন এই…
হেঁটে যাই অজানা-অচেনা রাস্তায়
হেঁটে যায় পায়ের নিচে কাঁপে পুরনো কিছু
তোমার নামটি
বাতাসে ভাসে
অর্ধেক বলা কথার মতো
থেমে থাক নীলা…
এইবার মুছে যায় অন্ধকার
মোছে না ছায়াটুকু
পাখি একটি পাখি দু’টি ডাকে দূরে
একটি নদী শেখাচ্ছে ভেসে যেতে
আমি শিখি হারিয়ে গিয়েও পাতাটিকে আঁকড়ে ধরতে
এই তো আমারই গান…
তৈমুর খান -এর একটি কবিতা

আরেকটি বৃক্ষজন্ম
পথের ধারে আমিও একা
ছায়ার নরম বৃক্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম
তুমি তোমার ঈশ্বরের সাথে কত গল্প করলে সেদিন
কথাগুলি কাঠবিড়ালি হয়ে উঠে এল আমার নরম শরীরে
কথাগুলি ভাষাপাখি হয়ে বাসা বাঁধল ডালে
তুমি চুল এলোমেলো, বুকের বাঁধন খুলে
হৃদয় উড়ালে
সে হৃদয়ে ঈশ্বরের আকাশ ভরে গেল
তোমার ঈশ্বর অন্যভুবনের ঠিকানা দিলে
তুমি চুম্বন পাঠালে সেই নতুন ডাকঘরে
আমি শুধু সবুজ হলাম ঘাসের মতন সহিষ্ণু নীরবে।
রেহানা বীথি -এর একটি কবিতা

অনিশ্চিত গন্তব্যের গন্ধ
দীর্ঘ শূন্যতা
অতঃপর খয়েরি প্রলেপ
অতঃপর আমাদের রাত্রিকালীন নিস্তব্ধতা
কিছু ফুল বিছিয়েছিলাম একসময়
কোথায়? জানি না…
হয়তো প্রাণের ওপর
হয়তো মৃত্যুর ওপর
হয়তো আরও কিছু ফুলের ওপর!
শূন্যতার ভেতর থেকে
নিশ্চিত করে বলা যায় না কিছুই
রাত্রিকালীন নিস্তব্ধতাও
আমাদেরকে নিশ্চিত হতে দেয় না কিছুতেই
নারায়ণ ঝাঁ -এর একটি কবিতা

নদীর ওপারে
সন্ধ্যার শেষে নদী ধীরে অন্ধকারে ঢাকে, আমি দাঁড়িয়ে থাকি কূলের ভাঙা সিঁড়িতে।
জল ছুঁয়ে দেখি : কত কি ভেসে গেছে নিঃশব্দে।
দূরের একটিমাত্র প্রদীপ জ্বলে,
মনে হয় সে-ই আমাকে ডাকেছে নাম ধরে। শোনা যায় অচেনা বাঁশির সুর, যেন হারানো দিনের ফিরে আসার গান।
তোমার চোখের মতো শান্ত ছিল যে সবকিছু, আজ সেখানে মেঘ জমেছে অকারণ।
তথাপি নদী থেমে নেই…
আমি শিখছি জলের কাছ থেকে–
ভালবাসা আঁকড়ে ধরা নয়। ভালবাসা মানে স্রোতে ছেড়ে দেওয়া আর বিশ্বাস রাখা–
চিত্ত রঞ্জন চক্রবর্তী -এর একটি কবিতা

ব্যথার স্মৃতি বুকে নিয়ে বেঁচে থাকা
ক্ষুধা আর পিপাসার মত শত্রু নেই পৃথিবীতে, আমি ভুখা পেটে উপোষ জীবন বসে আছি।
পিপাসায় বুক ফেটে যায়, অন্তহীন ক্ষুধা জ্বালাময়ী আগ্নেয়গিরি জ্বলে পেটে।
সময়ের আবর্ত, কত কিছু ভাবনা চলে যায়–
জলের স্রোতের মতো স্রোত হয়ে।
অশান্ত মনের আগুন পারিনা নিভাতে।
আমি একা বসে আছি অনুক্ষণ জীবনের সব ঋণ নিয়ে।
কেউ কি আছো প্রিয় বান্ধবী অথবা বন্ধু অথবা আপনজন?
কেউ কি আছো, সময়ের কাছে ঋণ থেকে আমাকে বাঁচাতে?
পরাভুখ সময় অনেক কিছু দিয়ে, আবার সব গেছে নিয়ে।
পরে আছে আসা যাওয়া সময়ের মাঝে স্পন্দন টুকু ব্যথার স্মৃতি হয়ে।
গোলাম কবির -এর দু’টি কবিতা

সেইসব মৃত মানুষের জন্য
এই যে চোখের সামনে
কতো মৃত মানুষ হেঁটে চলে,
ঘাড় গুঁজে নিজে নিজেই ঘোঁৎ ঘোঁৎ
করতে করতে হেঁটে যায়, এদেরকে
দেখে আমার ভীষণ মায়া লাগে,
আহা! মানুষেরা আর কতো কাল
এমন মৃত মানুষের মতো থাকবে
নির্বিকার এবং কতটা সময় নষ্ট করবে
ওরাও যে মানুষ এই কথা বুঝতে!
সবই তো করে ওরাও!
খায় দায়, ঘুমায়, সঙ্গমে লিপ্ত হয়
প্রিয় নারীর সঙ্গে, ঠোঁটে ঠোঁট রাখে গভীর আবেগে,
সন্তানের গালে, কপালে চুমু খায়!
শুধু নিজের অধিকার টুকুই
বুঝতে পারে না অথবা বুঝলেও
জীবনের মতো মৃত্যুও একবারই আসে
জেনেও মৃত্যুর ভয়ে নির্বিকার থাকে
শত অন্যায় অত্যাচার সহ্য করেও!

মাকে নিয়ে কবিতা লেখা বিষয়ে
‘মা’ এই একটা মাত্র শব্দ নিয়ে
কত কবিতা, কত গল্প, উপন্যাস
লেখা বেরিয়ে গেল এবং
তা চিরকালের জন্য অমর হয়ে রইল!
আমিও অবশ্য পড়েছি সেসব বিখ্যাত কবিতা,
গল্প ও উপন্যাসের কিছু কিছু কিন্তু
আমি যখন তোমায় নিয়ে
কবিতা লিখতে বসলাম, তখন!
তখন– কেমন একটা দলা পাকিয়ে বুকের
পাঁজর ভেঙে অস্পষ্ট গোঙানির মত
কান্নারা ভিড় জমাতে জমাতে পুরো আমাকেই
গ্রাস করে নিল এমন করে যেনো
কোনও এক গভীর বিষাদের তমসায়
পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ লেগেছে
আমার সমগ্র পৃথিবী জুড়ে!
আর কোনও কথা কিংবা শব্দ দিয়ে
মাকে নিয়ে আমার কিছুই লেখা হল না!
কবিতা লেখার খাতায় শুধু ‘মা, মা, মা, মা…’
এই শব্দটাই প্রায় মুছে যাওয়া শব্দের মত
কিছু অস্পষ্ট শব্দ হিসেবে রয়ে গেল!
জাগৃতি শিকদার গুহ -এর একটি কবিতা

কুয়াশার পরের যে পথটুকু
ভোরের আগের নরম কুয়াশায় আমি একা হাঁটি শিশিরভেজা ঘাসের।
পায়ের শব্দে জেগে ওঠে নিঃস্তব্ধতা, গাছেদের ছায়া দুলে ওঠে।
তখনও আকাশে ফোটেনি আলোটুকু পুরো
তবু পূর্ব দিগন্তে রঙের ইশারা।
মনে হয়, সব জানে ও।
তোমার অনুপস্থিতি এখন আর ব্যথা দেয় না
যেন দীর্ঘ যাত্রার প্রস্তুতি।
আমি শিখেছি ভাষা,
শিখেছি না-পাওয়াকেও প্রার্থনা করতে।
যা চলে গেছে, তাকে ডাকি না আর।
জানি, কুয়াশা সরলেই নিজেই স্পষ্ট হয় ভোর
রাত যেমন খুঁজে নেয়…
আমি তাই থামি না কোনও সংশয়ে।
পথের ধুলোতেই রাখি বিশ্বাস।
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস /২
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হল সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।
হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা

মমতা রায় চৌধুরী
৭.
শীতের রাত্রে ও তিথির যেন গরম করছে কেন এমন হচ্ছে। ভেতরটা কেন এত যে অস্থির হচ্ছে? উঠে একটু জল খেল। ফোন করবে বাড়িতে। না, না, না। বাবা তো ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমান। মনের ভিতরে ওলোটপালট শুরু হয়েছে। কী করবে এখন ভেবেই পাচ্ছে না। পবিত্রকে ডাকবে। সরস্বতীকে ফোন করবে? কেন এত খারাপ লাগছে? কিসের জন্য। এসব ভাবতে ভাবতেই তিথি দরজাটা খুলল একি অবস্থা শ্বেতাম্বরী, গা টা পুরো ফাঁকা।আহারে কত কষ্ট পাচ্ছে, যা ঠাণ্ডা। এত ঠাণ্ডাতেও লেজ নেড়ে যাচ্ছে, হাত দুটো বাড়িয়ে দিচ্ছে। না মা তোমার কান দুটো ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছে। এসো তোমাকে ঢাকা দিয়ে দিই, কেন খুলে দিয়েছ কেন? শ্বেতাম্বরীকে ধরে একটু হামি খেলো।
–সেটাই তো বলছি, এসব কথা কি বলা যায় বল! সহ্য করা যাচ্ছে না। কী চিৎকার করছে ওকে রাখা যাচ্ছে না।
–তিথি কী বলবে ভেবে পেল না। গলার স্বর আটকে গেল যেন। শরীরটা আনচান করতে লাগল। কথা বলতে বলতেই খাটের উপর বসে পড়ল।
–পবিত্র ওকে ধরে ফেলল।
তারপরও ব্যালকনিতে গেল কুয়াশার যেন ঢেউ আসছে। হঠাৎ যেন মনে হল ফোন বেজে উঠল।
পবিত্র ডাকছে,
–কি গো কোথায় গেলে?
–তিথি, তিথি, তিথি ঘুম জড়ানো কণ্ঠে ডাকছে পবিত্র।
এর মধ্যে বুবুন কেঁদে উঠল। এবার পবিত্র একটু বিরক্ত হল জোরে ডাকল কী হল তুমি এত রাতে তুমি কোথায়? আওয়াজটা কানে যেতেই তিথি ছুটে আসলো। –কী হয়েছে, কী হয়েছে? এত চেঁচাচ্ছ কেন?
–চেঁচাচ্ছি কি আর এমনি এমনি!
রাত্রে একটু শান্তিতে ঘুমোতেও পারব না।
–হ্যাঁ সেটাই বল।
—আরে বাবা তোমার ফোন বাজছে…
–আমার ফোন!
–তোমার ফোন না হলে কী আমি চেঁচাতাম?
–এত রাত্রে!
–কার ফোন!
–বুবুনকে তুমি দেখো।
–এই চুপ কর বাবা।
–একি বড় মামির ফোন!
এত রাত্রে!
–দিদার কিছু হল!
–এসব কী ভাবছ তুমি?
–বড় মামি ফোন করেছে।
–ফোন করলেই বা…
ফোনটা ধরাতেই সঙ্গে সঙ্গে ফোন ধরে,
–‘হ্যালো’।
–এ বাবা এত রাত্রে জেগে!
মনের ভেতরে যেন একটা দুঃস্বপ্ন তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
–হ্যাঁ মামি বলো।
–কীরে ঘুমের ডিস্টার্ব করলাম।
–বলো না।
–আর বলিস না! কি যে বলি…
–কেন!
গলার স্বরটা শুনেই কেমন যেন আতঙ্কে ভুগছে তিথি।
–একটা খারাপ খবর আছে।
–খারাপ খবর!
–হ্যাঁ রে।
–দিদার কিছু হয়েছে?
–না, না, না।
–তাহলে?
–কি করে যে বলি…
এবার সত্যিই তিথির হার্ট অ্যাটাক হবে!
মামি বলল,
–অপর্ণার মেয়ে…
–অপর্ণা?
–তুলি, তুলি…
–ও কি হয়েছে? শরীর খারাপ?
–না রে, ওর বড় মেয়ে…
–কী হয়েছে?
মামি চুপ করে আছে।
–বলো।
–মারা গেছে।
–কী বলছ এসব কথা !
–সেটাই তো বলছি, এসব কথা কি বলা যায় বল! সহ্য করা যাচ্ছে না। কী চিৎকার করছে ওকে রাখা যাচ্ছে না।
–তিথি কী বলবে ভেবে পেল না। গলার স্বর আটকে গেল যেন। শরীরটা আনচান করতে লাগল। কথা বলতে বলতেই খাটের উপর বসে পড়ল।
–পবিত্র ওকে ধরে ফেলল।
–মামি পরে কথা বলছি।
–কী? কী হয়েছে? ওর কী হয়েছে?
মেঘ যেন কাটছেই না অকাল বর্ষণে চারিদিকে ডুবুডুবু অবস্থা! এসব কী শুনছে নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। ফুটফুটে একটা মেয়ে কত মাসি মাসি করে পাগল করে দিত।
–তিথি… তিথি… শক্ত হও…
পবিত্র ওকে সান্তনা দেবার চেষ্টা করল। মামি মনে মনে ভাবতে লাগল, এত রাত্রে কথাটা না জানালেই হত। ‘মেঘ দেখে তুই করিস না ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে’ প্রবাদ বাক্যটা ভাবতে ভাবতে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফোনটা রেখে দিল।🍁 (ক্রমশঃ)
🍂মুক্তগদ্য
আচ্ছা পুরনো কথা মৃত মানুষের নাভিকুণ্ডের মতো গঙ্গায় ভাসিয়ে দিলাম৷ এখন শোনো আমার একটা নতুন প্রেমিক হয়েছে– এই যে আমার হৃদয়ের কাছে থাকা মৃত বাবলা গাছ…
তুমি কি জানো এটি আমাকে আদর করে, চুমু খাই? তবে তোমার এটা জেনে রাখা দরকার এই গাছের আদর শুধু আমি একা উপভোগ করি৷ অন্য কোনও পাখি আজ পর্যন্ত এই আদরের স্বাদ পাইনি৷
অমিত পাল -এর তিনটি মুক্তগদ্য

রহস্য
বিরহ কাতর কাঠবেড়ালিটাও বোঝে পাকা পেয়ারার রহস্য৷ টিয়ে পাখির লাল ঠোঁটে ছোয়া লেগে যাওয়া পেয়ারা বীজগুলি কোকিলের জন্য আদরচিহ্ন– সেকথার গল্পও কাঠবেড়ালি জেনে গিয়েছে৷ তবুও কেন জানি না কাঠবেড়ালিটা ঐ পেয়ারার পিছনে উৎসুক, অপেক্ষায়মান৷
সমুদ্র চড়ে ঝিনুক কুড়ানো শ্যামলা মেয়েটিও বোঝে কন্ঠমালার রহস্য৷ কিন্তু তার স্বাদ ও সাধ মেটাতে পারে এমন রাজকুমার কোথায়?
অভিশাপ নামক একটা কাহিনীর কথা শুনেছি৷ ‘বেদনাসিক্ত নারী অভিশপ্ত আজও’ –ব্যপারটা কেমন ছাইভস্ম মাখা ধাঁধা না?
মেয়ে দূর্গা কিভাবে চাঁদ মনসা হয়ে ওঠে সেকথার রহস্য কি তুমি জানো?
পাঁচবেলা নামাজ পড়া নারীর মধ্যেও এক ঐশ্বরিক চাহিদার রহস্য লুকিয়ে! উত্তপ্ত লাভা স্রোতও জানে আগ্নেয়গিরির রহস্য কতটা কঠিন৷ তুমি কি জানো ছায়াবৃত পথে রহস্যের গন্ধ কতখানি?
ফেলে আসা বিকেলে সাদা পদ্মের ঘ্রাণ লাগাব এবার৷ তোমার প্রতি আমার অন্তহীন বিরহী রহস্যের গভীরতা কতখানি তুমি বুঝে উঠতে পারনি! চাই শুধু ঝাপসা আলোর ঝরনা ধারায় এই রহস্যের অবসান ঘটুক…
প্রেম কী বোঝা যায় না৷ বুঝতে হলে, নিজের শরীর ও হৃদয়কে ভাসাও ব্রহ্মাণী তরঙ্গে৷ পারলে একদিন সময় নিয়ে এসো বাবলা তলায়৷ দেখে যেও আমার আর বাবলা গাছের প্রেম…
ছেলেটা যা চায়
বহুকাল যাবৎ অপরিষ্কৃত টুপিতে দীনতার ছাপ স্পষ্ট৷ পাশের বাড়ির দাদুর খড়ের চালে হওয়া একটুকরো কাঁচা কুমড়ো জোগাড় করতে পেরে সে আনন্দিত৷ আজ সে বড় সাধ করে কুমড়ো তরকারী দিয়ে ভাত খাবে৷ তৃপ্তি খুঁজবে ভাতের অমৃত ঘ্রাণ৷ অন্য একটি ব্যঞ্জন হল ঐ কমড়োটির খোলা ভাজা৷ কী যে অমৃত আছে– কাছে না গেলে কেউ জানতেই পারবে না!
দিন আনে দিন খাই৷ কোনও কোনও দিন পোড়া পেটকে শান্ত করতে ঢেলে নেই পেটে পাশের বাড়ি থেকে চেয়ে আনা গরম ভাতের ফ্যান৷ বাবার বয়স হয়েছে৷ বিড়ি বাঁধার হাত অবশ৷ ছানি পরা চোখে তামাক সাজা বারণ৷ মা পরের বাড়ি মুড়ি ভাজে৷ এঁটো বাসনপত্র ধোয়৷ এই অবস্থাতেই দিন পার হয়…
ছেলেটা এখন দু’চারটি বাড়ির রাখালি করার সুযোগ পেয়েছে৷ অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে গরু নিয়ে মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়াতে৷ প্রতিদিন দামপাল, বৃন্দেপাল, বুড়িবাগানে ঢো মেরে আসা তার কাজ৷
পুজো আসছে৷ মালিক এবার নতুন কিছু পোশাক দেবে৷ চারদিন ভাল করে খেতে পাবে৷ ভালো বকশিস পাবে সে– আহা! এতেই তার কত আহ্লাদ৷
পাশের বাড়ির দাদুর রেডিওতে মহালয়ার গান শোনার জন্য সে উৎসুক হয়ে থাকে৷ গরু ভেড়া চড়াতে চড়াতে কাশবনের ধারে দাঁড়ায়৷ ফুল তোলে হাতে করে৷ সাদা তুলোর মতো কাশফুলগুলিকে নিজের গায়ে ছোঁয়ায়, আদর করে৷ এরপর শিউলিফুলের ঘ্রাণের টানে ঘরে আসে৷ আনন্দে, আহ্লাদে আত্মহারা নাবিক হয়ে ওঠে– পূজার সময় হয়ে এল যে…
আমার নতুন প্রেমিক
পাঁচ বছরে ধরে দণ্ডায়মান মৃত বাবলা গাছের নিচে আকস্মিক নিদ্রা ভঙ্গ হয়৷ সন্দিহান ফিরে পেলেও স্বপ্নে দেখা কাল্পনিক বাস্তব এখনো ফিকে হয়ে যায়নি৷ কবি ও কবিতা, লেখক ও গল্প, প্রাবন্ধিক ও প্রবন্ধ বলে কিছু নেই৷ সবই সৃষ্টিকর্তার হাতে ধোয়া তুলসী পাতা স্বরূপ…
দেখো ঐ যুবক নিমগাছের কাছে কখনো প্রার্থনা করো না, —তোমার আইবুড়ো ভাতের পাশে তার নামে একপদ ব্যঞ্জন হোক৷
আচ্ছা! একটু আব্দার কম করলেও তো পারো৷ আচ্ছা! আকন্দমালা সাজালে তুমি বিয়ে করবে? আচ্ছা! তোমার প্রসাদ শুধু আমার জন্যে রাখবে না কি সকলের কাছে ভাগ করে দেবে? —দয়া করে পত্রে জানিও৷
আচ্ছা পুরনো কথা মৃত মানুষের নাভিকুণ্ডের মতো গঙ্গায় ভাসিয়ে দিলাম৷ এখন শোনো আমার একটা নতুন প্রেমিক হয়েছে– এই যে আমার হৃদয়ের কাছে থাকা মৃত বাবলা গাছ…
তুমি কি জানো এটি আমাকে আদর করে, চুমু খাই? তবে তোমার এটা জেনে রাখা দরকার এই গাছের আদর শুধু আমি একা উপভোগ করি৷ অন্য কোনও পাখি আজ পর্যন্ত এই আদরের স্বাদ পাইনি৷
তুমি জেনো রেখ– শিয়াল কাঁটা গাছের পাতা দিয়ে তন্ত্রমন্ত্র শিখলেও মাধুর্য্য কী? প্রেম কী বোঝা যায় না৷ বুঝতে হলে, নিজের শরীর ও হৃদয়কে ভাসাও ব্রহ্মাণী তরঙ্গে৷ পারলে একদিন সময় নিয়ে এসো বাবলা তলায়৷ দেখে যেও আমার আর বাবলা গাছের প্রেম…🍁
🍂জীবনচর্চা
মনের সঙ্গে মন ও আত্মার বোঝাপড়া।জেদ, আশা, আকাঙ্ক্ষা, আত্মশক্তি, মানসিক শক্তি মনকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সংযুক্ত চিন্তায় থেকে মনোনিবেশ বাড়িয়ে জীবনকে এগিয়ে নিতে হয়। ঝলমলে, চকচকে আলোকিত জীবন পূর্ণ ধারায় রাখে নিদারুণ ব্যাখ্যা। সবই মন সতেজতার ফল। মন সতেজ থাকবে, আগ্রহ পাবে কাজে। ইচ্ছে শক্তি থাকে জীবন গলিতে।
নিযুক্ত ও মনোভঙ্গ

প্রিয়াংকা নিয়োগী
নিযুক্ত বলতে এখানে মনের সঙ্গে মনের নিযুক্তি করণের কথা বলা হচ্ছে। মনের সঙ্গে মনের নিযুক্তকরণ অটুট রাখতে হলে নিজের মনের সঙ্গে আনন্দে থাকা জরুরী। মনোভঙ্গ হল, দুঃখ-কষ্ট-আঘাতে আশাহত, মর্মাহত, হৃদয় ভঙ্গ হওয়া। নিযুক্তের ক্ষেত্রে মনের ইচ্ছে পূরণ হলে, মন আঘাত, দুঃখ, কষ্ট না পেলে মন ঠিক থাকে। মনোযোগ একই
থাকে। মনের সঙ্গে মনের ঘনিষ্ঠ যোগ মনোযোগ ঠিক রাখে। মনে উৎসাহ বৃদ্ধি পায়, প্রফুল্ল থাকে। তাই দুঃখ দেওয়ারও নেই, দুঃখ নেওয়ারও নেই। চলতে হবে দেখে, কাটা না ফুটে যায় মনে ও পায়ে। মানসিকতা কামরানোর জায়গা কাউকে দেওয়া যাবে না।নিজের সঙ্গে নিজের অস্তিত্ব সংযোগে যেতে হবে এগিয়ে। তাই মনের শক্তি অত্যন্ত জরুরি। মনের ফুল যত্নে রাখতে হবে। রস থাকবে মনে,মন চলুক সেভাবে।
জীবনে এগিয়ে যাওয়ার রস জোগায় মনঃসংযোগ। মনের সঙ্গে মন ও আত্মার বোঝাপড়া।জেদ, আশা, আকাঙ্ক্ষা, আত্মশক্তি, মানসিক শক্তি মনকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সংযুক্ত চিন্তায় থেকে মনোনিবেশ বাড়িয়ে জীবনকে এগিয়ে নিতে হয়। ঝলমলে, চকচকে আলোকিত জীবন পূর্ণ ধারায় রাখে নিদারুণ ব্যাখ্যা। সবই মন সতেজতার ফল। মন সতেজ থাকবে, আগ্রহ পাবে কাজে। ইচ্ছে শক্তি থাকে জীবন গলিতে। মনের সাথে বুদ্ধি ও মনো-সংযোগ, নিজ আত্মার সঙ্গে নিজ আত্মার আত্মীয়তা পারে নিজেকে ঠিক রাখতে, সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে হবে। মনোভঙ্গ মানে মন ভেঙে যাওয়া, আশাহত হওয়া। মনের কষ্ট বেদনায় জর্জরিত। এতে মনের অসুখ বাড়ে। মন ভাঙতে থাকে, অকেজো হয়ে যায়। মনের সঙ্গে মনের দূরত্ব বাড়তে থাকে। মনো সংযোগ নষ্ট হয়। জীবনে মন নিযুক্তকরণ ও মনোভঙ্গ দু’টোই থাকবে। তবে মনোভঙ্গকে গুরুত্ব দিলে বা জীবিত রাখলে মন ব্যথায় ব্যাকুল থাকবে, মনের শক্তি ও আত্মশক্তি হারাতে থাকবে। যেটা প্রত্যেকের জন্য অত্যন্ত খারাপ। মনোভঙ্গ হলেও করণীয় কাজ করে যেতে হবে। স্বপ্ন দেখে যেতে হবে।
মনোভঙ্গ বা হতাশার লক্ষণ:
১. প্রথমত নিজেই বুঝে নেওয়া যে কষ্ট পেয়েছি, কষ্টে আছি।
২. কাজ বা সৃজনশীল কাজে উৎসাহ হারিয়ে ফেলা।
৩. সামনে এগোনোর রাস্তা না পাওয়া।
মনোভঙ্গ বা হতাশার থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসতে হবে?
১. মনের কষ্ট চিহ্নিত করা, কারণ বের করা।
২. মনের কষ্ট ঝেড়ে ফেলা বা মুছে ফেলার রাস্তা বের করা।
৩. সেই সব মানুষ থেকে দূরে থাকা যারা দুঃখ কষ্ট দিয়েছে।
৪. চলতে ও বলতে হবে সেভাবে যাতে কেউ দুঃখ না দেয়।
৫. প্রয়োজনে কাছের কোনো মানুষের সাথে বিষয়টা বলা ও আলোচনা করা।
৬. নাচ-আবৃত্তি-ছবি-আকা- গান শোনা, যোগা সহ সৃজনশীল কাজ ও সমাজ সেবার কাজে যুক্ত হওয়া।
৬. জেদ, শক্তি, ধৈর্য্য ও সাহস রাখা নতুন পরিকল্পনা ও এগিয়ে। যাওয়ার, প্রতিকূলতাকে মুছে দেওয়ার জন্য।
৮. মানসিক প্রস্তুতি সবসময় প্রয়োজন আমি ভাল থাকব,
যে কোনও পরিস্থিতিতে শক্ত থাকব, আমার কাজগুলো
এগিয়ে নিয়ে যাব।
৯. আমার সঙ্গে অন্যায় হতে দেব না। হওয়া অন্যায়ের জন্য প্রতিবাদ করতে হবে।কখনো নিঃশব্দ যুদ্ধ করতে হবে।
১০. নিরাশা হলেও নিজেকেই আশার আলো জোগাতে হবে। কাজ করে যেতে হবে।
১১. নেতিবাচক চিন্তা ও কার্যকলাপ থেকে যোজন যোজন দূরে থাকতে হবে।
১২. নিজের ভাঙা মনকে জোড়া লাগানো নিজ চেষ্ট ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ছে।
১৩. নিজের প্রতি আস্থা ও ভরসা রাখতে হবে।
ভাল থাকা ও খারাপ থাকা দুটোই আমাদের হাতে
আছে। স্ব দৃষ্টিভঙ্গি, নিজ কর্ম, বিবেচনা, আত্মোপলব্ধি,
স্বপ্ন, ভাবনা, দিক নির্বাচন, ইতিবাচক থাকা সমস্তটাই
রয়েছে ভাল থাকার মধ্যে।🍁

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ বিভাগের লেখা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।





