Sasraya News Sunday’s Literature Special | 19th July 2026, Sunday | Issue 119 | সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল | ১৯ জুলাই ২০২৬, সংখ্যা ১১৯

SHARE:

ম্পাদকীয়

ময় এর সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বাহ্যিক পরিবর্তন এক নতুন কথা নয়। তবুও নতুন কারণ পুরোনো মানুষ যেতে যেতেই আবার নতুনের আগমন ঘটে। এই যাওয়া আসার মাঝেই আছে টানাপোড়েন। ভালোবাসার মধ্যে প্রকৃতি যখন সুন্দর হয়ে উঠে তখন সমস্ত প্রেম নীরব ও স্থির হয়ে যায় ফলে জীবনের চাওয়া পাওয়ার কোনও আরম্ভর থাকে না। মনের ইচ্ছে এতো দ্রুত কাজ করে যে সেখানে কোন বিপরীত শক্তি প্রবেশ করতেই পারবে না।

আসলে আমাদের ভিতরে আত্ম অহংকার রাগ এতো এতো বেশি যে নিরলস ভালোবাসাকে প্রেমে রূপান্তর করতে পারিনা। এগুলো আমাদের সমাজের এক বিশেষ ভুল ক্রিয়া যেখানে আমিই মানে আমিত্ম যোগ এতোই বেশি করে দেখি সেখানে প্রেমের মৃত্যু ঘটে। মা – বাবার প্রেম, বন্ধু -স্বজনের প্রেম, আত্মীয়পরিজনের প্রেম, সমাজের প্রেম, প্রকৃতির প্রেম এই ভাবে প্রেম ভাগ হয়ে যায়। বিশেষ ভাবে প্রেম যে এক উত্তরণ অভিন্ন চরম শক্তি তা ভুলে গিয়ে বিভাজন লিপ্ত হয়ে যায় ফলে। আমার – আমার বিষয়ে প্রবেশ করেছি এই স্বয়ংঅতা আমাদের পরমতাকে নষ্ট করে দেয়। যদিও এই বিষয়ে ভালাবাসা প্রেম এই বিষয় জনিত ভিন্ন শব্দে মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে বা হয়। তাই ভালোবাসা ও প্রেমের ব্যখ্যা ভারতীয় ভাষা বিশেষ করে সংস্কৃত হিন্দী বাংলা… ভাষা ছাড়া এর উদাহরণ আর অন্য কোনও ভাষায় ভালো ভাবে পাওয়া যায় না।🍂

 

 

🍂মহামিলনের কথা

 

শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ

শ্রীশ্রীরামনাম-মাহাত্ম্য

হাবীরের অভয়বাণী— “যে মন্ত্রপরায়ণ মানব নিত্য ভক্তি সহকারে উত্তমরূপে রামকে স্মরণ করেন, হে মুনীশ্বরগণ, আমি তাঁহার ইষ্টসংদ্ধির জন্য দীক্ষিত। সর্ব্বপ্রকারে জাগরুক, রামকার্য্যধুরন্ধর (ভারবাহক) আমি রাঘবের ভক্তগণের বাঞ্ছিত বস্তু প্রদান করিয়া থাকি।”

শ্রীশ্রীঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব। ছবি : সংগৃহীত

রামনামে জাগরিতা প্রেমময়ী নাদময়ী জগজ্জননী কুলকুন্ডলিনী আবেশে বিভোর হইয়া রামনামকারীকে সতত সুমধুর সঙ্গীত শুনাইতে শুনাইতে কখন যে প্রাণনাথের সহিত একীভূতা হইয়া যান,নামপ্রেমী তাহা জানিতেও পারেন না।

সেইজন্য শাস্ত্র উচ্চকন্ঠে বলিয়াছেন— যোগের মধ্যে পরম যোগ রামনাম কীর্ত্তন।
—নামই পরম জ্ঞান,ধ্যান,যোগ ও প্রেম। একমাত্র রামনামই পরম গোপনীয় বিজ্ঞান।
—নামই পরম জ্ঞান, নামই অখিল জগৎ, নামই জীবগণের জীবন, নামই বিপুল ধন।
—রামনাম শ্রেষ্ঠ জ্ঞান, রামনাম পরম রস, রামনাম অতি প্রশস্ত মন্ত্র, রামনাম পরম শোভন জপ।

রামনাম রসপানে মানব ভুমা-সুখ লাভে সমর্থ থাকে।
রামনাম কেবল রস নহেন, রসতম ওঙ্কারেরও আকর! ওঙ্কারও রাম নাম হইতে উৎপন্ন হন।
এই রামনাম গ্রহণে যোগী, কর্ম্মী সকলেই স্ব-স্ব অভীষ্ট লাভে কৃতার্থ হইতে পারিবেন।
এখানে জিজ্ঞাস্য— যদি রামনামের দ্বারা সকলেই কৃতার্থ হইতে সমর্থ হন, তাহা হইলে সাংখ্য-যোগ-বেদান্তাদি শাস্ত্র নিরর্থক? —না, নিরর্থক বলিতে পার না। কেন না, সকলের অধিকার একরূপ নহে; জন্মান্তরের কর্ম্ম অনুসারে মানুষের প্রকৃতি গঠিত হয়। যিনি পূর্ব্বজন্মে যে শাস্ত্রে ও সাধনে অনুরাগী ছিলেন, পরজন্মে তিনি সেই শাস্ত্রে ও সাধনে অনুরাগসম্পন্ন হন। মুল সূত্র— “বহু হইব—জন্মগ্রহণ করিব”। তজ্জন্য অধিকারী ভিন্ন ভিন্ন; তাঁহারা স্ব-স্ব অভিমত শাস্ত্র অবলম্বনে সাধন করত পরমানন্দ প্রেম-পারাবারে অভিসার করিয়া থাকেন।

এই রামনাম পরমপাথেয় যিনি গ্রহণ করিয়াছেন, তাঁহার জ্ঞান, যোগ ও মুক্তি না চাহিলেও স্বতঃই হইয়া যায়।
—ভক্তগণ সালোক্য, সামীপ্য, সারূপ্য ও সাযুজ্য মুক্তি ভগবান দান করলেও গ্রহণ করেন না। তাঁহারা চাহেন সেবা।

শ্রীভগবান স্বয়ং বলিয়াছেন, “দদাত্যপি ন গৃহ্নন্তি ভক্তা মৎসেবনং বিনা”। —ভক্তকে মুক্তিসকল দান করলেও ভক্তগণ মুক্তি গ্রহণ করেন না। একমাত্র ভগবদভক্তি প্রভাবেই ভক্তগণ শ্রীভগবানকে লাভ করিয়া থাকেন। শ্রীভগবান এ যুগেও দর্শন দান এবং যোগক্ষেম বহন করেন। 🍁 —শ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী

 

 

🍂ফিরেপড়া

 

উজ্জ্বল সিংহ -এর দু’টি কবিতা

শুনতে পাচ্ছ, উন্মাদ নাবিক

উদ্ভিদমুখর একটুকরো ভূখণ্ডের জন্য তুলে ধরেছি দূরবীন।
কোথায় সেই ব্যাভিচারী বন্দরের মায়াজাল?
প্রবল লালসার জরে জ্বলছি দিনরাত,
জিভ লকলক করছে অবলেহ ক্ষারের জন্য।
রাত্রিকে ভাবি আততায়ী। দিনকে বিশ্বাসহন্তা।
ভুল ম্যাপে ঠিকরে পড়ে বিভ্রমের ধাঁধা।
কোথায় সেই অনাবিষ্কৃত মাটির তেরছা চাহনি?
সামনে পিছনে মারমুখী হাওয়ার ছোবল!
দীর্ঘশ্বাস ছুঁয়ে যায় ঢলে-পড়া নক্ষত্রের লেজ।

উথলে উঠছে ফেনার ইন্দ্রজাল, দুলে উঠছে পাটাতন। তুফানসর্বস্ব এক মধ্যরাতে (সর্বাঙ্গ উদোম তখন)
পিঠে বিঁধেছিল চকচকে জ্যোৎস্নার হুল!
তারপর, চঞ্চল হল পর্তুগীজমেধা, পলিনেশিয়ান রক্ত।
আমাকে খুঁজে বের করতে হবে ক্রিটাসিয়াস প্রাণীর কবর,
উত্তর-নিরক্ষীয় স্রোত এবং ঈজিয়ানের অভিযানক্ষেত্র।
শুনতে পাচ্ছ পিথিয়াস, উন্মাদ নাবিক,
পেট্রলিয়ামের ছুঁচোলো দাঁড়া কুরে খাচ্ছে
তলদেশের ঠান্ডা আবহকে, শুনতে পাচ্ছ?

শুভরাত্রি, ভাঙা কম্পাস, বাতিল লগবুক, ভিজে দড়িদড়া,
শুভরাত্রি, অকেজো মেশিনগান, আমার সার্ডিনশূন্য টিন, শুভরাত্রি।
মাথার উপর ঝুলছে উদ্যত কুইজ, আর কোনো শব্দ নেই,
শুধু সমুদ্র-বায়ুর ব্লুজ, শুধু মর্ষকামী ঢেউয়ের ফোঁপানি।

 

শ্রীচরণেষু বাবা

ঈশ্বর অভূতপূর্ব! ঈশ্বর অভাবনীয়!!
সকল চরণে তিনি উদ্বৃত্ত দু-এক মাত্রা।
ভাঙাচোরা ডাকঘরে
মানিঅর্ডারের নীচে তিনি অলৌকিক আশীর্বাদক।
ঈশ্বর জল্পনাহীন। বাহির ব্রহ্মাণ্ডে তিনি ফিজিক্স-অনার্স।
(আমি শহরের মেসে বাংলায় এম.এ…)
সৌরমণ্ডলের বাইরে টিভি-ও বিকল। ঈশ্বর ঝিরঝির।
আমার যৌন অভিযানের তিনি সবুজ পতাকা।
আতঙ্কের প্রতিফলে অভিযাত্রা সমাপ্তির লাল আলো।
সূর্যোদয়ের আগেও তিনি নেই সূর্যাস্তের পরও তিনি নেই।
ঈশ্বর আশ্চর্য শূন্য। তিনি সংখ্যার বাঁদিকে বসেন।
নারী-পুরুষের মধ্যে ঈশ্বর দৃশ্যমান হাইফেন।

 

 

ল্প | ১

 

প্রত্যেকের তো চোখ আর হাত বাঁধা ছিল। মাইনুলের সেই বাঁধন খুলল কিভাবে? কে খুলে দিল? দলা দলা রক্তের ওপর উঠে বসলো মাইনুল। দেখল, শকুনেরা তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছে। দ্বিধা-সংকোচ কাটিয়ে মাছিরাও রক্তে চুমুক দিচ্ছে। গোধূলি ধীরে ধীরে গাঢ় থেকে গাঢ়তর। মাইনুল এখন কোথায় যাবে?

 

গন্তব্য উত্তরের পথে

রেহানা বীথি 

সুবাসটুকু নাক দিয়ে ঢুকে প্রথমে বুকের খাঁচায় কিছুক্ষণ চাপ ধরে থাকল। তারপর সুড়সুড় করে মাথায়, মানে, মগজে ঢুকে পড়ল। এবার আর চাপ ধরে থাকল না। মৃদু মৃদু ধাক্কা দিতে লাগল–
মনে কর মাইনুল, মনে কর। আমি কোন ফুলের সুবাস,  কেন মনে পড়ছে না তোর!
মাইনুল মনে করার চেষ্টা করল। এ-জীবনে যে ক’টা ফুল ও-দেখেছে, তার কোনোটার সঙ্গে কি এই সুবাস মিল খাচ্ছে? তাছাড়া, রেললাইনে কি এমন সুবাসওয়ালা ফুলের গাছ কখনও দেখেছে?
মনটা বিলি কেটে কেটে উকুন খোঁজার মতো করে খুঁজতে লাগল। কিন্তু ওর মনের পর্দায় কেবলই ভেসে উঠতে থাকল থোকা থোকা ভাঁটফুলের ছবি। রেললাইন জুড়ে তো লাইন ধরে ওই ফুলই ফোটে।

…বাপরে বাপ, বুড়ির ফুটোফাটা টিনের চাল আর উঠোন যেন ঝাঁঝরা করে দেবে! তবে কিনা বুড়ির ওপর বোধহয় ওপরওয়ালার রহমত আছে। না হলে তো উড়ে আসা গুলির যেকোনো একটা শরীরে বিঁধে কবেই মরে যেত। তো এতসব দেখে সয়ে বুড়ির ঠোঁটের আঠা একটু ঢিলা হয়েছে। কিন্তু ঢিলা হয়ে লাভ কি হল? বশিরকে পেয়েও তো আতার কথা চুপিচুপি জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গিয়েছে মাহাত বুড়ি। মন খারাপ করে দেহের হাড় ক’খানা আরেকটু গুছিয়ে বসতে বসতে বুড়ি হঠাৎ মাইনুলকে দেখতে পেয়েছিল। তারপর খুব গোপনে মাইনুলের কানের কাছে ফোকলা মুখ এনে আতার কথা ফিসফিসিয়ে জানতে চেয়েছিল।

আরও কিছু ফুলও ফোটে, তবে ওগুলোর সুবাস আছে কিনা কে জানে! সুবাস থাকলেই যে ফুল,  তা-ও তো নয়। এই যেমন বাবলা গাছের হলুদ হলুদ ফুলে সুবাস নেই, তবুও তো ওগুলো ফুলই। একথা মনে আসতেই মাইনুলের মনে পড়ে গেল,  রেললাইনে বেশ কিছু বাবলা গাছও আছে। ওর গাঁয়ে ঢোকার মুখেই তো একটা বাবলা গাছ ভাঙা মাজা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু বাবলা ফুলে কি আসলেই সুবাস নেই? কখনও নাক ডুবিয়ে শুঁকে না দেখা মাইনুল নাকের ডগায় হঠাৎই সুড়সুড়ি অনুভব করল।
একটু চুলকানো দরকার। কিন্তু পিছমোড়া করে ওর দু’হাত বাঁধা আছে বলে পারছে না। সুড়সুড়ি তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে আর অসহায় মাইনুলের শরীর অদ্ভুত ভঙ্গিতে এঁকেবেঁকে যাচ্ছে।
‘হিলনা মাৎ! নেহি তো পেহলি গোলি তুম পার চলেগা।’
ধমকের চড়টা নাকের সুড়সুড়ির চেয়ে বেশি তীব্র হওয়ায় মাইনুলের শরীর থেমে গেল। কিন্তু মন? মন সুবাসের ফুলটি খুঁজছে। চোখ বাঁধা, নাহলে খুঁজতে আরেকটু সুবিধে হতো। তবে মন দিয়ে খোঁজার কাজটি করতে গিয়ে মাইনুলের মনে এক ধরনের আনন্দ-বেদনার মিশ্রিত অনুভূতি কাজ করছে। ও-নিজেকে একজন অন্ধ মানুষের সঙ্গে তুলনা করে বেদনা অনুভব করছে, আবার অন্ধের চোখ দিয়ে ফুল খুঁজতে খুঁজতে কল্পনায় বিভিন্ন বৃক্ষ-লতা-পাতা দেখার সৌভাগ্য হচ্ছে বলে আনন্দের পক্ষী ওড়াউড়ি করছে ওর মনের ভেতর। আর এই ওড়াউড়ি ওর মন ভেদ করে কণ্ঠনালীতে এল। তারপর কণ্ঠনালীতে হালকা তরঙ্গ তুলে ঠোঁটের আগায় এসে দু’কলি গান হয়ে ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে। আর তার পরপরই আচমকা একটা ঘুসি এসে পড়ল ওর ঠোঁটের ওপর। এবং ঘুসির প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আছড়ে পড়ল একটি ধমক –
“চুপ রাও!”
চুপ হয়ে গেল সব, হঠাৎই। মাইনুলের গান ছড়িয়ে পড়ার আগে হামেদ কাঁদছিল,  সিরাজুল কাকুতি-মিনতি করছিল,  বাসেদ শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ফোঁসফোঁস করছিল। এখন সবাই চুপ। শুধু রেললাইনে বিছানো পাথরের ওপর বুটের আওয়াজ হচ্ছে। ওই আওয়াজের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে পাথরের খড়খড় খড়াৎ।
আরেকটা শব্দ পেল মাইনুল- ওর একতারাটা কি এরা ভেঙে দিল নাকি?
এই ভাঙনের শব্দে মাইনুল চরম বেদনা অনুভব করল। বেদনায় কমে গেল ঘুসিতে ঠোঁট কেটে যাওয়া এবং ঠোঁটের নেকাবে ঢেকে থাকা দাঁতসকলের মধ্যে একটা দাঁত নড়বড়ে হয়ে যাওয়ার ব্যথা। ওর এই বেদনার আশেপাশে আনন্দের কোনো ছায়া নেই,  ফুলের সুবাসও নেই। ও-ভুলে গেল,  একটু আগেও সুবাসের ফুল খুঁজে খুঁজে পেরেশান হয়ে যাচ্ছিল। ভুলে গেল, রেললাইনে সার করে দাঁড় করানো মানুষগুলোর নাম।
“বহুত সময় চলে গ্যায়া, এখন খতম করে দেন না স্যার!”
গলাটা আতা, মানে আতাউরের। খালেকের ব্যাটা আতাউরের। ওর এই ঊর্দু বলার প্রয়াসেই কিনা কে জানে, যে বাতাস এবং শব্দেরা এতক্ষণ গুম মেরে ছিল, তারা হঠাৎ ছোটাছুটি শুরু না করলেও হাঁটাহাঁটি করতে লাগল। মাইনুলের মনের ভেতরেও কিছুক্ষণ আগের এবং তারও আগের ভুলে যাওয়া দৃশ্যগুলো হাঁটাহাঁটি করতে লাগল-
সূর্য মাথার উপরে। একতারা হাতে ঈদগাহের মাঠের মাঝখান দিয়ে বাড়ি ফিরছিল মাইনুল। আর ওর মাথার ওপর দিয়ে একটা শকুন চক্কর খাচ্ছিল। শকুনটা তার ভারি ডানা ঝাপটে ঝাপটে এমনভাবে মাইনুলের মাথার কাছে চলে আসছিল, মনে হচ্ছিল যেন ঠুকরে দেবে। ওর ভয় লাগছিল, কিন্তু মাথার ওপরের সূর্যটার চড়চড়ে তাপে কিছুটা হাওয়া লাগছিল বলে ভালোও লাগছিল। ওই ভালোলাগায় ঈদগাহ পেরিয়ে গোরস্থান,  গোরস্থান পেরিয়ে আমবাগানের মধ্যে ঢুকে ছায়ায় মায়ায় কী যে শান্তি পেয়েছিল! মনে করেছিল, গামছা পেতে একটু ঘুমিয়ে নেবে। আর ঘুমানোর আগে গাছে ঝুলে থাকা সবুজ আম দু’তিনটে ছিঁড়ে ফাটিয়ে খাবে। কিন্তু কোথায় কী! যেন মাটি ফুঁড়ে বের হয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল আতা। আতার সঙ্গে ছিল ওরই বয়সী আরও কয়েকজন। ওরা সবাই ফিকফিক খিকখিক করে হেসে মাইনুলকে ঘিরে ধরেছিল। তারপর ওরা জানতে চেয়েছিল – “এই গণ্ডগোলের মইধ্যে একতারা নিয়া রোজ কই যাও মাইনুল? তুমার ডর নাই? আর জানো না, গানবাজনা করা হারাম?”
মাইনুল একটু বোকা হাসি চেহারায় নিয়ে ঘুরে ঘুরে ওদের চেহারাগুলো দেখছিল। দেখতে দেখতে মাইনুলের মনে হয়েছিল,  আতা একেবারেই ওর বাপের মতো চেহারা পেয়েছে। বাপের মতোই চ্যাপ্টা ধড় চ্যাপ্টা নাক আর মোটা ঠোঁটের আতার অবশ্য মাথাভর্তি বাবরি চুল। আর ওর বাপ খালেকের মাথার চান্দি পূর্ণিমার চাঁদের মতো ফকফকে ফাঁকা। ঘুরে দেখতে দেখতে একবার ওর বাপের ফাঁকা মাথায় বাবরি চুল বসিয়ে দিয়েছিল মাইনুল। আতার বুড়ো বাপের মাথায় বাবরি চুল বসিয়ে মনে মনে বেশ আমোদও পেয়েছিল। আমোদে আমোদেই খেয়াল করল- আতাকে বুড়ো বানিয়ে দেয়ায়, কিংবা বুড়ো খালেককে তার ছেলের বয়সী বানানোর চেষ্টার কারণে আতা কেমন যেন রেগে যাচ্ছে। রাগতে রাগতে ক্ষেপে খয়েরী হয়ে যাচ্ছে। আর তারপর আতার হাতে উঠে এসেছে কাঁচা কঞ্চি। শুধু আতার হাতেই নয়,  ওর সঙ্গীরাও কোথা থেকে যেন জোগাড় করে ফেলেছে চিকন চিকন কঞ্চি। ওরা সবাই কঞ্চিগুলো দিয়ে বাতাসে সপাং-সপাং বাড়ি দিতে দিতে আরও বেশি খিকখিক ফিকফিক করে হাসছে।
চোখ ঘুরিয়ে দেখতে দেখতেই কিনা কে জানে, মাইনুলের মাথা পাক খেতে শুরু করেছিল। মাথা ঘুরে পড়ে যাবে কিনা,  এই ভয় কিংবা আতঙ্কে তখন ও-চোখের ঘোরাঘুরি বন্ধ রেখে একতারার তারে হালকা টান দিতেই আতা বলেছিল –
“চলো মাইনুল। আমাগো লগে একটু রেললাইনের হাওয়া খায়া আসবা। হাওয়া খাইতে গেলেই বুঝবা, গান বাজনা করা আসলেই হারাম।”
আতা এমনভাবে বলেছিল,  যেন মাইনুল কিছু জানে না। মাইনুল তো আতাকে চোখেও চেনে ভ্রুতেও চেনে। ওর চ্যাপ্টা নাকের দুই পাশের দুই সরু চোখ কত যে খেলা জানে! বলা যায়,  মাইনুলের দুই চোখ সেইসব খেলার সাক্ষী। গাঁয়ের প্রতিবেশী, একসঙ্গে হেলে-খেলে বড় হয়েছে, যা ঘটনা তা তো সব চোখের সামনেরই। তবে আতা এবং মাইনুল দু’জনেরই বয়স যখন কম ছিল, যখন মাইনুলের ততটা বুঝ হয়নি, তখন হয়তো আতা এতটা চোখের খেলোয়াড় ছিল না। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাইনুলের বুঝ-এর সঙ্গে পাল্লা দিয়েই আতার চোখের খেলাও বেড়েছে। আর ওর চোখের খেলার সঙ্গী হয়েছে ভ্রূর কারুকাজ। কথায় কথায় কী তাদের নাচুনি! এই নাচুনি দেখে ত্যক্ত-বিরক্ত মাহাতো বুড়ি তো মাঝে মাঝে মুখে ঝামা ঘষে দেয়ার জন্যে আতাকে দু’দশ কথা শুনিয়ে দিতেও ছাড়েনি। হাবল মুন্সি তো কতদিন বলেছে – “মুরুব্বির মুখের ওপর চোখ-ভুরু নাচায়া কথা কওয়া হইলো গিয়া এক নম্বরের বেয়াদবি। তোর বাপ-মা তোরে শিখায় নাই আতা?”
কিন্তু এই যে যুদ্ধ, যে যুদ্ধ বাঙালির মুক্তির জন্যে, সেই যুদ্ধে আতার এইসব বেয়াদবিই এখন আদব। মাহাতো বুড়ির ঠোঁটজোড়ায় যেন বেলের আঠা লাগানো হয়েছে। আতার মুখের ওপর তো বটেই, আড়ালেও কাউকে ওর কথা জিজ্ঞেস করে না। সারাদিন পুব ভিটের ঘরের দাওয়ায় পথের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে। বসে বসে চুনের পানির মতো সাদাটে চোখে জোর খাটিয়ে পথ চলতি মানুষজনকে চেনার চেষ্টা করে। কাউকে চেনা মনে হলে কাছে ডেকে জানতে চায়–
“কে যায়, বশির? মিলিটারি নাকি স্কুলে ক্যাম্পো বানাইছে? তুমি কি দেখছো বাবা? সেদিন নাকি বাদল মাস্টারের লাশ পচা ডোবায় ভাসতেছিল,  তুমি কি দেখছো বাবা?”
বলতে বলতে থরোথরো শরীরে বুড়ি উঠে দাঁড়ায়। বুড়ি উঠে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ওর গায়ের ঝুলে যাওয়া চামড়া আর প্রায় সমতল বুকের আঁচল ক্রমশ নিচে নামতে থাকে। এমনভাবে নামতে থাকে, যেন একসময় ওগুলো বুড়িকে বুড়ির জায়গায় রেখেই পুরোপুরি খুলে পড়ে যাবে। কিন্তু সেটা হওয়ার আগেই পথচারী চলে যায়। বুড়ি আবারও বসার আয়োজন করে। এবং ধীরে ধীরে শরীরের হাড়গুলোকে গুছিয়ে বসতে থাকে। যখন বসা সম্পূর্ণ হয়, তখন তার গায়ের চামড়া আর বুকের আঁচল জায়গামতো ফিরে না এলেও অনেকটাই ঠিকঠাক হয়ে যায়। বুড়ি তার সাদা চোখ আবারও পথে পেতে দিতে দিতে ভাবে- “বশিররে কি য্যান জিগাইবার চাইছিলাম, কী য্যান?”
আসলে, বশিরের কানে কানে বুড়ি আতার কথাই জানতে চেয়েছিল। কারণ, সেই গত বুধবার বিকেলে, বুড়ি যখন লাঠিতে কাঁপন তুলে গোয়ালঘরের পাশের নিম গাছটার তলায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল,  তখন আবছাভাবে কিছু কথা ও ঘটনার গুঞ্জন ওর কানে এসেছিল। সেই কিছু কথার এবং ঘটনার মধ্যে দুটো ঘটনা বুড়ির অন্তরে গভীরভাবে দাগ কেটে গেছে। দু’টোতেই আতা জড়িত। প্রথমটা হচ্ছে- আসাদুল্লাহ মাস্টারের সোমত্ত দুই কন্যাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে ভয় দেখিয়ে মিলিটারির ক্যাম্পে নিয়ে গিয়েছে আতা।
আর দ্বিতীয়টি হল- হাবল মুন্সিকে নাকি মিলিটারি তুলে নিয়ে গিয়েছে। নিয়ে গিয়েছে তো গিয়েছে, পাঁচদিন পার হওয়ার পরেও মুন্সি নাকি বাড়ি ফেরেনি। অথচ মিলিটারি তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় আতা সঙ্গে ছিল। এবং সে নাকি মুন্সির বউকে বলেছিল, “এই যাইব আর আইব,  চিন্তা কইরো না চাচি।”
সেই কবে বুধবার চলে গেছে,  তারপর বৃহস্পতি, শুক্র, শনিও পেরিয়ে গেছে। এবং এই চারদিনের আগেও কত কত দিন পেরিয়ে রাত হয়েছে,  রাত পেরিয়ে আবারও দিন এসেছে। কিন্তু মাহাতো বুড়ির স্বপ্নেও যা কোনোদিন আসেনি, তা-ই তো ঘটেছে। টিনের চালের ওপর দিয়ে উড়োজাহাজের সে কী শব্দ! এই যে উড়োজাহাজ, তা কি বুড়ি কোনোদিন দেখেছিল,  না দেখতে চেয়েছিল?
আর গুলি! বাপরে বাপ, বুড়ির ফুটোফাটা টিনের চাল আর উঠোন যেন ঝাঁঝরা করে দেবে! তবে কিনা বুড়ির ওপর বোধহয় ওপরওয়ালার রহমত আছে। না হলে তো উড়ে আসা গুলির যেকোনো একটা শরীরে বিঁধে কবেই মরে যেত।
তো এতসব দেখে সয়ে বুড়ির ঠোঁটের আঠা একটু ঢিলা হয়েছে। কিন্তু ঢিলা হয়ে লাভ কি হল? বশিরকে পেয়েও তো আতার কথা চুপিচুপি জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গিয়েছে মাহাত বুড়ি। মন খারাপ করে দেহের হাড় ক’খানা আরেকটু গুছিয়ে বসতে বসতে বুড়ি হঠাৎ মাইনুলকে দেখতে পেয়েছিল। তারপর খুব গোপনে মাইনুলের কানের কাছে ফোকলা মুখ এনে আতার কথা ফিসফিসিয়ে জানতে চেয়েছিল। মাইনুল বলেছিল-
“আল্লারে ডাকো দাদী। এই বয়সে ওইসব চিন্তা কইরা মাথা আউলা করো ক্যান। খাও, ঘুমাও আর দ্যাশের লাইগা, আমগো লাইগা দোয়া করো।
একলা মানুষ তুমি,  নিশ্চিন্তির সংসার। খামাখা চিন্তা কইরো না।”
বুড়ি তারপরও আমতা আমতা করে বলেছিল – “ভাবছিলাম আমাগো গ্যারামডা শান্তিতে আছে, যুদ্ধ এদিকে আইবো না। কিন্তু আইলোই তো। ক্যাম্পো বানাইলো। গ্যারামের লোকজনও মাইরা ফালাইতাছে। আর গ্যারামের পোলা হইয়া আতা  মিলিটারিগো পিরিতের মানুষ হইছে। আরও কয়জনও নাকি হইছে। ছিঃ!”
এসব বকবকানির মধ্যেই মাইনুল বুড়ির পশ্চিম ভিটের ঘরখানায় একবার ভালো করে চোখ বুলিয়ে নিয়েছিল। তারপর ঘর থেকে চোখ সরিয়ে শূন্য গোয়ালঘরেও উঁকিঝুঁকি দিয়ে চলে এসেছিল। আর তারপরে একতারা হাতে সোজা উত্তরে হাঁটা দিয়েছিল। এই উত্তরের পথের কোনো এক প্রান্তে কিংবা কোনো এক ঘরে পুরো দু’টো দিন মাইনুল ছিল কিংবা ছিল না, সে খবর কেউ জানে না। এই দু’দিন গাঁয়ের মানুষ মাইনুলকে দেখতে পায়নি। ওর এক টুকরো ভিটের ওপর যে একখানা পাটকাঠির বেড়া দেয়া ঘর আছে,  সেই ঘরে দু’টো রাত কুপি জ্বলেনি বলেও কারও মাথাব্যথা হয়নি। অন্য সময় হলে হয়তো হতো,  কিন্তু এই যুদ্ধের সময়ে মাহাতো বুড়ি ছাড়া সবাই যেন নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। প্রতিদিন সবার জীবনেই যেন রোজ কেয়ামত।
কিন্তু না, আপাতদৃষ্টিতে এমনটা মনে হলেও ঘটনা যে অন্যরকম, তা তো মাইনুল তখনই বুঝেছে যখন আমবাগানের মধ্যে আতাবাহিনী ওকে ঘিরে ধরে রেললাইনে হাওয়া খাওয়ানোর কথা বলেছে। গোপনে যে ওরা মাইনুলের চলন-ফিরনের ওপর নজর রেখেছিল, সেটা তো তখনই পরিষ্কার হয়ে গেছে। অবশ্য তাতে মাইনুলের কিছু যায় আসে না। ও-তো হাসতে হাসতেই ওদের সঙ্গে রেললাইনে চলেও এসেছে। আর তারপর থেকেই অপেক্ষায় আছে বুকের ছাতিতে, নাহয় পেটে, নাহয় মাথায়, যেকোনো এক জায়গায় অথবা পুরো শরীরে গুলি খেয়ে মরার। কিন্তু অপেক্ষা তো শেষ হচ্ছে না!

খুব সন্তর্পণে উসখুস করে উঠল মাইনুল এবং বহুক্ষণ পর সেই অচেনা ফুলের অচেনা সুবাস আবারও মাইনুলের নাকের কাছে ঘুরঘুর করতে লাগল। সেই সঙ্গে একটা মাছিও ভোঁ… আওয়াজে ওই সুবাসের আশেপাশেই ঘুরঘুর ঘুরছে। বোধহয় ঘুসিতে মাইনুলের কেটে যাওয়া ঠোঁট বেয়ে সুড়সুড় করে নেমে আসা রক্তের গন্ধ মাছিটাকে আকৃষ্ট করেছে। কিন্তু মাইনুল রক্তের কোনো গন্ধই পাচ্ছে না। শ্বাস টেনে কয়েকবার চেষ্টা করার পরেও শুধু ফুলের গন্ধই পাচ্ছে। মাইনুলের মনে হল- শুধু ফুলের গন্ধ পাওয়ার মতো করেই বোধহয় ওর নাকের ফুটো দু’টো তৈরি। ও-দেখেছে,  ওর নাকের ফুটো অনেকের চাইতে ছোট। আর এই ছোট ফুটো দিয়ে হয়তো দুই গন্ধ একসঙ্গে যাওয়া-আসা করতে পারে না। নিজের নাকের এই ঘাটতি আজই প্রথম অনুভব করল মাইনুল। তবে চিন্তিত হল না। শুধু সুবাস পেয়েই ও-খুশি।
কিন্তু এই খুশির সঙ্গে অপেক্ষার উসখুস মিশে যাচ্ছে বলে অস্বস্তি বাড়ছে মাইনুলের।
বাড়তে বাড়তে চরমে চলে যাচ্ছে। ওর ইচ্ছে করছে চিৎকার করে বলে- “মাইরা ফালাবি এ তো জানা কথা, কিন্তু মারার আগে এত রঙ্গ করিস ক্যান তোরা?”
তবে মাইনুলের চিৎকারটা গলাতেই আটকে থাকে। ও-শুনতে পায় ইনিয়ে-বিনিয়ে কাঁদছে আর বার বার প্রাণ ভিক্ষা চাইছে কেউ একজন।
আতাদের সঙ্গে রেললাইনে আসার পর দেখেছে মাইনুল, গাঁয়ের ছেলে বুড়ো আধবুড়ো মিলে জনা আটেক লোককে ধরে আনা হয়েছে। এ-কান্না তাদের কারোরই নয়।
তাহলে কি নতুন কাউকে ধরে এনেছে?
নতুন একজন, নাকি একাধিকজন? এখন তাহলে লাইনে দাঁড়ানো মানুষের সংখ্যা কত? সবাইকেই মেরে ফেলবে, নাকি যাচাই-বাছাই করে কাউকে কাউকে ছেড়ে দেবে? আগেও এরকম করেছে মিলিটারিরা। হয়ত পাঁচজনকে লাইনে দাঁড় করিয়েছে, কিন্তু দু’জনকে মেরে বাকি তিনজনকে ছেড়ে দিয়েছে। তবে ছেড়ে দেয়ার আগে মুক্তিপ্রাপ্তদের পশ্চাৎদেশে ডাণ্ডা দিয়ে বেদম পিটিয়ে লাল করে দিয়েছে। আজও কি তা-ই করবে নাকি? আবার এমনও তো হতে পারে, আজ যাদেরকে ছেড়ে দেবে তাদের মধ্যে মাইনুলও একজন! যদিও জান দেয়ার জন্যে মাইনুল রেডিই আছে, তবুও কেন যেন এই সম্ভাবনার কথা ভেবে ওর মনে একটুখানি আনন্দ হল। অবশ্য ওর এই একটুখানি আনন্দের পিছনে অনেকখানি ব্যাপার আছে। মরে গেলে তো মরেই যাবে। মাইনুলের সব কাজ থেমে যাবে। কিন্তু সেদিন যে মাহাতো বুড়ির পশ্চিম ভিটের ঘর আর গোয়ালঘরে চোখ বুলিয়ে এসেছে। আর শুধু চোখ বুলিয়েই তো থেমে থাকেনি ও। তারপর সোজা উত্তরে হাঁটা দিয়ে, দু’দিন থেকে জানিয়েও এসেছে-
“হ্যাঁ হ্যাঁ, কুনু সমস্যা নাই। বুড়ির বাড়ি এক্কেরে নিরালা। মাঝে মইধ্যে কাকপক্ষী যাওয়া-আসা করে, কিন্তুক হ্যারা তো অবলা জীব।”
মাইনুলের এই কথার ওপর ভরসা করে আছে ওরা। ওরা মানে মুক্তিযোদ্ধারা। মাইনুলের কথামতো ওরা মাহাত বুড়ির পশ্চিম ভিটের ঘরে অথবা গোয়ালঘরে এক রাতের জন্যে এসে উঠবে। অবশ্য পুরো রাত থাকবে না। ওই অপারেশন শেষ করতে যতক্ষণ লাগবে,  ততক্ষণই থাকবে।
কিন্তু কি অপারেশন?
গাঁয়ের স্কুলে মিলিটারি যে ক্যাম্প বানিয়েছে,  সেখানে হামলা। এটা জেনেই মাইনুলের রক্ত ছলাৎ করে উঠেছিল। বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা ভেবে আবারও সেই ছলাৎ উঠল রক্তে। ওর মনে হল- না না, এত তাড়াতাড়ি মরে যাওয়া যাবে না। অন্তত ক্যাম্পে হামলা পর্যন্ত ওকে বেঁচে থাকতেই হবে।
“হামে ছাইড়া দ্যান সাব। হাম পাক্কা মুসলমান। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তা হ্যায় রোজ রোজ।”
ঘ্যানঘ্যান করে হামেদ আবারও কেঁদেই যাচ্ছে।
একজন মিলিটারি খেঁকিয়ে উঠল- “মুসলমান হো তো ক্যায়া হুয়া,  তুম সব বাঙালি হো। তুম সব গাদ্দার হো।”
এই কথা শুনে ফুলের সুবাসের মতোই খুব হালকা চালে রাগ প্রবাহিত হতে শুরু করল মাইনুলের মগজে। আর এই প্রবাহ ক্রমশ বাড়তে বাড়তে কানের দু’পাশে দপদপ করতে লাগল। ওর ইচ্ছে হল –  রাইফেল কেড়ে নিয়ে চালিয়ে দেয় ঠাঁইঠাঁই করে।
কিন্তু রাইফেল চালাতে জানারও তো একটা ব্যাপার আছে। মাইনুল তো তা জানে না। মাইনুল শুধু জানে,  গোপন খবর কিভাবে গোপন রেখেই জায়গামতো পৌঁছে দিতে হয়। এবং এই কাজটা মাইনুলের কাছে পানির মতো সোজা।  মাখন বৈরাগীর শিষ্য মাইনুল বৈরাগী গাঁয়ের চিকনপথ, খালপথ, ঘাটপথ, কাদাপথ, জঙ্গলপথ, পাড়িয়ে-মাড়িয়ে তাই সেই কাজটিই করে। করে তৃপ্তি পায়।
আর বেঁচে থেকে যদি ক্যাম্পে হামলাটা নিজের চোখে দেখতে পায়,  তাহলে সেই তৃপ্তি হবে ওর জীবনের সেরা তৃপ্তি। শক্ত করে বাঁধা দুই চোখ নিয়ে মাথা উপরে তুলল মাইনুল। বোধহয় প্রার্থনা করল। প্রার্থনায় আকাশজুড়ে মেঘ না এলেও ট্রেনের শব্দ এল।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যে রেললাইনে ট্রেনের কোনো শব্দ শোনা যায়নি, সেই রেললাইনে ট্রেন আসছে ঝমঝম করে। এসে একেবারে মাইনুলদের শরীর ঘেঁষে থেমে গেল।
শোনা গেল, ট্রেন থেকে ঊর্দু শব্দেরা ধপধপ করে নামছে। আতা কিছু বলল কুকুরের মতো কুঁইকুঁই করে।
জবাবে কেউ বলল- “তুম বহত আচ্ছা কাম করতে হো। হামলোগ খুশ হ্যায়।”
তারপর নির্দেশ এল- “খতম কর দো সব সালে কো।”
তারপর গুলির বৃষ্টিতে গলে গলে ঢলে পড়ল একেকটি দেহ। ট্রেন আবার ঝমঝম করতে করতে চলে গেল।

হয়ত এক ঘণ্টা, কিংবা আরও বেশি সময় পরে ধীরে গোধূলি নামলো। দলবদ্ধ নয়,  বিচ্ছিন্নভাবে কিছু শকুন ওড়াউড়ি করতে করতে পড়ে থাকা দেহগুলো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছে। একসময় যে মাছিটি মাইনুলের ঠোঁটের রক্তে ডুবতে চাইছিল, সে এখন একা নয়। ওর আরও কিছু সঙ্গী জুটেছে এবং একযোগে ভ্যানভ্যান ভোঁ… করছে সবাই। একসঙ্গে অনেক রক্ত দেখে আনন্দে হুঁশ হারিয়ে ফেলছে নাকি ওরা? রক্তের ওপর বসছে না, শুধু উড়ছে তো উড়ছেই।
মাছিদের এমন কাণ্ড দেখে মাইনুলের হাসি পেল খুব। কিন্তু হাসলো না। উঠলোও না। উপুড় অবস্থাতেই শুধু দুই চোখ ঘুরিয়ে আশপাশটা দেখে নিলো।
নাহ্, কেউ নেই।
মাইনুলই কি আছে? কোথায়? এই রক্তে ভেজা রেললাইনে,  নাকি আসমানে? মৃত্যু-লাইনে দাঁড়ানো প্রত্যেকের তো চোখ আর হাত বাঁধা ছিল। মাইনুলের সেই বাঁধন খুলল কিভাবে? কে খুলে দিল?
দলা দলা রক্তের ওপর উঠে বসলো মাইনুল। দেখল, শকুনেরা তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছে। দ্বিধা-সংকোচ কাটিয়ে মাছিরাও রক্তে চুমুক দিচ্ছে। গোধূলি ধীরে ধীরে গাঢ় থেকে গাঢ়তর। মাইনুল এখন কোথায় যাবে? উত্তরে হাঁটা দেবে, নাকি গাঁয়ে ঢুকে সন্ধ্যার সঙ্গে মিশে রাত হয়ে যাবে? কিছু বুঝতে না পেরে আরও কিছুক্ষণ বসে রইল। তারপর ওর ভাঙা একতারাটা খুঁজতে লাগল। পেল না। তবে একটা রাইফেল পেল। মিলিটারিরা ফেলে গেছে? এ কেমন কথা?
এবার হো-হো করে হাসতে লাগল মাইনুল। হাসতে হাসতে রাইফেল হাতে উঠে দাঁড়াল। তারপর হাঁটতে লাগল উত্তরের পথে। হাঁটতে হাঁটতে ওর মনে প্রশ্ন জাগলো- মুক্তিযোদ্ধারা এখন কোথায় আছে? উত্তরের সেই বাড়িতে, নাকি অন্য কোথাও? এক জায়গায় বেশিদিন থাকে না তো ওরা! খুঁজে পাবে তো? তাছাড়া, ক্যাম্পে অপারেশন চালানোর কথাও তো আছে!
এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে আবারও হাঁটতে লাগল মাইনুল।  সংকোচহীন পদক্ষেপ উত্তরেই গন্তব্য নিশ্চিত করল। মাইনুলের মনে হল- ওই পথ বেয়েই ভেসে আসছে অচেনা ফুলের অচেনা সুবাস। 🍁

 

 

 

🍂ধারাবাহিক উন্যাস | ১ 
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।

 

শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

৩৭. 

ঝড়ের ভাষা

ড়েরও একটি ভাষা আছে। সে ভাষা মানুষের অভিধানে নেই। তার কোনও ব্যাকরণ নেই, কোনও বর্ণমালা নেই। সমুদ্র প্রথমে সেই ভাষায় আকাশকে ডাকে। তারপর আকাশ বাতাসকে। বাতাস ঢেউকে। ঢেউ জাহাজকে। আর শেষে মানুষের বুকের ভেতরে কোথাও এক অচেনা কাঁপুনি জন্ম নেয়। সেই কাঁপুনির নামই হয়তো ভয়। জাহাজের ক্যাপ্টেন ভোর থেকেই মুখ গম্ভীর করে রেখেছিলেন। রেডিওর পর্দায় একের পর এক সংকেত ভেসে উঠছে। নিম্নচাপ দ্রুত শক্তি বাড়াচ্ছে। পথ বদলাতে হবে। নীলয় তখন ডেকে দাঁড়িয়ে ছিল। চারদিকে শুধু জল। অথচ সেই জল যেন আর আগের মতো নেই। মনে হচ্ছিল, সমুদ্রের চোখে আজ অন্যরকম আলো।

নীলয়ের বুক কেঁপে উঠল। সে জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কী বললেন?
বৃদ্ধ আর কিছু বলল না। একটি ছোট্ট কাঠের জানালা হাতে তুলে দিল। জানালাটির কাচ ছিল নীল। কাচের মধ্যে সূক্ষ্মভাবে খোদাই করা একটি ঢেউ। নীলয় দাম দিতে গেল। বৃদ্ধ মাথা নাড়ল।

বৃদ্ধ ইউসুফ এসে কাঁধে হাত রাখল,
—কী দেখছিস?
—জানি না। মনে হচ্ছে, জলগুলো আজ আমাকে চিনতে পারছে না।
ইউসুফ মৃদু হেসে বলল,
—ভুল বললি। সমুদ্র মানুষকে চিনে না। মানুষই ভুল করে ভাবে, সে সমুদ্রকে চিনে ফেলেছে।
এই কথার পরে দু’জনেই চুপ করে রইল। নিঃশব্দতাও কখনও কখনও কথার চেয়ে ভারী হয়ে ওঠে।
এদিকে চরকমলপুরে সেদিন দুপুর থেকেই আলো অদ্ভুত হয়ে উঠেছিল। সূর্য ছিল, অথচ তার রঙে যেন ছাই মিশে আছে। কাকেরা অকারণে নিচু হয়ে উড়ছে। নদীর জলও স্থির নয়। ঘাটের বাঁধে বাঁধা নৌকাগুলো নিজেরাই দড়ি টানছে। বৃদ্ধ হরনাথ মাঝি বলল,
—দূরে সমুদ্রে বড় কিছু হচ্ছে।
গ্রামের মানুষ আকাশের দিকে তাকাল। কেউ কিছু বুঝল না। কিন্তু মেঘলার বুকের ভেতরে অকারণ একটা হাহাকার জমতে লাগল। সে জানালার কাছে এসে দাঁড়াল। হঠাৎ মনে হলো, জানালাটা যেন আগের চেয়ে ছোট হয়ে গেছে। না, জানালা ছোট হয়নি। মানুষ যখন দুশ্চিন্তায় ভরে যায়, তখন পৃথিবীর সব পথই সংকীর্ণ মনে হয়।

মেঘলার একটি অভ্যাস ছিল। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে সে নীলয়ের জন্য একটি গল্প বানাত। যেন সে ফিরে এলে শুনবে। একদিন সে বলবে, একটি নদী ছিল, যে সমুদ্রে যেতে চাইত না। আরেকদিন বলবে, একটি পাখি ছিল, যে উড়তে উড়তে নিজের ছায়াকে হারিয়ে ফেলেছিল। এসব গল্পের কোনও শেষ থাকত না। কারণ নীলয় ফিরলে তবেই গল্প শেষ হবে। অপেক্ষা আসলে অসমাপ্ত গল্পের আরেক নাম।

ঝড়ের প্রথম ধাক্কা এল সন্ধের মুখে। জাহাজ যেন হঠাৎ একটি অদৃশ্য পাহাড়ে ধাক্কা খেল। ইস্পাতের শরীর কেঁপে উঠল। তারপর দ্বিতীয় ঢেউ। আরও বড়। তারপর তৃতীয়। ডেকের ওপর রাখা ভারী লোহার বাক্স সরে গিয়ে ধাক্কা মারল রেলিংয়ে। সাইরেন বেজে উঠল। চারদিকে চিৎকার। দৌড়। আদেশ। লোহার শব্দ। জলের শব্দ। বাতাসের শব্দ। এই সব শব্দ মিলেমিশে যেন পৃথিবীর আদিম কোনও সংগীত বাজাতে লাগল। নীলয় জীবনে প্রথম বুঝল, মানুষ আসলে কত ছোট। একটি ঢেউয়েরও সমান নয়। রাত গভীর। বিদ্যুৎ চমকালেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য পৃথিবী দেখা যায়। তারপর আবার সব অন্ধকার।

সেই আলো-অন্ধকারের মধ্যে নীলয়ের হঠাৎ মনে হল, দূরে কোথাও একটি জানালা জ্বলছে। অসম্ভব। সমুদ্রের মাঝখানে জানালা? সে চোখ মুছে আবার তাকাল। আছে। একটি ছোট্ট আলো। যেন কোনও বাড়ির দক্ষিণমুখো জানালা। যেন মেঘলা দাঁড়িয়ে আছে। তার বুকের মধ্যে অদ্ভুত এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল। পরের মুহূর্তেই ঢেউ এসে সব ঢেকে দিল। আলো নেই। জানালা নেই। শুধু জল। ঝড় থামতে থামতে ভোর হল। আকাশের রঙ এমন, যেন কেউ নীলের মধ্যে ধূসর ছাই মিশিয়ে দিয়েছে। সবাই ক্লান্ত। কারও চোখে ঘুম নেই। ক্যাপ্টেন ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিচ্ছেন। একজন নাবিক আহত। একটি লাইফবোট ভেঙে গিয়েছে। কিছু যন্ত্র বিকল। কিন্তু জাহাজ বেঁচে আছে। মানুষও। ইউসুফ ধীরে ধীরে এসে নীলয়ের পাশে দাঁড়াল,
—কাল রাতে কী দেখছিলি?
নীলয় একটু থেমে বলল, —একটা জানালা।
ইউসুফ অবাক হলো না। বরং দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
—আমিও একদিন দেখেছিলাম।
—সত্যি?
—হ্যাঁ। তখন আমার বয়স তোর মতো। আমি দেখেছিলাম আমার মাকে। উনি তখন বহু বছর আগেই মারা গেছেন।
নীলয় চুপ।
ইউসুফ বলল,
—সমুদ্র মানুষের ভেতরের সবচেয়ে গভীর স্মৃতিগুলোকে তুলে আনে। সেগুলো কখনও সত্যি হয়, কখনও মায়া। কিন্তু দুটোর মধ্যে পার্থক্য করা বড় কঠিন।
গ্রামে সেই রাতেও মেঘলা ঘুমোতে পারেনি। ভোরের দিকে একটু চোখ লেগেছিল। স্বপ্নে দেখল, জানালার কাচে লবণ জমেছে। সে যত মুছছে, ততই কাচের ওপারে পৃথিবী ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ কাচের ওপর একটি হাতের ছাপ ফুটে উঠল। ভেজা। নোনাজলে ভরা। সে চমকে উঠে হাত বাড়াল। অমনি হাতের ছাপটি মিলিয়ে গেল। ঘুম ভেঙে দেখে, সত্যিই জানালার কাচ ভিজে আছে। কিন্তু বাইরে তো বৃষ্টি হয়নি। সে হাত দিয়ে কাচ ছুঁয়ে দেখল। আঙুলে লবণের স্বাদ। মেঘলা অকারণে কেঁপে উঠল।

দিন যেতে লাগল। জাহাজ এগিয়ে চলল নতুন বন্দরের দিকে। জীবন যেন আবার স্বাভাবিক। কিন্তু নীলয়ের ভেতরে কিছু একটা বদলে গেছে। রাতে সে আর ঘুমোতে পারে না। ডেকে এসে দাঁড়ায়। অন্ধকার জলের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মনে হয়, সমুদ্রের তলায় অসংখ্য বাড়ি ডুবে আছে। সেখানে মানুষ এখনও বাস করে। তারা জানালায় আলো জ্বালায়। যারা হারিয়ে গেছে, তারা সেখান থেকেই পৃথিবীকে দেখে। কখনও কখনও তারা কারও নাম ধরে ডাকে। কিন্তু সেই ডাক কেবল ঢেউ শুনতে পায়।

একদিন দুপুরে জাহাজ ভিড়ল একটি বিদেশি বন্দরে। বহুদিন পরে সবাই কয়েক ঘণ্টার ছুটি পেল। নাবিকেরা বাজারে গেল। কেউ জামা কিনল। কেউ ঘড়ি। কেউ মদের দোকানে। নীলয় একা হাঁটছিল। একটি পুরোনো গলির শেষে সে একটি ছোট্ট দোকান দেখতে পেল। দোকানজুড়ে শুধু জানালা। পুরোনো কাঠের জানালা। লোহার জানালা। রঙিন কাচের জানালা। দোকানের প্রবীণ মালিক নীলয়ের দিকে তাকিয়ে বাংলার মতো শোনায় এমন ভাঙা উচ্চারণে বলল,
—মানুষ দরজা কেনে থাকার জন্য। জানালা কেনে ফিরে যাওয়ার জন্য।
নীলয়ের বুক কেঁপে উঠল। সে জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কী বললেন?
বৃদ্ধ আর কিছু বলল না। একটি ছোট্ট কাঠের জানালা হাতে তুলে দিল। জানালাটির কাচ ছিল নীল। কাচের মধ্যে সূক্ষ্মভাবে খোদাই করা একটি ঢেউ। নীলয় দাম দিতে গেল। বৃদ্ধ মাথা নাড়ল।
—এটার দাম আগে থেকেই দেওয়া হয়েছে।
—কে দিয়েছে?
বৃদ্ধ শুধু সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইল। সন্ধ্যায় জাহাজ ছাড়ল। নীলয় সেই ছোট্ট কাঠের জানালাটি নিজের কেবিনে রেখে দিল।
রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল তার। কোথা থেকে যেন খুব মৃদু একটি শব্দ আসছে।
টুপ…
টুপ…
টুপ…
যেন কাচের ওপরে নোনাজল পড়ছে। সে উঠে বসে দেখল, কেবিনে কোনও জল নেই। কিন্তু সেই ছোট্ট কাঠের জানালার নীল কাচের ভেতর দিয়ে যেন দূরের কোনও ঘরের আলো জ্বলছে। আর সেই আলোয়, খুব অস্পষ্টভাবে, একটি নারীমূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। সে কি মেঘলা? নাকি সমুদ্রের আর-এক গোপন বাসিন্দা? নীলয় জানালাটির দিকে হাত বাড়াল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে, হাজার মাইল দূরে চরকমলপুরে, মেঘলা নিজের ঘরের জানালায় একই সঙ্গে হাত রাখল। দুজনের আঙুলের মাঝখানে ছিল কেবল কাচ নয়, একটি সমুদ্র। আর সেই সমুদ্রের গভীরে, অদৃশ্য কেউ যেন খুব ধীরে একটি পুরোনো জানালা খুলে দিল। 🍁 (ক্রমশঃ)

 

 

🍂কবিতা 

 

শ্যামলকান্তি দাশ -এর একটি কবিতা

বাবার খোঁজে

যতই হোক বাবা তো।
বাবাকে খুঁজে বেড়ানোই এখন আমার একমাত্র কাজ। এই অসম্ভব ঠান্ডার দেশ বাবা সহ্য করতে পারছে না,
হিমানীর তীব্র শীতলতা থেকে বাবা পালিয়ে বেঁচেছে।
মা বলে : মানুষটা নাকি বরাবরই এইরকম ঊর্ধ্বচারী, আকাশের কূলে কূলে সূর্যাস্ত খুঁজে বেড়ায়।

পর পর অনেকগুলো টিলা পেরোলাম অনেকগুলো নদীর নীলিমা
একটা গিরিখাতের সামনে এসে দেখলাম
ধূসর হয়ে আছে বাবার মুখ—
ফুলগাছের জোনাকিরা বর্ষার রাত্রে
বাবার গায়ে অনবরত আলো দিচ্ছে
একটা ঘরপাগলা হায়েনা বাবাকে শুনিয়ে শুনিয়ে জোর হাসছে, লুটিয়ে পড়ছে বাবার পায়ে।

যতই হোক বাবা তো।
একটুর জন্য ছুঁতে পারলাম না,
বাবার গা ঘেঁষে বেরিয়ে গেলাম।

 

 

তৈমুর খান -এর একটি কবিতা

প্রদীপ জ্বেলে দিই

কবর শুইয়ে রাখছে দেহ
আমি কবরখানায় প্রদীপ জ্বেলে দিই
সেই মুখ, মমতার চোখগুলি চেয়ে চেয়ে দ্যাখে
নীরবতার পাশে আমি দাঁড়িয়ে থাকি

রাত চলে যায় অন্যরাতের দিকে
দিন মিশে যায় পরের দিনে
একটি জীবন্ত হৃদয়—হৃদয়ে হৃদয়ে চলাফেরা করে
নীরব কথারা মুখর হয়

রোজ ডেকে নেয় প্রাণের কোনও আলো
একটা একটা সিঁড়ি পেরিয়ে যাই
কবর বিস্তৃত হয়ে ওঠে এক একটি অলৌকিক ঘর

ফেরেশতারা দরজা খুলে দেয়
ঈমানের আয়নায় ভেসে ওঠে ছায়া

 

 

সুস্মেলী দত্ত -এর একটি কবিতা

ঠেক

দুব্বো ঘাসে চোখ রেখেছি ও মহাকাল সবুজ তুই
উর্দ্ধ লালে ঠোঁট ছোঁয়ালি ডুবসাঁতারে একটু ছুঁই

জলছবি সে ভাবনা এবং লক্ষ তারা বসন্তে পা
এর’ম আগে সের’ম পরে নাস্তিকেরা কাটছে রা ….

ইত্যাদি ও ঘুম খোয়ালো রাতবিরেতে নিশির ডাক
মধুর চাকে মৌমাছি গো বুনছে নদী হা নির্বাক

বিশুদ্ধ ‘ব’ সাজিয়ে রাখি ঘরের মাঝে দেরাজ খোল
প্রেম পিরিতি উজান স্রোতে হরির বাসা হরির বোল।

 

কুন্তল দাশগুপ্ত -এর কবিতাগুচ্ছ : কুসুম-গুচ্ছ 

কুসুমাগুন

কুসুম এবার সোনালি ডানার পাখি হয়ে উড়ে যাও…
দূরে– আরও দূরে।
খুঁজে নাও নিজের ঠিকানা।
পুড়িয়ে দিচ্ছে ডানা
কাল বৈশাখী রোদ।
ক্রোধ
করো এত এত,
রোদের অজ্ঞাত
আজও যে ক্ষমতা
আদপে রম্যতা
সে তোমার হোক।
আগুনের শ্লোক
হয়তো পুড়িয়ে দেবে পুরোনো পালক,
ক্ষতি নেই,
সবেতেই
অধিকার
থাকে না সবার।
তবে,
সেই কবে
চন্দ্রবিন্দু চরে
অতুল আকাঙ্ক্ষা ভরে
চেয়েছিল যে,
সে– আজও আছে
হয়তো দূরে অথবা কাছে।

অগ্নিমিত্রা,
তোমার উপহার
বর্ষার
যত চাষবাস
আর, বৈশাখী রোদেলা আকাশ।

 

উত্তর তো জানা

সকলে বলছে নতুন বছর ভালো কাটুক…
এই কাটা শব্দটাকে তুমি বিশ্বাস করো?
করো!
ওই বাক্যে কর্তা কি বছর?

তা সে যাই হোক, কাটা মোটে ভালো নয়।
কী বলছ?
ভুল হলে কাটবে বইকি?
তা ভুল হয় শেখানোর দোষে।

তাহলে বোঝাই গেল পৃথিবীর সব ভুল শিক্ষক ঝোলায়।

ভুল শিখে, সিঁড়ি ভাঙা অঙ্কের শেষে ছাদমিতি আসে।
উত্তরমালা ছেঁড়া অঙ্কের বই শিক্ষানবিশের হাতে দেয় চোষ্য পেনসিল।

যত পেন কিল না ক’রে সিল করে মোহর বাজিয়ে যত কিলের গোঁসাই, যাদের বিভীষণ গোঁ ঠিকঠাক শিখিয়েছে অশিক্ষকে।

এবার বলোতো কুসুম, এই ফুটন্ত পর্বে ভুল নাকি ঠিক কোনটা শিখেছ ফুটতে?

চরণ-চিহ্ন দিয়ে যাও

ভিক্ষা শিক্ষা পেয়েছ কুসুম।
তোমাকে ভিখিরি ক’রে বাজারে ছেড়েছি।

পাতা পাতা ল্যাদখোরি, প্রাকৃতিক ভাবে সাজেস্টিভের দোরে ধর্ণায়।

মৃতবাস থেঁত কুসুমের বুকে লবণ গন্ধ।
লেহ্য লাবন্য চেটে ব্যবস্থা-বিপির অনন্তে লাফ।

মরা কুসুমে বেহুতাশ পাতাখোর, কোকুন বুননে জমকালো আগামীর ছবিতে রংবাজি পলতেয় ফুলকি।

কুসুমের বুকে কোনো চরণ চিহ্ন দেখি নাই।

 

বনের কুসুম নয় কুসুমের বন

ঝুঁকে আছি আজীবন…

খোঁড়াখুঁড়ি, বোনাবুনি, বাঁধাবাঁধি সব কলম-কাণ্ডে।

দূরে?
কই?
নিজের বিপিনে,
কুসুম-বৃন্ত কেটে চলে গেছে সোনালি শামুক…

কুসুমের থেঁত বুকে পৃথিবীর তিন ভাগ…
পর্যটকী বিনোদন ক্যামেরায় ধ’রে রাখে আলো দিয়ে খন্ডহর-ছায়া।

কুসুমাকাঙ্ক্ষা 

এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ।
হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত।

পাচ্ছ কুসুম, ফুটন্ত কালে এত রক্ত-গন্ধ?

কুসুমকলির পরপদ মিলিয়ে দিতে পারব?

ভারি সংশয়…

আমাদের এই মন্দবাসা-র রেসিপ্রোকালে তুমিই নিয়ে যেতে পারো

এসো, বৃতি-বন্ধন ছিঁড়ে সমস্ত দল মুক্ত করো। ওড়াও রেণু আগামীর।

কুসুম, ফুটে ওঠো সোনা।
তোমাকে দেবার মতো কিছু আর নেই আমাদের ‘তোমার’ আকাঙ্ক্ষা ছাড়া।

প্রতীক্ষায়… 

ওদের দু’পায়ে ঘোড়দৌড়ের তাড়া।
আমাদের নেই দৌড়ে যাবার মাঠ।
ওদের দু’হাত বিষ আর কূটে ভরা।
আমাদের হাতে মরাগাছ, জ্বলা-কাঠ।

আমরা প্রায়শ গাছে জল দিতে ভুলি।
খেলার ছলনা ভাঙে ডাল, ছেঁড়ে ফুল…
আমরা কেবল মরাগাছ বওয়া কুলি।
খেলা ছলছল প্রবাহ ভাঙছে কুল…

ভাঙন আসছে আমাদের বন খেতে।
পিছু হটে হটে আমাদের বনে বাস
গাছেদের কাছে দাঁড়িয়েছি হাত পেতে।
পতিত শরীর ঢেকে দিক কচি ঘাস।

দহন দিনের বার্তা এলেও ছুটে
আমাদের বনে কুসুম উঠছে ফুটে।

 

ভরসা থাকুক 

আকাশ তখন অগ্নিবর্ণ আলো,
অষ্টম দিক অকারণে চমকালো।
নবমের চাপে অধোগতি চরাচর,
প্রবল ফুটছে বোধ-মন্বন্তর।

যদিও নরক খুব বেশী দূরে নয়
এবং করেছি মরা-গাছ সঞ্চয়।
তবু, সমস্ত মৃত প্রশাখার মুখে
কুসুম চিহ্ন রয়েছে দহন সুখে।

এবার শূন্য ভেসে যাক বরাবর
হোক শুরু হোক লিলিথ-সয়ম্বর।
এসো আহ্লাদ শ্রীযোনি স্রাবনে ভেসে।
আঁধার জ্বালাও দিতি-কুলে নিঃশেষে।

পুতুলের কোনো মনন থাকতে নেই
তবু, আশা রাখি ফুটন্ত কুসুমেই।

দহন শীতল দিনে

যেই লিখলুম পদ্মপাতায় দিন,
ছায়াবৃত্তের অবস্থা সঙ্গীন।
গোধূলি-ঊষার কনফিউশনে প’ড়ে
অনিয়ম হল
আলোকলতা শিকড়ে।

লেখাজোকা করা দিবস-লেজার ফ্রিতে,
হিসেব করেছে নিকেশ আচম্বিতে।
বেহিসেবি এই সময়ের খতিয়ান
গাইছে, শুনছি বেতালা-বেসুরো গান।

গান হাতে নিলে উড়ে যায় প্রিয় পাখি।
তাহার ছড়ানো নীবার দু’হাতে মাখি।
অণু পার হয়ে পরমাণু হাতে হাতে
খাদ্য কেড়েছে দুনিয়ার প্রতি পাতে।

প্রজ্বলনের গন্ধমাতন শীতে
আমরা রয়েছি কুসুম-গন্ধ নিতে।

আহ্লাদী! 

নেলপলিশে কি বিদ্যুৎ ঝলকায়?
মাস্কারা দেয় আস্কারা লালসায়?
মাছ হতে চায় কুসুম কি ফুটে ফুটে?
খোঁজ ক’রে চলে বৃষস্কন্ধ মুটে!

বলক এলেই পাত্রের জলে ডুব,
সিদ্ধ হবার ব্রত নিশ্চিত খুব।
কাঁটা বেছে খেতে লাগে মাছরাঙাদের?
তাহলে কুসুম, হবে অ্যাকোরিয়ামের!

জ্বলে গেলে পরে জলে যেতে হয় জানি।
মেকাপবক্সে চলে খুব কানাকানি
রাই ফেল ক’রে মুদ্রা বাজায় চুপি।
চোখ-কান বুজে কৃষ্ণ পরায় টুপি।

ভিতরবাগের নয়ানজুলির জলে
কমল কুসুম আহ্লাদ ভরে জ্বলে।

 

মন্দবাসায়… 

বাঁধের রাস্তা জুড়ে ধুলো ওড়া শোক।
ঘর ভেঙে দিল কারা কুসুমের জানো?
কালকেতু ঘোরে, সাথে কবন্ধ লোক,
শিরদাঁড়া যার দোমড়ানো মোচড়ানো।

সারথ্য ভুলে কৃষ্ণ কুটিল শোষী
নব বিধানের ঘোষণায় শ্রী কেশব
মৃত বোধ-হাতে নিয়ন্ত্রণের রশি।
ক্যান্ডেল স্টিক হারাল আর্চ বিশপ।

বেঘর কুসুম পড়ে থেকে থেকে মাটি
শ্রীচৈতন্য বিস্মৃত কীর্তন।
নিকোটিন ছাড়া আর কিছু আছে খাঁটি?
লড়াই ক্ষ্যাপার চৌপাট মূলধন।

তারায় তারায় নেপো মেরে যায় দই।
কুসুমে কুসুমে চরণ-চিহ্ন কই!

কাউন্ট-ডাউন

অধিকরণে সপ্তমী চিহ্ন আর আলঙ্কারিক অব্যয় কোলাকুলি করে দখল নিচ্ছে স্বাদ কোরকের।

কুসুমের মধু– তুমি সত্ত্ব হারিও না, হারিও না সত্য।

সুপ্রিয় সত্য গুলি সত্ত্ব বিহীন।
সত্য তোমার শুধু অপ্রিয়ে থাক।

কুসুম কুসুম– মা-টির আদুরে তুমি রেণু ধ’রে রেখো।
রেণুকার ঘরটুকু ছেয়ে দেব আমাদের পাতায় পাতায়।

এইমাত্র শুরু হল কাউন্ট-ডাউন ম্যাজিক রিয়েলিজমের।

 

ভুল শোধনিয়া

সেই কোন কলম-কাণ্ড-কথা।

আমাদের ভালবাসা ছিল তরু।

ওর সাথে জল-ফল-ফুল…
শনি-মঙ্গলের নীল-লাল…
রাত্রির শ্বেত শান্তি।

বাতাস কখনও আর্দ্রতায় লঘু,
কখনও মন খারাপে ভারী,
তবে যোজনগন্ধা বাতাস ছিল জড়িয়ে।

কলম-কাণ্ড শেষে
বোতাম-বেলায় কাচের আড়াল থেকে দেখেছি— বিতান তরুকে তুলে নিয়ে গেছে।
বেড়া ভাঙার সামর্থ্য ছিল না আমাদের,
ছিল টপকাবার…

সেই নিষিদ্ধ আনাগোনায় তরু আমাদের ভরিয়ে দিয়েছে, দিয়েছে কুসুম।
ধাত্রী-দাত্রী একাধারে।

আমাদের সমস্ত ভুল শুধরিয়ে ফুটে উঠছে প্রফুল্ল কুসুম।

 

 

মিতা নূর -এর দু’টি কবিতা

ভালোবাসি, ভালোবাসি

ক্লান্ত দুপুর রোদের হাসি,
তোমার ছায়ায়, বুকের ভেতর বাজে বাঁশি।
মুখে না বললেও ঠোঁটের কাছে এসে–
কাঁপে শুধু দু’টি কথা, ভালোবাসি, ভালোবাসি।

তোমার নামের গন্ধ মাখা হাওয়া,
উড়ে এসে ছুঁয়ে যায় আমার সকল চাওয়া।
স্মৃতির জমিতে আজও তুমি চাষ,
বুকের গভীরে তোমারই নিবাস।

জানালার ফাঁকে চাঁদের আলো,
লিখে যায় চুপি চুপি, ‘তুমি ভালো’।
চোখ বুঁজলেই তোমার মুখের আভা,
আমার রাতের সবটুকু শোভা।

হাস্যজ্জ্বল আকাশটা সাক্ষী থাক,
এই বুকের ভেতর শুধু তোমারই ডাক।
সব নিয়ম ভেঙে, সব লজ্জা ফেলে–
বলি আজ মন খুলে, ভালোবাসি, ভালোবাসি।

 

দীর্ঘশ্বাসেই বেঁচে থাকি 

আজও সে পাশে, গল্পে আলাপে,
আমি বাসাতেও তার দীর্ঘ নিঃশ্বাস খুঁজে পাই’
খুঁজে পাই…
চায়ের কাপে লেগে থাকা ঠোঁটের ছাপে।

জানালার কাঁচেও, তার নাম লেখা কুয়াশায়,
শাড়ীর ভাঁজে লেগে থাকা অভিমানে,
খুঁজে পাই…
দেয়ালের চারপাশে অজস্র ছোঁয়ায়,

এখনও হৃদয় ভর্তি তার স্মৃতি, মুছে আর আঁকি,
তেমন করে ভালবাসবে না কেউ আর,
ওপারে তো সে ভালই আছে..!
আর আমি… আমি সেই নিঃশ্বাসেই বেঁচে থাকি।

 

 

🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ২
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।

 

হারিয়ে যায়া নারীর
ইতিকথা

মমতা রায় চৌধুরী 

২৩.

জ রথযাত্রা বুবুন সকাল থেকেই ছোট্ট একটা রথ নিয়ে টেনে যাচ্ছে কত উৎসাহের সঙ্গে উঠোন জুড়ে রয়েছে ওর সাথে আমার পুচু সোনা। উফ গতকালকে সন্ধ্যেবেলায় বুবুন বায়না এত করেছে যে রথ ওকে এনে দিতেই হবে। শাশুড়ি মা বললেন যা না নিয়ে আয় ওর জন্য একটা রথ কিনে। আমার দাদুভাই রথ নিয়ে টানবে, আমি দু’চোখ ভরে দেখি। পবিত্র বলল, ওসব তুমি বায়নাক্কা ছাড়ো তোমার ছোটদের এত বায়নাক্কা শুনলে হয় না।
—কি বলছিস রে ছোটবেলায় তুই কম বায়না করেছিস সেসব কথা তুই ভুলে যেতে পারিস আমি মা হয়ে ভুলে যাই কি করে? আর তাছাড়া ছোটবেলায় বায়না করবেই বা না কেন এইতো বয়স ওদের বায়নাক্কা করার।

চা করতে করতে তিথি রথের দিন আসলে মায়ের কথাটা বড্ড মনে পড়ে ছোট্টবেলায় মায়ের সাথে কি সুন্দর রথের মেলাতে যেত মা প্রথমেই রথের মেলায় জগন্নাথ দেবের জন্য পুজোর সামগ্রী কিনে নিয়ে আমাদেরকে সঙ্গে নিয়ে পুজো দিতেন তারপর বলতেন, এই রথের দড়িটা ধরে টান তারপরে কিনে দিতেন নানা সামগ্রী। পড়ন্ত বিকেলে যখন মায়ের সাথে রথের মেলাতে যেতাম কি অনাবিল আনন্দটাই না আমাদের হতো। তারপর মেলা থেকে আমাদের কিছু কিনে দিতেন হয়তো বেশি কিছু না কিন্তু আনন্দটা ছিল অনেক বড়। আমাদের ওইটুকু জিনিস এই বিশাল বড় প্রাপ্তি বলে মনে হতো।

দেখলে তিথি মা কথায় কথায় বুবুনের প্রসঙ্গ আসলে আমার প্রসঙ্গটা কেন টেনে নিয়ে আসে আমি বুঝতে পারি না।
তিথি এক গাল হেসে বলল,
—ভাগ্যিস মা দু’ চার কথা বলেন, তার জন্য তোমার ছেলেবেলার কথাগুলো জানতে পারি। মা তো ঠিকই বলছেন দাওনা একটা ওকে রথ কিনে এনে।
—কি আর বলি, একে রামে রক্ষে নেই তার আবার সুগ্রীব দোসর। আমি পেরে উঠব কি করে?
—নাও এবার ঠেলা বোঝো।
—হ্যাঁ সে তো তুমি বলবেই। —ঠিক আছে তাহলে তোমার ছেলেকে বল, যেন বাড়ির উঠোনেই রথ টেনে বেড়ায়। আমি কিন্তু ওর সঙ্গে রাস্তা দিয়ে যেতে পারব না।
মা এবার খাট থেকে নেমে এসে পাটা টেনে টেনে এসে চেয়ারে এসে বসলেন, তারপর বললেন,
—কেন রে জগন্নাথ দেবকে একটু ছেলের সাথে রাস্তাটায় নিয়ে যাবি কত লোক এসে রথের রশিটা ধরে টানবে কত সৌভাগ্যের ব্যাপার বল তো।
—আই মা, তুমি সব সময় এইভাবে বল না তো। —ইমোশনালে ঘা দিয়ে কথা বল না।
—এটা আবার ইমোশনাল কোথায় ঠিকই তো বললাম।
আমি রথ নিয়ে রাস্তায় টানব!
—হ্যাঁ, হ্যাঁ বাবা তুমি টানবে।
—তোমার বাবাই নিয়ে যাবে তোমাকে।
—ঠাম্মি নিয়ে যাবে কি মজা কি মজা।
—দেখো মা, এবার তোমার সাথে আমার ঝগড়া বেঁধে যাবে কালকে আমার কাজ আছে। একটা ছুটির দিন কত রকম কা ওওওওজ আমি ঠিক করে রেখেছি কোথায় কি কাজটা করব আর এরপর যদি আমাকে বুবুনের সঙ্গে..
—ওহ বাবা! একটু যাবি।
তাহলে ওই কথাই থাকল।
থ্যাংক ইউ ঠাম্মি
ওরে আমার দাদু ভাইরে ঠিক আছে, কালকে আমি তোমার সাথে যাব।
—পবিত্র বাথরুম থেকে বেরিয়ে বলল তুমি যাবে তাহলে তো সমস্যা মিটেই গেল।
আজ নয় গুনগুন গুনগুন… গান গাইতে গাইতে আবার বাথরুমে ঢুকে দরজাটা জোরে টানল।
—দেখো বৌমা দেখো আমি নাকি বানিয়ে তোমার ছেলের সঙ্গে রাস্তায় ওই রথ টেনে বেড়াব। আমি পারি আর আমি পারলে কি ওকে বলতাম।
—ছাড়ুন তো ও নিজেও জানে সেটা আপনি পারবেন না।
দেখুন দেখুন, পুচু কি বুঝল কে জানে ও আনন্দে লেজ নাড়তে শুরু করেছে।
—ও বৌমা, কালকে সোমা কি বলছিল গো।
—ওই তো সুনয়নার ব্যাপারে বলছিল।
শাশুড়ি মা দেখলাম খুব কৌতূহলী হয়েজিজ্ঞেস করলেন।
—কি বলছিল?
—ওই যে শ্বশুরবাড়িতে ওকে কিভাবে অত্যাচার করা হয়।
—সত্যি যাই বল, মেয়েটা কিন্তু বড্ড ভাল। কত আস্তে আস্তে কথা বলে।
—ভালর যুগ কি আর আছে মা!
—নিশ্চয়ই আছে, খারাপের সংখ্যা বেশি ভালর সংখ্যা কম, তাই বলে কি ভাল হেরে যায়।
—মা ঠিকই বলেছেন কিন্তু এভাবে কতদিন!
সেদিন বাড়িতে এসেছিল দেখলেন না ওর চেহারাটা কেমন হয়ে গিয়েছে।
—হ্যাঁ সেটা খেয়াল করেছি।
ও হয়ত কিছু বলতে চাইছিল, কেন যে বলল না সেটাই বুঝতে পারছি না।
—যাক আজ রথযাত্রার দিন অশুভ কথা না ভাবাই ভাল। যাও দু’জনে মিলে বিকেলে একটু রথ দেখে আসো জগন্নাথ তলায় গিয়ে।
—নিয়ে যাবে ও ভাবলেন? —ছেলেকে নিয়ে রাস্তায় যেতে হবে সেটা ভেবে অস্থির হয়ে যাচ্ছে।
শাশুড়ি মা একগাল হেসে বললেন,
—সত্যি ছেলেটা দিনকে দিন কেমন যেন ঘরকুনো হয়ে যাচ্ছে।
—আপনাকে চা দেব?
—বানিয়েছ? দাও।
—না। চা করছি।
চা করতে করতে তিথি রথের দিন আসলে মায়ের কথাটা বড্ড মনে পড়ে ছোট্টবেলায় মায়ের সাথে কি সুন্দর রথের মেলাতে যেত মা প্রথমেই রথের মেলায় জগন্নাথ দেবের জন্য পুজোর সামগ্রী কিনে নিয়ে আমাদেরকে সঙ্গে নিয়ে পুজো দিতেন তারপর বলতেন, এই রথের দড়িটা ধরে টান তারপরে কিনে দিতেন নানা সামগ্রী। পড়ন্ত বিকেলে যখন মায়ের সাথে রথের মেলাতে যেতাম কি অনাবিল আনন্দটাই না আমাদের হতো। তারপর মেলা থেকে আমাদের কিছু কিনে দিতেন হয়তো বেশি কিছু না কিন্তু আনন্দটা ছিল অনেক বড় ।আমাদের ওইটুকু জিনিস এই বিশাল বড় প্রাপ্তি বলে মনে হতো। আজ ওই আনন্দের দিনগুলো হয়ত ফেরত পাব না, কিন্তু যে মধুর স্মৃতি তার গন্ধ আজও যেন লেগে আছে হৃদয় জুড়ে। আসলে কিছু কিছু স্মৃতি বোধহয় এমনই হয় হাজার চেষ্টাতেও মন থেকে মুছে ফেলা যায় না। গন্ধ যেন ফিরে আসে আমাদের সেই চেনা স্মৃতির মধ্যে দিয়ে ভিড় করে আসে কত চরিত্র। সে সব কথা মনে পড়লে বড্ড কষ্ট হয়, গন্ধের নিশানা ধরে বারবার ফিরে পেতে ইচ্ছে করে তার মাঝেই বুকটা কেমন হাহাকার করে ওঠে। বুকের ভেতরে যেন কোন হাতুড়ি পিটতে থাকে কেন এমন হচ্ছে কেন ভেতরটা এত অস্থির অস্থির করছে। সুনয়নার কথা ভাবলেই কেন যে এমন হয় তিথি বুঝতেই পারে না। কে জানতো যে গলির ভিতরে নিষ্পেষিত হত নিপীড়িত হত। যে আব্রু বেআব্রু হয়ে যেত তার মধ্যেও যেন একটা সম্ভ্রম ছিল একদিন কথায় কথায় সুনয়না সেটাই বলছিল আজ ভালোবাসার কাছে গলির অচলায়তন ভেঙে সে মুক্ত অঙ্গনে পা রেখেছে অথচ এখানেও তাকে রশি পড়ানোর জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে বলুন তো ভালবাসাটা কি পাপ। যে ভালবাসার বন্ধনে সমস্ত কিছু ছেড়ে চলে আসলো। আর সেই ভালোবাসাই তার কাছে নতুন স্বপ্নের দিক নির্দেশ দাবি করে। তার স্বপ্নগুলো সব ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গিয়েছে। আদবে সেই সুন্দর স্বপ্নের দেশে সে কি পাড়ি জমাতে পারবে? ওর জীবনের মূল্যবান সম্পদগুলোর মধ্যে ছিল, তার এই ভালবাসা যে ভালবাসার টানে সে ছুটে এসেছে। একটা ছোট্ট সংসার হবে তাদের ।সেখানে থাকবে তার স্নেহের ভালবাসার ফসল। বেড়ে উঠবে তারা একদিন ফুলে ফলে ভরিয়ে দেবে, কোথায় গেল তার সেই স্বপ্নের দিক নির্দেশিকা। তার বিয়ের ক’ মাসের মধ্যে সেই বুঝতে পেরেছে তার ভালবাসার প্রথম ভাষা কুয়াশার চাদরে মুড়ে গেছে ঠিক প্রথম যখন সাঁতার শেখা হয় পুকুরের জলে কচুরিপানা সরিয়ে সরিয়ে ডুব দেয়ার মত। তেমনি কুয়াশার চাদর সরিয়ে সরিয়ে আলোর পথের যাত্রী হতে চাইছে যেন সুনয়না।🍁 (ক্রমশঃ)

 

 

 

ল্প | ২ 
ঘরের ভেতর বাইরের শুধু বৃষ্টির শব্দ আর নিঃশ্বাসের আবরণ। আলোটা নিভিয়ে দিল। অন্ধকারের ভেতর দাঁড়িয়ে, অনুভব করল এই অন্ধকারই এখন নিকটতম সঙ্গী। কোনও ভান নেই, কোনও প্রতারণা নেই। মহুল জানে, তার এই সিদ্ধান্ত তাকে আরও একা করে দেবে। কিন্তু এই একাকীত্ব সে বেছে নিয়েছে। কারণ এই একাকীত্ব অন্তত তাকে ঠকাবে না।

 

ঘেন্না

পারিজাত গঙ্গোপাধ্যায়

মানুষের ভেতরে যে অন্ধকার থাকে, সেটা যে বাইরে থেকে বোঝা যায় না, এটা মহুল অনেক আগেই শিখে ফেলেছে। অন্ধকারটা কোনও একদিন হঠাৎ তৈরি হয় না। ধীরে ধীরে জমে। স্তরে স্তরে জমে। অভ্যাস হয়ে যায়। তারপর একসময় সেটাই নিজের পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। পাথর হয়ে যায়। পুণেতে আসার পর থেকে মহুল লক্ষ্য করেছে, এখানকার মানুষরা নিজেদের খুব সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখে। তাদের হাসি, তাদের শরীর, তাদের সম্পর্ক এসবকিছু নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু সেই নিয়ন্ত্রণের নিচে কী আছে, সেটা কেউ জানতে চায় না।মহুলও চায় না। শুধু নিজেকে বলে, মহুল, মানুষের খুব কাছাকাছি যেও না।

ঈশার মধ্যে একটা অদ্ভুত সহজভাব ছিল। সে খুব দ্রুত মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। কিন্তু তার চোখে একটা স্থিরতা, যেটা মহুলকে অস্বস্তি দেয়। সে এই ধরনের চোখ এড়িয়ে চলে। কারণ এই চোখগুলো অনেক কিছু দেখতে পারে। লুকিং গ্লাসের মত। একদিন অফিসের পর সবাই মিলে বেরিয়েছিল। ঈশা তার খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়াল।

তৃধার সঙ্গে তার সম্পর্কটা কোনওদিনই স্পষ্ট ছিল না। বন্ধুত্ব নয়, প্রেম নয়, কিন্তু কী একধরনের নির্ভরতা ছিল। শরীরের ওপর নির্ভরতা, অভ্যাসের ওপর নির্ভরতা। আর কী কিছু? নাহ! কারণ এর পরের লাইনটা থেকে ও-নিজেকে খুব সতর্কভাবেই সরিয়ে রেখেছে। যেমন, দুধ থেকে সর তুলে নেওয়া! তেমনি কী? হয়ত! তৃধার ফ্ল্যাটটা অদ্ভূত! মনে পড়ে, ওই ছোট্ট ফ্ল্যাটটিতে ঢুকলেই নির্দিষ্ট একটি গন্ধ থাকত। কিছুটা স্যাঁতস্যাঁতে দেওয়াল, কফির গন্ধ, আর তার শরীরের উষ্ণতা। এই তিনটে জিনিস মিলিয়ে একটা অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি করত, যেটা মহুলকে একই সঙ্গে শান্ত করত ও অস্থিরও। সে বুঝতে পারত না, কোনটা সত্যি। একটি রাতে তৃধা আলো নিভিয়ে দিয়েছিল। অন্ধকারে বোধহয় মানুষ একটু বেশি সৎ হয়ে ওঠে, এই ধারণাটা তৃধার ছিল। আস্তে আস্তে বলেছিল, তুমি কি কখনও কাউকে ভেঙেছ? প্রশ্নটা হঠাৎই এসেছিল। মহুল একটু থেমে বলেছিল, সবাই কাউকে না কাউকে ভাঙে। তৃধা বলল, তুমি ইচ্ছে করে ভেঙেছ? মহুল উত্তর দেয়নি। কিন্তু তার মাথার ভেতরে তখন মেধার মুখটা ভেসে উঠেছিল। আর তার আগের সেই নামহীন মেয়েটি। তাদের চোখে একটা প্রশ্ন থাকত, কেন? এই কেন -এর কোনও উত্তর তার কাছে নেই। কারণ ওতো কখনও কিছু ভাঙতে চায়নি। শুধু দূরে থাকতে চেয়েছিল। কে বোঝাবে যে, দূরে থাকাও একধরনের ভাঙা। মহুলের সমস্যা হল, এখন আর সে কোনও অনুভূতিকেই বিশ্বাস করে না। করও না। তার কাছে অনুভূতি মানে, কিছু না। ঝড়ের খেয়ার মত। আবার শরীরের মত। তাই শরীরটাকে কে আলাদা করে দেখে। এখন, শরীর তার কাছে একটা যন্ত্র, যেটা চাহিদা মেটায়, চাপ কমায়, তারপর আবার নিরপেক্ষ হয়ে যায়। তৃধা এটা বুঝতে পারত। একদিন সে সরাসরি বলেছিল, আমি অনুভব করেছি তুমি যখন আমার কাছে থাকো, কিন্তু তখনও তুমি যেন আমার নয়, অন্য কোথাও, অন্য কারও! জানি না! মনে হয়, আমি খিদে! তুমি খাদক! সত্যিই তা-ই। আসলে, তুমি পুরোটা উপুড় করো না! শুনে মহুল হেসেছিল। আর ঘেন্নাটা আরও বেড়ে যাচ্ছিল। এখানেই তো সকলে পুড়ে যায় মিশে যায়, তারপর ভেসে যায়। সবাই কি পুরোটা দেয়? মনে মনে বেশ হেসে ছিল ও। শুধু বলেছিল, আমি এই যে চুলের গন্ধ নেব এখন,তারপর…!
কলকাতার কথা সে খুব কম ভাবে। কিন্তু মাঝে মাঝে কিছু দৃশ্য হঠাৎ ফিরে আসে। ভিজে রাস্তার গলির গন্ধ, ট্রামের শব্দ, সন্ধ্যেবেলা ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা এইসব ছোট ছোট মুহূর্ত। সেই সময়টায় সে অন্যরকম ছিল? হয়ত ছিল। তখনও ও অবশ্য বিশ্বাস করত, মানুষের সঙ্গে থাকা যায়। স্থায়ীভাবে। লেপ্টে! কিন্তু সেই বিশ্বাসটা খুব সহজে ভেঙে গিয়েছিল। প্রথমবার যখন সে জানতে পারে, তার ভালবাসা বলে কিছু হয় না। এবং তার ভালবাসা একতরফা। ভেতরে একটা ফাটল তৈরি হয়। তারপর সেই ফাটল ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। মহুল তখন বুঝতে পারে, মানুষকে পুরোটা দিলে, কেউ সেটা ধারণ করে না, ভাবে, সারল্য! কিন্তু, ব্যাঙ্গালোরে মেধার সঙ্গের সময়গুলি ছিল শিল্পময়, কিন্তু পূর্ণতাহীন। মেধা শুধু তার শরীর চায়নি, তার মনের ভেতরে ঢুকতে চেয়েছিল। একদিন মেধা বলেছিল, তুমি জানো, তোমার সমস্যা কী? শুনে মহুল বিরক্ত হয়েছিল। বলেছিল, সবাই আমার সমস্যা নিয়ে এত চিন্তা করে কেন? মেধাও থেমে থাকেনি, স্পষ্ট বলেছিল, কারণ তুমি নিজে চিন্তা করো না। মেধা তারপর মহুলের চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, তুমি নিজের ভেতরের যেটা, বাইরে আরেকটি। সেটাকে স্বীকার করতে ভয় পাও। মহুল তখন রেগে গিয়েছিল,
আমি যেমন, তেমনই। মেধা মাথা নাড়ল, না। তুমি যেমন, সেটা তুমি কাউকে দেখাও না। এমনকী নিজেকেও না। মহুলের আজ এসব ভেবে হাসি পায়, সেই কথাগুলো তখনও গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু মেধা চলে যাওয়ার পর, সেই কথাগুলো মাঝেমাঝে ফিরে এসেছে। আর নিজেকে বলেছে, ঘেন্না। সব এক গোয়ালের! না আছে রুচি না আছে বোধ, না আছে সম্মান! তৃধাও সেই একই জায়গায় আঘাত করছিল। সে বুঝতে পারছিল, মহুল শুধু দূরে থাকছে না, নিজেকে লুকিয়েই রাখছে। এক রাতে তৃধা খুব শান্ত গলায় বলেছিল, তুমি যখন আমাকে ছোঁও, তখন তোমার ভেতরে একটা রাগ থাকে। মহুল থমকে গিয়েছিল।
—রাগ?
—হ্যাঁ। যেন তুমি কারও ওপর রাগ ঝাড়ছ।
তৃধার এই কথাটা শুনে তার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল।
সে কি সত্যিই রাগ নিয়ে বাঁচে? কার ওপর রাগ? সেই মেয়েটার ওপর? মেধার ওপর? নাকি নিজের ওপর? এরপর থেকে সে লক্ষ্য করতে শুরু করল, তৃধার সঙ্গে থাকলে তার আচরণ কেমন হয়। সত্যিই অনুভব করল, তার ছোঁয়ায় একটা তাড়াহুড়ো থাকে। একটা অধিকারবোধ, ক্ষিপ্রতা। সে যেন প্রমাণ করতে চায়, এই মুহূর্তটা তার। কিন্তু মুহূর্ত কখনও কারও হয় না। এই উপলব্ধিটা ও কাকে বোঝাবে! একদিন তৃধা বলল, আমি যদি চলে যাই, তুমি কষ্ট পাবে?
মহুল সঙ্গে সঙ্গে বলেছিল,
—সবাই যায়।
—আমি প্রশ্নটা আবার করছি।
মহুল চুপ করে ছিল। কারণ সে জানে, আসলে তার ভেতর কী ঘটবে। কিন্তু সেটা সে স্বীকার করল না। অনুভব মানে দুর্বলতা। আর সে দুর্বল হতে চায় না। কিন্তু তৃধা যখন সত্যিই চলে যাওয়ার কথা বলল, তখন মহুলের ভেতরে একটা ফাঁকা জায়গা তৈরি হল। মহুল শুধু দেখল, অভ্যাস শেষ হয়ে যাচ্ছে। এখন সময়টা তার। একটা শরীর, একটা গন্ধ, একটা নির্দিষ্ট সময় সব হারিয়ে যাচ্ছে। যায়। ঋপুর ভেতর কেউ আটকে থাকতে পারে না। কিন্তু এর চেয়েও বেশি কিছু কি হারাচ্ছে? উত্তর খুঁজতে চাইল না। ওই শেষ রাতে তৃধা বলেছিল, তুমি জানো, তুমি নিজেকে শাস্তি দিচ্ছ?
কথাটি শুনে, মহুল হেসেছিল।
—আমি কেন নিজেকে শাস্তি দেব?
—কারণটা তুমি জানো মহুল।
এই কথাটা তার মাথার ভেতরে বজ্রপাতের মতো আঘাত করেছিল। সে কি সত্যিই জানে। হয়তো! কারণ কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। কাউকে পুরোটা মন দিতে পারে না। এই বিশ্বাসটাই তাকে বাঁচিয়ে রাখে, আবার ধ্বংসও করে।
তৃধা চলে যাওয়ার পর পুণে আবার আগের মতো হয়ে যায়। কিন্তু মহুল বদলায় না। ও একইভাবে এখনও একইরকম! দূরে থাকে, তবে একটা পার্থক্য আছে। মহুল জানে, সে পালাচ্ছে। কিন্তু জেনেও সে থামে না। কারণ পালিয়ে থাকাই তার অভ্যাস। কলকাতার স্মৃতি, ব্যাঙ্গালোরের ব্যর্থতা, পুণের নির্লিপ্ততা, এসব তার জীবন একটা চক্র। যেখানে সে বারবার একই জায়গায় ফিরে আসে। একইভাবে দূরে সরে যায়। আর শেষে একা হয়ে যায়। এই একাকীত্বটাই তার সবচেয়ে বড় সঙ্গী। তবুও, সেটাকেই…! কারণ একা থাকা, ভেঙে যাওয়ার থেকে সহজ। আর মহুল সহজ পথটাই বেছে নেয়। সবসময়।
তৃধা চলে যাওয়ার পর প্রথম ক’য়েকটা দিন মহুল খুব সচেতনভাবে নিজের রুটিনটাকে আঁকড়ে ধরে ছিল। অফিস, জিম, ফেরত এসে ল্যাপটপ। সব কিছু আগের মতই। যেন কিছুই বদলায়নি। যেন কেউ কোনওদিন তার জীবনে ঢোকেইনি। কিন্তু শরীর মিথ্যে বলে না। রাতে ঘুমোতে গেলে সে বুঝতে পারে, ঘরের ভেতরের নীরবতা আগের থেকে অনেক বেশি ভারী। তৃধার ফ্ল্যাটের সেই অল্প আলো, সিগারেটের ধোঁয়া, আর হঠাৎ ছুঁয়ে দেওয়া হাত, এই সবকিছু একসঙ্গে ফিরে আসে। ও উঠে বসে। জল খায়। আবার শোয়। কিন্তু ঘুম আসে না। হাসি পায়।
কাজের জায়গায় তৃধার নাম কেউ উচ্চারণ করে না। অফিসে সম্পর্কগুলো এমনই, আজ আছে, কাল নেই। সবাই জানে, কিন্তু কেউ বলে না। একদিন ক্যান্টিনে বসে থাকতে থাকতে তার সামনে এসে বসল একটা মেয়ে, ঈশা। ব্যাঙ্গালোর থেকে ট্রান্সফার হয়ে এসেছে। নিজে থেকেই বলল, তুমি মহুল, তাই তো?
মহুল মাথা নাড়ল।
—তোমার নাম শুনেছি। তুমি নাকি খুব কম কথা বলো?
মহুল একটু হেসে বলল,
—যতটা দরকার।
ঈশা তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।
–-দরকারটা কে ঠিক করে?
এই প্রশ্নটা তাকে অস্বস্তিতে ফেলল।
কারণ এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই।
ঈশার মধ্যে একটা অদ্ভুত সহজভাব ছিল। সে খুব দ্রুত মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। কিন্তু তার চোখে একটা স্থিরতা, যেটা মহুলকে অস্বস্তি দেয়। সে এই ধরনের চোখ এড়িয়ে চলে। কারণ এই চোখগুলো অনেক কিছু দেখতে পারে। লুকিং গ্লাসের মত। একদিন অফিসের পর সবাই মিলে বেরিয়েছিল। ঈশা তার খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়াল।
—তুমি সবসময় এত দূরে থাকো কেন?
মহুল গ্লাসটা নামিয়ে বলল,
—আমি দূরে নেই।ঈশা হেসে উঠল।
—তুমি এত দূরে যে, তোমাকে ছুঁতে গেলে মনে হয়, তুমি নেই।
এই কথাটা শুনে তার ভেতরে পুরনো অস্বস্তি ফিরে এল। তৃধাও তো প্রায় একই কথা বলেছিল।
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে সে আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের দিকে তাকিয়ে রইল। সে কি সত্যিই নেই? না কি সে নিজেকে মুছে ফেলেছে? অন্যদিকে, ঈশার সঙ্গে তার কথা বাড়তে লাগল। কিন্তু এবার সে সতর্ক ছিল। সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করছিল। শরীরকে দূরে রাখছিল। কারণ সে জানে, শরীর একবার ঢুকে গেলে, সবকিছু চূর্ণ হয়ে যায়। এক সন্ধ্যায় ঈশা নিজেই বলল,
—চল, আমার রুমে যাই।
মহুল কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর বলল,
—কেন?
ঈশা উত্তর দিল না। শুধু তার হাতটা ধরে টানল।
এই টানটা খুব পরিচিত। এই টানেই সব শুরু হয়।
ঈশার ফ্ল্যাটটা তৃধার মতো নয়। এখানে আলো বেশি, গন্ধ আলাদা। কিন্তু একটা জিনিস একই, দু’জন মানুষের মাঝের অদৃশ্য উত্তেজনা। ঈশা তার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। তার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা গায়ে লাগছিল। মহুল অনুভব করল, তার শরীর সাড়া দিচ্ছে।
কিন্তু তার মাথা পেছনে টানছে। এই টানাপোড়েনটাই তার ভিতরের যুদ্ধ। ঈশা ফিসফিস করে বলল, তুমি কি সবসময় নিজেকে আটকে রাখো?
মহুল উত্তর দিল না। শুধু চোখ বন্ধ করল।
তারপর যা হল, সেটা নতুন কিছু না, তবুও আলাদা। কারণ এবার তার মাথার ভেতরে তৃধা নেই, মেধা নেই, শুধু একটা শূন্যতা। যেন নিজের শরীরকে বাইরে থেকে দেখছিল। স্পর্শ হচ্ছে, উষ্ণতা বাড়ছে, নিঃশ্বাস দ্রুত হচ্ছে, সব চলছে। কিন্তু সেই নেই। শেষ হওয়ার পর ঈশা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুমি এখানে ছিলে না।
এই কথাটা যেন তার ওপর ছুরি চালাল। আবার হাসিও পেল।
–তুমি কীভাবে বুঝলে?
–কারণ আমি তোমার ভেতর ছিলাম।
এই সহজ উত্তরটা তাকে থামিয়ে দিল। এরপরের দিনগুলোতে ও-বুঝতে পারল, সে একই ভুল আবার করছে। একই প্যাটার্ন। একই দূরত্ব। কিন্তু এবার একটা পার্থক্য আছে। ঈশা তাকে প্রশ্ন করে না। শুধু পর্যবেক্ষণ করে। এই পর্যবেক্ষণটাই আরও ভয়ঙ্কর। একদিন ঈশা বলল,
—তুমি জানো, তুমি কাকে এড়িয়ে যাচ্ছ?
মহুল বিরক্ত হল।
—এইসব সাইকোলজি আমি শুনতে চাই না। প্লিজ…
ঈশা শান্ত গলায় বলল,
—তুমি নিজেকে এড়িয়ে যাচ্ছ।
এই কথাটা সে আগেও শুনেছে। কিন্তু এবার সেটা অন্যভাবে লাগল।
কারণ এটা তো সত্যি!
সেই রাতে সে প্রথমবার নিজের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করল। সে ভাবতে শুরু করল, কেন এত দিনেও ঘেন্না অনুভব করে? কেন মেয়েদের কাছে গেলেই তার ভিতরে একটা বিরক্তি জন্মায়? এই ঘেন্নাটা আসলে কার ওপর?
ঈশার সঙ্গে তার সম্পর্কটা কোথায় যাবে, জানে না। একটা জিনিস বুঝেছে, দূরে থাকলে কিছুই ভাঙে না। কিন্তু কিছুই গড়েও ওঠে না। একদিন, অনেক রাতের পরে, সে ঈশাকে বলল,
—আমি চেষ্টা করছি জানো।
ঈশা জিজ্ঞেস করল,
—কী?
ও ধীরে বলল,
—তোমার সঙ্গে থাকার।
কিন্তু এই থাকাটাই সবচেয়ে কঠিন। মহুল জানে না, ও কতদূর যেতে পারবে। কিন্তু এবার সে পালাচ্ছে না।
কমপক্ষে, পুরোপুরি তো না-ই।
মহুল জানত, আর কোনও মুক্তি নেই। মুক্তি শব্দটাই তার কাছে এখন একটা ভাঁওতা। মানুষের ভিড়, সম্পর্কের উষ্ণতা যেন কাঁচের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা এক দৃশ্য। যা ছুঁতে গেলেই আঙুল কেটে যায়।
সেদিন রাতটা অন্যরকম ছিল। ও জানালার পাশে বসে ছিল। সিগারেটের ধোঁয়া পাক খাচ্ছিল। ঘরের ভেতর অন্ধকারটা যেন ইচ্ছে করেই ঘন হয়ে উঠছিল। ফোনটা অনেকক্ষণ ধরেই বাজছিল। একই নাম। মহুল আর তাকায়নি। তাকাতে চায়নি। এই জীবনে আসা প্রতিটি নারী যেন একই ছাঁচে গড়া, প্রথমে আকর্ষণ, তারপর ঘনিষ্ঠতা, তারপর অদ্ভুত খেলা। শরীরের কাছে আসা, কিন্তু মনকে দূরে ঠেলে দেওয়া। যেন প্রত্যেকেই কোনও না কোনওভাবে একটি আকর্ষণের পেছনে ছুটছে। মন নেই। ভালবাসা নেই। প্রেম নেই।শুধু শরীর, যৌনতা! স্বার্থ, লোভ! কেউ ভালবাসতেই শিখল না। প্রেমকে স্পর্শ করতে পারল না! অজস্র প্যাঁচের ভেতর, মিথ্যের ভেতর বন্দী প্রায় সকলেই। এই মিথ্যে কিসের জন্য? এই পৃথিবীকে কী বা দিয়ে যাবে! মহুলের মনে পড়ে, প্রথমবার সে যখন সত্যিই কারও কাছে নিজেকে খুলে দিয়েছিল, তখন সে ভেবেছিল, এইবার হয়ত বদলাবে সবকিছু। সেই মেয়েটির চোখে ছিল একধরনের নিশ্চিন্তি। নরম প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি ভেঙে যেতে সময় লাগেনি। সম্পর্কটা ভেঙেছিল, কোনও বড় কারণ ছাড়াই। খুব ছোট ছোট মিথ্যে, আর অর্ধসত্যের জন্য। তারপর থেকেই মহুল বুঝে গিয়েছিল, নারীরা কাছে আসে, মোহে। তারপর লোভ জন্মায় তাঁদের ভেতর। ভয়ঙ্কর লোভ! আর তারপর সব ভেঙে দেয়, চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয় বিশ্বাস, নিরাপত্তা, বুকের ভেতরের একান্ত জায়গাগুলো।
রাত বাড়ছিল। বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। হালকা শব্দে টুপটাপ। এই শব্দটা একসময় তাকে শান্ত করত। এখন করে না।
সে উঠে দাঁড়াল। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের চোখের দিকে তাকাল, ক্লান্ত, শুষ্ক, কিন্তু কোথাও যেন একটা কঠিন রেখা। যেন সে নিজেই নিজের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে।
তার ফোন আবার বেজে উঠল। এবার সে তাকাল। নামটা চেনা। খুবই চেনা। একসময় যার জন্য সে নিজের নিয়ম ভেঙেছিল। যার হাসি তার ভেতরের অন্ধকারে আলো ফেলত। কিন্তু সেই আলোই পরে তাকে অন্ধ করে দিয়েছিল। ফোনটা ধরল না। ইচ্ছেও করল না। মহুল জানে, এখন সে যদি ফোনটা ধরে, তাহলে আবার একই চক্রে ঢুকে পড়বে। কিছুক্ষণ কথা, কিছু নাটক, কিছু স্মৃতি, তারপর ধীরে ধীরে সেই পুরনো খেলা। যেখানে শরীরের উষ্ণতা থাকে, কিন্তু বিশ্বাস থাকে না। যেখানে কাছাকাছি আসা মানে আরও গভীরভাবে দূরে সরে যাওয়া। জানালাটা খুলে দিল। ঠাণ্ডা হাওয়া ঢুকল ঘরে। বৃষ্টির গন্ধ। তার মনে হল, এই শহরে এত মানুষ, এত সম্পর্ক, কিন্তু প্রত্যেকেই একা। মহুলের ভেতরে একটা সিদ্ধান্ত ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। আর কোনও সম্পর্কে জড়াবে না। কোনও আবেগের কাছে নিজেকে তুলে দেবে না। ও দেখেছে, এটিও খেলা। কেউ কেউ খেলে। নেশায়। যা ড্রাগের নেশার থেকেও ভয়ঙ্কর। এইখেলায় জেতার কেউ নেই। শুধু হারার ধরণ আলাদা।নারীদের প্রতি মহুলের তার দৃষ্টিটা বদলে গেছে। সে আর তাদের আলাদা করে দেখে না। প্রত্যেকেই যেন একই গল্পের ভিন্ন চরিত্র। ও আবার আয়নার দিকে তাকাল। নিজের ঠোঁটে একরকম তির্যক হাসি ফুটে উঠল, আমি আর কাউকে বিশ্বাস করি না। নিজের মনেই বলল মহুল। মাথার ভেতর ভেসে উঠছিল অন্ধকার, নিঃশ্বাস। সবই বাস্তব, সবই মিথ্যে। মুহূর্তগুলো শুধু শরীরের, মনের নয়। মহুল বুঝে গিয়েছে, এই যে শূন্যতা, তা কেউ পূরণ করতে পারবে না। আর সে আর সেই চেষ্টাও করতে চায় না। ফোনটা এবার থেমে গিয়েছে। ঘরের ভেতর বাইরের শুধু বৃষ্টির শব্দ আর নিঃশ্বাসের আবরণ। আলোটা নিভিয়ে দিল। অন্ধকারের ভেতর দাঁড়িয়ে, অনুভব করল এই অন্ধকারই এখন নিকটতম সঙ্গী। কোনও ভান নেই, কোনও প্রতারণা নেই। মহুল জানে, তার এই সিদ্ধান্ত তাকে আরও একা করে দেবে। কিন্তু এই একাকীত্ব সে বেছে নিয়েছে। কারণ এই একাকীত্ব অন্তত তাকে ঠকাবে না।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে, শহর চলছে নিজের মতো। আর মহুল, ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে, সমস্ত কিছু থেকে, সবার থেকে।
নারীদের প্রতি মনের ভেতরে জন্ম নেওয়া ঘৃণাটা চিরতরের জন্য ঠাণ্ডা, স্থির। 🍁

 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী  সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com

বি: দ্রসমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ বিভাগের লেখা  আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন