সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ ভুবনেশ্বর: স্থায়ী কর্পোরেট চাকরি ছেড়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হাঁটা অনেকের কাছেই ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কিন্তু ওড়িশার গঞ্জাম জেলার বাসিন্দা সঞ্জীব রেড্ডি (Sanjeeb Reddy) সেই পথই বেছে নিয়েছিলেন বহু বছর আগে। লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো (Larsen & Toubro বা L&T) -এর চাকরি ছেড়ে কৃষিনির্ভর উদ্যোগ তিনি শুরু করেন। শুরুটা সহজ ছিল না, একাধিক ব্যর্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ সবকিছুর মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবু পথ বদলাতে বদলাতে শেষ পর্যন্ত ফুল চাষ ও বিপণনকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছেন সফল ব্যবসা, যার বার্ষিক টার্নওভার এখন ৬৫ লক্ষ টাকারও বেশি। সঞ্জীব রেড্ডির কর্মজীবনের শুরু ১৯৯৫ সালে, যখন তিনি L&T-র ECC ডিভিশনে Planning Assistant হিসেবে যোগ দেন। সেই সময় তাঁর বার্ষিক আয় ছিল প্রায় ৯৬ হাজার টাকা। বিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক হওয়া সত্ত্বেও তিনি চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা প্রশাসনে ডিপ্লোমা করেন ন্যাশনাল ইন্ডাস্ট্রিজ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল (National Industries Research and Development Council) -এর মাধ্যমে। শুরু থেকেই নিজের ব্যবসা করার ইচ্ছা ছিল বলেই চাকরির বড় অংশের আয় তিনি সঞ্চয় করতেন। তাঁর কথায়, ‘সারা জীবন বেতনের উপর নির্ভর করে থাকতে চাইনি, নিজের কিছু তৈরি করার লক্ষ্য ছিল।’
প্রায় পাঁচ বছর চাকরি করার পর ২০০০ সালে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। উদ্যোক্তা হওয়ার পথে প্রথম পদক্ষেপ ছিল কৃষিক্ষেত্রে প্রবেশ। ২০০১ সালে প্রায় ২,০০০ বর্গফুট জায়গায় খড় ও মাশরুম চাষ শুরু করেন। প্রথম দিকে কিছুটা সাফল্য মিললেও ২০০৫ সালে অনুকূল আবহাওয়ার অভাবে এবং ভুল সময়ে ব্যবসা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। সেই ধাক্কায় কিছুদিন তিনি সেলস পেশায় যুক্ত থাকেন। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে আবার কৃষিক্ষেত্রে ফিরে আসেন সঞ্জীব। এবার আরও বড় পরিসরে ১০,০০০ বর্গফুট এলাকায় oyster ও খড়-মাশরুম চাষ শুরু করেন। কয়েক বছর স্থিতিশীলভাবে চললেও ২০১৯ সালে ঘূর্ণিঝড় হুদহুদ (Cyclone Hudhud) তাঁর সমস্ত পরিকাঠামো প্রায় ধ্বংস করে দেয়। এক রাতের মধ্যে বহু বছরের পরিশ্রম ভেস্তে যায়।
এই পরিস্থিতিতেই তিনি নতুন দিক খোঁজেন। ২০২০ সালে মাশরুম চাষ থেকে সরে এসে ফুল চাষ বা ফ্লোরিকালচারের দিকে ঝুঁকেন। সেই বছরই লখনউয়ের ন্যাশনাল বোটানিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট (National Botanical Research Institute বা NBRI)-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ‘নমোহ-১০৮’ (Namoh-108) নামের বিশেষ পদ্ম ফুলের চাষ শুরু করেন। এই ফুলের বিশেষত্ব হল এর ১০৮টি পাপড়ি, যা ধর্মীয় ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তিনি জানান, ‘প্রিমিয়াম ফুলের বাজারে আলাদা জায়গা তৈরি করা সম্ভব বলেই এই চাষ শুরু করি।’
প্রথম পর্যায়ে প্রায় ১.০৮ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করে এই প্রকল্প শুরু করেন। স্থানীয় পঞ্চায়েতের অধীনে থাকা একাধিক জলাশয় লিজ নিয়ে সেখানে পদ্ম চাষ শুরু করেন। পাশাপাশি তামিলনাড়ুর নাগেরকোয়েল (Nagercoil) থেকে বিপুল সংখ্যক চারা সংগ্রহ করেন। চারা রোপণের ৬০ থেকে ৭০ দিনের মধ্যেই ফুল পাওয়া শুরু হয়। বর্তমানে বছরে ৩০ হাজারের বেশি পদ্ম উৎপাদন করছেন তিনি, যা দেশের বিভিন্ন শহরে সরবরাহ করা হয়। পদ্ম চাষে সাফল্যের পর ২০২৩ সালে তিনি আফ্রিকান গাঁদা (African Marigold) চাষ শুরু করেন। চার একর জমি লিজ নিয়ে এই চাষ শুরু হয়। প্রথমে ১,০০০টি চারা দিয়ে শুরু হলেও পরে তা বেড়ে প্রায় ৭,০০০ গাছে পৌঁছায়। প্রতি একরে ৮ থেকে ১০ টন পর্যন্ত ফুল উৎপাদন হয় বলে জানা গিয়েছে। বিশেষ উৎসবের মরসুমে এই ফুলের চাহিদা এবং দাম দুটোই বৃদ্ধি পায়। চাষের ক্ষেত্রে তিনি রাসায়নিক ব্যবহারের উপর নির্ভরতা কমিয়ে জৈব পদ্ধতির দিকে জোর দিয়েছেন। জীবামৃত (Jeevamruta), বীজামৃত (Bijamruta) ও আগ্নিয়াস্ত্রর (Agniastra) মতো প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে উৎপাদন বজায় রাখার চেষ্টা করেন। একইসঙ্গে অন্যান্য কৃষকদেরও এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে উৎসাহ দেন।
শুধু চাষেই সীমাবদ্ধ থাকেননি সঞ্জীব। তাঁর স্ত্রী জয়শ্রী রেড্ডির (Jayashree Reddy) নামে ‘হ্যাপি দোকান’ (Happy Dukan) নামে একটি সংস্থা গড়ে তোলেন, যা ফুল সংগ্রহ ও সরবরাহের কাজ করে। এই সংস্থা বিভিন্ন রাজ্যের কৃষকদের কাছ থেকে ফুল সংগ্রহ করে বাজারে পৌঁছে দেয়। তামিলনাড়ু থেকে পদ্ম, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে গাঁদা, কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্র থেকে গোলাপ, ছত্তীসগঢ় থেকে জারবেরা এভাবে বহু স্থান থেকে ফুল সংগ্রহ করা হয়। বর্তমানে প্রায় ২৫ ধরনের ফুল নিয়ে কাজ করছে এই সংস্থা। ব্যবসার ক্ষেত্রে তাঁর লক্ষ্য শুধুমাত্র বেশি লাভ নয়। তিনি বলেন, ‘ক্রেতার বিশ্বাস অর্জন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একবার বিশ্বাস তৈরি হলে তারা আবার ফিরে আসবেন।’ ফুলের সতেজতা বজায় রাখতে সংরক্ষণের দিকেও নজর দেওয়া হয়। বেরহামপুরের (Berhampur) রেগুলেটেড মার্কেট কমিটির (Regulated Market Committee) কোল্ড স্টোরেজ ব্যবহারের মাধ্যমে সেই কাজ করা হয়।
বর্তমানে তাঁর সংস্থায় প্রায় ১২ জন স্থায়ী কর্মী রয়েছেন। মরসুমভেদে অতিরিক্ত শ্রমিকও নিয়োগ করা হয়। ব্যবসার আর্থিক ও প্রশাসনিক দিক সামলাতে তাঁর স্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। আগামী দিনে ব্যবসা আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। কান্ধামাল (Kandhamal) জেলায় অতিরিক্ত জমি লিজ নিয়ে ক্রিসান্থেমাম, জুঁই, রজনীগন্ধা এবং অন্যান্য শোভাবর্ধক গাছের চাষ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন জেলার কৃষকদের যুক্ত করে তিনি বৃহত্তর ফুল সরবরাহ নেটওয়ার্ক তৈরি করতে চান। কিন্তু, চাকরি থেকে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার এই যাত্রায় একাধিকবার ধাক্কা এলেও প্রতিবারই নতুন পথে এগিয়েছেন সঞ্জীব রেড্ডি। ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলেই আজ তাঁর ফুলের ব্যবসা উল্লেখযোগ্য অবস্থানে পৌঁছেছে এবং বছরে ৬৫ লক্ষ টাকার বেশি লেনদেন করছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Chhattisgarh High Court verdict, penetration definition in rape law | ‘সঙ্গমই ধর্ষণের মূল শর্ত, বীর্যপাত নয়’ : ২০ বছর পুরনো মামলায় সাজা কমাল ছত্তীসগঢ় হাইকোর্ট




