সুজয়নীল দাশগুপ্ত ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : যে মেয়েটি একসময় নিজের ব্যাট কেনার টাকাটুকুও জোগাড় করতে পারতেন না, সেই মেয়েই ভারতীয় দলের জার্সি গায়ে বিশ্বকাপ মঞ্চ কাঁপাচ্ছেন। বাংলার গর্ব রিচা ঘোষ (Richa Ghosh), যাঁর সাফল্যের গল্প শিলিগুড়ির এক সাধারণ পরিবারের সংগ্রাম, অধ্যবসায় আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতিচ্ছবি। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় (Sourav Ganguly) ও ঝুলন গোস্বামী (Jhulan Goswami) -এর পর বিশ্বকাপে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করা শিলিগুড়ির এই কন্যা এখন লাখো তরুণীর প্রেরণা।
২০০৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জন্ম রিচার, বাবা মানবেন্দ্র ঘোষ ছিলেন ক্লাব ক্রিকেটার। মা স্বপ্না ঘোষ পরিবারের দায়িত্ব সামলাতেন। ছোট্ট রিচার বয়স যখন মাত্র চার, তখনই তিনি ব্যাট হাতে তুলে নেন। বাবার ক্রিকেট মাঠেই তাঁর প্রথম পাঠ। মানবেন্দ্র ঘোষ তখন নিজে কোচিং করাতেন, আর সেই সঙ্গেই মেয়ের অনুশীলনেও সময় দিতেন। এক সময় রিচার ক্রিকেটের প্রতি এমন টান তৈরি হয় যে, অন্য খেলা একদম ভালো লাগত না। একবার তাঁকে টেবিল টেনিস শেখার জন্য ভর্তি করানো হয়েছিল, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তিনি বাবাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘আমি শুধু ক্রিকেট খেলব।’

শিলিগুড়িতে তখন মেয়েদের ক্রিকেটের অবস্থা করুণ। প্র্যাকটিসের জায়গা, ট্রেনার, কিছুই ঠিকঠাক ছিল না। রিচাকে বাধ্য হয়ে ছেলেদের সঙ্গে অনুশীলন করতে হত। ছেলেরা মাঝে মাঝে হাসাহাসি করত, ব্যঙ্গ করত, ‘মেয়ে হয়ে ক্রিকেট খেলবে?’ কিন্তু এই কথাগুলোই তাঁকে আরও শক্ত করে তোলে। নিজের ব্যাট দিয়ে সেই বিদ্রূপের জবাব দিতে শিখেছিলেন রিচা।মানবেন্দ্র ঘোষের পক্ষে সবসময় মেয়ের খেলার খরচ চালানো সহজ ছিল না। কখনও ধার করে ব্যাট কিনেছেন, কখনও বন্ধুর সাহায্য নিয়েছেন। কিন্তু মেয়ে যেন ক্রিকেট না ছাড়ে এটাই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। রিচাও বাবার বিশ্বাস ভঙ্গ করেননি। রিচা প্রথমে ছিলেন এক অলরাউন্ডা ব্যাট, বল, উইকেটকিপিং, সবকিছুতেই মন দিতেন। পরে বুঝলেন, উইকেটকিপার-ব্যাটার হিসেবেই নিজেকে এগিয়ে নেওয়া যাবে। প্রচুর প্র্যাকটিস, পরিশ্রম আর আত্মনিয়ন্ত্রণই তাঁকে করে তোলে আজকের রিচা ঘোষ।

২০১৯ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে রিচা জায়গা পান বাংলা অনূর্ধ্ব-১৯ দলে। তাঁর খেলার দক্ষতা নজর কাড়ে নির্বাচকদের। এর পর দ্রুতই তিনি বাংলা সিনিয়র দলে জায়গা করে নেন। ২০২০ সালে আইসিসি মেয়েদের টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতীয় স্কোয়াডে নাম ওঠে তাঁর, যা ছিল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। সেই বছরই অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ত্রিদেশীয় সিরিজে ভারতীয় জার্সিতে অভিষেক হয় রিচার।২০২১ সালে তিনি বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তির আওতায় আসেন। এরপর ওডিআই ও টেস্ট ফরম্যাটেও আত্মপ্রকাশ করেন। ধাপে ধাপে তিনি প্রমাণ করেছেন, সুযোগ পেলে ছোট শহরের মেয়েরাও বড় মঞ্চে সাফল্য অর্জন করতে পারে। বর্তমানে আইসিসি মহিলা ওডিআই বিশ্বকাপে রিচা ঘোষ ভারতীয় দলের অন্যতম ভরসা। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে তাঁর ৯৪ রানের ইনিংস শুধু দর্শকদেরই মুগ্ধ করেনি, রেকর্ডও গড়েছে ৮ নম্বরে নেমে কোনও ব্যাটারের সর্বোচ্চ রান এটি। তাঁর সাফল্য ঘরোয়া ক্রিকেট ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগেও। ২০২৩ সালে উইমেন্স প্রিমিয়ার লিগে (WPL) রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু (Royal Challengers Bengaluru) তাঁকে দলে নেয় ১.৯০ কোটি টাকায়। পরের বছরেই তিনি ছিলেন দলের তৃতীয় সর্বাধিক রান সংগ্রাহক। উইমেন্স প্রিমিয়ার লিগের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশ লিগ (Women’s Big Bash League) ও ইংল্যান্ডের দ্য হান্ড্রেড (The Hundred)-এ খেলেছেন রিচা, সেখানে তাঁর ব্যাটিং ঝলক নজর কেড়েছে আন্তর্জাতিক সমালোচকদেরও।
এই মুহূর্তে রিচা ঘোষ ভারতের হয়ে ৬৭টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ১০৬৭ রান করেছেন, সর্বাধিক ৬৪*। এছাড়া ৪৭টি ওয়ানডে ম্যাচে ১০৭৩ রান, সর্বাধিক ৯৬। টেস্টে ২ ম্যাচে তাঁর ঝুলিতে ১৫১ রান, সর্বাধিক ৮৬। পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, তিনি শুধুমাত্র প্রতিভাবানই নন, নির্ভরযোগ্যও।তাঁর খেলায় দেখা যায় আগ্রাসন, আত্মবিশ্বাস আর ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা, যা আজকের আধুনিক ক্রিকেটের চাহিদা। ভারতীয় নারী ক্রিকেটের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে রিচা ঘোষ এক উজ্জ্বল। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, প্রতিকূল পরিস্থিতি বাধা নয়, বরং সাফল্যের সিঁড়ি।রিচা ঘোষ নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ছোটবেলায় অনেকেই বলত, মেয়েরা ক্রিকেট খেলে না। আমি তখনই ঠিক করেছিলাম, একদিন এমন খেলব যেন সবাই মেয়েদের ক্রিকেট নিয়েও কথা বলে।’ তাঁর সেই স্বপ্ন আজ বাস্তব, কোটি মানুষের মুখে এখন শোনা যায় রিচা ঘোষের নাম। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাংলার শিলিগুড়ি থেকে বিশ্ব ক্রিকেটের আলোয় পৌঁছনো এই তরুণীর কেবল ক্রিকেটের নয়, এক অসাধারণ জীবন সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। রিচার সাফল্যের পেছনে আছে কঠোর পরিশ্রম, পারিবারিক ত্যাগ আর আত্মবিশ্বাসের অটুট ভিত্তি। তাঁর মতো মেয়েদের জন্যই আজ ভারতীয় নারী ক্রিকেট নতুন উচ্চতায় পৌঁছচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : NepalCricket, OmanCricket, T20WorldCup2026 | নেপাল ও ওমানের ঐতিহাসিক অর্জন: ২০২৬ আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে জায়গা পাকা করল দুই উদীয়মান শক্তি



