বসুধা চৌধুরী ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক: ভালবাসা মানেই শুধুই মানসিক সংযোগ নয়, শারীরিক ঘনিষ্ঠতাও সম্পর্ককে পূর্ণতা দেয়। দাম্পত্য কিংবা প্রেমের সম্পর্কে যৌনতা চিরকালই গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সমীক্ষা বলছে, তরুণ প্রজন্ম, বিশেষত জেন জেড (Gen Z), সেই আগ্রহ থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে। তাঁদের অনেকেই মানসিক সম্পর্ককে প্রাধান্য দিচ্ছেন, কিন্তু শরীরী খেলায় খুব একটা আগ্রহী নন। এই পরিবর্তন শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, ভবিষ্যতের সামাজিক ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নতুন প্রজন্মের একাংশ নিজেদেরকে “গ্রেসেক্সুয়াল” (Greysexual) পরিচয়ে চিহ্নিত করছেন। অর্থাৎ তাঁরা মানসিক ও আবেগের সংযোগ ছাড়া শারীরিক ঘনিষ্ঠতায় যেতে পারেন না। তাঁদের মধ্যে যৌনতার প্রতি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি থাকলেও চাহিদা তুলনামূলক অনেক কম। গ্রেসেক্সুয়ালদের এক আন্তর্জাতিক ফোরামও রয়েছে, যেখানে অন্তত ৮ হাজার ৩০০ জন সদস্য সক্রিয়ভাবে যুক্ত। তাঁদের অধিকাংশই মনে করেন, হাতে হাত ধরে হাঁটা, ঘনিষ্ঠ আলাপ কিংবা আবেগের গভীরতা তৈরি করাই সম্পর্কের আসল পূর্ণতা। ফলে শরীরী খেলায় তাঁরা খুব কম সময়ের জন্য অংশ নেন ও তা খুব ঘন ঘন হয় না।

মনোবিশ্লেষক ড. অনিন্দিতা মুখার্জি জানাচ্ছেন, “প্রেম কিংবা দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে যৌনতা একটি স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক চাহিদা। কিন্তু যখন কোনও প্রজন্ম সেই স্বাভাবিক প্রবৃত্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সমাজের উপর পড়তে বাধ্য।”
এখানেই প্রশ্ন, তাহলে কেন এই প্রবণতা বাড়ছে? গবেষকরা কয়েকটি বড় কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, অতিরিক্ত ব্যস্ততা ও মানসিক অবসাদ। বর্তমান সময়ে জেন জেড ছোট থেকেই পড়াশোনা, প্রতিযোগিতা এবং কেরিয়ার নিয়ে দৌড়ের মধ্যে আটকে আছে। সেই চাপ ধীরে ধীরে মানসিক ক্লান্তি তৈরি করছে। এর ফলে স্বাভাবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অবসাদ প্রভাব ফেলছে, আর যৌনতায় আগ্রহ কমে যাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, আত্মবিশ্বাসের অভাব। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, চেহারা ও শরীর নিয়ে জেন জেডের মধ্যে অস্বস্তি ও অতি সংবেদনশীলতা রয়েছে। শরীরের গঠন বা সৌন্দর্য প্রচলিত মানদণ্ডে না মিললেই মনখারাপ ও হতাশা দেখা দেয়। যা আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় ও সঙ্গীর সামনে শারীরিকভাবে খোলামেলা হতে অনীহা তৈরি করে। তৃতীয়ত, অতিরিক্ত সোশাল মিডিয়া আসক্তি। ডিজিটাল জগতের সঙ্গে অতিরিক্ত সংযুক্তির ফলে তাঁরা বাস্তব সম্পর্ক থেকে অনেকটা দূরে সরে যাচ্ছেন। ঘন্টার পর ঘন্টা ভার্চুয়াল দুনিয়ায় কাটানোয় কাছের মানুষের সঙ্গে সময় দেওয়ার সুযোগ কমছে। এর ফলে সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হচ্ছে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, “গ্রেসেক্সুয়ালরা আবেগ ও মানসিক সংযোগকে প্রাধান্য দেন। কিন্তু সোশাল মিডিয়ার আসক্তি সম্পর্কের সেই গভীরতা তৈরি হতে দেয় না।” চতুর্থত, পর্নগ্রাফি আসক্তি। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত পর্ন দেখার ফলে বাস্তব যৌন সম্পর্কে আগ্রহ কমে যাচ্ছে। কল্পনার জগতে আটকে থেকে তাঁরা বাস্তব সম্পর্কের স্বাভাবিক আনন্দ থেকে দূরে চলে যাচ্ছেন।

সমাজতত্ত্ববিদ অধ্যাপক রাজীব দত্ত (Prof. Rajiv Dutta) মনে করছেন, “যৌনতা শুধুমাত্র শারীরিক প্রবৃত্তি নয়, এটি সামাজিক ভারসাম্যেরও একটি অঙ্গ। তরুণ প্রজন্ম যদি ক্রমশ যৌনতায় আগ্রহ হারায়, তবে জন্মহার হ্রাস পেতে শুরু করবে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভয়ঙ্কর হতে পারে। কয়েক দশক পরেই মানবসমাজ অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে।”
আবার এই পরিবর্তনকে বিশেষজ্ঞরা একদিকে মানসিকতার বদল হিসেবে দেখছেন, অন্যদিকে সামাজিক সঙ্কটের পূর্বাভাস হিসেবেও ব্যাখ্যা করছেন। তবে অনেকেই মনে করছেন, জেন জেড হয়ত যৌনতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন না, তাঁরা সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করছেন। যেখানে আবেগ, মানসিক সংযোগ ও পারস্পরিক বোঝাপড়াই মূল ভিত্তি হয়ে উঠছে। মনোবিদ ড. সুদীপ্তা ঘোষ বলেন, “যৌনতা মানবজীবনের স্বাভাবিক প্রবণতা। কিন্তু জেন জেড নিজেদের মতো করে সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করছে। তাঁরা হয়তো আবেগকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তবে সমাজের ভারসাম্য রক্ষার জন্য মানসিক ও শারীরিক উভয় দিকের সমান গুরুত্ব থাকা প্রয়োজন।”

তরুণ প্রজন্মের এই পরিবর্তিত মনোভাব হয়ত ভবিষ্যতের সম্পর্কের নতুন ছবি আঁকছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পর্কের গভীরতা ও সমাজের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে শরীরী খেলা ও আবেগ, দুইয়ের সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। না হলে আসন্ন প্রজন্মের কাছে ভালোবাসা হয়তো শুধুই মানসিক সংযোগে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।
সব ছবি: প্রতীকী।
আরও পড়ুন : Gen Z nightlife trend UK | ব্রিটেনের রাতের জীবনে ম্লান আলো : কেন ‘জেন জেড’ আর ‘মজা’ করতে আগ্রহী নয়?




