সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: রাজনৈতিক অঙ্গনে এক উল্লেখযোগ্য মুহূর্তের সাক্ষী থাকল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা। কোচবিহার দক্ষিণের বিজেপি বিধায়ক রথীন্দ্র বসু (Rathindra Basu) শুক্রবার ধ্বনি ভোটে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিধানসভার নতুন স্পিকার নির্বাচিত হলেন। প্রোটেম স্পিকার তাপস রায় (Tapas Roy) -এর তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হওয়া এই নির্বাচনে সর্বসম্মত সমর্থনেই স্পিকারের আসনে বসেন তিনি। প্রথমবারের বিধায়ক হয়েও এই গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে আসীন হওয়ায় রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। শুক্রবার সকালেই বিধানসভা কক্ষে অধিবেশন শুরু হয় ‘বন্দে মাতরম্’ সঙ্গীতের মাধ্যমে। এরপর নিয়ম মেনে স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। শাসকদল বিজেপির তরফে রথীন্দ্র বসুর নাম প্রস্তাব করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। সেই প্রস্তাবকে সমর্থন করেন দলের অন্যতম নেতা দিলীপ ঘোষ (Dilip Ghosh)। ধ্বনি ভোটের মাধ্যমে তাঁর নির্বাচনে অনুমোদন দেওয়া হয় এবং কোনও বিরোধিতা ছাড়াই তিনি নির্বাচিত হন।
উল্লেখযোগ্য বিষয়, স্পিকার নির্বাচনের সময় তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) -এর বিধায়কেরা শুরুতে উপস্থিত ছিলেন না। তবে পরবর্তী সময়ে তাঁরা বিধানসভায় যোগ দেন এবং এই নির্বাচনের বিরুদ্ধে সরাসরি আপত্তি তোলেননি। ফলে কার্যত সর্বসম্মতিক্রমেই স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। প্রাক্তন স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় (Biman Banerjee) রথীন্দ্র বসুকে শুভেচ্ছা জানান, যা রাজনৈতিক সৌজন্যের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবেই দেখা হচ্ছে। নির্বাচনের পর প্রথা অনুযায়ী মুখ্যমন্ত্রী ও বিরোধী দলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় (Shovan Deb Chattopadhyay) রথীন্দ্র বসুকে স্পিকারের আসন পর্যন্ত এগিয়ে দেন। এই দৃশ্য বিধানসভার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবেই বিবেচিত হয়েছে। এরপর স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে রথীন্দ্র বসু অধিবেশন পরিচালনা শুরু করেন। স্পিকার হিসেবে প্রথম সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে বক্তব্য রাখার অনুমতি দেন। শুভেন্দু অধিকারী তাঁর বক্তব্যে নতুন স্পিকারের প্রতি আস্থা প্রকাশ করে বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে এই বিধানসভা গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে রাজ্যের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিরোধী দলের মতামত প্রকাশের পূর্ণ সুযোগ থাকবে, তবে অকারণ বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে চলা উচিত।’
এরপর বিরোধী দলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় বক্তব্য রাখতে উঠে নতুন স্পিকারকে অভিনন্দন জানান। তিনি বিধানসভায় সুস্থ ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার উপর জোর দেন। তাঁর বক্তব্যের পর একে একে অন্যান্য দলের বিধায়কেরাও রথীন্দ্র বসুকে শুভেচ্ছা জানান। আইএসএফ (ISF) বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি (Nausad Siddiqui) এবং সিপিএম (CPM) বিধায়ক মহম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানও (Mohammad Mostafizur Rahman) বক্তব্য রাখেন এবং বিধানসভায় গণতান্ত্রিক আলোচনার পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানান।
রথীন্দ্র বসুর রাজনৈতিক যাত্রাপথও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। পেশায় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (Chartered Accountant) তিনি দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (RSS) -এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি কোচবিহার দক্ষিণ কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী অভিজিৎ দে ভৌমিককে (Abhijit De Bhowmik) ২৩ হাজারেরও বেশি ভোটে পরাজিত করে প্রথমবার বিধায়ক হন। সাধারণত স্পিকার পদে আইনজীবী বা আইনজ্ঞদের মনোনয়ন দেওয়ার একটি প্রচলিত ধারা রয়েছে। সেই প্রথা ভেঙেই বিজেপি রথীন্দ্র বসুকে এই পদে প্রার্থী করে। তাঁর আর্থিক ও প্রশাসনিক পটভূমিকে গুরুত্ব দিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে মনে করা হচ্ছে।
নতুন স্পিকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হল বিধানসভার কার্যপ্রণালীকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা এবং শাসক-বিরোধী উভয় পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। রাজনৈতিক মতভেদ থাকা সত্ত্বেও বিধানসভাকে কার্যকর আলোচনার জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা তাঁর দায়িত্বের অন্যতম প্রধান দিক। এই প্রেক্ষাপটে রথীন্দ্র বসুর নির্বাচনে এক ধরনের নতুন বার্তা উঠে এসেছে। প্রথমবারের বিধায়ক হয়েও গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব পাওয়ার ঘটনা রাজনৈতিক পরিসরে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। আগামী দিনে তাঁর নেতৃত্বে বিধানসভার কাজকর্ম কীভাবে এগোয়, তা নিয়েই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Vande Mataram mandatory in schools, Suvendu Adhikari decision | স্কুলে বাধ্যতামূলক ‘বন্দে মাতরম’: সোমবার থেকেই নতুন নিয়ম, শুভেন্দু অধিকারী -এর ঘোষণায় জোর চর্চা রাজ্যে




