Rabindranath Tagore death anniversary | ২২ শ্রাবণ: বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণ দিবস

SHARE:

ভোলানাথ আচার্য : ২২ শ্রাবণ বাংলা ক্যালেন্ডারের এই তারিখটি বাঙালির হৃদয়ে গভীর আবেগের স্পর্শ রেখে যায়। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের (ইং ১৯৪১) ২২ শ্রাবণ, পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চিরবিদায় নিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore)।

রবীন্দ্রনাথের জীবন ও মৃত্যু নিয়ে নানা গবেষণা, নানা বই, নানা প্রবন্ধ লেখা হয়েছে। কিন্তু তাঁর প্রকৃত প্রভাবকে এককথায় প্রকাশ করা অসম্ভব। তিনি ছিলেন এমন এক স্রষ্টা, নিজের জন্মভূমির মাটিকে ভালবেসে তাকে বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর কলমে বাংলা ভাষা পেয়েছে নতুন মানচিত্র, তাঁর সুরে পেয়েছে নতুন নদী, আর তাঁর স্বপ্নে পেয়েছে অনন্ত-দিগন্ত। আজ ২২ শ্রাবণ, আমরা যখন তাঁকে স্মরণ করি, তখন শুধু একজন কবিকে নয়, আমরা স্মরণ করি একজন চিরন্তন সত্তাকে। এমন সত্তা, যিনি মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকেন মানুষের হৃদয়ে, মানুষের সৃষ্টিতে, মানুষের প্রতিদিনের জীবনে।

এত বছর পরেও এই দিনটি বাঙালির অন্তরের ক্যালেন্ডারে শোকের হরফে লেখা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু একজন কবি ছিলেন না, ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, গীতিকার, সুরকার, দার্শনিক, চিত্রশিল্পী, শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক, তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ যুগের প্রতীক। বাংলা সাহিত্যের এই মহীরুহের প্রয়াণ দিবস তাই কেবল শোকের দিন নয়, এটি গভীর স্মরণ ও শ্রদ্ধারও দিন। ভুলে গেলে চলবে না, রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath) বাঙালির মানসপটে এমন এক সেতুবন্ধন রচনা করেছেন, যা বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও সৃষ্টিশীলতার সমস্ত শাখাকে জুড়ে দিয়েছে। তিনি শুধু গান ও কবিতায় সীমাবদ্ধ ছিলেন না, গড়ে তুলেছিলেন এক সম্পূর্ণ জীবনদর্শন। তাঁর লেখা “গীতাঞ্জলি” (Gitanjali) তাঁকে এনে দিয়েছে নোবেল পুরস্কার (Nobel Prize in Literature, 1913), আর তাঁর সৃষ্টি “জন গণ মন” (Jana Gana Mana) ভারতের জাতীয় সংগীত। পাশাপাশি “আমার সোনার বাংলা” (Amar Sonar Bangla) বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে বহন করছে তাঁর সুর-শব্দের অমর বার্তা। এমন স্রষ্টা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।

২২ শ্রাবণের সকাল বাংলা নীরব, ধীর লয়। আকাশে যদি মেঘও থাকে, তবুও বাতাসে যেন এক অনির্বচনীয় আবহ ভাসে। হাজারও মানুষ শান্তিনিকেতন আশ্রম প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়ায়, হাতে ফুল, কণ্ঠে গান, “মোর বিশ্বাস করো প্রভু, তুমি বেঁচে আছো হৃদয়ে।” প্রতিটি রবীন্দ্রভক্ত তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে, তাঁর জীবনের সঙ্গে, তাঁর স্বপ্নের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হন। এই দিনটি শুধু ব্যক্তিগত শোক নয়, সাংস্কৃতিক পুনর্মিলনও। কবির কবিতা, গান, নাটক, চিত্রকলা, শিক্ষা, সমাজভাবনা সব একসূত্রে এসে মিশে যায়। অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের দিনটি নিয়ে নানা ঐতিহাসিক স্মৃতি রয়েছে। ১৯৩৭ সালে অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সৃষ্টির জোয়ার থামেনি। শেষ বয়সেও তিনি লিখে গেছেন কবিতা, গান, প্রবন্ধ। তাঁর জীবনের শেষ কবিতাগুলোর মধ্যে ‘তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি’ কিংবা ‘জীবনের জ্যোতি’ এগুলো যেন মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে জীবনের জয়গান। ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮-এ যখন তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন বাংলার পরিবেশে যেন সময় থমকে গিয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর খবর মুহূর্তে কলকাতা (Kolkata) থেকে ঢাকা (Dhaka), লন্ডন (London) থেকে নিউ ইয়র্ক (New York) সহ বিশ্বের সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় কেবল একটি খবর, “বিশ্বকবি আর নেই”।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ২২ শ্রাবণ শুধু তাঁকে স্মরণ নয়, তাঁর অনন্ত জীবনের উদ্‌যাপনও। কারণ রবীন্দ্রনাথের লেখা, তাঁর সুর, তাঁর দর্শন আজও সমান প্রাসঙ্গিক। “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে” এই গান শুধু স্বাধীনতার লড়াই নয়, ব্যক্তির মানসিক মুক্তির পথও দেখায়। “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য” এই প্রার্থনা আজও প্রতিটি স্বাধীন চিন্তাশীল মানুষের স্বপ্ন। বাঙালির ঘরে ঘরে রবীন্দ্রনাথের অস্তিত্ব এতটাই গভীর যে, ২২ শ্রাবণ এলে অনেকে নিজের অজান্তেই তাঁর গান গুনগুন করে। স্কুল-কলেজে, সাংস্কৃতিক মঞ্চে, রেডিও-টেলিভিশনে শুরু হয় রবীন্দ্রস্মরণ। শান্তিনিকেতন থেকে শুরু করে কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি (Jorasanko Thakur Bari), প্রতিটি জায়গায় আয়োজন হয় বিশেষ অনুষ্ঠানের। কবি নিজেই বলেছিলেন, “মৃত্যু আমারে গ্রাস করিতে পারে, কিন্তু আমার গান বাঁচিয়া থাকিবে”। এবং সেটিই সত্য হয়েছে।

এই সময় দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের লেখা একটি চিঠি, একটি গান, একটি নাটক, একটি কবিতা আমাদের অন্তরের গভীরে নাড়া দিতে পারে। তাঁর শিক্ষা-দর্শন, যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে পড়াশোনার কথা বলা হয়েছে, যেখানে শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল তথ্য মুখস্থ নয় বরং মানুষ হয়ে ওঠা, আজও শিক্ষাবিদদের কাছে অনুপ্রেরণা। বিশ্বভারতী (Visva-Bharati University) তাঁর সেই স্বপ্নের বাস্তব রূপ, যা এখনও বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করে। ২২ শ্রাবণ তাই কেবল একটি ঐতিহাসিক দিন নয়, এটি বাঙালি আত্মার গভীরতম স্পর্শ। কবির শারীরিক উপস্থিতি আর নেই, কিন্তু তিনি যে সংস্কৃতির আলোকবর্তিকা জ্বেলে গিয়েছেন, সেটি আজও আলো ছড়াচ্ছে। তাঁর গান গেয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম শিখছে ভালবাসতে, প্রকৃতিকে অনুভব করতে, মানবতাকে শ্রদ্ধা করতে।

রবীন্দ্রনাথের জীবন ও মৃত্যু নিয়ে নানা গবেষণা, নানা বই, নানা প্রবন্ধ লেখা হয়েছে। কিন্তু তাঁর প্রকৃত প্রভাবকে এককথায় প্রকাশ করা অসম্ভব। তিনি ছিলেন এমন এক স্রষ্টা, নিজের জন্মভূমির মাটিকে ভালবেসে তাকে বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর কলমে বাংলা ভাষা পেয়েছে নতুন মানচিত্র, তাঁর সুরে পেয়েছে নতুন নদী, আর তাঁর স্বপ্নে পেয়েছে অনন্ত-দিগন্ত। আজ ২২ শ্রাবণ, আমরা যখন তাঁকে স্মরণ করি, তখন শুধু একজন কবিকে নয়, আমরা স্মরণ করি একজন চিরন্তন সত্তাকে। এমন সত্তা, যিনি মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকেন মানুষের হৃদয়ে, মানুষের সৃষ্টিতে, মানুষের প্রতিদিনের জীবনে। তিনি আমাদের শেখান, জীবন যতই ক্ষণস্থায়ী হোক না কেন, সৃষ্টির আলো চিরন্তন। আর তাই, ২২ শ্রাবণ যতবার আসবে, ততবার আমরা মনে মনে উচ্চারণ করব, “তুমি রবে নিরবে, হৃদয়ে মম”।

ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : The Heart Stone | Rabindranath Tagore : ‘দেবতারে প্রিয় করি প্রিয়েরে দেবতা’

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন