সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : একটা সাধারণ চিঠি বদলে দিতে পারে গোটা জীবনের গতিপথ। ইতিহাসের পাতায় এমন এক নাম হয়ে রইলেন প্রিয়া ঝিঙ্গান (Priya Jhingan), যিনি শুধু নিজের স্বপ্নই পূরণ করেননি, ভারতীয় সেনাবাহিনীর অচলায়তন ভেঙে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন। ভারতের সামরিক ইতিহাসে তিনি চিরকাল থাকবেন ‘লেডি ক্যাডেট নম্বর ১ (Lady Cadet No. 1)’ হিসেবে, যে নাম আজও প্রতিটি ভারতীয় মেয়েকে অনুপ্রেরণা দেয় নিজের সীমা ছাপিয়ে এগিয়ে যেতে। ১৯৯২ সালের আগে পর্যন্ত ভারতীয় সেনাবাহিনীতে (Indian Army) মহিলাদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ ছিল চিকিৎসক বা সেবিকা হিসেবে। জলপাই রঙের পোশাক পরে যুদ্ধক্ষেত্রের দায়িত্ব নেওয়া কেবল পুরুষদেরই অধিকার ছিল। সেই সময়েই এক হিমাচলি কন্যা ইতিহাস লেখার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর হাত ধরেই প্রথমবার মহিলা অফিসারদের প্রবেশাধিকার মেলে সেনাবাহিনীতে।
প্রিয়া ঝিঙ্গান জন্মেছিলেন এক পুলিশ অফিসারের পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল দেশসেবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তিনি ঠিক করে ফেলেছিলেন, জীবন উৎসর্গ করবেন দেশের জন্য। তবে সেনাবাহিনীতে মহিলাদের প্রবেশাধিকার না থাকায় একসময় তিনি হতাশ হয়েছিলেন। একদিন সংবাদপত্রে ভারতীয় সেনায় নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেখে মনে হয়েছিল, হয়তো এই স্বপ্ন কখনও সত্যি হবে না। কিন্তু ভাগ্যের লেখা অন্য ছিল।
প্রিয়া সেনাপ্রধানকে চিঠি লেখেন, ‘আমি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে চাই।’ কিছু মাসের অপেক্ষার পর তাঁর কাছে আসে উত্তরের চিঠি। ১৯৯২ সালে জজ অ্যাডভোকেট জেনারেল (Judge Advocate General – JAG) শাখায় অফিসার নিয়োগের সুযোগ আসে। প্রিয়া সেই পরীক্ষায় অংশ নেন, এবং সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি চেন্নাইয়ের অফিসার্স ট্রেনিং অ্যাকাডেমিতে (Officers Training Academy – OTA) প্রশিক্ষণ শুরু করেন আরও ২৪ জন মহিলা ক্যাডেটের সঙ্গে। সেটিই ছিল ভারতীয় সেনার প্রথম মহিলা অফিসার ব্যাচ। ১৯৯৩ সালে প্রশিক্ষণ শেষ করে প্রিয়া ‘ক্যাডেট নম্বর ১’ তকমা পান এবং জজ অ্যাডভোকেট জেনারেল শাখায় যোগ দেন।
প্রিয়ার সেনা জীবনের শুরুটা সহজ ছিল না। সামরিক পরিবেশে নারী অফিসারদের জন্য ছিল না কোনও প্রস্তুত কাঠামো। পুরুষপ্রধান বাহিনীর মধ্যে জায়গা করে নিতে হয়েছিল অগণিত চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে। কঠোর প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলার শৃঙ্খল, এবং মানসিক দৃঢ়তা, সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছিল এক অন্যরকম সৈনিক। এক সাক্ষাৎকারে প্রিয়া বলেন, “আমি কখনও ভাবিনি যে আমি ইতিহাস লিখছি। আমার মনে হতো আমি অন্য যেকোনও মানুষের মতোই যোগ্য। আমি শুধু আমার স্বপ্নের পথে হাঁটছিলাম।”
তাঁর এই অদম্য মনোবলই অন্য নারীদের কাছে হয়ে ওঠে প্রেরণা। সেনাবাহিনীর পুরুষ অফিসাররাও তাঁর নিষ্ঠা ও পরিশ্রমে মুগ্ধ হয়েছিলেন। প্রশিক্ষণের সময় তাঁর পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ; ভারতীয় মহিলাদের মধ্যে প্রথমবারের মতো রৌপ্য পদক জিতে ইতিহাস গড়েন প্রিয়া ঝিঙ্গান।
ভারতীয় সেনাবাহিনী তখনও মহিলাদের যুদ্ধক্ষেত্রে অনুমতি দেয়নি। ফলে প্রিয়াকে আইন স্নাতক হিসেবে জজ অ্যাডভোকেট জেনারেল বিভাগে নিয়োগ করা হয়। সেখানে তিনি সেনাবাহিনীর বিভিন্ন আইনি বিষয় সামলাতেন। দশ বছরের দীর্ঘ সেবা শেষে, ২০০৩ সালে মেজর (Major) পদে অবসর নেন। বারবার পদোন্নতির আবেদন করলেও তিনি দৃঢ়ভাবে কাজ চালিয়ে যান নিজের দায়িত্বে। তাঁর সেই অধ্যবসায়ই প্রমাণ করে, সেনাবাহিনীতে নারী মানে দুর্বলতা নয়, বরং নতুন সম্ভাবনার সূচনা।
অবসরের পর প্রিয়া নতুনভাবে জীবন শুরু করেন। প্রথমে হরিয়ানা জুডিশিয়াল সার্ভিসেস (Haryana Judicial Services) পরীক্ষায় পাশ করলেও যোগ দেননি। পরে সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং গ্যাংটক (Gangtok) -এর একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। এরপর শিক্ষকতা শুরু করেন সানওয়ারের লরেন্স স্কুলে (Lawrence School, Sanawar), ইংরেজি শিক্ষিকা হিসেবে। তিনি এখন তরুণ প্রজন্মকে নেতৃত্ব ও আত্মবিশ্বাসের প্রশিক্ষণ দেন। নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য একটি নিজস্ব প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছেন। তাঁর মতে, “সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কখনও চাপিয়ে দেওয়া যায় না। এটি হৃদয়ের ডাকে আসা এক যাত্রা। যদি সত্যিই পরিবর্তন আনতে চাও, তাহলে সশস্ত্র বাহিনী তোমার জন্য উন্মুক্ত।”
প্রিয়া লেফটেন্যান্ট কর্নেল মনোজ মলহোত্রা (Lt. Col. Manoj Malhotra)-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের এক পুত্রসন্তান রয়েছে। বর্তমানে চণ্ডীগড় (Chandigarh) -এ বসবাস করছেন প্রিয়া। এখনও তিনি সেই প্রেরণা, যিনি প্রমাণ করেছেন, একজন নারী ইচ্ছাশক্তি দিয়ে যে-কোনও প্রাচীর ভেঙে দিতে পারেন।তাঁর পদক্ষেপের ফলেই পরবর্তী প্রজন্মের ভারতীয় নারীরা সেনাবাহিনীতে সাহসিকতার সঙ্গে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন। প্রিয়া ঝিঙ্গান শুধু ভারতের প্রথম মহিলা সেনা অফিসার নন, তিনি এক অনুপ্রেরণার নাম, দেশের প্রতি নিষ্ঠা, আত্মবিশ্বাস আর অদম্য সাহসের দিক নির্দেশক।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ বাইশ-তম কিস্তি)




