মমতা রায়চৌধুরী-এর সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে সম্পর্ক বহু দিনের। কবিতা লেখার পাশাপাশি গদ্যেও সিদ্ধহস্ত। লিখেছেন বহু কবিতা, গল্প, উপন্যাস। পাশাপাশি শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। স্কুলের ছাত্রীদের সংস্কৃতি চেতনা বৃদ্ধি করতে ওঁদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। সাশ্রয় নিউজ-এর আজকের পাতায় রইল কবির কবিতা।
মমতা রায় চৌধুরী
স্বার্থপর
আশেপাশে লোকগুলোকে
চেনা যায় না আর
কেমন যেন মুখোশপরা
একটু স্বার্থে লাগলে আঘাত
তাবিদারির বহর দেখে
বিবেকে লাগে ঘা।
এখনি একরকম
তখনি অন্যরকম।
ইতি উতি পাতে উঁকি
ফিসফাঁস ফুসফাস কানে গুজি
কাকে বিশ্বাস
কাকে অবিশ্বাস
এযেন গোলক ধাঁধা।
আশেপাশে লোকগুলো
চেনা যায় না আর।
অন্য এক বসন্ত
প্রকৃতির অঙ্গে আজ
আবির রাঙা সাজ।
কৃষ্ণচূড়া শিমুল পলাশ
সেজেছে লাল পরাগ।
আমার মনে আজ
বসন্তের ঢেউ।
কোকিলের কুহুতান
পাতা ঝরা বিকেল
হাতে হাত চোখে চোখ
প্রীতি রাগে সারাক্ষণ।
হঠাৎ জানান দেয়
এ যে এক অন্য বসন্ত।
বারুদের গোলার স্তুপে
হারিয়ে ক্ষতবিক্ষত
সেই প্রিয় মুখ।
বসন্তের ঢেউ আজ
অন্য কথা বলে
হারিয়ে ও ফিরে আসি
কদর্যতার মাঝে।
কৃষ্ণচূড়ার রংগুলো
তাই ফিকে মনে হয়।
কবিতা ভাবনা ছুটি
ভাবনাগুলো যতই তোমায় দি ছুটি
তবুও মনের কোণে কাটো আঁকিবুকি।
সারাদিনের ব্যস্ততায় ফিরে ফিরে আসো
সন্ধ্যেবেলায় বাড়ি ফিরে জাঁকিয়ে তুমি বসো।
ক্লান্ত মন দীর্ঘ প্রতীক্ষায় খোঁজে প্রিয়জন
তুমি তার দোসর হয়ে আপনজন।
ভাবনা এবার তোমায় সত্যি দিলাম ছুটি
অলস দুপুরে এখন উপন্যাসে ডুবি।
প্রিয়জনের খুনসুটি আজ
তোমার থেকেও দামি।
তাই বলি ভাবনা তোমার ছুটি
যাও তো তুমি ধরিও না বিরক্তি।
ভুলেই তোমার অস্তিত্ব
তোমাকে বিশ্বাস করে
নিজেকে উজাড় করেছি।
তোমাকে বিশ্বাস করে
অস্তিত্ব ভুলতে বসেছি l
এগুলো সবই ভুল…
সব ভাল মুহূর্তগুলো
কখন কফিন হলো
বুঝতেই পারিনি।
তোমাকে ভালোবেসে
পৃথিবীর সব কিছুকে
দূরে সরিয়ে রেখেছি
সেগুলো সবই ভুল..
আজ বুঝি।
ভুল করতে করতেই
হয়তো নতুন পথের
সঠিক নিশানায় পৌঁছাব,
অতীতের স্মৃতি আঁকড়ে
বর্তমানে তোমার অস্তিত্ব।
আগামী ভোরের সূর্যোদয়
আজও উঠোনজুড়ে
তোমার স্মৃতি।
না ফোটা ফুলগুলি
তোমার আশাতেই গুনি।
দিন, রাত, মাস শুধু
হিমেল হাওয়ায় বান ডাকে
মনের আঙিনায়।
তোমার হাতে হাতটি রেখে
উষ্ণতার পরশ মেখে
মন চলে যায় দূর বহু দূরে।
আজও তাই উঠোন জুড়ে
ভোরের সূর্য আলো
ছড়িয়ে দেয় মন সাগরে
আগামী ভোরের সূর্যোদয়ে।
যদি পারতাম
যদি হতে পারতাম
তোমার উষ্ণ হৃদয়ে
একরাশ হিমেল বাতাস
গ্রীষ্মের নির্জন দুপুরে
আঁকতাম শীতল সোহাগ।
যদি হতাম শ্রাবণী সন্ধ্যার
বুক দুরু দুরু করা নিশ্বাস
এক বুক অক্সিজেনে
কাটাতাম চিরটাকাল।
তারপর…
যদি শরতের নীলকাশে
শুভ্র মেঘের পানসিতে
ভেসে যেতে পারতাম
বহু দূরে…
তাহলে আর আমার
নাগাল কে পায়।
যদি হতাম
পাড় গাঁয়ের মেঠো সুরে
অঘ্রাণের নবান্নে মেতে উঠতে
পরতে পরতে ছড়িয়ে দিতাম
তার গন্ধ হৃদয়কাশে।
যদি হতাম ফাগুন হাওয়া
তোমায় নিয়ে মাততাম
আবিররঙা পলাশে।
যদি পারতাম…
তোমায় ছুঁতে…
যদি পারতাম…
মুক্তি
জানি অকারণে ফোন
তোমাকে অস্বস্তিতে ফেলে
কিন্তু আমি যে তোমায়…
অথচ
আজ তুমি বোঝার বাইরে
তাই
মুক্তি দিলাম হেসে।
এখন তুমি
মুক্ত আকাশে বিহঙ্গ
বাঁধন ছাড়া
উল্লাসে উড়ান ডানা।
তবুও অস্থির সময়ে
যদি পড়ে মনে…
হলুদ খামে উড়িও
বসন্ত বিকেলের চিঠি।
দেখবে উঠোন জুড়ে
কুয়াশার চাদর সরিয়ে
সোনালী ভালোবাসার রোদ্দুর।
কবিতা অভিমানী মন
বর্ষা তোমার সঙ্গে আড়ি
তুমি যে বড্ড আসতে দেরি
হৃদয় জ্বলে ছারখার
প্রেমিক হৃদয় মরুভূমি
অভিমানে পাহাড় গড়ি ।
যতই তুমি মিষ্টি হাসো
দু’চোখেতে দৃষ্টি হানো
তবুও আমি গলছি নাকো।
ঘাম ঘামাচিতে নিত্য জ্বলি
পুকুর ঘাট শুকিয়ে গেলো
তবুও তোমার হুঁশ হলো না
চাতক পাখি আর বাঁচে না।
এবার তুমি সদয় হও
মৌসুমী বাতাস বইয়ে দাও।
বৃষ্টি নেমে তাড়াতাড়ি
জমিয়ে দাও আসর খানি
নইলে আর ভাব হবে না
এই কথাটি জানিয়ে রাখি।
তুমি কি এখনো ব্যস্ত
চিলেকোঠায় কামরাঙ্গা সূর্যের আলো
শ্রান্ত পাখিরা ফিরছে আস্তানায়
রাখাল গোরুর পাল নিয়ে বাড়ির পথে
উদাসী বাউল মনটা হু হু করে
তোমার চোরা মনের অলিন্দে ।
ঘুরে ফিরে প্রশ্ন জাগে
“তুমি কি এখনো ব্যস্ত?”
বিকেলের স্নিগ্ধ সূর্যের ম্লান আলো
জলরাশিতে আলপনা আঁকে তোমার প্রতিবিম্ব।
এক পলক দেখা, একটু কথা বলার অপেক্ষা
ছোট্ট ছোট্ট অনুভূতি জড়ো করি পাহাড় সমান,
শুধু তোমার অপেক্ষায়।
ব্যস্ত সময় ঝেড়ে মুখোমুখি পরস্পরে,
হাতে হাত চোখে চোখ নিরন্তর অনুভবে
ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে জানান দিয়ে যায়
আজ ও একান্তে তোমাকেই…
চিলেকোঠায় নিস্তব্ধতা
মাথা ঠুকে মরে আর প্রশ্ন করে
“তুমি কি এখনো ব্যস্ত?”
অপেক্ষার বৃষ্টি
আমি তোমার জন্য
হাজার বছর কাটাতে পারি
অপরিমেয় ভালোবাসায়।
শুধু তোমার অপেক্ষায়
সময়ও দাঁড়াবে থমকে।
শুধু এক পলক দেখার জন্য
ঘন্টার পর ঘন্টা, দিনের পর দিন
রাত জেগেছি, প্রহর গুনেছি।
তোমার মিষ্টি সুবাস পাবো বলে
ছুটেছি চিরপরিচিত নদীর ধারে।
উন্মত্ত উচ্ছ্বসিত ফেনিল কলতান
আর একবার বুকের মধ্যে তুফান
তুলে একাকার হব বলে।
আজও তোমার জন্য
রয়েছি অপেক্ষায় কখন দখিনা
বাতাস ভুলে যাবে ফিসফিসিয়ে
আমি এসেছি অপেক্ষার বৃষ্টি,
সকল ক্লান্তি হতাশার অবসানে।
এক আকাশ বৃষ্টি নামে
ঝর ঝরিয়ে পড়বে মাঠে ঘাটে
আমি জানি একদিন আসবে
ভালোবাসার চির প্রতীক হয়ে
বৃষ্টি হয়ে ঝরবে মাঠে ঘাটে।
কৃষক মনে আনন্দের বন্যা বইবে
নবান্নে গ্রামীণ মানুষেরা উঠবে মেতে।
তাই তো তোমার অপেক্ষায়
কবে তুমি আসবে
হিংসা দ্বেষ বিবাদ ভুলে
ভালোবাসার মৈত্রী বন্ধনে।
সুখ সাগরে ভাসিয়ে দিতে
ধরার বুকে হাসি ঝরাতে।
আমি সেই দিনটার অপেক্ষায়
শুধু তোমার জন্য
কবে অপেক্ষার বৃষ্টি ঝরবে।
কালবৈশাখী হয়ে এসো
আমি এখন কালবৈশাখীকে চাই
জীবনটাকে নতুন করে সাজাতে
যা কিছু জরা জীর্ণ তার অবসানে।
দগ্ধে দগ্ধে শেষ হয়ে যাওয়া
পোড় খাওয়া একটা মানুষ
আবার ঘুরে দাঁড়াতে
কালবৈশাখীকেই চাই।
হোক না সে কঠিন
যতই হোক তার ধ্বংসাত্মক রূপ
সবশেষে সেই রেখে যায়
নতুন বীজের অঙ্কুরোদগমন।
তাই কালবৈশাখীকেই চাই
নব আনন্দে নব উল্লাসে মেতে উঠতে।
কখন যে ভালো লেগে গেল
ঠিক সময়টা মনে নেই
কখন তোমাকে ভালো লাগলো…
মন চোরাবালিতে ফল্গুধারার
যে ভালোবাসার স্রোত বইছিল,
একসঙ্গে বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে
কখন দু’জনার হাত ধরেছি
এক সুরে তার বেঁধেছি,
মনে করতে পারিনা ।
তবে বর্ষার প্রথম কদম ফুলের গন্ধ
অনাঘ্রাতা মনে দুজনারই লেগেছিল
এক অনর্বচ্চনীয় অনুভূতি।
পড়ন্ত বিকেলে ম্লান সূর্যের আলো
শুধুই মনে করায় তোমার কথা।
কালবৈশাখী ঝড়ের পূর্বাভাসে
তোমার আগমনী বার্তা আসে ভেসে।
শরতের শুভ্র মেঘের ভেলা নিয়ে
পৌঁছে যেতে ইচ্ছে করে তোমার কাছে।
কিন্তু…
কখন যে ভালো লেগে গেল
মনে করতে পারি না।
এটাই হয়তো ভালোবাসা এটাই হয়তো প্রেম
তাই তো তোমার একটা শব্দ শোনার জন্য
উদাসী বাউল মন এত ব্যাকুল হয়ে ওঠে।
মনে হয় দিঘির থেকে ভেলা নিয়ে
পৌঁছে যাই মন সাগরে।
[লেখা পাঠান 👉 স্থানীয় সংবাদ, স্বরচিত কবিতা, স্বরচিত গল্প, স্বরচিত উপন্যাস, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনী… । ই-মেল : sasrayanews@gmail.com ]




